বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার জন্ম ৯০ এর দশকে। আমি মারভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের সাথে পরিচিত, ডিসি ইউনিভার্সের সাথে পরিচিত। কিন্তু গেম অফ থ্রোনস কি তা জানিনা। ঠিক সেভাবেই জানিনা যেভাবে তোমরা ম্যাকগাইভার, আলিফ লায়লা এবং নতুন কুঁড়ি সম্পর্কে জানোনা।
লটারি বিজেতা জসিম কে নিয়ে যখনতখন বিনোদন নাও, ইউটিউব ঘাটলেই ফানি ক্লিপও পেয়ে যাও। সহজেই রিফ্রেশমেন্ট হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের বেলায় রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য ঘরের চালে উঠে এন্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করতে হত, "এইবার?"। আমরা এই পেটমোটা ফ্যামিলি প্যাকের নায়ককে দেখতেই তখন খেলাধুলো পজ করে এন্টেনা ঘুরাতাম। একজনকে টিভির সামনে বসিয়ে রাখতাম সেসময়, যাতে করে এডভারটাইজ শেষ হলে আমাদেরকে ডাক দিতে পারে আর আমরা খেলা রেখে টিভির সামনে বসতে পারি। এখনকার বিনোদন আর তখনকার বিনোদনের মধ্যে হারিয়েছে শুধু কিছু সোনালী স্মৃতি।
এখন ইউটিউবে বা বিভিন্ন লাইভ স্ট্রিমিং এপে তোমরা যখন ইচ্ছা হলেই কোন ভিডিও বা তার থিম সং শুনতে পারো অনায়াসে। আমাদের বেলায় ব্যাপারটা ছিল এমন যে টিভির মালিক যদি বলতো, এখানে বসে বসে আলিফ লায়লা দেখবি আর বাদামগুলো প্যাকেটে ভরে মুখ আগুনে পুড়িয়ে বন্ধ করে দিবি, তো আমরা তাই করতাম। কতদিন অন্যের জানালায় দাঁড়িয়ে থুথু গায়ে মেখেছি! পরক্ষণেই ফোকলা দাতে আবার জানালার সিক ধরে দাঁড়িয়েছি। তখনকার দিনে সবচেয়ে আনন্দ দিত "আলিফ লায়লা, আলিফ লায়লা, আলিফ লাআআআয়লা" নামের গান আর মাথায় ওড়না দেওয়া মহিলার কথা যে বলতো "প্রিয় দর্শকমণ্ডলী, এখন দেখবেন পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি...।" আমার মনে আছে, যখন বিটিভি তে সিনেমা হতো তখন কোন মানুষজন পাওয়া যেত না রাস্তায়। এমনকি পাড়ার সবচেয়ে খেলাপ্রিয় ছেলেগুলোও খেলা বাদ দিয়ে ধুলো মাখা হাফ প্যান্ট পরে কারোর ঘরের মেঝেতে বসে সিনেমা দেখতে ব্যস্ত থাকতো। নাহলে সিনেমা শেষ হলে বন্ধুদের সাথে গল্প বলায় ক্যাচআপ করবে কিভাবে? এরকম কত হয়েছে যে সিনেমার ফাকে ফাকে বিরতিতে খেলা করতে গিয়ে পরে আর ব্যাট পাইনি, সারাদিন ফিল্ডিং ই করেছি।
বৃহস্পতিবার ছিল আমাদের মত ফাঁকিবাজ ছাত্রদের জন্য আদর্শ দিন। স্কুল ছুটির পর প্লাস্টিকের স্লেট হাওয়ায় উড়িয়েছি কত! রোজই প্রায় স্লেট ভাঙতো। পরেরদিন যেটুকু অবশিষ্ট থাকতো তাতেই লিখতাম অ আ ই ঈ। এখনকার মত তখন প্রিক্যাডেট, লিডেন গ্রামার আর নার্সারি ছিল না। তখন তো ছিল ছোট ওয়ান বড় ওয়ান। তোমাদের মত পেট থেকে পড়েই কলম পেন্সিল ধরিনি। চক দিয়ে লিখতাম অর্ধেক তো খেয়ে ফেলতাম বাকি অর্ধেক। হাতে খড়ি দিয়েছিল আমাকে এক স্যার যিনি আমার মায়েরও হাতে খড়ি দিয়েছিলেন। বড় এক কাঁঠাল গাছের তলায় আমার হাতে খড়ি হয়েছিল। সেদিন থেকেই শুরু। এখনকার মত ব্রো ছিল না, ছিল সব ভাই। জিম, লিখন, আলিম, সাকিব, শৈশব, রিয়াদ, মুন্না, ভাইপো আরো অনেকে। তখনকার দিনে আমাদের কাছে দুটো জিনিস ছিল সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত। এক হল স্লেট মোছা তুলি, আর দুই হল চুম্বক। এই দুটো জিনিস পেলে ৯০ এর দশকের ছেলেরা হুমড়ি খেয়ে পড়তো। তাদেরকে খুশি করা হয়তো এযুগের আইপ্যাড ডিমান্ড করা ছেলেদের চেয়ে সোজা ছিল। শুধু একটা চুম্বকে দড়ি লাগিয়ে দাও আর তিনবেলা খেতে দাও। বাকি সময় তোমার যে একটা ছেলে আছে সে কথা মনে না রাখলেও তোমার চলবে, এরকম ছিল আমাদের লাইফ।
কাঁঠাল গাছ দেখতে কেমন তা এই জেনারেশন না চিনলেও ৯০ এর দশকের ছেলেরা ঠিকই কাঁঠালের পাতা দিয়ে চাড়া খেলেছে। চাড়া খেলাটা হল হাতে কাঁঠাল পাতা নিয়ে অন্যের চাড়ার চার আঙুল কাছে চাড়া ফেলে প্রতিপক্ষের পাতা জিতে নেওয়া। তোমরা যেভাবে অস্ট্রেলিয়া ভার্সেস ইন্ডিয়ার ম্যাচে বেট করা টাকা হেরে গিয়ে মর্মাহত হও, আমরা সেভাবেই মর্মাহত হতাম এই কাঁঠালের পাতা হেরে গেলে। কিছুকিছু একরোখা ছেলে ছিল, যারা হেরে যাওয়ার পর গায়ের জোরে বলতো, "তুই দাড়া, আমি আরো পাতা আনবো। খেলে যাবি।" প্রতিপক্ষ যদি বলে খেলবোনা তাহলে সে আবার বলবে, "খেলবিনা মানে? তোকে খেলতে হবে নাহলে তোর খবর আছে।" আমরা কাঁঠাল পাতার জন্য, গুটি কয়েক কাচের মার্বেলের জন্য মারামারি করেছি, শার্ট প্যান্ট ছিঁড়েছি কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা কখনো খুন করিনি যেমনটা তোমরা কর সামান্য কয়েকটা নেশার টাকার জন্য। আমরা তো শুধুই মুখে বলতাম, "তোকে ফাকাই পেয়ে নিই, তুই স্কুল আসিস কাল।" কিন্তু তোমাদের মত কখনওই ভিড়ের মাঝে কারোর পেটে চাকু ঢুকাইনি। আমরা পরেরদিন সব ভুলে আবার স্লেট উড়াতাম। একসাথে ঘাড় ধরে বাড়ি আসতাম।
ঈদের আগের রাত মানে চাঁদরাত ছিল আমাদের জন্য একটা আশীর্বাদ। কারণ এই একটাই দিন ছিল যেদিন এলাকার সবচেয়ে জঘন্য মানুষের বাড়ির উঠানে বাজি ফুটিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম। জঘন্যতার পরিমাপ হতো কে কত বেশি আমাদেরকে খেলায় বাধা দিত সেই হিসেবে। টিফিনের টাকা জমিয়ে প্রতি ঈদেই বন্ধুরা মিলে বাজি কিনতাম। দেয়াড়ে (নদীর তীরে) ছুটতাম মাগরিবের কিছু আগে। কারণ ওখান থেকেই বেশি ভাল করে চাঁদ দেখা যায়। আমরা চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য বসে থাকতাম না, আমরা হেডলাইন না দেখে চাঁদ দেখতাম। ঈদের দিন স্টল দিতাম। চিপস, জুস, প্যাটিস আর কোমল পানীয়জলের খেলা নিয়ে চলতো স্টলের কাজ কারবার। আমরা এই জেনারেশনের মত হ্যাশট্যাগ দিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে ছবি আপলোড দিয়ে ফেক চিল, মজা মাস্তির জানান দিতাম না। আমরা আসলেই মজা করতাম। কিন্তু কাউকে দেখাতাম না।
শীতকাল ছিল অন্যতম একটা আবেগ। শীতকালে আমরা স্কুলে যেতাম খেলা করার জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই সময়েই "অফিসার" নামক এক ভয়ানক জন্তু আসতো স্কুলে যাকে জীবনেও কোন ছাত্র দেখেছে কিনা সন্দেহ। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এই অফিসারদেরকে চেনে না, কারণ তারা আমাদের সাথেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্কুলের ক্রিকেট খেলায় ১১+১১ ২২ জন প্লেয়ারের বদলে খেলতাম ২৫+২৫ ৫০ জন। এখানে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে কখনওই গণ্য হতোনা। যে দলের গায়ের জোর বেশি, তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল। আমরা তোমাদের মত গলায় বেধে পানির বোতল আর বাক্স ভরা টিফিন আনতাম না। কারণ আমরা পেট ভরাতাম টিফিন পিরিয়ডে হয় খেলাধুলা করে, নাহলে মারামারি করে। ওইযে, এই টাইমে সবাই সবাইকে ফাকায় পায়।
তখন ১ টাকায় ৮ টা চকলেট পাওয়া যেতো। হসপিটালে গেলে ফ্রি ফ্রি চুলকানির ওষুধ পাওয়া যেত। ব্রিজের উপর থেকে ঝাপ দিলে ঘন্টা দুয়েক পর নাকের নিচে কাদার গোফ পাওয়া যেত। কিন্তু হাজার খুঁজলেও এখনকার মত পকেট ভর্তি ইয়াবা আর ফোন ভর্তি পর্ন পাওয়া যেত না। আমার যখন এলার্জি হত, আমি হাসপাতালে এসে চুলকানির ওষুধ নিতাম। তারপর বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাতে পানি, হলুদ, লবন, তেল, ইটের গুঁড়ো, ঝালের গুঁড়ো আরো কত কি মিশিয়ে সিরাপ বানাতাম। এরপর তা পুকুরে ঢালতাম মাছদেরকে খাওয়ানোর জন্য। ও হ্যা, আমরা মাছ ধরতাম। ঠ্যালা জাল চেনো? তিনকোণা নীল রঙা জাল। তখন পুটি মাছ পেয়ে যেন ইলিশের আনন্দ নিতাম।
সন্ধ্যে হলে অপেক্ষায় থাকতাম, কখন জোরে জোরে বাতাস ওঠে আর এই বিশ্রী ব্যাপার (পড়ালেখা) শেষ হয়। সন্ধ্যায় যখন আশেপাশে কেউ থাকতো না, তখন বইয়ের ভেতরের ময়ূর বের করে মাপতাম। এরপর তাকে চকের গুঁড়ো খেতে দিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিতাম। আমরা ভাবতাম ময়ূর বড় হয়। যার কাছে যত ময়ূর তাকে ততো সমীহ করে চলতাম যদি সে দয়া করে একটা ময়ূরের বাচ্চক দেয়! এভাবেই আমাদের গল্পে ময়ূর আর চকের গুঁড়ো মিশে আছে যার গন্ধ আমরা এখনো পাই প্রতিটা বইয়ের পাতায়। তোমরা যখন চিনি দেখলে কোকেন বলে মনে কর, আমরা ৯০ এর দশকের ছেলেরা প্রথমে তাকে চকের গুঁড়ো ভাবি। এটাই আমাদের সরলতা। রাত পেরিয়ে দিন হলে বা দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হলে আমরা পলিথিন জোগাড় করতাম। আগুন জ্বালাবার জন্য। মা বলতো উলের সোয়েটারে নাকি আগুন লাগে তাই সোয়েটার খুলে আমরা আগুনের কাছে যেতাম। আগুনের ভেতর থেকে হাত পা ঘুরিয়ে আনা আর সুচ দিয়ে আঙুল এর চামড়া ফুটো করে গেথে রাখা ছিল তৎকালীন সময়ে স্মার্টনেসের সর্বোচ্চ নিদর্শন। আগুন জ্বালালে তাতে নষ্ট কলম পোড়ানো ছিল ট্রেন্ড। এই জেনারেশন কখনওই জানবে না পলিথিন আর কলম পোড়ার গন্ধ, কিভাবে চামড়ায় সুচ আটকে রাখা যায় তা তারা শিখে নিতে পারবে কিন্তু রোমাঞ্চকর কোন অনুভূতি পাবেনা। কারণ তারা এখন রোমাঞ্চ পায় ইরোটিক ক্লিপ আর সবজী লাল পানি খাওয়াতেই।
আমরা দেখেছি কিভাবে কেরোসিন আনার জন্য কাচের স্প্রাইটের বোতলের মাথায় দড়ি বাধা হতো। আস্তে আস্তে কিভাবে দড়ি কালো হয়ে যেত আর বোতলের গায়ে ময়লার আবরণ পড়তো। ২০০০ সাল কখনওই জানবে না ষ্টোভ নেভানোর পর কেরোসিন পুড়ে কেমন সুঘ্রাণ বের হয়, সন্ধ্যাবেলায় প্রতিটা বাড়ি থেকে কিভাবে এক এক্কে এক, দুই এক্কে দুই পড়ার আওয়াজ ব্যাঙ এর ঘেংর ঘেংরকে হার মানায়, এরা কখনওই ধারাপাত বই চিনবে না। এরা জানে ইউটিউবের টিউটোরিয়াল, সারাদিনের স্কুলে পরে থাকা মোজার গন্ধ আর বিদেশী রাইটারের বই।
সময় পাল্টেছে, আমি যুগের দোষ দেবোনা, সময়ের দোষ দেব না, এই জেনারেশনের দোষ দেব না। দোষ দেব আমাদের, দোষ দেব এই ৯০ এর দশককে। কেন তারা এত সুন্দর ছিল যে পরবর্তী দিনগুলোকে তাদের ধারে কাছেও আসতে দিল না? সেই দিনগুলো ফেসবুক ইউটিউবে বন্দী ছিল না তাই আমাদের শৈশব কেটেছে মাঠেঘাটে, হাওড় বাওড়ে, আগুনে পানিতে, জলাজঙ্গলে। তোমরা তোমাদের গেম অফ থ্রোনস, ইউটিউব আর ফেসবুক দিয়ে আমাদের ম্যাকগাইভার, আলিফ লায়লা আর নতুন কুঁড়িকে চাপা দিতে পারবা কখনো? কি মনে হয়? পারবা?
"আমি ৯০ এর দশক বলছি"
লেখক - তানভীর রহমান
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now