বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"আলামেলাম্মার অভিশাপ"
রাখী নাথ কর্মকার
-----------------------
“তালিকা মারালাগলি
মালাঙ্গি মাদুভাগলি
মাইসুরু ধরেগালিগে মাক্কালাগাড়ে হোগালি!”
নিঝুম কীর্তিনারায়ণ মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ তালিকাড়ের রুক্ষ প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল অন্বেষা! চারিদিকে নিঃসঙ্গ, উদাসীন বালির আস্তরণে ডুবে থাকা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাঙাচোরা পাথরের পিলার, স্থাপত্যের ছিন্ন-ছিন্ন টুকরো, তারই মাঝে চেনা অচেনা সবুজের ফাঁকে দূরে ইউক্যালিপটাস গাছের শরীর মৃদুমন্দ শিরশিরে হাওয়ায় দুলে চলেছে। মহীশূর থেকে প্রায় ৪৫ কিমি দূরে, কাবেরী নদীর বামতীরে এক বালুকাময় ছোট্ট শহর তালিকাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে কখন যেন অজান্তেই আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম সুদূর অতীতের আনাচেকানাচে। “কী? কী বললি?” অন্বেষার মুখ থেকে দুর্বোধ্য শব্দগুলো শুনে বেশ সচকিত হয়ে আমি প্রশ্নটা করলাম।
আমার উপস্থিতিটাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেই অন্বেষা এবার যেন আত্মস্থের মত বলে উঠিল, “অভিশাপ! অভিশাপ! অভিশাপ!”
“আরে, কী বলছিসটা কী, একটু খোলাসা করে বল না বাবা! কিছুই তো ছাই বুঝছি না!” আমি চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলাম। আমার কথার এবারও সরাসরি কোন উত্তর দিল না ও, ঝিরঝিরে হাওয়ায় এলোমেলো চুলটা ঠিক করতে-করতে উলটে আমাকেই প্রশ্ন করল, “আজ সকালের নিউজটা দেখেছিস? মাইসোরের আলামেলাম্মা টেম্পল থেকে দুদিন আগেই কিছু মূল্যবান অলঙ্কার খোয়া গিয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র দুটি বহুমূল্য আংটি উদ্ধার হয়েছে। একটা টেব্লঘড়ির মধ্যে করে পাচার করার চেষ্টায় ছিল দুষ্কৃতীরা। মাইসোর এয়ারপোর্টে ধরা পড়েছে একজন। তার কাছ থেকেই এই আংটিটা পাওয়া গিয়েছে। তবে ব্রিজরাজ নামের ওই ধৃত লোকটা কিন্তু কেবলই বলে যাচ্ছে সে নাকি কিছুই জানে না, পুরনো বাজারে গতকাল এক ব্যক্তি নাকি বলেছিল, টাকার বিনিময়ে এই টেবলঘড়িটা একজনকে পৌঁছে দিতে। সেই ব্যক্তিটি নাকি তার সঙ্গেই এয়ারপোর্টে এসেছিল, সে মালসুদ্ধ ভেগেছে। কিন্তু ঐ ব্যক্তিটির যে ঠিকানা বা ফোন নাম্বার এই ব্রিজরাজ দিয়েছে, তা সবই ভুয়ো! ব্রিজরাজকে ধরা পড়তে দেখেই হয়তো পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার মতলবে সে রেস্টরুমে নিজের জিনসের জ্যাকেটটা খুলে রেখে সটকেছে৷ কিংবা তাড়াহুড়োয় ফেলে গিয়েছে। সে যাই হোক, মোদ্দা কথা, তার জিনসের জ্যাকেটটা শুধু পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে, তবে লোকটিকে এখনও ট্রেস করা যায়নি। আর বেঙ্গালুরুতে যার কাছে ব্রিজরাজের জিনিসটি পৌছে দেওয়ার কথা ছিল, সেই লোকটিরও কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।”
“সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু অভিশাপের কথা কী বলছিলি? আমি রীতিমত অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলাম।
“ধৈৰ্য ধরো হে বৎস, সে এক ভয়ঙ্কর, দুৰ্ভাগ্যজনক গল্প! তবু যদি শুনতেই চাস বেশি ডিটেলে না গিয়ে বলি, মহীশূরের প্রথম রাজা ছিলেন যদুরায় ওডেয়ার, তিনি ১৩৯৯ সালে মহীশূরের সিংহাসনে বসেছিলেন। এই ওডেয়ার বা ওডিয়ার রাজবংশের প্রথম রাজাই ছিলেন ওডেয়ার। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এই রাজা ১৫৭৮ থেকে ১৬১৭ সাল অবধি রাজত্ব করেছিলেন। ১৬১০ সালে তিনি তদানীন্তন বিজয়নগরের ভাইসরয় তিরুমালার কাছ থেকে শ্ৰীরঙ্গপত্তনমের দুর্গটি দখল করে নেন। যুদ্ধে তিরুমালা নিহত হন। এই তিরুমালার স্ত্রী আলামেলাম্মা ছিলেন শ্রীরঙ্গনায়কি দেবীর একান্ত ভক্ত। রঙ্গনায়কি দেবী ছিলেন বিখ্যাত আদি-রঙ্গা মন্দিরের দেবতা শ্ৰীরঙ্গনাথের স্ত্রী বা সহচরী। তাঁকে অনেকসময় তামিলভাষায় “থাইয়ার” অর্থাৎ ‘পবিত্ৰ মাতা’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। লক্ষ্মীরই এক রূপ এই দেবী রঙ্গনায়কি বা রঙ্গনাচিয়ার! শোনা যায় স্বামীর মৃত্যুর পর আলামেলাম্মার তাঁর সমস্ত মূল্যবান অলঙ্কার তাঁর আরাধ্য এই দেবীর চরণে সমৰ্পণ করেছিলেন, তবে সেগুলির দেখাশোনার ভার কিন্তু তিনি কারও হাতে ছাড়েননি। এদিকে সেই অলঙ্কারের লোভে রাজা ওডেয়ার হয়ে উঠলেন নাছোড়বান্দা। ওই অলঙ্কার তার চাই-ই-চাই! তাই প্ৰথমে রাজা সরাসরি আলামেলাম্মার কাছে অলঙ্কারগুলির স্বত্ত্ব দাবি করলেন, কিন্তু আলামেলাম্মা তাতে কৰ্ণপাতই করলেন না। রেগে গিয়ে রাজা এবার সেগুলি জোর করে হস্তগত করার জন্য লোক পাঠালেন। এদিকে আলামেলাম্মাও অত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি এক রাতে, তাঁর কাপড়ের মধ্যে সেই সমস্ত অলঙ্কার বেঁধে এই তালিকাড়ের তীর থেকেই ঝাঁপ দিলেন কাবেরীর ঘূর্ণিজলে। আর শেষমূহুর্তে সেই ক্ষুব্ধ, বিপদগ্ৰস্ত রাজমহিষী এই অভিশাপ দিয়ে গেলেন “তালিকাডু মারালাগলি মালাঙ্গি মাদুভাগালি মাইসুরু ধরেগালিগে মাক্কালাগাড়ে হোগালি!” কানাড়া ভাষায় যে কথাগুলির মানে হল ‘তালকাড় বালুকাময় এক মরুভূমিতে পরিণত হবে, মালাঙ্গিকে (কাবেরীর তীরে এক ছোট্ট গ্রাম) গ্রাস করবে এক জলাবর্ত, আর মহীশূরের রাজাদের কখনওই সন্তান হবে না!" এই যে দেখছিস এই কীর্তিনারায়ণ মন্দিরটি, যেটি ১১১৭ সালে, হোয়সল রাজবংশের রাজা বিষ্ণুবৰ্ধন চোল রাজাদের হাত থেকে তালকাড় দখল করার পরে স্থাপন করেছিলেন, এই মন্দিরের আনাচেকানাচেও মিশে আছে। সেই অভিশাপের দীর্ঘশ্বাস!”
“জনিস ইমলি, বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যারও অতীত এই অভিশপ্ত আখ্যান. গত কয়েক শতাব্দী ধরেই এই তালকাড়ুর বালি খুঁড়ে উদ্ধার হয়েছে নানা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, এখানে নাকি ৩০টির বেশি মন্দির ছিল, যার অধিকাংশই চলে গিয়েছিল বালির তলায়। সেই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই নাকি মালাঙ্গির কাছে কাবেরী নদীর জলাবর্ত এক ভয়াল রূপ ধারণ করে এবং গ্রামটির কিছু অংশ জলের তলায় চলে যায়। আর মহীশূরের রাজবংশে প্রতিটি অল্টারনেট জেনারেশন অর্থাৎ পৰ্যায়ক্রমিক প্রজন্মে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিয়েই চলেছে, এই ৪০০ বছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ন্যাচারাল জিওলজিক্যাল কারণ দেখিয়ে অভিশাপের প্রথম দু’টির ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও রাজপরিবারের ইতিহাসে এই দীর্ঘ সন্তানহীনতার ব্যাখ্যা আজ অবধি কেউ করতে পারেনি। এমনকী কিছুদিন আগেই দেহ রাখলেন যে রাজা জয়চামরাজেন্দ্ৰ একমাত্র পুত্র রাজা শ্ৰীকান্তদত্ত, এই শ্ৰীকান্তদত্তেরও কিন্তু কোনও সন্তান হয়নি। তবে তিনি মৃত্যুর আগে অবধি কোন দত্তক নেননি। তার কারণ, তিনি নাকি স্বপ্নে দেখেছিলেন, দেবী আলামেলাম্মা নাকি এই অভিশাপ তুলে নিচ্ছেন। যদিও এখনও অবধি তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই অগত্যা সিংহাসনে বসেছেন তাঁর বড়দিদির নাতি যদুবীর।”
“কিন্তু তারপর সেই প্রথম রাজা ওডেয়ারের কী হল?” আমি উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
“তারপর নাকি রাজা অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসেন এবং মহীশূর প্যালেসের মধ্যেই আলামেলাম্মার একটি সোনার মূর্তি স্থাপন করেন, যা নাকি এখনও প্যালেসে প্রতিনিয়ত পূজিত হয়। এই আলামেলাম্মা মন্দিরের দায়িত্বভার ন্যস্ত আলামেলাম্মার আইনি উত্তরাধিকারদের হাতে যারা মহীশূর প্যালেস ফোর্টেই থাকেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে তারাও একইভাবে এই অভিশাপে অভিশপ্ত। সন্তানহীনতার অভিশাপ এই পুরোহিত আর কেয়ারটেকারদেরও নাকিরেয়াত করেনি। এদিকে রাজা ওডেয়ার মেলকোটের চেলুভানারায়াণা স্বামী মন্দিরে নিজেকে সমর্পণ করলেন। একান্ত ভক্ত হিসেবে তিনি নাকি প্রতিদিনই দেবদর্শন করতে যেতেন। অবাক ব্যাপার কি জানিস, রাজার মৃত্যু নিয়েও এক অদ্ভূত কাহিনি আছে। শোনা যায়, ১৬৭১ সালের একটি স্মরণীয় দিনে, রাজা মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। অথচ আর বেরিয়ে আসেননি। মন্দিরের সেবায়েত, পুরোহিতরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নাকি রাজাকে আর দেখতে পাননি। অবশেষে হিন্দু ঐতিহ্য মেনেই রাজার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।”
থমথমে প্রান্তরে সন্ধের অন্ধকার নেমে আসছিল অজান্তে। মা-বাবা, পিসি-পিসেমশাই সকলেই কখন জানি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে এক অভিশপ্ত রাজবংশের এই গা ছমছমে কাহিনি শুনছিলেন। এবার পিসেমশাই তাড়া লাগাতে শুরু করলেন, “আর দেরি করলে চলবে না। এবার হোটেলে ফিরতে হবে আমাদের। আগামীকাল আমাদের বৃন্দাবন গার্ডেন এবং আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় যাওয়ার আছে।
সারাদিন খুব জার্নি আছে। আজ তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরে ঘুম দিতে হবে। পরশুই আবার আমাদের ফেরার ফ্লাইট...”
ফেরার কথা শুনতে মোটেই ভাল লাগছিল না আমার। কিন্তু বিলক্ষণ জানি, সময়ের গতি দুর্নিবার, কীভাবে যে এই কাঁটা দিন কেটে গেল! পুজো শেষে দিনকয়েকের ছুটিতে আমরা এই দুটি পরিবার এসে পৌঁছেছিলাম মহীশূর।
ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকে প্ল্যানটা অবশ্য অন্বেষাই ছকেছিল। এখন বুঝতে পারছি মহীশূরের এই ইতিহাসই ওকে টেনে নিয়ে এসেছিল। এখানে। আমার যদিও প্রাথমিক পছন্দ ছিল পাহাড়। তবে অন্বেষার কথায় সেই মত বদলাতে দেরি করিনি। ভাগ্যিস! না হলে এত কিছু জানা বাকি থেকে যেত। এরই মধ্যে অবশ্য সোমনাথপুর টেম্পল, চামুন্ডেশ্বরী টেম্পল, মাইশোর প্যিলেস সহ বেশ কিছু দ্রষ্টব্য স্থান আমাদের ঘোরা হয়ে গিয়েছে। শান্তশিষ্ট এই শহরটি এই ক’দিনে আমার খুব ভাল লাগার শহর হয়ে উঠেছে। সকালের নরম রোদুরে ঝালাসে ওঠা হোটেলের জানালায় নীলাকাশের হাতছানি। পথের আনাচেকানাচে কমলা আবেলি আর সাদা জুঁইফুলের থোকার ভারে সেজে থাকা দক্ষিণী মেয়েদের কালো চুলের ঢল, মাটির মানুষগুলোর আন্তরিকতা, এই সবের মাঝেই আজ হঠাৎ অভাবিতভাবে কোথায় যেন খুঁচিয়ে উঠল এক ভয়ানক অভিশাপের বীভৎসতা!
ভোররাতে ঘুমিয়ে—ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম আমি, সর্বাঙ্গ দামী গয়নায় সুসজ্জিতা, ধবধবে সাদা সিল্কের শাড়ি পরিহিতা এক রাজমহিষী এসে দাড়িয়েছেন আমাদের হোটেলের দরজার সামনে, তারপর হঠাৎই দেখি আমাদের হোটেলটা কখন যেন জেলখানা হয়ে গিয়েছে! জেলখানার মধ্যে দুটো বিশাল আংটি গলায় হারের মতো করে পরা একটা লোকের দিকে তাকিয়ে তিনি আগুনচোখে তড়পে যাচ্ছেন, “আমার গয়না চুরি করে পার পাবি ভেবেছিস? তালকাডু, মারালাগলি, মালাঙ্গি মাদুভাগলি...!” তার ক্ষুব্ধ, আকুল দুইটি চোখ থেকে বেরচ্ছে আগুননীল ধোঁয়া আর ঠোঁটের ফাঁকে বেঁকে ঝুলে রয়েছে অসহ্য ঘূণা।
‘ইমলি! এই ইমলি!” তীব্র একটা জোরালো ঝাঁকুনিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আমার। আমার মুখের উপর ঝুকে পড়ে রয়েছে অন্বেষা, ‘যা বলছি, মন দিয়ে শোন, আজ আমার শরীরটা ভাল নেই, পেট খারাপ হয়েছে। আমি তোদের সঙ্গে আজ বেরোতে পারছি না। মা-বাবাকে কনভিন্স করার দায়িত্ব তোর!”
“কিন্তু...”
“কোনও কিন্তু নয়। আজ ভোরে পুলিশি হেপাজতে আংটিচোরটি অস্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছেন। চোখ ছিল বিস্ফারিত, মুখে গোঁজলা। কিন্তু কেন বা কী করে? আমি একবার যাব থানায়। অতএব পুরো ব্যাপারটা তোকে ম্যানেজ করে নিতে হবে।”
এই হল অন্বেষার দোষ কোথাও কিছু নেই, কিন্তু রহস্য খুঁজে বার করবে ও! ধুত্তেরি, একা-একা ঘুরতে ভাল লাগে নাকি? কিন্তু প্ল্যানটা আমার একান্ত অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও
ওর কথার অবাধ্য হতে পারলাম না। বাবা-মা, পিসেমশাই প্রথমে একেবারে রাজি না হলেও আমার আর অন্বেষার পাল্লায় পড়ে গাইগুই করতে—করতে বেরিয়ে পড়লেন হোটেল থেকে। সারাটাদিন ঘুরতে-ঘুরতে কীভাবে যে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।
রাতে ফেরার পথে একটা হোটেলে পাঁচজন মিলে পাঁচখানি অনিয়ন ধোসা সাবড়ে এসে হোটেলে ঢুকে ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় উপুড় করতেই দেখলাম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্বেষা। ঠোঁটের কোণে মিচকে হাসি। পাশের রুমে পিসি-পিসেমশাই আর বাবা-মা ততক্ষণে শুয়ে পড়েছে।
‘কী রে আছিস কেমন?” খোঁচা মারলাম আমি।
“বিন্দাস!” ফিচকে হাসল অন্বেষা। ‘আসল চোর ধরা পড়েছে বুঝলি, যে জিনসের জ্যাকেটটা পাওয়া গিয়েছে তার থেকেই পাওয়া গেল হরেক সূত্র। নজরবাদ থানার বড়বাবু কিন্তু বেশ হেল্পফুল। বড়মামা লালবাজারে আছেন, সেই ছতোতেই একটু কথা বলতে গিয়েছিলাম আর কী। যে জ্যাকেটটা পাওয়া গিয়েছে, সেটার বাঁদিকের পকেটটা দেখলাম বেশ নোংরা এবং বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং লোকটা অবশ্যই বাঁহাতি। জ্যাকেটটার সাইজ লার্জ, অর্থাৎ সেটা লম্বা-চওড়া কোন মানুষেরই হবে। জ্যাকেটের বোতামে আটকে থাকা একটা চুল দেখে মনে হল, লোকটার মাথার চুল কোঁকড়া। ডানপকেটে পাওয়া গেল গাঁদা ফুলের একচিলতে শুকনো পাপড়ি। তবে কি সে কোন মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত? বাঁ পকেটে পাওয়া গেল একটা কাগজের টুকরো। বেশ কয়েকমাস ওটা ঐ পকেটেই ছিল কারণ ধুয়েমুছে গিয়েছে অনেককিছুই। তাই প্রথমে কিছু বোঝা না গেলেও, শেষে আয়োডিন ট্ৰিটমেন্টে দেখা গেল, সেটা রানুজা রোডে মিস্টার মুরালিকে পাঠানো একটা প্যাকেটের পোস্টাল রিসিট। পুলিশ আজ বিকেলেই সেখানে গিয়ে তার প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জানা গিয়েছে এই মুরালি আর আলামেলাম্মা টেম্পলের ফুলসরবরাহকারী মুরালি একই ব্যক্তি।
কিছুদিন আগে ওই বাড়ি ছেড়ে সে উঠে এসেছিল নেহেরু সার্কলের কাছে একটি ঘূপচি বাড়িতে। সেখানে গিয়েই সন্ধে বেলায় তাকে পাকড়াও করা হয়েছে। ব্যাটা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি, ঐ একটা জ্যাকেটই তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। চুরি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় আর ধরপাকড় শুরু হয়ে যাওয়ায় সে অবশ্য আর চুরির মাল পাচার করার সুযোগ পায়নি। তার বোন আনি বেই-এর কাছে রাখা ছিল সব গয়নাগুলো। অবশ্য ব্যাটার শরীরের অবস্থা মোটেই ভাল নয়, ফুড পয়জনিং হয়েছে। এখন একটাই প্রশ্ন খালি আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, দুটো লোকই প্রায় একসঙ্গে ফুড পয়জনিংয়ের শিকার, কিন্তু কী করে?”
আমি লম্বা একটা হাই তুলে, নড়েচড়ে পাশ ফিরে শুয়ে হালকা চাদরটা গায়ে টেনে নিলাম। “অভিশাপ, অভিশাপ, অভিশাপ!” মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা অলক্ষুণে শব্দগুলোকে কোনও মতে সামলে নিয়ে এবার তড়িঘড়ি গম্ভীর গলায় নির্দেশ দেওয়ার সুরে আমি বলে উঠলাম, ‘অনেক রাত হয়েছে অন্বেষা, এবার ঘুমিয়ে পড়। মনে আছে তো, আগামিকাল ফেরার ফ্লাইট.” শুধু গতকাল রাতের সেই ভয়াবহ স্বপ্নটার কথা আমি চুপচাপ চেপে গেলাম। সেই সারা গায়ে গয়না পরে হোটেলের রুম থুড়ি জেলখানার সামনে এসে দাঁড়ানো সেই রাজমহিষীর আস্ফালন, সেই তীব্ৰ আক্রোশ, সেই আগুনরঙা চোখে ঝলসে ওঠা অসহায় ঘৃণা উফ। বাবারে!
(সমাপ্ত)
---------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now