বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আজ নিলার জন্মদিন

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আজ নিলার জন্মদিন। - নাজিম-উদ-দৌলা । ========== মিনিটের কাটাটা বোধহয় ৯ এর ঘরে এসে থেমে গেছে । আর এগোতে চাইছে না। রাত বাজে ১১ টা ৪৫ ; অপেক্ষায় প্রহরগুলো কখনোই কাটতে চায়না নিলার। কিন্তু আজ যেন সময়টা একটু বেশিই দীর্ঘ মনে হচ্ছে ! প্রায় ১ ঘণ্টা যাবত ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে শোয়ার ঘরের ইজিচেয়ারে বসে আছে সে। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন টুকরো টুকরো চিন্তা । *** আজ নিলার জন্মদিন । কিন্তু আশে পাশে কেউ নেই। একা অসহায় চোখে নিলা তাকিয়ে আছে ঘড়ির কাটার দিকে। কখন বাজবে রাত ১২ টা? কখন কেউ এসে বলবে- শুভ জন্মদিন নিলা! নিলার বিয়ের ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। তার স্বামী ওমর এক্সপোর্ট ইমপোর্ট এর বিজনেস করে । সপ্তাহের ৭ দিনই কাজের চাপে ব্যাস্ত থাকে। কাজের মধ্যে থেকে লোকটা পাথর প্রকৃতির হয়ে গেছে। নিলার অস্ফুট প্রেমাবেগ, কম্পিত অনুভুতি, হৃদয়ের আহবান সব কিছুই ওমরের কাছে দুর্বোধ্য । বিয়ের পর ওমর ৩ দিনের ছুটি পেয়েছিল। সে সময়টা দুজন একসাথে কাটিয়েছে। তারপর থেকে ওমর দিনের বেলা প্রায় কখনোই বাসায় থাকেনা । যেদিন থাকে সেদিন সারাক্ষন পরে পরে ঘুমায়। নিলা ছিল খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরা ছিল তার শখ। আজ সেই নিলা এক ঘর কুনো পতিভক্ত স্ত্রীতে পরিনত হয়েছে। ভাবতে অভাব লাগে নিলার, কত সহজেই সে বদলে গেছে! *** অবশেষে ঘড়ির কাটাটা বোধহয় নড়েছে। ১১ টা ৫০ বাজে। নিলার শশুর শাশুড়ি সহজ সরল মানুষ। নিলাকে তারা নিজের মেয়ের মত ভালবাসেন। ওমরের ছোট বোন সুমি। সেই তো নিলার সারাক্ষনের সঙ্গী। সুমি নিলার কষ্টগুলো বোঝে। সে প্রায়ই বলে, “তুমি কষ্ট পেয়োনা ভাবি, ভাইয়া তোমাকে অনেক পছন্দ করে কিন্তু প্রকাশ করেনা । ভাইয়া কাজের চাপে পরে এমন হয়ে গেছে। কিন্তু ভাইয়া একসময় কবিতা লিখত। অনেক রোমান্টিক কবিতা লিখেছে ভাইয়া । ভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে সবাই ভাইয়াকে ক্যাম্পাস কবি বলে ডাকত” ; সুমির কথাগুলো বিশ্বাস করতে নিলার কষ্ট হয়। ওমর আর কবিতা-দুইজন দুই মেরুর বাসিন্দা! তাছাড়া যে প্রেমের “প” ও বঝেনা সে লিখবে রোমান্টিক কবিতা! নিঃসন্দেহে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রসিকতা! *** বাইরে আকাশ ডাকছে। মনে হছে আজ রাতে প্রচুর বৃষ্টি হবে! আকাশের মত নিলার বুকের ভেতরটাও ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে! ঘড়ির কাটাটা আর একটু নড়েছে। ১১ টা ৫৫ বাজে। সকালে ওমর যখন অফিস যায়, তখন নিলা বার বার করে বলে দিয়েছে- “রাতে তারাতারি ফিরবে”; ওমর কথা দেয়নি। বলেছে চেষ্টা করবে। এই তার নমুনা? নিলা ওমরকে বেশ কয়েকবার নিজের জন্মতারিখ বলেছে। কিন্তু ওমর যে তা ভুলে বসে আছে সে সম্পর্কে নিলার কোন সন্দেহ নেই। যার বাসায় ফেরার কথাই মনে থাকেনা তার স্ত্রির জন্ম তারিখ মনে থাকবে কিভাবে? আর একটু পর ১২ টা বাজবে। নিলা জানে একটু পরই তার মোবাইল টা ব্যাস্ত হয়ে পরবে। একের পর এক ফোন আসবে। বাবা-মা , রফিক ভাই, মিনা ভাবি, সবাই উইস করবে। আপা-দুলাভাই, মোনা, রুমি, অপু সবাই জেগে আছে উইশ করার জন্য। ওর বান্ধবীরা – জয়া, লিনু, অ্যানি , সপ্না কেউ বাদ থাকবে না। কিন্তু নিলা জানে, এর কোনটাতেই তার মন ভরবে না। কারো কোনও কথাই তার অন্তরের ক্ষুধা মিটাতে পারবে না । বুক ঠেলে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে নিলার। এটাই তার স্বভাব। দুখেও কান্না পায়, সুখেও কান্না পায়। *** গতবারের জন্মদিনের সব ঘটনা এখনও মনে আছে নিলার। জন্মদিনের কথা ভুলেই গিয়ে ছিল সে। আগে আগে শুয়ে পরেছিল। রাত ১২ টার দিকে হটাত চিৎকার চ্যাঁচ্যাঁ ম্যাচি শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ধড় মড় করে উঠে বসে চারিদিকে তাকাল। বাবা-মা, ভাই-ভাবি, ছোট বোন- মোনা সবাই সুর করে গাইছে, “হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ...” সারা ঘর জরি , রঙিন কাগজ আর বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। সামনে বিরাট বড় এক কেক, চার পাশে ২০ টা মোমবাতি, চকচকে কেক কাটার ছুরি। সবাই মিলে নিলাকে একটা সারপ্রাইজ দিল। প্রচণ্ড অবাক হলেও সমস্ত হৃদয় জুরে ছিল এক সুখানুভূতি ! ভীষণ কান্না পেয়ে গেল তাকে! ফিচ ফিচ করে কেঁদে ফেলল। এটা টার অনেক আগের স্বভাব। সুখেও কাদে, দুখেও কাদে! ওহ! পরদিন কি আনন্দই না হয়েছিল! সারা দিন এখানে ওখানে ঘোরা ঘুরি আর মজা করেছে সে। সকালে ফ্যামিলির সাথে বেড়িয়েছে আর বিকালে বেড়িয়েছে বান্ধবীদের সাথে। সে দিন আজ অতিত! আর কখনও হয়ত সেই নিলার জীবনে ফিরে আসবে না। ঘড়ির কাটা ১২ টা ছুই ছুই করছে। মোবাইলটা হাতের কাছেই ছিল। ঝটকা মেরে সেটা হাতে নিয়ে সুইচ অফ করে দিল নিলা। চাইনা তার কারো শুভকামনা। আজ নিলার কষ্টের আগুন বুকে চেপে জ্বলার দিন। তার জীবনটা এমন হবে সেটা কখনো কল্পনা করেনি নিলা। তবে কেন এমন হল? বুকের ভেতর থেকে ঠেলে আসা কান্নাটাকে আর সামলানো গেলনা। বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল নিলা। এটাই তার স্বভাব দুখেও কান্না পায়, সুখেও। তবে আজকের কান্নাটা বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্য পেল। নিলার সাথে গলা মিলিয়ে হটাত আকাশটা শব্দ করে করে কেঁদে উঠল। থেকে থেকে হচ্ছে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের শব্দ। নিলার ঘরের ভেতর ও বাইরে যেন এক অতিপ্রাকৃত পরিবেশ। আকাশ কাঁদছে, কাঁদছে নিলাও। যেন দুজনই কেঁদে কেঁদে মুছে সাফ করে দেবে হৃদয়ের যত ব্যাথা । *** টুকরো টুকরো অনেক চিন্তা মাথায় আসছে নিলার। কিন্তু কোনটাই পরিপূর্ণ রুপ পাচ্ছে না। সে খুব বেশি আহামরি গোছের সুন্দরী নয়। কিন্তু তার চেহারায় এক অকৃত্রিম কমনিয়তা আর মায়াবি চোখ দুটিতে আছে আশ্চর্য আলোর ঝলকানি যা যেকোনো মানুষকে আকর্ষণ করে । কলেজ ভার্সিটি লাইফে অনেক ছেলেদের সাথে পরিচয় হয়েছে নিলার। অনেকে আকারে ইঙ্গিতে অনেক কিছু বোঝাতে চেয়েছে তাকে। কিন্তু এড়িয়ে গেছে নিলা, কাউকে তার মনে ধরেনি। ওমর তার বাবার বন্ধুর ছেলে। বিয়ের কথা বার্তা যখন চলছিল, ওমরের ছবি দেখে খারাপ লাগেনি নিলার। দু-এক দিনের হালকা কথা বার্তার পর সুদর্শন মানুষটাকে পছন্দ হয়ে গেল নিলার। ব্যাস, বিয়ে হয়ে গেল। তখন নিলা বোঝেনি, একটা মানুষ কে ভালভাবে বোঝার জন্য দু দিন যথেষ্ট নয়। বিয়ের পর থেকেই নিলা বুঝতে পারল, প্রেম-ভালবাসা-আবেগ এ বিষয় গুলো ওমরের কাছে অপরিচিত। সেই থেকে আবেগপ্রবন মেয়েটি বুকের মাঝে কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। বিয়ের এই ৬ মাসে নিলা অনেক চেষ্টা করেছে ওমরের মাঝে রোমান্টিকতা জাগিয়ে তোলার। কিন্তু তার চেষ্টা সফল হয়নি। ওমর কথা বলে কম, শব্দ করে হাসেও না। একবার নিলা ওমরের সামনে ফল কাটতে গিয়ে অনেকটা ইচ্ছে করেই হাত কেটে ফেলল। নিলা ভেবে ছিল ওমর দৌরে এসে হুলুস্থুল কাণ্ড করে বসবে। কিভাবে রক্ত পরা বন্ধ করা যায় তা ভেবে অস্থির হয়ে পড়বে। কিন্তু ওমর তার কিছুই করল না। সে হাসল! বলল, অসাবধানে কাজ করলে এমন ই হয়। যাও তারাতারি সেভলন দিয়ে ধুয়ে হাত টা কিছু দিয়ে বাধো। ওমরের আচরণ নিলাকে যতটা না কষ্ট দিল তার চেয়ে বেশি অবাক করল। সে দাড়িয়ে দাড়িয়ে বোকার মত কাঁদছিল আর হাত থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছিল । ওমর হয়ত ভেবেছিল, নিলা হাতের ব্যাথা আর রক্ত পাতের কারনে কাঁদছে। কিন্তু হাতের চেয়ে বেশি রক্ত পাত তার অন্য কোথাও হচ্ছে- সেটা বোঝার ক্ষমতা ওমরের ছিলনা। *** এমন টুকরো টুকরো হাজারো কথা মাথায় আসছিল নিলার। এভাবে কতক্ষন কেটে গেছে জানেনা সে। হঠাৎ নিচে গাড়ির হর্নের শব্দ হল। উঠে বসল সে। ওমর ফিরেছে! দ্রুত চোখ মুছল নিলা। কপালে একটা টিপ পড়ল। ঠোঁটে দিল হালকা লিপস্টিক। শাড়িটা ঠিক ঠাক করে নিল। তারপর দৌড়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো। প্রতিদিনের মত আজও ওমর কলিং বেল চাপার আগেই সে দরজা খুলে দিল। অন্যান্য দিনের মত আজও শব্দ ছাড়া একটু হেসে ভেতরে ঢুকল ওমর। নিলার উৎসুক চোখ দুটি ওমরের ছখে-মুখে কিছু খুজল, কিন্তু না পেয়ে আবার হতাশ হয়ে পড়ল। এটাই তো স্বাভাবিক, নিলার জন্ম তারিখ ওমরের মনে থাকার কথা নয়। একটা ব্যাপারে অবাক হল নিলা, ওমর অনেকটা ভিজে গেছে ! ভেজা শার্ট গায়ে লেপটে আছে। পথে গাড়ি থেকে নেমে ভিজেছে নাকি? গাড়ির ভেতরে তো ভেজার কথা না! ওমরের শরীর মোছার জন্য একটা একটা তোয়ালে আনতে গেল নিলা। ফিরে এসে দেখল, ওমর তার দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ হাসছে। সে বুক পকেট থেকে একটা টাটকা রক্তলাল গোলাপ বের করল। সেটা বাড়িয়ে ধরল নিলার দিকে। “গাড়ি থামিয়ে ফুলটা কিনতে গিয়ে ভিজে গেলাম। আমি ভিজেছি। কিন্তু ফুলটাকে ভিজতে দেই নি। শুভ জন্মদিন নিলা!” হতভম্ব হয়ে নিলা ফুলটার দিকে তাকিয়ে থাকল। ওমর বলে চলেছে, “ও... হ্যাঁ... একটা কথা তোমাকে প্রায়ই বলব বলব করি কিন্তু বলা হয়না। আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালবাসি নিলা!” হঠা ৎ আবার ভীষণ কান্না পেয়ে বসল নিলার। মেয়েটির এই স্বভাব টা বুঝি আর গেলনা! দুখেও কান্না পায়, সুখেও কান্না পায়!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আজ নিলার জন্মদিন
→ আজ নিলার জন্মদিন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now