বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আগন্তুক

"সাইন্স ফিকশন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান উৎস বিশ্বাস (০ পয়েন্ট)

X - আচ্ছা ,তোমাকে যদি বলা হয় তুমি নিজের ইচ্ছেমত কোন সময়ে যেতে পারবে, তাহলে তুমি অতীতে যাবে নাকি ভবিষ্যতে? প্রশ্নটা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেলাম। কবির সাহেবের মত গম্ভীর,দরকার না পড়লে কথা বলেন না সাধারনত, এমন মানুষের কাছ থেকে দুম করে এমন প্রশ্ন শুনলে থতমত খেতে হয় বৈকি। -ইয়ে, কখনো ভেবে দেখিনি,তবে… -ভেবে দেখো নাই ,তো এখন ভাবো। এত কথা কেন বল? চোখেমুখে পরিষ্কার বিরক্তির ছাপ কবির সাহেবের। - ইয়ে মানে, আমি ভবিষ্যতে কোন পর্যায়ে যাব সেটা জানার খুব ইচ্ছা ছিল। আমি দম নিয়ে বললাম। আমার এখন ২৯ বছর বয়স, আমি গেলে ৪৮ বছর বয়সে যাব। তারপর… -তুমি যে ৪৮ বছর বয়সে যেতে চাও, যদি এতবছর না বাঁচো? যদি আজকে অফিস থেকে বের হবার পরেই একটা গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে তোমায় মেরে ফেলে??? আমার কথা উনি ভয়ানক ভাবেই থামিয়ে দিলেন। উনি ই যদি কথা বলবেন,তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকার টা কি ছিল? -চুপ করে আছো কেন??? কথা বলতে পারো না???? আমার কথায় ত বাধা দিচ্ছেই,আমার চিন্তাতেও বাধা দিচ্ছে বুড়োটা। মনের মাঝে একরাশ বিরক্তি আর মুখে তেলতেলে একটা হাসি নিয়ে বললাম,না ,ইয়ে মানে, মারা যাবার কথা কে ই বা ভাবতে চায় বলুন? তাছাড়া … - তাছাড়া কোন কথা নেই। তার মানে আমরা জানি না আমাদের ভবিষ্যত কোথায় অথবা কখন শেষ হবে,ঠিক? - হ্যা, সেটা তো অবশ্যই, সৃষ্টিকর্তা আমাদের… - তুমি বড় বেশি কথা বল নোমান। অভ্যাস পাল্টাবে। যা জিজ্ঞেস করা হবে শুধু সেটার জবাব দিবে। কবির সাহেবের মুখে বিরক্তির ছাপ টা কি চিরস্থায়ী? মানুষ যেমন জন্মদাগ নিয়ে জন্মায়, উনি বোধহয় জন্মদাগ হিসেবে মুখে বিরক্তি নিয়ে জন্মেছেন। প্রতিটা কথায় বিরক্তি উগড়ে উগড়ে দিচ্ছেন। -জ্বি,স্যার। সেটা তো বটেই। যারা বেশি কথা বলে তারা গাধা টাইপ হয়। নার্ভাস ভঙ্গিতে নিজেকে গাধা বললাম। অফিস টাইম শেষ হবার পরেও যদি বসের সাথে খেজুরে আলাপ পাড়তে হয়, তবে নিজেকে গাধা বলে হোক, আর যে করেই হোক , মুক্তি পাওয়াই প্রধান। -এখন যা বলি শুধু শুনে যাবে। আমি বাধ্য ছেলের মত ঘাড় কাত করলাম। -শোন তাহলে। আমাদের কাছে তাহলে দেয়া সুযোগ টা তাহলে কি আমরা অতীত দেখার জন্য ব্যবহার করব ? আমি চুপ করে আছি,বুঝতে পারছি না উত্তর দেয়া ঠিক হবে কিনা। -আরেহ্ , এখন উত্তর দাও। আমি ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেলাম, বুড়ো এই বলে কথা বলতে না, আবার বলে উত্তর দিতে। সমস্যা টা কি? -জ্বি স্যার,যেহেতু ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নাই , সেহেতু অতীতেই যাব। প্রিয় কোন স্মৃতিতে ,প্রিয় কোন মানুষের…। -যে জিনিস তোমার প্রিয় ,সেখানে যাবার জন্য আলাদা কোন ক্ষমতার দরকার হয় না। মানুষ তার মনের মাঝে পুষে রাখে, বুঝলা? সেই স্মৃতি গুলা শুধুমাত্র নিজের, সেই জগত টা শুধুমাত্র নিজের, সেখানে কেউ অনধিকার প্রবেশ করতে পারে না, কোন বাধা আসে না। কথাগুলো বলার সময় কবির সাহেবের মুখের বিরক্তি ভাব টা অনেক খানি ই চলে গেল,তার চোখে লুকানো ব্যথার ছাপ। অনেকদিনের লুকানো ব্যথা। ২ আমি কিছুটা অবাক হলাম, আগে কখনো এরকম ভাবে উনাকে দেখিনি।অফিস শেষ হয়ে যাবার পর একজন মোটামুটি কর্মচারীর সাথে নিজের রুমে কথা বলার মানুষ ও তিনি না। হঠাৎ করেই তার জন্য কেমন যেন মায়া হতে লাগল। নিজের কাছেও অদ্ভুত লাগছিল ব্যাপার টা । -যেটা বলছিলাম, নিজেকে সামলে নিয়ে সেই চিরায়ত বিরক্তির ছাপ টা নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন উনি, অতীত যেখানে আমাদের জানা সেখানে কেন সেই জানা জিনিস টা সশরীরে দেখতে যাব? তাহলে সেই একমাত্র সুযোগ টা কিভাবে কাজে লাগানো যায় বলতো? আমার মাথায় তখন কিছু আসছিল না। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে উনি বলা শুরু করলেন আবার, আমরা আমাদের অতীত নিয়ে পড়ে থাকি, সুদূর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করি , কিন্তু আমরা কেউ কখনো নিকট বর্তমান নিয়ে কি ভাবি কখনো? এই ধরো এখন বাজে ৫ টা ৫০, ঠিক ৬ টার সময় কি হবে তা কি আমরা কেউ বলতে পারি? অথবা জানতে চাবো কখনো? আমি উনার কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম, হায় হায়, ৫ টা ৫০ বেজে গেছে???? খেয়াল ই করিনি। আমার মোটরসাইকেল টাও পার্কিং এ রাখতে পারিনি, বাইরে রেখে এসেছি। কখন যে ছাড়বে উনি , কিছুই বলা যায় না, ইতিহাস বলা শুরু করেছেন। -তোমার মোটরসাইকেল টা আজকে পার্কিং এ রাখতে পারো নি, তাই না? আমি ভয়ানক ভাবে চমকে উঠলাম, আমার চোখে মুখে যে ভয় মিশ্রিত বিস্ময় , সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম। উনি হেসে দিলেন। যাহ্, আজকে হচ্ছে টা কি? উনাকে কেউ কখনো হাসতে দেখে নাই, কি হয়েছে উনার? -নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কিভাবে জানলাম এটা? ভয় পাবার কিছু নাই, আমার সকালে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কফি খাবার অভ্যাস। জানালা থেকে দেখা যায় পার্কিং এর পাশের রাস্তাটা। তখন ই দেখেছি। উনার কথা শেষ হবার পরেও মুখে হাসি টা মলিন হয়নি, সাদা খোঁচা খোঁচা দাড়িতে খুব সুন্দর লাগছে হাসি টা। আমাকে চমকে দিয়ে দুম করে দাঁড়িয়ে পড়লেন উনি। নিজের ড্রয়ার থেকে অদ্ভুত কিন্তু অনেক সুন্দর দেখতে সবুক একটা ডায়েরী বের করলেন উনি। ডায়েরী টা হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। আমিও তাকালাম নিজের ঘড়ির দিকে, ৬ টা বাজে। আমাকে ডাক দিলেন কবির সাহেব, নোমান এখানে এসো। আমি ইতস্তত ভাবে গেলাম জানালার পাশে । বাইরে তাকিয়ে দেখি ঠিক ই ত, আমার নীল কালো হোন্ডা টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কিন্তু একি!!! একটা লোক এসে আমার মোটরসাইকেলে চড়ে বসল, আমি চিৎকার দিয়ে উঠছিলাম, কবির সাহেব আমাকে থামালেন। বললেন, দেখতে থাকো। আমি হতভম্ব হয়ে দেখতে লাগলাম আমার সাধের মোটরসাইকেল চুরি হয়ে যাচ্ছে, চোখ টা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তীক্ষ্ণ একটা শব্দে চোখ খুলে গেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি , আমার মোটরসাইকেল টাকে একটা মাইক্রোবাস ধাক্কা দিয়ে ফালিয়ে দিয়েছে, যে চুরি করছিল, তার দেহ টা পড়ে আছে মোটরসাইকেল থেকে বেশ খানিক টা দূরে। নিথর। তার আশেপাশে রক্তে ভিজে যাচ্ছে। বিকেলের শেষ আলোয় রক্ত টা কেমন কালচে লাগছে এখান থেকে। আমি নিস্তব্ধ হয়ে আছি, আমার হাত কাঁপছিল একটু একটু করে। - ওই লোকটার জায়গায় তোমার থাকার কথা ছিল। আমার হাতে ওই ডায়েরী টা ধরিয়ে দিতে দিতে তিনি বললেন। এই ডায়েরী বাসায় যেয়ে পড়বে, তোমার সাথে আর কখনো দেখা হবে না আমার। অনেক প্রশ্ন আছে তোমার, বুঝতে পারছি তোমাকে দেখে। আশা করি সব প্রশ্নের জবাব এই ডায়েরী টা দিবে। আমার যেতে হবে এখন, যত দ্রুত সম্ভব। ভাল থেকো। এক দমে কথা গুলো বলে গেলেন উনি। তাড়াহুড়া করে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেলেন । আমি বিস্ফোরিত চোখে শুধু উনার চলে যাওয়া দেখলাম। হচ্ছে কি আজকে আমার সাথে? ৩ কাঁপা কাঁপা হাতে চাবি দিয়ে কোনমতে দরজা টা কোনমতে খুললাম। বাস নিয়ে আসার সাহস হয়নি, ১০০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়েই আসলাম। ছোট এক রুমের একটা বাসা আমার। একটা বেডরুম,একটা ড্রয়িং ,একটা রান্নাঘর, একটা বাথরুম এবং মানুষ ও একটা । কিন্তু হ্যা, বারান্দা দুইটা। ছোট ছোট দুইটা সুন্দর বারান্দা। মন খারাপ থাকলে রাস্তার পাশে যে বারান্দা টা ,সেখানে দাঁড়িয়ে থাকি। আজকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি মন খারাপের জন্য না, মাথা টা পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি। ফোন বেজে ওঠার শব্দে চমকে উঠলাম। মা ফোন দিয়েছে। এইটা মায়ের ডেইলী রুটিন। সকালে ফোন দিবে অফিসে ঠিকমত গেলাম কিনা, সন্ধ্যায় ফোন দিবে ঠিকমত বাসায় আসলাম কিনা, রাতে ফোন দিবে ঠিকমত খেলাম কিনা। সবকিছু ঠিকমত না হলেই তার দুশ্চিন্তার শুরু। বিয়ে করার জন্য জোরাজুরি করছে , আমারো যে ইচ্ছা কম সেটা না, কিন্তু দায়িত্ববোধের কাছে ভালবাসা আটকে গেছে। মা একা একা গ্রামে থাকে, আমি এখানে বঊ নিয়ে ঢাকায় বংশবৃদ্ধি করব, সেটা মেনে নিতে মন চায় না।ছোটবেলা থেকে নিজে বাবা ছাড়া বড় হয়েছে মা, বেচারী অনেক কষ্ট করেছে ,আর কত? ফোনটা রিসিভ করে কানে দিলাম, হ্যালো মা, বল। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করতে লাগলাম আমার গলার অস্থিরতা যেন মা টের না পায়, কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন মা টের পেয়ে গেল। -নোমান, কি হইসে রে তর বাবা???? এমুন শুনা যায় ক্যান তর গলা? মায়ের গলায় দুশ্চিন্তার ছোঁয়া। কোনমতে মা কে বোঝালাম কিছুই হয় নাই, বাসায় আসলাম মাত্র তাই হয়ত এমন শোনা যাচ্ছে গলা। মার সাথে কথা বলার পর মন কিছুটা শান্ত হয়েছে। তখন ই মনে পড়ল ডায়েরী টার কথা। ৪ ড্রয়িং রুমের সোফায় ডায়েরী টা নিয়ে বসলাম। ডায়েরী টার উপরে ছোট্ট একটা পাথরের মত কেমন যেন একটা জিনিস, ধূসর রঙের । ডায়েরী টার সাথে বেমানান। আমি ডায়েরী টা পড়া শুরু করলাম। “ঘড়িতে এখন বাজে ৪ টা ২৫। জরুরী একটা কথা বলে রাখি, ভুলেও ডায়েরীটা বেশিক্ষন সময় নিয়ে পড়বে না, যত তাড়াতাড়ি পারো। এখন এমন কিছু কথা বলব যা শুনতে তোমার ভাল লাগবে কি না জানি না, কিন্তু জীবনের সব থেকে অদ্ভুতুড়ে কথা , এটুকু বলতে পারি। তুমি আমার অফিসে ঠিক ৫ টা ১০ মিনিটে আসবে। আমি জানি তুমি ফারহানার কাজ টা করে দিতে থাকতে, কিন্তু ওটা যদি করতে তাহলে তুমি এই লেখা টা পড়তে পাড়তে না। কারন আজকে ৬ টায় তোমার মারা যাবার কথা ছিল। মোটরসাইকেল এক্সিডেন্টে। এটুকু তুমি জানো, কারন তুমি আমার সাথে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা টাই নিজ চোখে দেখেছ। আমি তাড়াহুড়া করে কেন চলে গেলাম সেটা পরে বলছি। তুমি ছোটবেলায় নিশ্চয়ই পড়েছ ম্যাগনেট কিভাবে প্রথম পাওয়া যায়? গ্রিসের ম্যাগনেসিয়া নামক জায়গায় চার হাজার বছর আগে ম্যাগনেটস নামের এক রাখাল ম্যাগনেটের আবিষ্কার করে প্রথম। এইটা কিন্তু সবাই বিশ্বাস করে না। আসলে ওই রাখাল টার নাম ম্যাগনেটস ছিল না। ওর নাম ছিল একিওস। আচ্ছা ওই ঘটনা টা পড়তে পড়তে মনে মনে কি একবারো প্রশ্ন জাগে নি, কিভাবে এলো ওই জায়গায় ম্যাগনেট টা? হতো তুমি ভাবছ আজকের ঘটনার সাথে একিওস এর সম্পর্ক কি? আছে সম্পর্ক, বুঝতে পারবে। একিওস তখন মাঠের মাঝে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। দুপর গড়িয়ে বিকেল হবে , এমন একটা সময়। একিওস চোখ বন্ধ করে ছিল,ভাবছিল তার হবু স্ত্রীর কথা। হঠাৎ করেই প্রচন্ড একটা শব্দ তার ভাবনার মাঝে ছেদ ঘটায়। আকাশ থেকে প্রকান্ড বড় একটা আগুনের গোলা ছুটে আসছে। চোখ বড় বড় করে দেখছিল একিওস,নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে ছিল ওই আগুনের গোলাটার দিকে। হ্যা, উল্কাপাত ছিল ঘটনা টা। একিওস মারা যায় নি। উল্কাটা মোটামুটি বড়ই ছিল। প্রচন্ড আঘাতে অনেক গুলো টুকরো তে পরিনত হয়। মাথার মাঝে তীব্র একটা ব্যথা ছিল ওর। এখনকার বোমার স্প্লিন্টার যেমন শরীরের মাঝে ঢুকে যায়, ওর শরীরে বেশ কতগুলো ছোট টুকরো ঢুকে গিয়েছিল। মাথার পাশে প্রচন্ড ব্যথা ছিল, রক্ত ঝরছিল অনেক। মাথার মাঝেও যে একটা টুকরো ঢুকে গিয়েছে, সেটা বুঝতে দেরি হয়নি একিওস এর। অজ্ঞান হয়ে যায় ও। যখন জ্ঞান ফিরে দেখে ওর মাথায় রক্ত, কিন্তু ব্যথা নেই। উল্কাপতনের নমুনা বলতে শুধু বেশ খানিক টা জুড়ে পোড়া জায়গা, একিওস এর মনে পড়ল , জ্ঞান হারাবার আগে দেখেছিল আগুন ধরে গেছে যে জায়গাটায় উল্কা টা পড়েছিল। কোনমতে নিজের লাঠিটার উপরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় একিওস। দুর্বল লাগছিল খানিক টা । কিন্তু ব্যথা অনুভব করছিল না ও। আস্তে আস্তে পোড়া জায়গাটার দিকে এগিয়ে যায় ও। হঠাৎ করেই ও আটকে যায়। ওর হাতের লাঠি টা একটা পাথরে আটকে গেছে। হ্যা, তোমরা হয়ত পড়েছিলে যে, ওর জুতা আটকে যায়, কিন্তু ওর পায়ে কোন জুতা ছিল না। ওর হাতের লাঠি টার নিচের অংশ ছিল লোহার। হ্যা, ওই পাথর টা ছিল চুম্বক। নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কিভাবে এতো খুটিনাটি জানি? কারন আমি ই একিওস। ” ৫ মানে কি?!!!!! এটুকু পড়ার পর নিজের অজান্তেই চিৎকার দিয়ে উঠলাম,এগুলো কি পড়ছি আমি????? নিজের হতবিহ্বল ভাব সামলে নিয়ে আবার পড়া শুরু করলাম। “ হ্যা, আমি জানি তুমি যথেষ্ট পরিমানে চমকে গিয়েছ, কিন্তু এটাই সত্যি। আমি কোনমতে পাথর থেকে লাঠি টা ছাড়িয়ে নেই। আর কোন ছোট টুকরোই নেই। আমি আগুনের বেশ খানিক টা দূরে ছিলাম বলেই বোধহয় বেঁচে গিয়েছিলাম। আমি আনমনেই মাথায় হাত দিলাম । বেশ কতগুলো ছোট ছোট ধুসর রঙের পাথর আটকে আছে যেমন টা এই ডায়রীর সবার আগে আছে। আমি যে জায়গা টায় পড়ে ছিলাম, সে জায়গা আগুনের থেকে বেশ খানিকটা দূরে ছিল,ওইখানেও কতগুলো ওই অদ্ভুত ধূসর পাথর গুলো পড়ে ছিল। কেন জানি না, আমি খুঁজে খুঁজে ওই রকমের পাথর গুলো সব তুলে নিলাম। মোট ছিল ৪৩০ টা পাথর। অদ্ভুত কোন কারনে সব গুলো একই আকারের। এখন প্রশ্ন আসতে পারে মনে এই পাথর গুলো দিয়ে আমি কি করলাম? তোমার ডায়েরীতে যে পাথর টা দেখছ সেটাই শেষ পাথর,মানে ৪৩০নম্বর পাথর। এই পাথর গুলোর কাজ কি? বলছি। আমি নিজেও অনেক পরে বুঝেছিলাম। যেটা আগে বুঝেছি ,সেটা হলো আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পারছিলাম। প্রথম প্রথম ওটাকে স্বপ্ন ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছিলাম, কিন্তু দেখি ঐ স্বপ্ন গুলো হুবুহু সত্যি হচ্ছে, তখন ই নিশ্চিত হলাম ব্যাপার টা। এই পাথরগুলোর কাজ টা বুঝি অনেক পরে। পাথরগুলি নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে। আমার স্ত্রী এমিলিয়াও জানতো না। চার হাজার বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি নিজেকে। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও আসলে ব্যপার টা ক্লান্তিকর। মারা যেতে পারছিনা আমি। যুগের পর যুগ,শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে আমি ক্লান্ত। এই দেশ থেকে ওই দেশ, এই মহাদেশ থেকে ওই মহাদেশ।চার হাজার বছরের বুড়ো মানুষ টা কতজন ভালবাসার মানুষ কে মারা যেতে দেখেছে, সেটা সম্পর্কে তোমার কোন ধারনাই নেই। আমার স্ত্রী এমিলিয়া ও মারা যাবে জানতাম, এ টা নিয়ে সারাক্ষন ভাবতে থাকতাম। যেদিন ওর মারা যাবার কথা, সেদিন আমি মাঠে যাই নি। ওর কাছে ছিলাম সারাদিন। মই থেকে পড়ে গিয়ে মারা যাবার কথা ছিলো ওর, বিকাল বেলা। আমি দুপুর থেকে আনমনে ঐ ধূসর পাথর গুলোর একটা নিয়ে ভাবছিলাম। ওই ঘটনার তিন বছর পার হয়ে গিয়েছে। এই কয়দিনে একবারের জন্য আমার কোন ধরনের অসুস্থতার লক্ষন দেখা যায় নি। আমার ভবিষ্যত জানার ক্ষমতা টা টের পেয়েছি প্রায় দু বছর হলো, কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারি নি। যেটা জানি আগে ভাগে, সেটা কোন না কোন ভাবে হয়েই যায়। এর জন্যই মন খারাপ করে বসে ছিলাম হাতে পাথর টা নিয়ে। দেখছিলাম, এমিলিয়া মই টা নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির উঠানে। আমি চুপ করে বসে থাকতে পারলাম না। পাথর টা হাতে নিয়েই ওকে থামাতে গেলাম। ওর হাত ধরে থামালাম, বললাম, আমি দেখছি। ও মিষ্টি করে হেসে উত্তর দিল, নাহ্, থাক। বলে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। আমি আবার ওকে ধরতে যেতেই আমি পড়ে গেলাম। আমার পড়ে যাবার শব্দ শুনে চমকে পেছনে তাকায় এমিলিয়া। মই টা ফেলে আমার কাছে দৌড়ে ছুটে আসে। কিন্তু মইয়ের কাজ টাও জরুরী ছিল। আমাদের বাড়িতে এমিলিয়াকে কাজে সাহায্য করার জন্য একটা ছোট ছেলে ছিল। এমিলিয়া ওকে বলল মই টা নিয়ে কাজটা করতে। আমি মনে মনে অনেক বেশি খুশি হয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার খুশি টা চলে গেল ছেলেটার রক্তপানি করা চিৎকারে । ঠিক যেখান টাতে এমিলিয়ার পড়ার কথা ছিল, সেখানে ও পড়ে আছে,নিথর হয়ে। এমন টাতো হবার কথা ছিলো না। ” এটুকু পড়ে আমি পানি খেতে উঠলাম। এগুলা আমার কাছে অবাস্তব লাগছিল। কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় নেই, চোখের সামনে যা ঘটেছিল, সব উনি আগে থেকেই লিখে রেখেছেন। কি করে সম্ভব এইটা??? ৬ জগ থেকে পানি খেয়ে আবার বসলাম ডায়েরী টা নিয়ে। যেখানে শেষ করেছিলাম, তার ঠিক পরের থেকে শুরু করলাম। “ এমিলিয়ার চিৎকারে সম্বিত ফিরে আমার। কিছু করার ছিলনা তখন আমার। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারি এই ধূসর পাথর গুলোর ক্ষমতা । কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। তুমি জানো , আমি মহাত্না গান্ধীকেও বলেছিলাম, আপনার উপরে হামলা হবে, উনি বিশ্বাস করেন নি। আমাকে উনার কাছে যেতে দেয়া হয়নি। ৪২৯ টা পাথর আমি আমার কাছের মানুষ, পৃথীবীর মঙ্গলের জন্য দরকার এমন মানুষ গুলোকে বাঁচাতে ব্যবহার করেছি। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ কেন তোমাকে বাঁচাতে গেলাম? কারন আমি চাই নি আমার মেয়ের একমাত্র সম্বল মারা যাক। ” আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম। কিছুটা সামলে নিয়ে আবার পড়তে শুরু করলাম। ‘ হ্যা, তোমার মা কে ছোটবেলায় রেখে চলে এসেছিলাম, ওর ভালোর জন্যই। ৪২৯ নাম্বার পাথর টা তোমার মায়ের জন্য ছিল। আমি চাই নি ও আরো কষ্ট পাক।আমি চার হাজার বছরের অপরাধবোধে ভারাক্রান্ত। কিন্তু জানো কি , সব কিছুর ই একটা চরম মুল্য থাকে, সেটি বুঝি নি বলেই এমিলিয়া ওইদিন বেঁচে যাবার পর ও তার পরদিন ই মৃত্যু হয়, যেটা আমি ঠেকাতে পারতাম না, কারন পাথর টাই মৃতুর কারন ছিল। আমিও ছিলাম, কারন আমার ভিতরেও পাথরের অস্তিত্ব ছিল। মুল্য টা তুমি নিজেই বুঝতে পারবে। এটুকুই বলার ছিল। ঘড়িতে এখন ৫ টা ১০ বাজে। তুমি আমার রুমের দিকে আসছ,দেখতে পাচ্ছি। ডায়েরীটা পড়া শেষ হলে সাথে সাথে পুড়িয়ে ফেলবে, দেরি করবে না। এটা অবশ্যি দরকার, নয়ত তোমাকে বাঁচানো বৃথা’’। ৭ ডায়েরী এখানেই শেষ। আমি ভয়ের থেকেই হোক আর যেখান থেকেই হোক, তাড়াতাড়ি ম্যাচ আর ডায়েরী টা নিয়ে বাথরুমে ছুটে গেলাম। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলাম। ওই পাথর টা ধুসর থেকে নীল রঙ হয়ে উড়ে যাচ্ছে! আমি পোড়া ছাইটুকু কমোডে ফেলে দিলাম। বেসিনে হাত টা ধুয়ে মুখ টা ধুলাম। একী!!! আয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে তার মাথার চুল সাদা কেন??? পঞ্চাশ বছরের এর বুড়োকে দেখা যাচ্ছে কেন আয়নায়? চিৎকারে ভরে গেল ফাঁকা রুম টা।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২০১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গ্রহাণ্তরের আগন্তুক।
→ বিজ্ঞাপন ও আগন্তুক
→ আগন্তুকের পাগলি (পর্ব-৫..শেষ পর্ব)
→ আগন্তুকের পাগলি (পর্ব-৪)
→ আগন্তুকের পাগলি (পর্ব-৩)
→ আগন্তুকের পাগলি (পর্ব-২)
→ আগন্তুকের পাগলি (পর্ব-১)
→ শার্লক হোমস ০৫. বিজ্ঞাপন ও আগন্তুক
→ আগন্তুক

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now