বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীরবতার গুনাহ

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। চন্দ্রপুর গ্রামটা এক সময় ছিল নদীর মতো স্বচ্ছ। মানুষজন সহজ-সরল, মুখে আল্লাহর নাম, আচরণে লজ্জা। ফজরের আজান ভেসে আসত কাঁচা রাস্তায়, আর সন্ধ্যায় মসজিদের উঠোনে বসে বয়স্করা কুরআনের তাফসির শুনত। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত—ভালো কাজ করলে ভালোই ফিরে আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রপুরের বাতাস বদলাতে শুরু করল, আর সেই পরিবর্তনের শুরুটা ছিল খুবই নীরব, এতটাই নীরব যে কেউ বুঝতেই পারেনি, এই নীরবতাই একদিন গুনাহ হয়ে উঠবে। গ্রামের প্রভাবশালী লোক ছিলেন মজিদ চেয়ারম্যান। বাহ্যিকভাবে তিনি ছিলেন ধার্মিক—নামাজ পড়তেন, দান করতেন, হজও করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার আসনে বসে তিনি ধীরে ধীরে অন্যায়ের পথ ধরলেন। খাস জমি দখল, গরিবের ভাতা আত্মসাৎ, মিথ্যা মামলায় দুর্বলদের ফাঁসানো—সবই চলতে লাগল প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ ফিসফিস করে বলত, “ঠিক হচ্ছে না।” কিন্তু কেউ সামনে এসে কিছু বলত না। কারণ সবাই জানত, প্রতিবাদ মানেই বিপদ। এই গ্রামেই থাকতেন আবদুস সালাম। তিনি একজন সাধারণ মাদ্রাসা শিক্ষক। বই আর কলমই ছিল তাঁর সম্বল। সালাম হুজুর অন্যায় দেখলে চুপ থাকতে পারতেন না। একদিন মসজিদের বারান্দায় বসে তিনি বললেন, “ভাইয়েরা, অন্যায় দেখে চুপ থাকাও অন্যায়। রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন, হাত দিয়ে না পারলে মুখ দিয়ে, তাও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে।” তাঁর কথায় কয়েকজন মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখে ছিল ভয়। কেউ বলল না, “আমরা আপনার সঙ্গে আছি।” দিন যেতে যেতে মজিদ চেয়ারম্যানের অন্যায় আরও বেড়ে গেল। একদিন গ্রামের বিধবা নারী রহিমা খাতুন এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট জমিটুকুও দখল হয়ে গেছে। সালাম হুজুর তাকে আশ্বস্ত করলেন, প্রতিবাদ করবেন। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি একা হয়ে গেলেন। মসজিদের মুসল্লিরা বলল, “হুজুর, এসব ঝামেলায় যাবেন না। আল্লাহ সব দেখছেন।” সালাম হুজুর বুঝলেন, মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসার কথা বলছে, কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। এক শুক্রবার জুমার খুতবায় সালাম হুজুর সরাসরি অন্যায়ের কথা বললেন। নাম নিলেন না, কিন্তু ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল। খুতবার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে গুজব ছড়াতে শুরু করল—তিনি নাকি রাজনীতি করেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। গ্রামের মানুষ তখনও নীরব। কেউ ভাবল, “আমার কী?” কেউ বলল, “আমরা কিছু করলে তো আমাদেরও বিপদ।” নীরবতার এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে চন্দ্রপুরকে গ্রাস করল। চুরি, সুদ, মাদক—সব ঢুকে পড়ল সমাজে। যে অন্যায় একসময় একজন করত, তা এখন অনেকেই করতে লাগল। মানুষ নামাজ পড়ত, কিন্তু অন্যায় দেখেও চোখ ফিরিয়ে নিত। দোয়া করত, কিন্তু দোয়া কবুল হচ্ছে না—এ কথা কারও মাথায় আসত না। খরা দেখা দিল, ফসল নষ্ট হলো, রোগ ছড়াল। সবাই বলল, “আল্লাহ পরীক্ষা নিচ্ছেন।” কিন্তু কেউ ভাবল না, এই পরীক্ষা কেন। এক রাতে হঠাৎ আগুন লাগল মজিদ চেয়ারম্যানের গুদামে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের দিকে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করতে লাগল। সেই আগুনে পুড়ে গেল গরিবের ঘর, ধ্বংস হলো ফসল। মজিদ চেয়ারম্যান বেঁচে গেলেও তাঁর সম্পদের বড় অংশ শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ক্ষতিটা শুধু তাঁর নয়—পুরো গ্রামটাই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তখন মানুষ বুঝতে শুরু করল, অন্যায় যখন ছড়ায়, তার আগুন কাউকে ছাড়ে না। এই দুর্যোগের পর সালাম হুজুর গ্রামে ফিরলেন। মুখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু গভীর দুঃখ। মসজিদের উঠোনে তিনি বললেন, “ভাইয়েরা, আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনি বলেই আজ এই অবস্থা। আল্লাহর গজব আসে শুধু অন্যায়কারীর ওপর নয়, নীরব দর্শকের ওপরও।” তাঁর কণ্ঠে ছিল কান্না, আর সেই কান্না অনেকের হৃদয় ভেঙে দিল। গ্রামের মানুষ তখন নিজেদের দিকে তাকাল। তারা বুঝল, তারা হাত দিয়ে প্রতিবাদ করতে পারেনি, মুখ দিয়েও করেনি, এমনকি অন্তর দিয়েও ঘৃণা করেনি—বরং অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অভ্যাসই তাদের ইমানকে দুর্বল করেছে। কেউ কেউ স্মরণ করল বনি ইসরাইলের কাহিনি—যেখানে অন্যায়ে নীরব থাকা মানুষও শাস্তি থেকে বাঁচেনি। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করল। মানুষ অন্যায় দেখলে কথা বলতে শিখল। সালাম হুজুর একা রইলেন না। মজিদ চেয়ারম্যানের ক্ষমতা কমতে লাগল, কারণ মানুষ আর ভয় পায় না। চন্দ্রপুর আগের মতো পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়ে উঠল না, কিন্তু মানুষ বুঝে গেল—নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ নয়, নীরবতা অনেক সময় অন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়ায়। চন্দ্রপুরের ইতিহাসে সেই সময়টাকে এখন মানুষ বলে, “নীরবতার কাল।” তারা জানে, সেই নীরবতার শাস্তি তারা পেয়েছে পার্থিব দুর্ভোগে আর ইমানি দুর্বলতায়। আর এই উপলব্ধিই তাদের শেখায়—অন্যায়ের প্রতিবাদ করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইমানের দাবি। কারণ নীরবতা যদি গুনাহ হয়ে ওঠে, তবে প্রতিবাদই হয়ে ওঠে মুক্তির পথ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৪৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ নীরবতার গুনাহ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now