বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
কুমিল্লার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মেছিলো ছেলেটি—তার নাম রাশেদ। জন্মের পর থেকেই তার গায়ের রং নিয়ে পরিবারের লোকজন থেকে শুরু করে আশপাশের মানুষ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্তব্য করত। “ও কালো ছেলে, চেহারা খারাপ হবে”, “ওর বিয়ে কে দেবে?”, কিংবা “কালো বাচ্চা মানেই অশুভ” — এ ধরনের কথায় রাশেদের শৈশব ভরে উঠেছিল। কিন্তু মায়ের স্নেহমাখা কণ্ঠ সবসময় তাকে শক্তি দিতো। তিনি বলতেন,
—“বাবা, রঙে কিছু আসে যায় না। মানুষকে বড় করে তোলে তার চরিত্র, তার ভালো কাজ আর আল্লাহর ভয়।”
মা প্রায়ই কোরআনের হুজুরাতের সেই আয়াত শুনিয়ে দিতেন—যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া। শিশুমনে তখন হয়তো পুরোটা বুঝতো না, কিন্তু শব্দগুলো তার হৃদয়ে এক ধরনের শক্তি জাগাত।
________________________________________
গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলো রাশেদ। প্রতিদিন কিছু ছেলেমেয়ে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কেউ তাকে “কালো” বলে ডাকত, কেউবা বলত—“তুই তো রাতের অন্ধকার।” প্রথমদিকে রাশেদ চুপ করে সহ্য করত, মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলত। কিন্তু একদিন স্কুলে ইসলাম শিক্ষা ক্লাসে শিক্ষক আবদুল হাকিম স্যার বিদায় হজের ভাষণের অংশ শুনালেন—
—“আরবির উপর অনারবির, শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ায়।”
এই লাইনগুলো রাশেদের মনে যেন আলো জ্বালিয়ে দিল। সে বুঝল, আল্লাহর কাছে তার গায়ের রং কোনো বাধা নয়। আল্লাহ তাকেও ভালোবেসে সৃষ্টি করেছেন।
________________________________________
সময়ের সাথে সাথে রাশেদ পড়াশোনায় খুব ভালো করলো। ধীরে ধীরে ক্লাসে সবার মধ্যে সেরা হতে লাগল। শিক্ষকেরা তাকে আদর্শ ছাত্র হিসেবে দেখতে শুরু করলেন। কিন্তু গ্রামে যারা তাকে কালো বলে ঠাট্টা করত, তারা অবাক হয়ে গেলো।
একদিন স্কুলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলো। রাশেদ দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো। মঞ্চে উঠে পুরস্কার নেবার সময় অনেকেই চমকে উঠল—“এই কালো ছেলে এত ভালো পারে!” গ্রামের প্রবীণ মাওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে বললেন—
—“সন্তানরা, মনে রেখো, মানুষকে তার রং দিয়ে বিচার করো না। আল্লাহ যার অন্তরে তাকওয়া দেন, সেই-ই শ্রেষ্ঠ।”
সেদিন থেকে অনেকেই আর তাকে নিয়ে মজা করল না।
________________________________________
কিছুদিন পর পাশের গ্রামে এক বিয়ে হলো। বর ছিলো ফর্সা, হ্যান্ডসাম, শহরে চাকরি করে। কনে একটু শ্যামলা হওয়ায় বরপক্ষের লোকেরা মুখ টিপে হাসাহাসি করছিল। রাশেদ সব দেখছিল। তার মনে হলো, সমাজে বর্ণবৈষম্যের এই বিষ এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে।
তখন সে সিদ্ধান্ত নিল—শিক্ষিত হয়ে মানুষকে এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত করবে।
________________________________________
বছর ঘুরে রাশেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। তার গায়ের রঙ নিয়ে শুরুতে অনেকে তাকাতো, কিন্তু তার বুদ্ধি, নম্রতা, আর কুরআন-হাদিসের আলোচনায় দক্ষতা দেখে সবাই সম্মান করতে শুরু করল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা হলো—বিষয় ছিল “বর্ণবৈষম্য সমাজের জন্য কল্যাণকর কি না”। প্রতিপক্ষ বলছিল—সাদা চামড়ার মানুষকে সবাই বেশি পছন্দ করে, তাই সেটা নাকি সুবিধাজনক। রাশেদ দাঁড়িয়ে বলল—
—“মানুষের গায়ের রংকে আল্লাহর দান ছাড়া কিছু নয়। সাদা বা কালো হওয়ার মধ্যে আমাদের কোনো হাত নেই। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে মর্যাদাসম্পন্ন সেই, যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ নবী করিম (সা.) বলেছেন, শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কাজেই গায়ের রং দিয়ে মানুষকে ছোট করা হলো জাহিলি মানসিকতা।”
তার যুক্তি, কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি, আর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি দেখে হলভর্তি মানুষ হাততালি দিল। সেই প্রতিযোগিতায় রাশেদ প্রথম হলো।
________________________________________
বিশ্ববিদ্যালয় শেষে রাশেদ শিক্ষক হলো। ক্লাসে এসে ছাত্রদের বলত—
—“তোমরা যদি কাউকে তার রংয়ের কারণে অবজ্ঞা করো, তাহলে আসলে আল্লাহর সৃষ্টিকে অবজ্ঞা করছো। তোমরা যদি তাকওয়ার পথে চলো, তাহলে আল্লাহর কাছে তোমরা বড় হবে। মনে রেখো, মুমিনের হৃদয়ে বর্ণবৈষম্যের কোনো স্থান নেই।”
তার এই কথাগুলো ধীরে ধীরে ছাত্রদের হৃদয়ে দাগ কাটল। তারা শিখল, মানুষকে সম্মান দিতে হলে রঙ নয়, চরিত্র দেখতে হয়।
________________________________________
রাশেদ একসময় সমাজে সেবামূলক কাজ শুরু করল। দরিদ্র কালো শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিল। তাদের বলত—“তোমরা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। তোমাদের গায়ের রং অন্ধকার নয়, বরং আলো লুকিয়ে আছে। সেই আলো জ্বালাতে হলে জ্ঞান অর্জন করো, সৎ পথে থেকো।”
একদিন গ্রামের সেই ছেলেটি, যে ছোটবেলায় রাশেদকে “কালো” বলে ঠাট্টা করত, তার কাছে এসে বলল—
—“ভাই, আমি তোমাকে নিয়ে কত খারাপ ব্যবহার করেছি। আজ বুঝছি, তোমার ভিতরেই আসল আলো। তোমাকে দেখে আমি শিখেছি, মানুষের আসল সৌন্দর্য চরিত্রে।”
রাশেদ শুধু মুচকি হেসে বলল—“ভুল বুঝতে পারাটাই বড় পাওয়া। আমরা সবাই আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর বান্দাকে অবজ্ঞা করলে আসলে আল্লাহকেই অবজ্ঞা করা হয়।”
________________________________________
সমাজ ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। গ্রামে আর কালো বলে ঠাট্টা করা হতো না। মানুষ বুঝতে শিখল, তাকওয়াই হলো মানুষের আসল পরিচয়।
রাশেদ এক সমাবেশে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
—“আজ যদি আমরা গায়ের রং দেখে মানুষকে বিচার না করি, বরং তাকওয়া ও সৎকাজ দেখে বিচার করি, তবে সমাজে ভালোবাসা বাড়বে। হিংসা, বিভেদ, অপমান কমে যাবে। মনে রেখো, কালোর ভেতরেও আলো আছে, আর সেই আলোই মানুষের হৃদয় আলোকিত করে।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now