বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অমীমাংসিত সত্য

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X অমীমাংসিত সত্য --- মনিরুল ইসলাম ঘুমের আড়মোরা ভেঙ্গে বিছানাতেই শুয়ে ছিল অভ্র। জানালার ফাঁক দিয়ে গলে পড়া রোদ খুব মিষ্টি লাগছিল। নতুন শহরের এই শুনশান সকালটা দেখে ভাবল "আজ একটু জলদি ঘুম ভেঙ্গে গেল"। ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল সে। আজ ভার্সিটির প্রথম ক্লাস। মাত্র ত্রিশ মিনিট বাকি, আর সে তখনো বিছানায়। কোনমতে তৈরি হয়ে ক্লাসের জন্য দৌড় দিল।তবু শেষ রক্ষা হল না। ক্লাসে স্যার ঢুকে পড়েছেন। -"আসতে পারি, স্যার?" -"এসো। আশা করি এরপর আর এমনটা হবে না।" -"সরি, স্যার।" এই বলে ক্লাসে পা দিল অভ্র। ফাঁকা সিট খুঁজতে হঠাৎ একটা মেয়ের দিকে চোখ পড়ল। মেয়েটা মুচকি মুচকি হাসছিল আর পাশের মেয়েটাকে কি যেন বলছিল। পরে একসময় জেনেছিল মেয়েটির নাম মিথি। এভাবেই মিথিকে প্রথম দেখা। ক্লাসমেট ছাড়া অন্য কোন পরিচয় দেবার মত আলাপ ওদের মাঝে হয়নি তখনো। মিথি তার নিজের শহরে পরিচিত পরিবেশেই ভার্সিটি জীবন শুরু করেছিল। তাই খুব অল্প সময়ের মাঝেই ক্লাসের অনেকের সাথে ফ্রি হতে পেরেছিল। একদিন সে নতুন বন্ধু বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ অভ্রকে আসতে দেখে থেমে গেল। -"আমি কি তোমাদের ডিস্টার্ব করলাম?" কথাটা সকলের উদ্দেশ্যেই বলল অভ্র সাথে সাথে মিথি হাসি মুখে বলল," না, না ইটস ওকে। প্লিজ বসো। আমরা জাস্ট গল্প করছিলাম"। -"আসলে আমার বাসের এখনো একটু দেরী,তাই ভাবলাম তোমাদের সাথে যোগ দিই।" -"ভাল করেছ। আমিও বাসের জন্যই অপেক্ষা করছি। চিরাচরিত হাসি মাথা মুখে উত্তর দিল মিথি।" অভ্রর সাথে প্রথম আলাপের কথা বলতে গেলে আজও এই দিনটার কথাই মনে পড়ে মিথির। এরপর থেকে অভ্র মিথিসহ আরও অনেকেই ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। সম্পর্কগুলো কখন যে তুমি থেকে তুই তোকারিতে নেমে এল ওরা কেউই জানলনা। তবে অভ্র আর মিথির মাঝে তুই বলাটা একটু দেরিতে আসলেও খুব ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছিল ওরা। দিনের প্রতিটা গল্প শেয়ার করা, খেলার মাঠ থেকে সিনেমার নায়ক নিয়ে তর্ক করা, ঝগড়া করা, অভিমান ভাঙ্গানো সবকিছুতেই ওরা একে অপরের উপর নির্ভর হয়ে পড়ছিল। সকলের সাথে আড্ডার মাঝে কোন কোন দিন মিথির জোর করে হাসার চেষ্টা অভ্রর চোখ এড়াতো না। মিথি সবচেয়ে অবাক হত ওদের মাঝের টেলিপ্যাথি দেখে। বেশকিছুদিন এমনও হয়েছে যে অভ্রর কথা মনে পড়ে ও নিজের মনে হাসছে ঠিক সেই মূহুর্তে ফোনের রিং বেজে উঠেছে। এভাবেই স্বপ্নের মত দিনগুলো কাটছিল ওদের। মিথি একসময় বুঝতে পারল যে অভ্র ওর কাছে কেবল বন্ধু নয়,বরঙ বেশি কিছু। বৃষ্টির দিনগুলোতে যখন ও বাড়ি ফিরত তার কল্পনাতে অভ্র তার পাশে পাশেই হাঁটত। গভীর রাতে হতাশার কান্না চাপতে সে যখন বালিশে মুখ গুজে কাঁদত, মন কেবল অভ্রর সান্ত্বনা শুনতে চাইত। তাকে জড়িয়ে ধরে, তার বুকে মাথা রেখে নতুন করে স্বপ্ন দেখত কল্পনায়। রেজাল্টের দিনগুলোতে মিথির দুশ্চিন্তাগুলো যেন অভ্রর শান্ত সাহসী চোখের মাঝেই আশ্রয় খুঁজে বেড়াতো। মনের অজান্তেই অভ্র সেই আশ্রয় দিয়ে বসেছিল, কেবল বাকি ছিল সত্যটুকু স্বীকার করে নেবার। মিথি নিজে থেকে সেই সত্যকে স্বীকারে করেছিল ঠিকই, কেবল তার বাবা মায়ের কথা ভেবে সে কোন নতুন স্বপ্নের পথে পা বাড়ালোনা । মিথির বাড়ির পরিবেশ অতটা রক্ষনশীল না হলেও বাবা-মায়ের সামান্যতম কষ্ট মিথিকে খুব কষ্ট দিত। মিথি জানতো ছেলে হিসাবে অভ্র ওর বাড়িতে যতই জনপ্রিয় হোক না কেন মিথির জীবনসঙ্গী হিসেবে হয়তো মেনে নিতে পারবে না ওর বাবা-মা। তাই মিথি তার স্বপ্নগুলোকে চেপে রেখে বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিল। মিথি যেমন অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস বা স্বপ্ন কোনটাই দেখে নি, তেমনি ওদের বন্ধুত্বের দাবির মুখে অভ্র থেকে দূরে সরে যেতেও পারেনি। বন্ধুত্বের আড়ালে মিথি কেবল ভালবেসে গিয়েছিল অভ্রকে, যে ভালবাসার কোন পরিণতি ছিল না, কোন দাবি ছিল না; ছিল কেবল ভীরুতার মুখোশে ঢাকা অনুশোচনা। এভাবেই দেখতে দেখতে চার বছর পেরিয়ে গেল। পাশ করে চাকরি জীবনে ঢোকার সময় হয়ে এল। অভ্র শীঘ্রই পড়াশোনার পার্ট চুকিয়ে চাকরীতে যোগ দেবে। মিথিকে ঘিরে এই শহরটাতে অনেক মায়া পড়ে গেছে। সেই মায়া কাটাবার সময় হয়ে এসেছে। সব ছেড়ে যাবার কথা মনে করে চোখ বুজলে প্রথমেই যে মুখটা ভেসে ওঠে সে হল মিথি। সমরেশ বাবুর সেই বিখ্যাত মাধবীলতার যে ছবি মনের মাঝে এঁকেছিল অভ্র তাকে খুঁজে পেয়েছিল মিথির মাঝে। যাবার আগে এই সত্যটা অন্তত মিথিকে জানানো দরকার যেন জীবনে কোন আফসোস না থাকে। যাবার আগের দিন মিথি অভ্রর সাথে দেখা করতে গেল। শেষবারের মত, হয়তো দুজনের এভাবে ক্যাম্পাসে আর দেখা হবে না, এভাবে আর কোনদিন কথা হবে না। মিথি ঠোঁটে কাষ্ঠহাসি রেখে জিজ্ঞাসা করল; -"তাহলে কাল চলেই যাবি, আবার কবে আসবি আমার শহরে?" -"যদি কোন পিছুটান থেকে যায় তবে আসব," নির্লিপ্ত উত্তর অভ্রর -"পিছুটানের কথা মনে করে আবার আমাকে ভুলে যাস না যেন, আমার সাথে অবশ্যই দেখা করবি এখানে আসলে" -"পিছুটান বলে কিছু খুঁজতে চাইলে তোকেই খুঁজব আমি। ধরা দিবি?" মিথির চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল অভ্র। হঠাৎ করে হকচকিয়ে গেল মিথি। অভ্র কী বলতে চাচ্ছে তার মাথায় যেন কিছু ঢুকছিল না। অস্পষ্ট স্বরে বলল; -"মানে?" -"মানে তোর মাঝে আমি আমার মাধবীলতাকে খুঁজে পেয়েছি। আজ নয়, অনেক আগেই খুঁজে পেয়েছি। আমার মাধবীলতা হবি? নিজের কাছে কোনকিছুর জন্য অনুতাপ রাখতে চাইনা বলেই এতদিন পর তোকে কথাগুলো বলছি। আজ না বললে আর কোনদিন হয়তো বলা হত না। তোকে বিব্রত করে থাকলে আমি সরি।" মিথি সে মুহুর্তে কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে এমন একটা পরিস্থিতিতে সে পড়তে পারে। যে মানুষটাকে যে কথাগুলো সে প্রত্যহ কল্পনাতে বলেছে,সে কথাগুলো আজ নিজের কানে সেই মানুষের কাছে শুনতে পাচ্ছে। আবেগে ওর গলা ধরে আসছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে বলল; -"তুই ভুল মানুষকে খুঁজে পেয়েছিস। আমি তো মাধবীলতা নই। আমি মিথি,শুধুই মিথি আর কিছু নয়" -"চাইলে কি আমার জন্য মাধবিলতা হওয়া যায় না?" -"না, আমি পারব না," নিজের দৃষ্টিকে অভ্রর কাছ থেকে আড়াল করে ধীর কন্ঠে বলে ফেলল মিথি এরপর সেখানে থেকে চলে এসেছিল মিথি। রাস্তার চারপাশে কতজনের কাছ থেকে চোখের পানি লুকিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরেছিল সে নিজেও হয়তো জানেনা। পরদিন ভোরে চটজলদি তৈরী হয়ে নিল। সারারাত ঘুমায়নি মিথি। পানির ঝাপটা দিয়ে চোখের লাল ফোলা ভাবটা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালালো কিছুক্ষণ। সাড়ে ছয়টায় অভ্রর ট্রেন। ওকে সি অফ করতে যাবার কথা আগে থেকেই ছিল ওদের মাঝে। গত বিকেলের ঘটনার প্রেক্ষিতে অন্তত কথার বরখেলাপ করাটা ঠিক হবে না। বেরিয়ে পড়ল মিথি। স্টেশনে পৌঁছাতে দেখল অভ্রকে ঘিরে ওর রুমমেট আর হলের কিছু বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে। মিথিকে দেখে এগিয়ে এল অভ্র। -"ভেবেছিলাম তুই আজ আসবিনা," অভ্র বলল - "আসব সেরকমই তো কথা হয়েছিল আমাদের মাঝে তাইনা?" অভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। হাসিটার মাঝে যে কত কষ্ট লুকানো ছিল তা মিথির চোখকে ফাঁকি দিল না। মিথির লাল চোখ দুটো দেখে অভ্রর বুঝতে বাকি রইল না যে কাল রাতে মিথি ঘুমায়নি। তারপরও মিথ্যা করে বলল; -"ঠান্ডা লাগসে নাকি তোর? চোখ লাল হয়ে গেছে।" -"হু,"ছোট করে উত্তর দিল মিথি। একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল অভ্রর দিকে। বলল, "এটা তোর জন্য।" প্যাকেটটা হাতে নিতেই ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। সবাই চটজলদি ট্রেনে উঠে পড়ছিল। আর দেরী করাটা বোধহয় ঠিক হবে না। মিথিও ওকে উঠে পড়তে তাগাদা দিল। অভ্র প্রাণপনে চেষ্টা করছে গলার কাছে জমে থাকা কান্নাগুলো গিলে ফেলতে। অভ্র ট্রেনের গেটে দাড়িঁইয়ে একদৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর বন্ধুরা হাত নাড়ছে। আর মিথি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে অভ্র…ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে গেল সব। নিজের সিটে এসে বসতেই হাতে ধরা প্যাকেটএর দিকে চোখ পড়ল অভ্রর। প্যাকেটএর ভেতর ছিল একটা বই,"মিসির আলীর অমীমাংসিত রহস্য"। প্রথম পাতাটা খুলতেই মিথির হাতের গোটা হরফে লেখ; -"কিছু সত্য এভাবেই অমীমাংসিত থেকে যাক,কিছু সত্য না জানাই থেকে যাক। ভালো থাকিস"………… কথাগুলো কেমন আবছা হয়ে আসছিল অভ্রর কাছে। অভ্র জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবার আর গলার কাছে জমে থাকা কান্না যেন ওর কথা শুনতে চাইছে না। দূর দিগন্ত গুলো চোখের বাষ্পে ঝাপসা হয়ে আসছিল। দিগন্ত দূরে সরে যাচ্ছে, অভ্রর মনে হল তার মনের সমস্ত চাওয়া সে ফেলে রেখে যাচ্ছে, অনেকদূর……কোন পিছুটানের আশায় নয়, তবু তারা দূরে ভেসে যাচ্ছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now