বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(৪)
দশ মিনিট পর পাহাড়ের মাথার কাছে উঠে এলো ওরা। পাহাড় না বলে বড় টিলা বলাই উচিত। কিন্তু নাম পাহাড়, জলদস্যুর পাহাড়।ঠিক চূড়ার কাছে গুহামুখ,খুদে একটা আগ্নেয়গিরি যেন। ভেতরে উঁকি দিল তিন গোয়েন্দা। অন্ধকার।
ভেতরে পা রাখল ওরা। তেরছাহয়ে নেমে গেছে সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে একটা গুহায় এসে ঢুকল তিন কিশোর। বেশ বড় হলরুমের মত গুহা। লম্বাটে।
শেষ প্রান্তটা সরু। সুড়ঙ্গ দিয়ে আলো এসে পড়ছে, গুহার ভেতরে আবছা অন্ধকার।
গুহার মাটি আলগা, হাঁটতে গেলে পা দেবে যায়। অসংখ্যবার খোঁড়া হয়েছে প্রতিটি ইঞ্চি, তার প্রমাণ।
নিচু হয়ে একমুঠো মাটি তুলে নিলো কিশোর। আঙুলের ফাঁক দিয়ে ছাড়তে ছাড়তেবলল,
কিশোর পাশা: “গুপ্তধন খুঁজেছে লোকে। গত সোয়াশোবছরে কয় সোয়াশো বার খোঁড়া হয়েছে এখানকার মাটি, আল্লাই জানে ! সব গাধা ! এমন একটা খোলা জায়গায় এনে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখবে, জলদস্যুদের এত বোকা ভাবল কি করে !”
মুসা আমান: “ঠিক,”
মাথা ঝাঁকাল মুসা। আঙুল তুলে সরু প্রান্তটা দেখিয়ে বলল,
“ভেতরে আরও গুহা আছে মনে হচ্ছে ! টর্চ আনলে ঢুকতে পারতাম।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাগিরি করছ, গুহায় ঢুকতে এসেছ, টর্চ আননি কেন ?”
হাসল কিশোর। রবিনের দিকে ফিরল,
“তুমি এনেছ ?”
মুসা আমান: “গুহায় ঢুকব, ভাবিনি।”
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভাবিনি।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাদের জন্যে টর্চ একটা অতি দরকারি জিনিস, সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত,”
আবার হাসল কিশোর।
“তবে, আমিও রাখতে ভুলে যাই। আজ গুহায় ঢুকব, জানি, তাই মনে করে সঙ্গে নিয়ে এসেছি !”
গুহার সরু প্রান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। টর্চ জ্বাললকিশোর। পাথুরে দেয়াল। দেয়ালে অসংখ্য তাক, প্রাকৃতিক। মসৃণ। এখানেই ঘুমাত হয়ত জলদস্যুরা, ঘষায় ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে। কে জানে, বন্দিদেরকে হয়ত হাত-পা বেঁধে এখানেই ফেলে রাখা হত ! অসংখ্য ফাটল, খাঁজ দেখা গেল দেয়ালের এখানে ওখানে। একপাশে, মাটি থেকেফুট ছয়েক উঁচুতে একটা খাঁজে এসে স্থির হয়ে গেলটর্চের আলো। সাদা একটা বস্তু। ওপরের দিকটা গোল।
মুসা আমান: “খাইছে রে !”
চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ঘুরে দাঁড়িয়েই ছুট লাগাতে গেল।
তারপরেই ঘটল অদ্ভুত একটা কাণ্ড ! চমকে থেমে গেল সে।
তাকের ওপর বসে আছে যেন মানুষের মাথার খুলিটা। চক্ষু কোটর দুটো এদিকে ফেরানো। দাঁতগুলো বীভৎস ভঙ্গিতে হাসছে নীরব হাসি,দুই পাটি দাঁতের মাঝে সামান্য ফাঁক। ওই ফাঁক দিয়েই এলো যেন কথাগুলোঃ
–“ভাগ, ভেগে যাও জলদি !”
দী-র্ঘ-শ্বা-স . . .
“আমাকে শান্তিতে একা থাকতে দাও ! এখানে কোন গুপ্তধন নেই !”
পাপালো হারকুস: “তারপর ?”
খুলিটা পেছনে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাপালো হারকুস।
“চিনতে পার ?”
কিশোর পাশা: “নিশ্চয়। প্রথমে দৌড় দিয়েছিলাম, তারপরই মনে হল গলাটা কেমনচেনা চেনা। টর্চ তুলে নিতে আসার সাহস করেছি সেজন্যেই।”
পাপালো হারকুস: “তারমানে,ভয় পাইয়ে দিতে পেরেছি তোমাদের ?”
আবার হাসল পাপালো।
“জলদস্যুর ভূত ভেবে কি একখান কাণ্ডই না করলে !”
মুসা আর রবিনের গোমড়া মুখের দিকে চেয়ে আবার হা হা করে হেসে উঠল সে।
কিশোর পাশা: “আমি ভয় পাইনি,”
গম্ভীর গলায় বলল কিশোর।
“শুধু চমকে গিয়েছিলাম। মুসা আর রবিন . . . ”
দুই সহকারীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে থমকে গেল সে। ভেড়া বনে গেছে যেন মুসা আর রবিন।
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভয় পাইনি,”
বিড়বিড় করল রবিন।
“পা দুটো কথা শুনল না, কি করবে ! খালি ভাগিয়ে নিয়ে যেতে চাইল . . . ”
মুসা আমান: “আমারও একই ব্যাপার ! খুলির ওদিক থেকে কথা শোনা যেতেই পা দুটো চনমন করে উঠল। ছুটিয়ে বের করে নিয়ে যেতেচাইল গুহার বাইরে। তাই, ইচ্ছে করেই তো হোঁচট খেলাম . . . ”
হো হো করে হেসে উঠল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “দারুণ কৌতুক ! হাঃ হাঃ হাঃ . . . ”
কিশোরও হেসে ফেলল। হাসিটাসংক্রমিত হল মুসা আর রবিনের মাঝেও।
রবিন মিলফোর্ড: “দু’ডলারেদু’জন মানুষের খাওয়া হয়!!”
চোখ কপালে উঠল রবিনের।
“বেঁচে আছ কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “আছি, কোনমতে,”
সহজ গলায় বলল পাপালো।
“পুরানো ভাঙা একটা কুঁড়েঘরে ঘুমাই। এক সময় ঝিনুকরাখত ওখানে জেলেরা। কাজে লাগে না এখন, ফেলে রেখেছে। ভাড়া দিতে হয় না আমাকে। সীম আর রুটি কিনতেই খরচ হয়ে যায় দু’ডলার। মাছ ধরতে জানি, তাই বেঁচে আছি। বাবা অসুস্থ। ভাল খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব? মাঝে মাঝে বাবার কষ্ট দেখলে আর সইতে পারি না। ছুটে বেরিয়ে আসি কুঁড়ে থেকে। পাগলের মত ঘুরে বেড়াই উপসাগরে, খুঁজে ফিরি সোনার মোহর। মানুষেরদয়া আমি চাই না, ঈশ্বর আমাকে সাহায্য করলেই যথেষ্ট।”
অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না আর। নোনাপানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে হাওয়া, শাঁই শাঁই শব্দ, সাগরের দীর্ঘশ্বাস যেন।
কোমরের বেল্টে গোঁজা ছুরিখুলে নিয়ে খামোখাই মাটিতে গাঁথছে পাপালো। থমথমে পরিবেশ হালকা করার জন্যে হাসল।পাপালো হারকুস: “নিজের দুঃখের সাতকাহনই গেয়ে চলেছি ! আসল কথা থেকে দূরেসরে গেছি অনেক। হ্যাঁ, কি যেন জিজ্ঞেস করছিলে ?”
মুসা আমান: “গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে খুঁজে পেলে কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “সকালে হাক স্টিভেনের ওখানে বাসনমাজছিলাম। হঠাৎ কানে এলো,হাসাহাসি করছে কয়েকজন লোক। একজন বললঃ গোয়েন্দা, না ! গোয়েন্দা আনাচ্ছে ! আসুকনা আগে ! হাত দেখিয়ে ছাড়ব ব্যাটাদের !”
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে হঠাৎ থেমে গেল কিশোর।
কিশোর পাশা: “হাত ! শব্দটাকোন বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিল ?”
পাপালো হারকুস: “তুমি কি করে বুঝলে ! ওই শব্দটা বলার সময় জোর দেয় সে। ঝড়ের সময়ই তোমাদের নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল। বুঝে গেলাম, কোথায়পাওয়া যাবে তোমাদেরকে।”
কিশোর পাশা: “দ্য হ্যাণ্ড. . . হস্ত. . . হাত,”
বিড়বিড় করল কিশোর। চিমটি কাটছে ঠোঁটে।
পুরানো গলাবন্ধ শার্টের তলায় হাত ঢোকাল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “আমাকে যখন বিশ্বাস কর তোমরা. . . একটা জিনিস দেখাচ্ছি. . .,”
ছুরিটা মাটিতে রেখে চামড়ার তেল চিটচিটে একটাথলে বের করে আনল সে। প্লাস্টিকের সুতোয় বাঁধা মুখ। বাঁধন খুলল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “চোখ বন্ধকর সবাই,”
হাসি হাসি গলায় বলল।
“হাত বাড়াও।”
হাসল তিন গোয়েন্দা। চোখ বন্ধ করে হাত সামনে বাড়াল।
সবার ডান হাতের তালুতে একটা করে বস্তু রাখল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “এবার চোখখোল !”
অবাক হয়ে দেখল তিন গোয়েন্দা, তিনটে পুরানো সোনার মোহর।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে চকচকে মুদ্রার ধারটা পরীক্ষা করল রবিন। ক্ষয়েগেছে। লেখা পড়ল।
রবিন মিলফোর্ড: “ষোলোশো পনেরো !”
চোখ বড়বড় হয়ে গেছে তার।
“এত পুরানো !”
কিশোর পাশা: “স্প্যানিশ ডাবলুন !”
হাতের মোহরটার দিকে চেয়েআছে কিশোর।
“জলদস্যুদের গুপ্তধন !”
মুসা আমান: “ইয়াল্লা ! কোথায়, কোথায় পেয়েছ এগুলো ?”
কিশোর পাশা: “দশ লাখ ডলার!”
ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের।
জিম রিভান: “হ্যাঁ,”
অকেজো বাঁ হাত দেখিয়ে বলল জিম।
“ওই টাকার জন্যেই আমার হাতটা গেল . . . ”
কৌতূহলী হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কাহিনীটা শোনাতে অনুরোধ করল জিমকে।জিম রিভান: “এক পরিবহন কোম্পানিতে চাকরি করতাম সে সময়। টাকা-পয়সা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র এক জায়গা থেকেআরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিত কোম্পানি। আমি ছিলাম একটাআর্মার কারের গার্ড। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পৌঁছে দিতে হত বিভিন্ন জায়গায়। কিছু নিয়মিত কাজ ছিল। তার মধ্যে একটাঃপ্রাইভেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে মেলভিলেরন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দিয়ে আসা। দিয়ে আসতাম। ঠিকঠাক মতই চলছিল সব। নির্দিষ্ট কোন একটা পথে চলাচল করতাম না আমরা। আজ এ পথে গেলে পরের বার অন্য পথে, তারপরের বার আরেক পথে। নির্দিষ্ট কোন সময়ওমেনে চলতাম না। ডাকাত লুটেরাকে ফাঁকি দেবার জন্যেই এই সাবধানতা। কিন্তু তারপরেও একদিন ঘটেগেল অঘটন . . . ”
জিমের কথা থেকে জানা গেল, ঘটনার দিন, ফিশিং-পোর্টেরএক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে মেলভিলে চলেছিল আর্মার কার। গাড়িতে দু’জন লোক। ড্রাইভার আর জিম। পথে এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে দুপুরের খাবার খেতে নামল দু’জনে। গাড়িটা পথের পাশে পার্ক করে তালা লাগাল সিন্দুকে।তারপর ঢুকল রেস্টুরেন্টে। বসল গিয়ে জানালার কাছে, ওখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল গাড়িটা।
খাওয়া শেষ করে বেরোল দু’জনে। হঠাৎ পাশের একটা পুরানো সিডান গাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো মুখোশপরা দু’জন লোক। হাতে রিভলভার।ড্রাইভারের পায়ে গুলি করল একজন। আরেকজন বাড়ি মারল জিমের কাঁধে, মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে বেহুঁশ হয়ে পড়ল জিম।
গার্ডের পকেট থেকে সিন্দুকের চাবি বের করে নিলো ডাকাতেরা। আর্মার কারে উঠে বসল। গুলির শব্দকানে গিয়েছিল একজন কনস্টেবলের। ছুটে এলো সে।গুলি করল দুই ডাকাতকে লক্ষ্য করে। একজনের হাতে গুলি লাগল। গাড়ি নিয়ে পালিয়ে গেল ডাকাতেরা।
পুলিশ স্টেশনে ফোন করে দিল কনস্টেবল। সাড়া পড়েগেল। রোড ব্লক করে দিল পুলিশ। কড়া পাহারা বসে গেল রাস্তায় রাস্তায়।
সাঁঝের একটু পরে পাওয়া গেল গাড়িটা, রক্তাক্ত। খালি। একটা পরিত্যক্ত বোটহাউসের কয়েক মাইল দূরে। বোঝা গেল, জলপথে পালিয়েছে ডাকাতেরা।
মাঝরাতে কোস্ট গার্ডদের পেট্রল বোট একটা সাধারণ বোটকে ভাসতে দেখল উপসাগরে, কঙ্কাল দ্বীপের কাছাকাছি। বোটের একজন কি যেন ফেলছে পানিতে। তাড়াতাড়ি কাছে চলে এলো কোস্ট গার্ডের বোট। দু’জনলোক অন্য বোটটাতে। দুই ভাই, ডিক এবং বার্ড ফিশার। দু’জনেই খুব ক্লান্ত, হাল ছেড়ে দিয়েছে। বাডের বাহুতে গুলির ক্ষত, রক্ত ঝরছে ! লুট করা টাকার একটি নোটও পাওয়া গেল না বোটে।জিম রিভান: “ব্যাপারটা বুঝেছ তো ? নোটের বাণ্ডিলপানিতে ফেলে দিয়েছিল দুইডাকাত। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে পরে, কিন্তু একটা নোটও আর পাওয়া যায়নি। পানিতে ভিজে নিশ্চয় গলে-ছিঁড়ে গিয়েছিল কাগজের নোট।”
মুসা আমান: “মহা-হারামী তো ব্যাটারা। ধরা পড়ল বটে, কিন্তু টাকা ফেরত দিল না। তা ব্যাটাদের জেলহয়েছিল তো ?”
জিম রিভান: “হয়েছিল। হোভারসনের রিভলভারের বুলেটে আহত হয়েছে বাড। কিন্তু বমাল ধরা যায়নি, তাই মাত্র চার বছর করে জেল হয়ে গেল দুই ভাইয়ের। জেলখানায় ভাল ব্যাবহারের জন্যে অর্ধেক শাস্তি মওকুফ করে দেয়া হয়েছে ওদের। ছাড়া পেয়েছে হপ্তা দুয়েক আগে। কিন্তু আমার হাত আর ফিরে পেলাম না,”
জিমের কণ্ঠে ক্ষোভ।
“কাজও গেল কোম্পানি থেকে।এরপর আর ভাল কোন কাজ পাইনি আজ পর্যন্ত। ইচ্ছে করে, ব্যাটাদেরও হাত ভেঙেদিই . . . ”
রাফাত আমান: “এই যে, যাও, বোটে উঠে পড়। চোখ বুজে নির্ভর করতে পার জোসেফের ওপর। খুব ভাল ডুবুরি।”
ছেলেদেরকে বোটে তুলে দিয়ে চলে গেলেন মুসার বাবা।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now