বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
খেয়াঘাটের মাঝি
-আরভিন আহমেদ
পদ্মার পানিতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে ছোট ডিংগি নৌকাখানা এগিয়ে যাচ্ছে তার আপন গন্তব্য।নৌকার উপর সাত-আট জন যাত্রী বসে আছে অধীর অপেক্ষায় তাদের গন্তব্য পৌছানোর জন্য,আর নৌকাখানার একপাশের শেষ প্রান্তে দৃঢ়হাতে বসে মাঝি কাঁলাচান তার শক্ত,পরিশ্রমী হাত দিয়ে পদ্মার গভীর জলরাশির বুকে বৈঠাদ্বারা গভীর জলসংগীত সৃষ্টি করছে।গ্রীষ্মের খরদীপ্ত রৌদ্র আর শারিরীক কান্তিতেও কাঁলাচান দূর্বার পরিশ্রমে ছুটে চলেছে,কবিরাজপুরের খেয়াঘাটের দিকে,গত ত্রিশটি বছর ধরেই এ ডিংগি নৌকার সহিত সে হৃদ্যতার বন্ধনে যুক্ত,পিতার সাথে সেই বুঝ হওয়ার পরই সে এই ডিংগি নৌকার সহিত সম্পর্ক,মাঝে অনেকগুলো বছরই কেটে গিয়েছে,কবিরাজপুরের শেষ সীমানায় তার বাড়ি।সেই পঁচিশ বছর পূর্বে পিতাকে হারানোর পর হতেই স্বীয় হাতে এ ডিংগি নৌকা নিয়ে সে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে, তার এই জগত সংসারে থাকার মত আছে কেবল এগারোবর্ষী কন্যা আলেয়া আর সন্তানরূপী এই ডিংগি নৌকা,স্ত্রী গত হয়েছে সেই আলেয়া জন্ম নেবার সময়ই,আতুঁড়ঘরেই মেয়েটাকে রেখে হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারের মাঝে,তখন থেকেই কাঁলাচান মেয়েটাকে অনেক কষ্টে,পেলেপুষে বড় করেছে,তার জগত সংসারই এখন আলোকিত করে আছে এই আলেয়া,মাঝে মাঝে কাঁলাচানের মনে হয় তার মাতা পুনরায় আলেয়ার বেশ ধরেই ফিরে এসেছেন তার কাছে,স্নেহ দিয়ে,শাসন দিয়ে তাকে পরিচালিত করছে তার এই মাতারূপে আলেয়া।সংসারের সমস্ত কাজ আলেয়া একাই সম্পাদন করে,নিজের কচি ডগার মত হাতগুলো দিয়ে রান্নাঘরটাকেই ব্যস্ত রাখে সে,দুপুরের সূর্যটা যখন প্রচন্ড তাপে উদ্ভাসিত হয়ে পড়ে ঠিক তখন আলেয়া খাবার নিয়ে ছুটে যায় পদ্মার তীরে তার পিতা কাঁলাচানের জন্য।
আজো ব্যাতিক্রম নয়,দূর হতেই বসে দেখতে পেল কাঁলাচান, খাবারটা হাতে নিয়ে ঘাটে বসে আছে আলেয়া।ঘাটে এসেই নৌকাখানা ভিড়িয়ে সবার কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে,সকাল হতে এ পর্যন্ত একটাকার ভাড়া আদায় করেছে,যা দিনকাল পড়েছে তাতে এ অর্থ খুবই যৎসামান্য, নৌকাটাকে ঘাটের খুটির সাথে বেধে হাত মুখ ধুয়ে বসে পড়ল খেতে,পরিশ্রান্ত শরীরে খুবই ক্ষুধার্ত কালাচাঁন।মাটির সানকিতে ধূয়ো উঠা গরম ভাতের সাথে কচুর শাক রেঁধে এনেছে আলেয়া,নিশ্চিত আজো শাক কুড়াতে বেরিয়ে ছিল মেয়েটা ভাবছে কালাচাঁন। পরম তৃপ্তিতে উদরফুর্তি করছে আর পাশে বসে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে আলেয়া।
-" মা রে তুই খাইছস "জিজ্ঞেস করল সে।
-" হ বাজান,আমি খাইছি তুমি খাইয়া লও "প্রতিত্তুরে বলল আলেয়া।
কি সুন্দর করেই সাজিয়ে উত্তর দিল এত্তটুকুন মেয়েটা,কালাচাঁন ভাল করেই জানে, বাড়িতে যে পরিমাণ চাল ছিল তাতে একজনেরই হওয়ার কথা,আখিযুগল অশ্রুধারায় ভারি হয়ে উঠল তার,নিজ হাতেই আলেয়ার মুখে ভাত তুলে দিতে লাগলো সে।মেয়েটা ঠিক তার দাদীর মত,কালাচাঁন যখন ছোট ছিল,তখন তার মা ও নিজে না খেয়ে তাকেই খাওয়াত আর পরম তৃপ্তিভরে চেয়ে থাকতো। খাওয়া শেষে সব গুছিয়ে আলেয়া বাড়ির দিকে পথ ধরে,পিছন হতে ডাক দিয়ে কালা তাকে একটাকা দিয়ে দেয় আর বলে ঘরের জন্য চাল,ডাল কিনে নিতে,আলেয়া কোনরুপ প্রতিত্তুর না দিয়ে ভাংগতি পয়সাগুলো নিয়ে বাড়ির দিকে আবার পথ ধরে।নৌকার উপর গিয়ে আলসে ভাব নিয়ে বসে কালা,নৌকাটার বয়স হয়েছে,বেশকিছু সংস্কার করাতে হবে কিন্তু এই মূহুর্তে যে তার হাতখানা একদম খালি,নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা,আনমনেই চিন্তার গহীন রাজ্য হারিয়ে যায় কালাচাঁন।
বেশ কদিন ধরেই শুনছে,কলের স্টীমার নাকি ভিড়বে খেয়াঘাটে,এতে যে তার নৌকার চাহিদা কমবে তা সে ঢ়েড় বুঝতে পারছে।রাতের বেলা হঠাৎই ঘুম ভেংগে যায় তার,খড়ের চালার ফাক হয়ে যাওয়া অংশ দিয়ে আকাশের থালার মত চাদের জোৎস্না ঘরে এসে পড়ছে,এই জোৎস্না আলোয় মেয়েটাকে দেখে পুলকিত হয়ে উঠে কালার হৃদয়,তার এই মেয়ের জন্যই হয়তো আজ সে বেঁচে আছে,মাঝে মাঝেই অবাক হয় সে,কি করে অতটুকু মেয়ে এই সংসারটা সামলায়,মেয়েটার ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই কপালে চিন্তার বলি রেখা ফুটে তার,দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবার শুয়ে পড়ে কালাচাঁন। পরদিন সকালেই ঘাটে আসতে অবাক হয়ে যায় কালা,মজিদ সরদার কিছু লোক নিয়ে ঘাটের পাশে একটা ঘর করেছে,আর ঘাট টাকে নানা রং বেরংয়ের কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে,অনেকেই দাড়িয়ে তাদের তামাশা দেখছে,কালাচাঁন কাছে যেতেই মজিদ সরকার মিঠাইর হাড়ি এনে তাকে মিষ্টিমুখ করাতে লাগলো আর কোন কিছু ভেবে না পেয়ে হতবিহ্ববল হয়ে রইল কালা।
-"নেও নেও আগে মিঠাই খাও,আজ থেইক্যা এই ঘাটের ইজারা পাইছি আমি,অহন থেইক্যা এই খেয়াঘাটে কলের স্টীমার ভীড়ব "
কথাখানা শুনেই কালার বুকের মাঝে ধক করে হতাশার হৃদস্পন্দন আঘাত করল,
-" হুন মিয়া,আজীবন তো কষ্ট করলা,ভালা একখান কথা কই,এই নাও বেইচ্যা গঞ্জে চইল্যা যাও,অইহানে বরফকল আছে কামে লাইগ্যা যাও,ম্যালা পয়সা কামাইতে পারবা "
কোন কথার উত্তর না দিয়েই সোজা নৌকায় গিয়ে বসে রইল কালা,ঘাটে যাত্রী থাকলেও আজ তার ডিংগি নৌকার যাত্রী নেই তেমন একটা, মাত্র দুজন যাত্রী নিয়েই গঞ্জের দিকে রওনা হয় কালা,পিছন ফিরে দেখতে পায় সে মজিদের উপহাস্যকর হাসি।কিছুটা দূর যেতেই দেখতে পায় কলের স্টীমার কে,কত শক্তি নিয়ে এই জলদানব পদ্মার অবাধ্য জলরাশিকে শায়েস্তা করতে করতে এগোচ্ছে,এই জলদানবের উত্তলিত জলের ধাক্কায় কালা বৃদ্ধভারাক্রান্ত নাওয়ের অবস্থা হাবুডুবু খাওয়ার মত,তাকে পিছনে ফেলেই জলদানবটা এগিয়ে যায় গঞ্জের দিকে।
সারাটা দুপুর পার হয়ে বিকেল হয়ে আসে,মাথার উপর থেকে সূর্যটা ঢলে পশ্চিমে চলে যায় তবুও কালাচাঁন আজ গঞ্জের ঘাটে বসে আছে যাত্রীর অপেক্ষায়, তারই সামনে দিয়ে গগনবিদারী আর্তনাদে যাত্রী নিয়ে ছুটে চলে যায় খেয়াঘাটের দিকে,দিন শেষে মাত্র তিনজন যাত্রী নিয়ে রওনা দেয় খেয়াঘাটের দিকে তখন রাতের আধার ঘনিয়ে এসেছে।সারাটা দুপুর জুড়ে বিকেল অবধি পিতার জন্য খাবার নিয়ে আলেয়া খেয়াঘাটে অপেক্ষা করতে থাকে কিন্তু তার পিতার দেখা না মেলায় সন্ধ্যারাত্রিতে ঘরে ফিরে কুপি জ্বালিয়ে পিতার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থাকে।কুপির তেলও প্রায় ফুরিয়ে যায় যায় অবস্থা,এমতাবস্থায় ঘরে ফিরে কালা,পিতাকে দেখে গামছাখানা নিয়ে এগিয়ে আসে আলেয়া,কালার আজ মন বিমর্ষ তাই কন্যার এহেন ব্যবহারেও সে অসন্তুষ্ট, ছো মেরে গামছাখানা নিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ফিরে।কালা ঘরে ফিরতেই আলেয়া তার পিতার জন্য পাতে ভাত বেড়ে দেয়,ঠান্ডা ভাত মুখে পড়তেই চেতে উঠে কালা,
-" হারাটা দিন ধইরা করছস কি,সাইঝ বেলায় আইসা ঠান্ডা ভাই খাইতি দেস "
পিতার এহেন ক্ষুব্ধ আচরণে আলেয়া অবাক হলে ও চুপ করে নিরবতা পালন করে,কিছুক্ষন পর বলে উ...
-" বাবা ঘরে চাউল নাই,কাইলকের লাগি চাউল লাগবে "
কথাখানা শুনেই যেন আরো ক্ষেপে উঠে কালা...
-" এত চাউল যায় কই,বইয়া বইয়া ডাইনীর মত খালি খাইস, থাকবো কেমনে"
যদিও কালা ভাল করেই জানে,জিনিসপাতির যে দাম তাতে তো কোনমতে দিনে এনে দিনে খাওয়ার মত চলছিল,কিন্তু ওই জলদানবটার জন্য এখন যে তাকে না খেয়ে মরতে হবে তা ভালই টের পাচ্ছিল,মনে মনে জলদানবটাকে উদ্দেশ্য করে খুব বিশ্রী ভাষায় গাল কীর্তন করল,এহেন সময় নিভু নিভু কুপিখানা নিভেই গেল,
-" কিরে কুপি নিভল ক্যান " জিজ্ঞেস করল কালা,
-" বাজান তেল ফুরাইয়া গেছে গা,ঘরে তেলও নাই,কাইল কিনতে হইব, ট্যাকা দিয়া যাইও,আইনা রাখমু নে.."
আলেয়ার এহেন প্রতিত্তুরে ক্ষীপ্ত কালা ক্ষোভে ফেটে পড়, অন্ধকারেই কুপিখানা হাতড়ে ছুড়ে মারে আলেয়ার দিকে,
-" হারামজাদি,খাইয়ে খাইয়ে আমার সব শেষ করলি....
কুপিটা অদৃশ্য কোনস্থানে ভোঁতা আওয়াজ তুলিয়া মাটিতে আছড়ে পড়ল,আর সাথে সাথে একটা আওয়াজ উৎপন্ন হল," ও মা গো.. "তারপর সব নিশ্চুপ...রাগে গজতে গজতে কালা নদীর পাড়ে চলে যায়,উন্মত্ত কালা ছুটে গিয়ে ঘাটের ইজারার ঘরখানা ভেংগে ফেলে গোটা কয়েক খিস্তি খেউর তুলে মজিদ আর জলদানবটার প্রতি।আজ আকাশে চাঁদটা অনেক উজ্জ্বলিত হয়ে আছে,তার স্ফুটিত জোছনায় সারা বসুধা আলোকিত,এখনো নদীর পাড়েই বসে আছে কালা,মনটা আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে,বুঝতে পারে আলেয়ার সাথে তার অমন ব্যবহার মোটেও শোভা পায় না,নিশ্চিত এখনো মেয়েটা তার জন্যই বসে আছে,তাছাড়া এখানে থাকাও নিরাপদ নয়,কেউ দেখে ফেললে নির্ঘাত ফেসে যাবে ঘাটের ইজারার ঘর ভাংগার অপরাধে,দ্রতপদে বাড়ির দিকে রওনা হয় কালাচাঁন।
বাড়ির কাছে ফিরতেই মেয়েকে ডাকা শুরু করে কালা,
"মা রে ও মা"কই গেলি... বাপরে মাফ কইরে দে,রাইগে ছিলাম তো তাই,
কিন্তু তার কথার কোন প্রতিত্তুর ভেসে আসে না,এবার নাম ধরেই ডাকে সে,
-" আলেয়া, আলেয়া মারে,বাপজানের লগে কথা কইবি না..."
মনে মনে ভাবে মেয়েটা হয়তো রাগ করেই আছে এখনো, ঘরে ঢুকে দেখে খড়ের চালার ফাক দিয়ে পুরো ঘর আলোকিত হয়ে আছে আর মেঝেতে পড়ে আছে আলেয়া, ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নেয় সে,চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় রক্তস্নাত আলেয়ার মুখখানা, আজ জোছনার আলোয় আলেয়া আলোকিত,আজ যে কালা তার জীবনের আলোকেই হারিয়ে ফেলল,বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো গলা দিয়ে,মেয়েকে বুকে রেখেই অঝোর ধারায় অশ্রুর বর্ষণ করতে লাগলো। আস্তে আস্তে ভোর ঘনিয়ে আসছে,কালা তার গুটিকতক কাপড় নিয়ে গামছাখানা দিয়ে মুখমণ্ডল ভালভাবে ঢেকে ঘর হতে বের হল,পাছে কেউ না দেখে যায়,শেষবারের মত সে তার মাতারূপী কন্যা আলেয়ার নিথর দেহটাকে দেখে বের হয়ে পড়ল।বুকের ভেতর আজ দুঃখের ডমরু বাজছে,কন্যাবিয়োগে সে আজ নিঃস্ব,আবার এও ভয় কেউ দেখলে পুলিশে দেবে নিঘাৎত ফাসি,না তাকে যে বাঁচতেই হবে।খেয়াঘাটে এসে দেখল গুটিকতক যাত্রী অপেক্ষা করছে তাদের সাথে সেও অপেক্ষা করতে লাগলো, দূর হতে লক্ষ্য করল,মজিদ ইজারার ঘর ভাংগার জন্য অদৃশ্য কারো নামে গালিবর্ষণ করছে।কিছু সময় পরেই,স্টীমার ঘাটে এসে ভীড়ে,অন্যদের সাথে সেও উঠে পড়ে,আস্তে আস্তে গঞ্জের দিকে রওনা দিতে থাকে জলদানবটা,যতদূরে চোখ যায়, নদীর ঘাটে পড়ে থাকে খেয়া ঘাটের নৌকা আর খেয়া
ঘাটের মাঝি চলে যায় কালের হাত ধরে, অন্তর্নীলের মাঝে....................
উৎসর্গঃ আমার প্রিয় আব্বু কে যিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে......
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now