বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সেদিন নূতন ফাল্গুনে প্রথম বসন্তের
হাওয়া দিতেই আশা অনেক দিন
পরে সন্ধ্যার আরম্ভে ছাদে মাদুর
পাতিয়া বসিয়াছে। একখানি
মাসিক কাগজ লইয়া খণ্ডশ
প্রকাশিত একটা গল্প খুব মনোযোগ
দিয়া সেই অল্প আলোকে
পড়িতেছিল। গল্পের নায়ক তখন
সংবৎসর পরে পূজার ছুটিতে বাড়ি
আসিবার সময় ডাকাতের হাতে
পড়িয়াছে,আশার হৃদয় উদ্বেগে
কাঁপিতেছিল; এ দিকে হতভাগিনী
নায়িকা ঠিক সেই সময়েই বিপদের
স্বপ্ন দেখিয়া কাঁদিয়া জাগিয়া
উঠিয়াছে। আশা চোখের জল আর
রাখিতে পারে না। আশা বাংলা
গল্পের অত্যন্ত উদার সমালোচক
ছিল। যাহা পড়িত,তাহাই মনে হইত
চমৎকার। বিনোদিনীকে ডাকিয়া
বলিত,”ভাই চোখের বালি, মাথা
খাও, এ গল্পটা পড়িয়া দেখো। এমন
সুন্দর! পড়িয়া আর কাঁদিয়া বাঁচি
না।” বিনোদিনী ভালোমন্দ বিচার
করিয়া আশার উচ্ছ্বসিত উৎসাহে
বড়ো আঘাত করিত।
আজিকার এই গল্পটা আশা
মহেন্দ্রকে পড়াইবে বলিয়া স্থির
করিয়া যখন সজল-চক্ষে কাগজখানা
বন্ধ করিল, এমন সময় মহেন্দ্র আসিয়া
উপস্থিত হইল। মহেন্দ্রের মুখ
দেখিয়াই আশা উৎকণ্ঠিত হইয়া
উঠিল। মহেন্দ্র জোর করিয়া
প্রফুল্লতা আনিবার চেষ্টা করিয়া
কহিল, “একলা ছাদের উপর কোন্
ভাগ্যবানের ভাবনায় আছ?”
আশা নায়ক-নায়িকার কথা
একেবারে ভুলিয়া গিয়া কহিল,
“তোমার কী শরীর আজ ভালো
নাই।”
মহেন্দ্র। শরীর বেশ আছে।
আশা। তবে তুমি মনে মনে কী একটা
ভাবিতেছ, আমাকে খুলিয়া বলো।
মহেন্দ্র আশার বাটা হইতে একটা
পান তুলিয়া লইয়া মুখে দিয়া কহিল,
“আমি ভাবিতেছিলাম, তোমার
মাসিমা বেচারা কত দিন
তোমাকে দেখেন নাই। একবার হঠাৎ
যদি তুমি তাঁহার কাছে গিয়া
পড়িতে পার, তবে তিনি কত খুশিই
হন।”
আশা কোনো উত্তর না করিয়া
মহেন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া
রহিল। হঠাৎ এ কথা আবার নূতন
করিয়া কেন মহেন্দ্রের মনে উদয়
হইল, তাহা সে বুঝিতে পারিল না।
আশাকে চুপ করিয়া থাকিতে
দেখিয়া মহেন্দ্র কহিল, “তোমার
যাইতে ইচ্ছা করে না?”
এ কথার উত্তর দেওয়া কঠিন।
মাসিকে দেখিবার জন্য যাইতে
ইচ্ছা করে, আবার মহেন্দ্রকে
ছাড়িয়া যাইতে ইচ্ছাও করে না।
আশা কহিল, “কালেজের ছুটি
পাইলে তুমি যখন যাইতে পারিবে,
আমিও সঙ্গে যাইব।”
মহেন্দ্র। ছুটি পাইলেও যাইবার জো
নাই; পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতে
হইবে।
আশা। তবে থাক্, এখন না-ই গেলাম।
মহেন্দ্র। থাক্ কেন। যাইতে
চাহিয়াছিলে, যাও-না।
আশা। না, আমার যাইবার ইচ্ছা
নাই।
মহেন্দ্র। এই সেদিন এত ইচ্ছা ছিল,
হঠাৎ ইচ্ছা চলিয়া গেল? আশা এই
কথায় চুপ করিয়া চোখ নিচু করিয়া
বসিয়া রহিল। বিনোদিনীর সঙ্গে
সন্ধি করিবার জন্য বাধাহীন অবসর
চাহিয়া মহেন্দ্রের মন ভিতরে
ভিতরে অত্যন্ত অধীর হইয়া
উঠিয়াছিল। আশাকে চুপ করিয়া
থাকিতে দেখিয়া তাহার একটা
অকারণ রাগের সঞ্চার হইল। কহিল,
“আমার উপর মনে মনে তোমার
কোনো সন্দেহ জন্মিয়াছে নাকি।
তাই আমাকে চোখে চোখে পাহারা
দিয়া রাখিতে চাও?”
আশার স্বাভাবিক মৃদুতা নম্রতা
ধৈর্য মহেন্দ্রের কাছে হঠাৎ অত্যন্ত
অসহ্য হইয়া উঠিল। মনে মনে কহিল,
“মাসির কাছে যাইতে ইচ্ছা আছে,
বলো যে, আমি যাইবই, আমাকে
যেমন করিয়া হোক পাঠাইয়া দাও–
তা নয়, কখনো হাঁ, কখনো না, কখনো
চুপচাপ–এ কী রকম।”
হঠাৎ মহেন্দ্রের এই উগ্রতা দেখিয়া
আশা বিস্মিত ভীত হইয়া উঠিল।
সে অনেক চেষ্টা করিয়া কোনো
উত্তরই ভাবিয়া পাইল না। মহেন্দ্র
কেন যে কখনো হঠাৎ এত আদর করে,
কখনো হঠাৎ এমন নিষ্ঠুর হইয়া উঠে,
তাহা সে কিছুই বুঝিতে পারে না।
এইরূপে মহেন্দ্র যতই তাহার কাছে
দুর্বোধ্য হইয়া উঠিতেছে, ততই
আশার কম্পান্বিত চিত্ত ভয়ে ও
ভালোবাসায় তাহাকে যেন অত্যন্ত
অধিক করিয়া বেষ্টন করিয়া
ধরিতেছে।
মহেন্দ্রকে আশা মনে মনে সন্দেহ
করিয়া চোখে চোখে পাহারা
দিতে চায়! ইহা কি কঠিন উপহাস,
না নির্দয় সন্দেহ? শপথ করিয়া কি
ইহার প্রতিবাদ আবশ্যক, না হাস্য
করিয়া ইহা উড়াইয়া দিবার কথা?
হতবুদ্ধি আশাকে পুনশ্চ চুপ করিয়া
থাকিতে দেখিয়া অধীর মহেন্দ্র
দ্রুতবেগে সেখান হইতে উঠিয়া
চলিয়া গেল। তখন কোথায় রহিল
মাসিক পত্রের সেই গল্পের নায়ক,
কোথায় রহিল গল্পের নায়িকা।
সূর্যাস্তের আভা অন্ধকারে
মিশাইয়া গেল, সন্ধ্যারম্ভের
ক্ষণিক বসন্তের বাতাস গিয়া
শীতের হাওয়া দিতে লাগিল–
তখনো আশা সেই মাদুরের উপর
লুণ্ঠিত হইয়া পড়িয়া রহিল।
অনেক রাত্রে আশা শয়নঘরে গিয়া
দেখিল, মহেন্দ্র তাহাকে না
ডাকিয়াই শুইয়া পড়িয়াছে। তখনই
আশার মনে হইল, স্নেহময়ী মাসির
প্রতি তাহার উদাসীনতা কল্পনা
করিয়া মহেন্দ্র তাহাকে মনে মনে
ঘৃণা করিতেছে। বিছানার মধ্যে
ঢুকিয়াই আশা মহেন্দ্রের দুই পা
জড়াইয়া তাহার পায়ের উপর মুখ
রাখিয়া পড়িয়া রহিল। তখন
মহেন্দ্র করুণায় বিচলিত হইয়া
তাহাকে টানিয়া লইবার চেষ্টা
করিল। আশা কিছুতেই উঠিল না। সে
কহিল, “আমি যদি কোনো দোষ
করিয়া থাকি, আমাকে মাপ করো।”
মহেন্দ্র আর্দ্রচিত্তে কহিল,
“তোমার কোনো দোষ নাই, চুনি।
আমি নিতান্ত পাষণ্ড, তাই
তোমাকে অকারণে আঘাত
করিয়াছি।”
তখন মহেন্দ্রের দুই পা অভিষিক্ত
করিয়া আশার অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে
লাগিল। মহেন্দ্র উঠিয়া বসিয়া
তাহাকে দুই বাহুতে তুলিয়া আপনার
পাশে শোয়াইল। আশার রোদনবেগ
থামিলে সে কহিল, “মাসিকে কি
আমার দেখিতে যাইবার ইচ্ছা করে
না। কিন্তু তোমাকে ফেলিয়া
আমার যাইতে মন সরে না। তাই
আমি যাইতে চাই নাই, তুমি রাগ
করিয়ো না।”
মহেন্দ্র ধীরে ধীরে আশার আর্দ্র
কপোল মুছাইতে মুছাইতে কহিল, “এ
কি রাগ করিবার কথা, চুনি।
আমাকে ছাড়িয়া যাইতে পার না,
সে লইয়া আমি রাগ করিব?
তোমাকে কোথাও যাইতে হইবে
না।”
আশা কহিল, “না, আমি কাশী
যাইব।”
মহেন্দ্র। কেন।
আশা। তোমাকে মনে মনে সন্দেহ
করিয়া যাইতেছি না–এ কথা যখন
একবার তোমার মুখ দিয়া বাহির
হইয়াছে, তখন আমাকে কিছুদিনের
জন্যও যাইতেই হইবে।
মহেন্দ্র। আমি পাপ করিলাম,
তাহার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে
করিতে হইবে?
আশা। তাহা আমি জানি না–
কিন্তু পাপ আমার কোনোখানে
হইয়াছেই, নহিলে এমন-সকল অসম্ভব
কথা উঠিতেই পারিত না। যে-সব
কথা আমি স্বপ্নেও ভাবিতে
পারিতাম না, সে-সব কথা কেন
শুনিতে হইতেছে।
মহেন্দ্র। তাহার কারণ, আমি যে কী
মন্দ লোক তাহা তোমার স্বপ্নেরও
অগোচর।
আশা ব্যস্ত হইয়া কহিল, “আবার! ও
কথা বলিয়ো না। কিন্তু এবার আমি
কাশী যাইবই।”
মহেন্দ্র হাসিয়া কহিল, “আচ্ছা
যাও, কিন্তু তোমার চোখের
আড়ালে আমি যদি নষ্ট হইয়া যাই,
তাহা হইলে কী হইবে।”
আশা কহিল, “তোমার আর অত ভয়
দেখাইতে হইবে না, আমি কিনা
ভাবিয়া অস্থির হইতেছি।”
মহেন্দ্র। কিন্তু ভাবা উচিত।
তোমার এমন স্বামীটিকে যদি
অসাবধানে বিগড়াইতে দাও, তবে
এর পরে কাহাকে দোষ দিবে?
আশা। তোমাকে দোষ দিব না,
সেজন্য তুমি ভাবিয়ো না।
মহেন্দ্র। তখন নিজের দোষ স্বীকার
করিবে?
আশা। একশোবার।
মহেন্দ্র। আচ্ছা, তাহা হইলে কাল
একবার তোমার জেঠামশায়ের
সঙ্গে গিয়া কথাবার্তা ঠিক
করিয়া আসিব।
এই বলিয়া মহেন্দ্র “অনেক রাত
হইয়াছে” বলিয়া পাশ ফিরিয়া
শুইল।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ পুনর্বার এ পাশে
ফিরিয়া কহিল, “চুনি, কাজ নাই,
তুমি নাই বা গেলে।”
আশা কাতর হইয়া কহিল, “আবার
বারণ করিতেছ কেন। এবার একবার
না গেলে তোমার সেই ভর্ৎসনাটা
আমার গায়ে লাগিয়া থাকিবে।
আমাকে দু-চার দিনের জন্যও
পাঠাইয়া দাও।” মহেন্দ্র কহিল,
“আচ্ছা।” বলিয়া আবার পাশ
ফিরিয়া শুইল।
কাশী যাইবার আগের দিন আশা
বিনোদিনীর গলা জড়াইয়া কহিল,
“ভাই বালি, আমার গা ছুঁইয়া একটা
কথা বল্।”
বিনোদিনী আশার গাল টিপিয়া
ধরিয়া কহিল, “কী কথা, ভাই।
তোমার অনুরোধ আমি রাখিব না?”
আশা। কে জানে ভাই, আজকাল তুমি
কী রকম হইয়া গেছ। কোনোমতেই
যেন আমার স্বামীর কাছে বাহির
হইতে চাও না।
বিনোদিনী। কেন চাই না সে কি
তুই জানিস নে, ভাই। সেদিন
বিহারীবাবুকে মহেন্দ্রবাবু যে কথা
বলিলেন, সে কি তুই নিজের কানে
শুনিস নাই। এ-সকল কথা যখন উঠিল
তখন কি আর বাহির হওয়া উচিত–
তুমিই বলো-না, ভাই বালি।
ঠিক উচিত যে নহে, তাহা আশা
বুঝিত। এ-সকল কথার লজ্জাকরতা যে
কতদূর, তাহাও সে নিজের মন হইতেই
সম্প্রতি বুঝিয়াছে। তবু বলিল, “কথা
অমন কত উঠিয়া থাকে, সে-সব যদি
না সহিতে পারিস তবে আর
ভালোবাসা কিসের, ভাই। ও কথা
ভুলিতে হইবে।”
বিনোদিনী। আচ্ছা ভাই, ভুলিব।
আশা। আমি তো ভাই, কাল কাশী
যাইব, আমার স্বামীর যাহাতে
কোনো অসুবিধা না হয় তোমাকে
সেইটে বিশেষ করিয়া দেখিতে
হইবে। এখনকার মতো পালাইয়া
বেড়াইলে চলিবে না।
বিনোদিনী চুপ করিয়া রহিল। আশা
বিনোদিনীর হাত চাপিয়া ধরিয়া
কহিল, “মাথা খা ভাই বালি, এই
কথাটা আমাকে দিতেই হইবে।”
বিনোদিনী কহিল, “আচ্ছা।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now