বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ১

"সাইমুম সিরিজ" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ১ ১ সুস্মিতা বালাজীদের তিন তলার হাওয়াখানা। একে অভজারভেটরিও বলে সুস্মিতারা। এখানে বসে হ্রদের মত বিশাল সরোবরের উপর দিয়ে আন্দামানের শান্ত নীল সমুদ্র দেখা যায়। আহমদ মুসার শূন্য দৃষ্টি নীল সাগর পেরিয়ে ছুটছে আরও দূরে, অনেক দূরে- আরব সাগরও পার হয়ে। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে জোসেফাইনের মিষ্টি হাসির শান্ত সুন্দর মুখ। এইমাত্র টেলিফোন করেছিল ডোনা জোসেফাইন। তার রুটিন টেলিফোন। আগে সাত দিন পর পর টেলিফোন করতো। সন্তান আহমদ আব্দুল্লাহ জন্ম নেয়ার পর সাত দিন থেকে নেমে এসেছে এখন তিন দিনে। প্রতি তিন দিন পর সে এখন টেলিফোন করে। ডোনার যুক্তি হল আহমদ আব্দুল্লহ আসার পর তার দায়িত্ব বেড়েছে এবং তার সাথে দুশ্চিন্তাও বেড়েছে। এখন সাত দিন অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিন দিন পরের ডোনার এই টেলিফোন আহমদ মুসার কাছে অমৃতের মত, যেন প্রানসঞ্জীবনী সুধা। তিন দিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায় একটি পরিচিত কন্ঠের মিষ্টি সম্বোধনে। কিন্তূ ডোনা আজ টেলিফোন করেছে দু’দিনের মাথায়। আজ ডোনা ছিল দারুন খুশি। ফ্রান্স থেকে তার আব্বা এসেছে এবং রাশিয়া থেকে এসেছে তার মা (ওলগার মা)। কিন্তূ এই খুশির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে জোসেফাইন। বলেছে, ‘এই মুহূর্তে খুব ফিল করছি আমি তোমাকে। মনটা অস্থির লাগছে। চারদিকে আমার সবই আছে, কিন্তূ মনে হচ্ছে কিছুই নেই। হঠাৎ করে শূন্যতার একটা যন্ত্রণা আমাকে ঘিরে ধরেছে। তাই একদিন আগেই তোমাকে টেলিফোন করলাম।’ কথা শেষ করেই সে তাড়াতাড়ি বলে উঠেছে, ‘স্যারি, আমার কথা গুলোকে শাব্দিক অর্থে নিও না। আব্বা, আম্মা এসেছেন তো। তাই মনটা হঠাৎ আনন্দে বাঁধন হারা হয়ে উঠেছে। আহমদ মুসা উত্তরে বলেছে, কিন্তূ জোসেফান, আমি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি এ কথা তো ঠিক।’ উত্তরে জোসেফাইনের জবাবটা দীর্ঘ ছিল। বলেছে, কষ্ট পাচ্ছি এ কথা যদি বলি তা ঠিক হবে না। কিন্তূ এ কষ্টে যে সুখ আছে, তা কষ্টের চেয়ে অনেক বড়, এ কথা তুমি অন্তত বুঝবে। কারণ এমন কষ্ট তোমার মাঝেও আছে এবং কষ্টের মধ্যে যে বড় সুখ তা আমার মত তোমাকেও সান্তনা দেয়। আর তুমি আমাকে কোন কষ্ট দাও না। এ কষ্ট যদি কেউ দিয়ে থাকেন তিনি আমার আল্লাহ, বিশ্ব জাহানের প্রভূ। আনন্দের সাথে বুক পেতে এই কষ্ট আমি গ্রহন করেছি। কারণ এর যে পরম জাযাহ তিনি পুরস্কার হিসাবে প্রস্তূত রেখেছেন তা তোমার আমার কল্পনার বাইরে। বল, এরপর তুমি কষ্টের কথা বলতে পার?’ আহমদ মুসা বলেছে, ‘বলতে পার জোসেফাইন। পুরস্কারের অস্তিত্ব যেমন বাস্তব, কষ্টেরও অস্তিত্ব তেমনি বাস্তব। কষ্ট আছে বলেই তো পুরস্কার। তবে আমার খুব ভাল লাগছে জোসেফাইন, আল্লাহর ইচ্ছাকে তুমি এমনভাবে গ্রহন করতে পেরেছ দেখে। তোমার এই ধৈর্য আমাকে আরও শক্তি যোগাবে।’ জোসেফাইন উত্তরে আবেগরুদ্ধ কন্ঠে বলেছে, ‘সকল প্রসংসা আল্লাহর। আর আল্লাহকে তুমিই আমাকে চিনিয়েছ। আল্লাহর প্রতি এই নির্ভরতা আমি তোমার কাছে থেকেই শিখেছি। আজকের এই যে আমি, তাকে তুমিই গড়েছ। সুতরাং.........।’ জোসেফাইনকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তার কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলে উঠেছে, ‘মানুষ একমাত্র আল্লাহই গড়ে জোসেফাইন। আল্লাহরই দেয়া যে আলো আমি তোমার কাছে তুলে ধরেছি, তাঁকে গ্রহন করার শক্তি আল্লাহই তোমাকে দিয়েছেন। এ আলোয় যে আলোর জীবন তুমি পেয়েছ, আল্লাহই দয়া করে তা গড়ে দিয়েছেন। সর্বাবস্থায় সব প্রশংসা আল্লাহর।’ সঙ্গে সঙ্গেই জোসেফাইন বলেছে, ‘ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি আমার ভূল শুধরে দিয়েছ। তুমি আমার স্বামী, আমার শিক্ষক। এটা আমার গর্ব।’ আহমদ মুসা সঙ্গে সঙ্গেই বলেছে, ‘ব্যাপারটা একতরফা নয় জোসেফাইন। আমাদের কুরআন শরীফে স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের অভিভাবক হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। অভিভাবক শিক্ষকও। সুতরাং শুধু ছাত্রী নয়, শিক্ষকও তুমি।’ হেসে উঠেছিল জোসেফাইন। বলেছে, ‘স্যার যদি ছাত্রীকে স্যারে উন্নতি করেন, তাহলে কোন বোকা ছাত্রী আনন্দে আত্মহারা হবে না।’ আহমদ মুসা বলেছেন, ‘কথাটা ওভাবে নয় এভাবে বল, স্বামী-স্ত্রী দুজনকে সমান আসন দেয়ার জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ।’ একটু সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলেছে জোসেফাইন, তোমার সমান কথাটার সাথে আমি একমত নই। আল্লাহরব্বুল আলামিন স্ত্রীদের তাদের উপযুক্ত স্থান দিয়েছেন এ জন্য তার শুকরিয়া আদায় করছি। উত্তরে আহমদ মুসা বলেছে, ‘কথাটার মধ্যে প্রতিযোগিতা দরকষাকষি আছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক দরকষাকষির নয়, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার। সম্প্রীতি ও সহযোগিতা না থাকলে দরকষাকষির রেজাল্ট খুব ফল দেয়না। আল্লাহ উভয়ের মধ্যে এই সম্প্রীতি ও সহযোগিতার কথাই বলেছেন।’ কথা শেষ জোসেফাইন আবার বলে উঠেছে, ‘তোমার অনেক সময় নিয়েছি, প্রসঙ্গ থেকেও অনেক দূরে সরে এসেছি। শোন, আপাকে বলো আমি টেলিফোন করব। রাখলাম টেলিফোন।’ বাধা দিয়ে আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিল, রেখো না প্লিজ। একটা দম নিয়ে জোসেফাইন বলেছে, তমার মনটা আজ খুব ফ্রি দেখছি। এমন ফ্রি দেখলে আমার ভয় করে।’ ‘কেন’ বলেছে আহমদ মুসা। ‘তোমার এমন ফ্রি হওয়া তোমার বড় কিছুতে জড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দেয়, বলেছে ডোনা জোসেফাইন। তার কন্ঠ ভারী শোনা যাচ্ছিল। বলেছে আহমদ মুসা, ‘কিন্তূ তুমি তো অনেক শক্ত জোসেফাইন। তোমার দৃঢ়তা আমাকে শক্তি জোগায়।’ জোসেফাইন বলেছে, স্যরি এভাবে বলা আমার ঠিক হয়নি। কিন্তূ সত্যি কি জান? আহমদ আবদুল্লাহর দিকে চাইলে আমি যেন দুর্বল হয়ে পড়ি। তুমি পাশে থাকলে এ দুর্বলতা আমি অনুভব করি না। বুঝতে পারি, এটা আমার জন্যে শোভনীয় নয়। কিন্তূ......। কথা শেষ করতে পারে না ডোনা জোসেফাইন। গলায় আটকে যায় তার কথা। বেদনার একটা তীক্ষ্ণ ছুরি এসে আঘাত করে আহমদ মুসাকে। বলে সে, তোমার এ চিন্তা শোভনীয় নয় কেন জোসেফাইন, এ চিন্তাই স্বাভাবিক। একজন স্ত্রীর চেয়ে একজন ‘মা-স্ত্রীর’ দায়িত্ব তো বেশি হবেই। দায়িত্ব থেকে আসে চিন্তা, চিন্তার একটা পর্যায় ভয়ও।’ সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠেছে জোসেফাইন, ‘আমার দুর্বলতার কথা তোমাকে বলেছি সাহস পাওয়ার জন্যে, শক্তি পাব বলে। কিন্তূ এখন দেখছি, দুর্বলতাকে তুমি প্ররোচণা দিচ্ছ, আরও বাড়িয়ে দিচ্ছি। তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।’ আহমদ মসা বলেছে, আমি এখন শুধু আহমদ মুসা নই, একজনের স্বামী এবং একজনের পিতাও। বলেছে জোসেফাইন, ‘স্যরি, আমি যে কথা বলছি, সে কথা তুমিও বললে। কথা সত্য এবং খুবই বাস্তব। কিন্তূ এই দুর্বলতা আমার জন্যে হয়তো কিছুটা সাজে কিন্তূ তোমার সাজে না। তুমি একজন জোসেফাইনের স্বামী তুমি একজন আহমদ আবদুল্লাহর পিতা, কিন্তূ কোটি কোটি মানুষের তুমি ‘আহনদ মুসা’। আল্লাহর কাছে তুমি আহমদ মুসাই। এই আহমদ মুসা দুর্বল হতে পারে না।’ এক ধরনের আবেগ ঢেউ খেলে উঠেছিল আহমদ মুসার চেহারায়। ডোনা জোসেফাইনের কথাগুলোকে মনে হচ্ছিল অবিস্মরণীয় শিলালিপির এক মূর্তিমান সত্তার মত দেদীপ্যমান। বলে উঠেছিল আহমদ মুসা, ‘জোসেফাইন আমার কৃতজ্ঞতা নাও। তোমার মত স্ত্রী থাকলে কারো পথ হারাবার ভয় নেই। আল্লাহ তোমাকে জাযাহ দান করুন। তুমি শান্তির মরুদ্যান শুধু নাও জোসেফাইন, অব্যাহত প্রেরণার এক মানস সরোবরও।’ আহমদ মুসার কথার পিঠেই ডোনা জোসেফাইন বলে উঠেছিল, হ্যা, মহানজন সূর্য যখন ঘাতক চাঁদের প্রসংসা করে তখন শুনতে ভালোই লাগে।’ ডোনা জোসেফাইনকে নিয়ে আহমদ মুসার এই সুখ চিন্তা আর কতক্ষণ চলতো কে জানে। কিন্তূ চলতে পারলো না। হাওয়াখানায় উঠার সিঁড়ি-মুখের দড়জায় নক হল। ভেঙে গেল আহমদ মুসার সুখ সপ্ন। সাগরের নীল বুক থেকে ফিরে এল তার চোখ। দরজার পেছনে বসেছিল আহমদ মুসা। পেছনে একবার তাকাল আহমদ মুসা। মুখ ফিরিয়ে আনল আবার। বলল, ‘এস শাহ বানু।’ অনুমতি পেয়ে শাহ বানু প্রবেশ করল হাওয়াখানায়। পরনে তার ঢোলা সালোয়ার-কামিজ। মাথায় ওড়না, শরীরেও জড়িয়ে আছে। মাথার ওড়নাটা কপালের উপর আরও টেনে দিয়ে চঞ্চল পদক্ষেপে আহমদ মুসার সামনে এল। বলল, ‘ভাইয়া আমি মাত্র একবার নক করেছি। কি করে বুঝলেন আমি।’ ‘তুমি তর্জনী ভাঁজ করে ভাঁজ হওয়া আঙুল দিয়ে প্রথমে একবার নক করে থাক।’ আহমদ মুসা বলল। ‘ভাইয়া আপনি এত হিসাব-নিকেশ করেন কখন?’ ‘হিসেব-নিকেশ নয়, এটা ভালো করে শোনার ব্যাপার।’ ‘আমরাও তো শুনি, কিন্তূ এই ফল তো হয় না।’ শাহ বানু বলল। ‘শোন বটে, কিন্তূ আন্তরিকভাবে মনোযোগ দাও না।’ সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে শাহ বানু একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘হতে পারে।’ শাহ বানু থামতেই আহমদ মুসা বলল, ‘কিছু বলবে, না হাওয়া খেতে এসেছ?’ ‘ভাইয়া, সুষমা টেলিফোন করেছিল। আপনি ছিলেন না। সে সুস্মিতা বালাজী আপার সাথে দেখা করার জন্যে পাগল হয়ে উঠেছে। আপনাকে অনুরোধ করেছে, যে কোন উপায়ে সুস্মিতা আপার সাথে তার দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য।’ হ্যাঁ, সুস্মিতা আপারা পোর্ট ব্লেয়ারে থাকে। সেখানে গেলে সহজেই দেখা হতে পারে। ঠিক আছে, ওদের সাথে আলোচনা করে দেখব।’ ‘ধন্যবাদ ভাইয়া। এটুকুই বলার ছিল।’ বলল শাহ বানু। ‘তোমার কথা শেষ হয়ে থাকলে আমার কিছু বলার আছে তোমাকে।আহমদ মুসা বলল। সোফায় হেলান দিয়ে আহমদ মুসার শূন্য দৃষ্টি আবার ফিরে গেল সাগরের দিকে। আহমদ মুসার কথায় চমকে উঠে তাকায় শাহ বানু আহমদ মুসার দিকে। কিছুটা উৎসুক, কিছুটা ভয় মিশ্রিত ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। বলল, ‘আমি কিছু অন্যায় করে ফেলিনি তো।’ সঙ্গে সঙ্গে কথা বলল না আহমদ মুসা। ভাবছিল সে। গতকাল সাহারা বানু আহমদ মুসাকে বলেছে শাহ বানু ও তারিকের ব্যাপারে। তার এবং আহমদ শাহ আলমগীরের ইচ্ছা তারিকের সাথে শাহ বানুর বিয়ে দেয়া। তারিক ও তারিকের পরিবারও এটা চায়। কিন্তূ দুর্বোধ্য হল শাহ বানু। এ সংক্রান্ত সব কথা সব প্রশ্নকেই সে এরিয়ে যায়। এই প্রস্তাবে তাকে আনন্দিত বলে মনে হয় না। আবার তারিককে সে খারাপ চোখে দেখে এটাও নয়। যদিও শাহ বানু কিছুটা সমালোচক, কিন্তূ সেটা আন্তরিক, বিদ্বেষমূলক নয়। সব মিলিয়ে এই ব্যাপারে সাহারা বানু কিছুই ঠিক করতে পারছে না, কি করবে বুঝতে পারছে না। তাই সে আহমদ মুসাকে অনুরোধ করেছে এই বিষয়ে দায়িত্ব নেয়ার জন্যে। সাহারা বানুর কথা, আহমদ মুসার কোন কথায় না করার সাধ্য শাহ বানুর নেই। সাহারা বানুর দেয়া এই দায়িত্ব নিয়েই শাহ বানুর সাথে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে আহমদ মুসা। কি বলবে একটু গুছিয়ে নিল আহমদ মুসা। বলল, ‘কোন অন্যায় কোন দিন করেছ যে অন্যায় করবে? সেসব কিছু না শাহ বানু।’ আহমদ মুসার দৃষ্টি সাগরের দিক থেকে ফিরে এসেছে। ‘অজান্তে, অজ্ঞাতেও অন্যায় হয়ে যায় ভাইয়া। কেউ না জানলেও আল্লাহ তা জানেন।’ ‘আল্লাহ তার বান্দার অজান্তে অজ্ঞাতের ভুল, অন্যায় গোপন রাখতেই চান এবং এসব তিনি মাফ করে দেন।’ ম্লান হাসল শাহ বানু। তার চোখের কোণটা ভারী হয়ে উঠেছিল। কেঁপে উঠেছিল তার মন। আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ। অন্যায়কে আমি অন্যায় বলি বটে, কিন্তু অন্যায়ের স্মৃতিকেও যে আমার ভালো লাগে। আল্লাহ তো এটাও জানেন। এ অন্যায়কেও তিনি মাফ করবেন? একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সামনে এল সে আহমদ মুসার। বলল, ‘বলুন ভাইয়া।’ শাহ বানুর ভারী চেহারা আহমদ মুসার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। শাহ বানুকে সহজ করার জন্যেই আহমদ মুসা বলল, ‘কারও সাথে ঝগড়া করেছ নাকি।’ মুখে হাসি আহমদ মুসার। ‘না ভাইয়া ঝগড়া করিনি। ঝগড়া তো একজনের সাথে হয়, আর হবে না।’ ম্লান হেসে বলল শাহ বানু। ‘কেন হবে না?’ ‘সে আপনার ছাত্র।’ গম্ভীর কণ্ঠ শাহ বানুর। ‘তাতে কি?’ শাহ বানু আহমদ মুসার সামনের সোফায় বসল। বলল, ‘আপনার কথা বলুন ভাইয়া।’ জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল শাহ বানু। একটা গাম্ভীর্য নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। বলল, ‘কথাটা তোমার আম্মার পক্ষ থেকে হলে ভালো হতো। কিন্তু তিনি আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। কথাটা তুমি ও তারিক মুসা মোপলাকে নিয়ে।’ থামল আহমদ মুসা। শাহ বানুর মুখ নিচু হয়ে গিয়েছিল। আহমদ মুসা থামলে একটুক্ষণ নিরবতা। ‘বলুন ভাইয়া।’ নিরবতা ভেঙে বলল শাহ বানু। তার কণ্ঠ একটু কাঁপা ও গম্ভীর। ‘সবাই মনে করেন, তোমাদের সম্পর্কটা খুবই ভালো হবে।’ ‘আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি ভাইয়া।’ মুখ নিচু শাহ বানুর। কণ্ঠটা ভেঙে পড়ার মত ভারী। আহমদ মুসা মুখ তুলল শাহ বানুর দিকে। বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার মুখ। ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ বলল শাহ বানুও। বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ কান্নায় ভেঙে পড়ল। দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্না চেপে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে পালাল শাহ বানু। মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল আহমদ মুসার ঠোঁটে। মনে মনে বলল, আমাদের মেয়েরা আনন্দের সিদ্ধান্তেও কাঁদে। এটাই স্বাভাবিক। জীবনে এর চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত কিছু নেই। নিজের কথা মনে পড়ল আহমদ মুসার। ‘আমাদের কাঁদার হাসার কোনটারই সুযোগ হয়নি’, স্মৃতিচারণ করল আহমদ মুসা, ‘আমাদের বিয়েটা ছিল রণাঙ্গনের বিয়ের মত। বিয়ের আসন থেকে সোজা এয়ারপোর্ট গিয়েছি। যাবার পথে গাড়িতে কয়েকটা কথা হয়েছিল মেইলিগুলি মানে আমিনার সাথে। কি অসীম ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিল সে। সে সময় সে ভেঙে পড়লে আমি এগোতে পারতাম না। সব চাওয়া, সব আবেগ, সব কান্নাকে আড়াল করে সে বিদায় দিয়েছিল আমাকে। আড়ালের সে কান্নার সমুদ্র আমি পেছনে তাকালেই দেখতে পাই।’ ভারী হয়ে উঠল আহমদ মুসার দু’চোখের কোণ। ভেবে চলে আহমদ মুসা, ডোনা জোসেফাইনের সাথে তার বিয়েও পরিকল্পনা করে হয়নি। কতকটা পথ-বিয়ের মতই ছিল ব্যাপার। এক সাথে রাশিয়া যাওয়া উপলক্ষ করে প্রয়োজনই দু’জনের চাওয়ার আকস্মিক মিলন ঘটায়। অভিভাবকদের পারিবারিক বিয়ের যে আনন্দ-আবেগ তার সাক্ষাত আহমদ মুসারা পায়নি। শাহ বানুর আবেগ-অনুভুতির মধ্যে তারই একটা প্রকাশ দেখল আহমদ মুসা। অতীতের স্মৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল আহমদ মুসা। তার দু’চোখের শূন্য দৃষ্টি আঠার মত সেঁটে গিয়েছিল দূর সাগরের বুকে। হাওয়াখানায় প্রবেশ করেছে সাহারা বানু, ড্যানিশ দেবানন্দ ও সুস্মিতা বালাজী। সুস্মিতা বালাজী বগলদাবা করে ধরে নিয়ে আসছিল শাহ বানুকে। শাহ বানু তার চোখের অশ্রু মোছারও সুযোগ পায়নি। হাওয়াখানায় তাদের সশব্দে প্রবেশ আহমদ মুসার তন্ময়তা ভাঙাতে পারেনি। সুস্মিতা বালাজী শাহ বানুকে ধরে নিয়ে সবার আগে আহমদ মুসার কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল। সে আহমদ মুসার আপনাহারা তন্ময়তা দেখে থেমে যায় এবং আঙুলের ইশারায় সবাইকে চুপ করতে বলে। সবারই চোখ পড়ল আহমদ মুসার তন্ময় ভাবের উপর। তারা বুঝল, কোন চিন্তার গভীরে তলিয়ে গেছে আহমদ মুসা। সবাই চুপ। পল পল করে কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। এতগুলো লোকের উপস্থিতি টের পেল না আহমদ মুসা। তার চোখ দু’টির শূন্য দৃষ্টি ফিরে আসেনি সাগরের বুক থেকে। তার মুখে পাতলা একটা বেদনার প্রলেপ। সুস্মিতা বালাজী একটু দ্বিধা করল। এগোল কয়েক ধাপ আহমদ মুসার দিকে। শাহ বানু দ্রুত ফিস ফিস করে বলে উঠল, ‘আপা, ওনাকে এখন ডিষ্টার্ব না করলে হয় না?’ ‘উনি এখন কোন কিছুতে ব্যস্ত নন। অতীতের কোন এক স্মৃতির গহ্বরে তিনি আটকা পড়েছেন মাত্র।’ ‘ছোট ভাই।’ উঁচু, কিন্তু নরম কণ্ঠে ডাকল সুস্মিতা বালাজী। আহমদ মুসা হঠাৎ ঘুম ভাঙার মত চমকে উঠে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘স্যরি আপা, আপনারা কখন এসেছেন। বসুন। আমি একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলাম।’ সুস্মিতা বালাজী সাহারা বানুকে বসিয়ে শাহ বানুকে পাশে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘না না ছোট ভাই, আপনি আনমনা নয়, অতীতের কোন স্মৃতির বাঁধনে আটকা পড়েছিলেন।’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘ঠিক তাই।’ ‘একান্ত পার্সোনাল না হলে কি সে স্মৃতি জানতে ইচ্ছা করছে।’ বলল সুস্মিতা বালাজী। ‘পার্সোনাল নয়, পাবলিকই। তবে তেমন কিছু নয়।’ বিষয়টাকে এড়ানোর চেষ্টায় বলল আহমদ মুসা। ‘অতীতের যে ঘটনা আহমদ মুসাকে বর্তমানেও এসে আপনহারা করতে পারে, সে ঘটনা যে বড় কিছু অবশ্যই এতে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’ সুস্মিতা বালাজী বলল। ‘আসলেই ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। আমি ভাবছিলাম বিয়ের রকম নিয়ে। কতক বিয়ে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা, বাহাস-বিতর্ক, অনুষ্ঠান-আয়োজন, মান-অভিমানের দীর্ঘ পটভুমিতে হয়ে থাকে। তার জন্যে আলোক সজ্জা হয়, গৃহ সজ্জা হয়, ঢাক-ঢোল পিটানো, গাড়ির মিছিল নামে, মানুষের মেলা বসে। আবার কতক বিয়ে এমন হয় যে, পাত্র-পাত্রীলও মনে হয় না যে তাদের বিয়ে হল।’ থামল আহমদ মুসা। ‘বিয়ের রকম নিয়ে হঠাৎ এত বড় ভাবনা এল কেন?’ বলল সুস্মিতা বালাজী। হাসল আহমদ মুসা। তাকাল শাহ বানুর দিকে। বলল, ‘একটা বিয়ের ঘটকালি করতে গিয়ে আপা নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ে গেছে।’ ভ্রুকুঞ্চিত হল সুস্মিতা বালাজীর। মুহূর্তকাল চিন্তা করেই তাকাল শাহ বানুর দিকে। সে শাহ বানুর মুখটা একটু তুলে ধরে বলল, ‘চোখের পানিতে মুখ ভাসানো হচ্ছিল এই কারণে? তা খুশির অশ্রুতো এতবেশি হওয়া উচিত নয়।’ মাথানত করে মুখটা আড়ালে নিল শাহ বানু। মুখটা তার আবার বেদনায় নীল হয়ে গিয়েছিল। বিবেকের সব শাসানি উপেক্ষা করে মনটা ডুকরে উঠল। সত্যিই খুশির নয়, এ এক নিষিদ্ধ, অবাধ্য অশ্রু। শাহ বানুকে কথা কয়টি বলেই সুস্মিতা বালাজী আহমদ মুসার দিকে ফিরল। বলল, ‘ছোট ভাই, আপনার বিয়ের কথা মনে পড়ল কেন?’ ‘এসব কথা থাক।’ ‘বলার মত না হলে থাক। কিন্তু আপনার অসাধারন তন্ময়তা দেখে লোভ হচ্ছিল জানার যে, বিয়ের কথাটা ঐভাবে মনে পড়েছিল কেন?’ হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘বিয়ের ব্যাপারটা সবসময় পাবলিক। বলা যাবে না কেন?’ বলে একটু থেমেই আবার বলা শুরু করল, ‘প্রথমে আমার মনে পড়ে সিংকিয়াং এ মেইলিগুলির সাথে আমার বিয়ের কথা। আমি প্রস্তুত হয়েছি সিংকিয়াং থেকে ককেশাসে যাবার জন্যে। প্লেন অপেক্ষা করছে বিমান বন্দরে। আমার বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাক্সিক্ষরা চাইল আমাকে এক ঠিকানায় বেঁধে ফেলতে। সঙ্গে সঙ্গেই মেইলিগুলির সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল। বিয়ে হয়ে গেল। বিমান বন্দরে যাবার গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। বিয়ের আসন থেকে উঠে আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। মেইলিগুলি আমার পাশে এসে বসল বিমান বন্দরে পৌছে দেবার জন্যে। ড্রাইভার গাড়ি ষ্টার্ট দিল। আমার গাড়ির আগে পেছনে বন্ধু-বান্ধবদের গাড়ির মিছিল। বিমান বন্দরে বন্ধু-বান্ধবদের সারিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুভেজা চোখ আর মুখে হাসি নিয়ে বিদায় দিল আমাকে মেইলিগুলি।’ থামল আহমদ মুসা। সবাই হা করে শুনছে আহমদ মুসার কথা। তাদের চোখে অবিশ্বাসের বিস্ময়। আহমদ মুসা থামতেই সুস্মিতা বালাজী বলল, ‘এটা কি রূপকথার রসিকতা ছোট ভাই, না আসলে ঘটেছিল?’ ‘ইতিহাস এটা আপা।’


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৭
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৬
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৫
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৪ বাকি অংশ
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৪
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৩ বাকি অংশ
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ৩
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ২ বাকি অংশ
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ২
→ ডুবো পাহাড় চ্যাপ্টার- ১ বাকি অংশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now