বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দেশের জন্য মন-কেমন-করা একটি
অতি চমৎকার অনুভূতি। যারা
চিরকাল এক জায়গায় কাটায়,
স্বগ্রাম বা তাহার নিকটবর্তী
স্থান ছাড়িয়া নড়ে না-তাহারা
জানে না ইহার বৈচিত্র্য।
দূরপ্রবাসে আত্মীয়স্বজনশূন্য স্থানে
দীর্ঘদিন যে বাস করিয়াছে, সে
জানে বাংলা দেশের জন্য,
বাঙালির জন্য, নিজের গ্রামের
জন্য, দেশের প্রিয় আত্মীয়স্বজনের
জন্য মন কি রকম হু-হু করে, অতি তুচ্ছ
পুরাতন ঘটনাও তখন অপূর্ব বলিয়া
মনে হয়-মনে হয় যাহা হইয়া
গিয়াছে, জীবনে আর তাহা হইবার
নহে-পৃথিবী উদাস হইয়া যায়,
বাংলা দেশের প্রত্যেক জিনিসটা
অত্যন্ত প্রিয় হইয়া ওঠে।
এখানে বছরের পর বছর কাটাইয়া
আমারও ঠিক সেই অবস্থা
ঘটিয়াছে। কতবার সদরে ছুটির জন্য
চিঠি লিখিব ভাবিয়াছি, কিন্তু
কাজ এত বেশি সব সময়েই হাতে
আছে যে, ছুটি চাহিতে সঙ্কোচ বোধ
হয়। অথচ এই জনশূন্য পাহাড়-জঙ্গলে,
বাঘ ভালুক, নীলগাইয়ের দেশে
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একা
কাটানো যে কি কষ্ট! প্রায়
হাঁপাইয়া ওঠে এক-এক সময়। বাংলা
দেশ ভুলিয়া গিয়াছি, কতকাল
দুর্গোৎসব দেখি নাই, চড়কের ঢাক
শুনি নাই, দেবালয়ের ধুনাগুগ্গুলের
সৌরভ পাই নাই, বৈশাখী প্রভাতে
পাখির কলকূজন উপভোগ করি নাই-
বাংলার গৃহস্থালির যে শান্ত পূত
ঘরকন্না জলচৌকিতে পিতল-কাঁসার
তৈজসপত্র, পিঁড়িতে আলপনা,
কুলঙ্গীতে লক্ষ্মীর কড়ির চুপড়ি-সে
সব যেন বিস্মৃত অতীত এক জীবন-
স্বপ্ন।
শীত গিয়া যখন বসন্ত পড়িয়াছে,
তখন আমার এই ভাবটা অত্যন্ত বেশি
বাড়িল।
সেই অবস্থায় ঘোড়ায় চড়িয়া
সরস্বতী কুণ্ডীর ওদিকে বেড়াইতে
গেলাম। একটা নিচু উপত্যকায় ঘোড়া
হইতে নামিয়া চুপ করিয়া
দাঁড়াইলাম। আমার চারিদিক
ঘিরিয়া উঁচু মাটির পাড়, তাহার
উপর দীর্ঘ কাশ ও বনঝাউয়ের ঘন
জঙ্গল। ঠিক আমার মাথার উপরে
খানিকটা নীল আকাশ। একটা
কণ্টকময় গাছে বেগুনি রঙের ঝাড়
ঝাড় ফুল ফুটিয়াছে, বিলাতি
কর্নফ্লাওয়ার ফুলের মতো দেখিতে।
একটা ফুলের বিশেষ কোনো শোভা
নাই, অজস্র ফুল একত্র দলবদ্ধ হইয়া
অনেকখানি জায়গা জুড়িয়া
দেখাইতেছে ঠিক বেগুনি রঙের
একখানি শাড়ির মতন। বর্ণহীন,
বৈচিত্র্যহীন অর্ধশুষ্ক কাশ-
জঙ্গলের তলায় ইহারা খানিকটা
স্থানে বসন্তোৎসবে মাতিয়াছে-
ইহাদের উপরে প্রবীণ বিরাট
বনঝাউয়ের স্তব্ধ রুক্ষ অরণ্য এদের
ছেলেমানুষিকে নিতান্ত অবজ্ঞা ও
উপেক্ষার চোখে দেখিয়া অন্য
দিকে মুখ ফিরাইয়া প্রবীণতার
ধৈর্যে তাহা সহ্য করিতেছে। সেই
বেগুনি রঙের জংলী ফুলগুলিই আমার
কানে শুনাইয়া দিল বসন্তের
আগমনবাণী। বাতাবী লেবুর ফুল নয়,
ঘেঁটুফুল নয়, আম্রমুকুল নয়, কামিনীফুল
নয়, রক্তপলাশ বা শিমুল নয়, কি
একটা নামগোত্রহীন রূপহীন নগণ্য
জংলী কাঁটাগাছের ফুল। আমার
কাছে কিন্তু তাহাই কাননভরা
বনভরা বসন্তের কুসুমরাজির প্রতীক
হইয়া দেখা দিল। কতক্ষণ সেখানে
একমনে দাঁড়াইয়া রহিলাম, বাংলা
দেশের ছেলে আমি, কতকগুলি
জংলী কাঁটার ফুল যে ডালি
সাজাইয়া বসন্তের মান রাখিয়াছে
এ দৃশ্য আমার কাছে নূতন। কিন্তু কি
গম্ভীর শোভা উঁচু ডাঙ্গার উপরকার
অরণ্যের! কি ধ্যানস্তিমিত,
উদাসীন, বিলাসহীন, সন্ন্যাসীর
মতো রুক্ষ বেশ তার, অথচ কি
বিরাট! সেই অর্ধশুষ্ক, পুষ্পপত্রহীন
বনের নিস্পৃহ আত্মার সহিত ও
নিন্মের এই বন্য, বর্বর, তরুণদের
বসন্তোৎসবের সকল নিরাড়ম্বর
প্রচেষ্টার উচ্ছ্বসিত আনন্দের সহিত
আমার মন এক হইয়া গেল।
সে আমার জীবনের এক পরম বিচিত্র
মুহূর্ত। কতক্ষণ দাঁড়াইয়া আছি, দু-
একটা নক্ষত্র উঠিল মাথার উপরকার
সেই নীল আকাশের ফালিটুকুতে,
এমন সময় ঘোড়ার পায়ের শব্দে
চমকাইয়া উঠিয়া দেখি, আমিন
পূরণচাঁদ নাঢ়া বইহারের পশ্চিম
সীমানায় জরিপের কাজ শেষ
করিয়া কাছারি ফিরিতেছে।
আমায় দেখিয়া ঘোড়া হইতে
নামিয়া বলিল-হুজুর এখানে?
তাহাকে বলিলাম, বেড়াইতে
আসিয়াছি।
সে বলিল-একা এখানে থাকবেন না
সন্ধ্যাবেলা, চলুন কাছারিতে।
জায়গাটা ভালো নয়, আমার
টিণ্ডেল স্বচক্ষে দেখেছে হুজুর। খুব
বড় বাঘ, ওধারের ওই কাশের
জঙ্গলে,-আসুন হুজুর।
পিছনে অনেক দূরে পূরণচাঁদের
টিণ্ডেল গান ধরিয়াছে -
দয়া হোই জী-
সেইদিন হইতে ঐ কাঁটার ফুল
দেখিলে আমার মন হু-হু করিয়া
উঠিত বাংলা দেশের জন্য। আর
ঠিক কি পূরণচাঁদের টিণ্ডেল ছট্টুলাল
প্রতি সন্ধ্যায় নিজের ঘরে রুটি
সেঁকিতে সেঁকিতে ঐ গানই
গাহিবে-
দয়া হোই জী-
ভাবিতাম, আসন্ন ফাল্গুন-বেলায়
আম্রবউলের গন্ধভরা ছায়ায়
শিমুলফুলফোটা নদীচরের এপারে
দাঁড়াইয়া কোকিলের কূজন শুনিবার
সুযোগ এ জীবনে বুঝি আর মিলিবে
না, এই বনেই বেঘোরে বাঘ
বন্যমহিষের হাতে কোন্দিন প্রাণ
হারাইতে হইবে।
বনঝাউ-বন তেমনই স্থির হইয়া
দাঁড়াইয়া থাকিত, দূর বনলীন
দিগ্বলয় তেমনই ধূসর, উদাসীন
দেখাইত।
এমনি এক দেশের-জন্য-মন-কেমন-করা
দিনে রাসবিহারী সিং-এর বাড়ি
হইতে হোলির নিমন্ত্রণ পাইলাম।
রাসবিহারী সিং এ অঞ্চলে
দুর্দান্ত মহাজন, জাতিতে রাজপুত,
কারো নদীর তীরবর্তী গবর্নমেণ্ট
খাসমহলের প্রজা। তাহার গ্রাম
কাছারি হইতে বার-চৌদ্দ মাইল
উত্তর-পূর্ব কোণে, মোহনপুরা
রিজার্ভ ফরেস্টের গায়ে।
নিমন্ত্রণ না রাখিলেও ভালো
দেখায় না, কিন্তু রাসবিহারী
সিং-এর বাড়িতে যাইতে আমার
নিতান্ত অনিচ্ছা। এ-অঞ্চলের যত
গরিব গাঙ্গোতা-জাতীয় প্রজার
মহাজন হইল সে। গরিবকে মারিয়া
তাদের রক্ত চুষিয়া নিজে বড়লোক
হইয়াছে। তাহার কড়া শাসন ও
অত্যাচারে কাহারো টুঁ শব্দটি
করিবার জো নাই। বেতন বা
জমিভোগী লাঠিয়াল পাইকের দল
লাঠিহাতে সর্বদা ঘুরিতেছে,
ধরিয়া আনিতে বলিলে বাঁধিয়া
হাজির করিবে। যদি কোনো রকমে
রাসবিহারীর মনে হইল অমুক বিষয়ে
অমুক তাহাকে যথেষ্ট মর্যাদা দেয়
নাই বা তাহার প্রাপ্য সম্মান ক্ষুন্ন
করিয়াছে, তাহা হইলে সে
হতভাগ্যের আর রক্ষা নাই।
রাসবিহারী সিং ছলে-বলে-
কৌশলে তাহাকে জব্দ করিয়া
রীতিমতো শিক্ষা দিয়া
ছাড়িবেই।
আমি আসিয়া দেখি রাসবিহারী
সিং-ই এদেশের রাজা। তাহার
কথায় গরিব গৃহস্থ প্রজা থরহরি
কাঁপে, অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন
লোকও কিছু বলিতে সাহস করে না,
কেননা রাসবিহারীর লাঠিয়াল-দল
বিশেষ দুর্দান্ত, মারধর দাঙ্গা-
হাঙ্গামায় তাহারা বিশেষ পটু।
পুলিসও নাকি রাসবিহারীর হাতে
আছে। খাসমহলের সার্কেল
অফিসার বা ম্যানেজার আসিয়া
রাসবিহারী সিং-এর বাড়িতে
আতিথ্য গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় সে
কাহাকেও গ্রাহ্য করিবে এ জঙ্গলের
মধ্যে?
আমার প্রজার উপর রাসবিহারী
সিং প্রভুত্ব জাহির করিবার চেষ্টা
করে-তাহাতে আমি বাধা দিই।
আমি স্পষ্ট জানাইয়া দিই,
তোমাদের নিজেদের এলাকার মধ্যে
যা হয় করিও, কিন্তু আমার মহালের
কোনো প্রজার কেশাগ্র স্পর্শ
করিলে আমি তাহা সহ্য করিব না।
গত বৎসর এই ব্যাপার লইয়া
রাসবিহারী সিং-এর লাঠিয়াল-
দলের সঙ্গে আমার কাছারির
মুকুন্দি চাকলাদার ও গণপৎ
তহসিলদারের সিপাহীদের একটা
ক্ষুদ্র রকমের মারামারি হইয়া যায়।
গত শ্রাবণ মাসেও আবার একটা
গোলমাল বাধিয়াছিল। তাহাতে
ব্যাপার পুলিস পর্যন্ত গড়ায়।
পুলিসের দারোগা আসিয়া সেটা
মিটাইয়া দেয়। তাহার পর কয়েক
মাস যাবৎ রাসবিহারী সিং আমার
মহালের প্রজাদের কিছু বলে না।
সেই রাসবিহারী সিং-এর নিকট
হইতে হোলির নিমন্ত্রণ পাইয়া
বিস্মিত হইলাম।
গণপৎ তহসিলদারকে ডাকিয়া
পরামর্শ করিতে বসি। গণপৎ বলিল-
কি জানি হুজুর, ও-লোকটাকে
বিশ্বাস নেই। ও সব পারে, কি
মতলবে আপনাকে নিয়ে যেতে চায়
কে জানে? আমার মতে না যাওয়াই
ভালো।
আমার কিন্তু এ-মত মনঃপূত হইল না।
হোলির নিমন্ত্রণে না-গেলে
রাসবিহারী অত্যন্ত অপমান বোধ
করিবে। কারণ হোলির উৎসব
রাজপুতদের একটি প্রধান উৎসব।
হয়তো ভাবিতে পারে যে, ভয়ে
আমি গেলাম না। তা যদি ভাবে,
সে আমার পক্ষে ঘোর অপমানের
বিষয়। না, যাইতেই হইবে, যা থাকে
অদৃষ্টে।
কাছারির প্রায় সকলেই আমায়
নানা-মতে বুঝাইল। বৃদ্ধ মুনেশ্বর
সিং বলিল- হুজুর, যাচ্ছেন বটে,
কিন্তু আপনি এ সব দেশের গতিক
জানেন না। এখানে হট্ বলতে খুন
করে বসে। জাহিল আদমির দেশ,
লেখাপড়াজানা লোক তো নেই। তা
ছাড়া রাসবিহারী অতি ভয়ানক
মানুষ। কত খুন করেছে জীবনে তার
লেখাজোখা আছে হুজুর? ওর অসাধ্য
কাজ নেই-খুন, ঘরজ্বালানি, মিথ্যে
মকদ্দমা খাড়া করা, ও সব-তাতেই
মজবুত।
ও-সব কথা কানে না তুলিয়াই
খাসমহলে রাসবিহারীর বাড়ি
গিয়া পৌঁছিলাম। খোলায় ছাওয়া
ইটের দেওয়ালওয়ালা ঘর, যেমন এ-
দেশে অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ি
হইয়া থাকে। বাড়ির সামনে
বারান্দা, তাতে কাঠের খুঁটি
আলকাতরা-মাখানো। দুখানা দড়ির
চারপাই, তাতে জনদুই লোক বসিয়া
ফর্সিতে তামাক খাইতেছে।
আমার ঘোড়া উঠানোর মাঝখানে
গিয়া দাঁড়াইতেই কোথা হইতে গুড়ুম
গুড়ুম করিয়া দুই বন্দুকের আওয়াজ
হইল। রাসবিহারী সিং-এর লোক
আমায় চেনে, তাহারা স্থানীয়
রীতি অনুসারে বন্দুকের আওয়াজ
দ্বারা আমাকে অভ্যর্থনা করিল,
ইহা বুঝিলাম। কিন্তু গৃহস্বামী
কোথায়? গৃহস্বামী না আসিয়া
দাঁড়াইলে ঘোড়া হইতে নামিবার
প্রথা নাই।
একটু পরে রাসবিহারী সিং-এর বড়
ভাই রাসউল্লাস সিং আসিয়া
বিনীত সুরে দুই হাত সামনে তুলিয়া
বলিল-আইয়ে জনাব, গরিবখানামে
তস্রিফ লেতে আইয়ে-। আমার মনের
অস্বস্তি ঘুচিয়া গেল। রাজপুত
জাতি অতিথি বলিয়া স্বীকার
করিয়া তাহার অনিষ্ট করে না।
কেহ আসিয়া অভ্যর্থনা না-করিলে
ঘোড়া হইতে না-নামিয়া ঘোড়ার
মুখ ফিরাইয়া দিতাম কাছারির
দিকে।
উঠানে বহু লোক। ইহারা
অধিকাংশই গাঙ্গোতা প্রজা।
পরনের মলিন ছেঁড়া কাপড় আবীর ও
রঙে ছোপানো, নিমন্ত্রণে বা
বিনা-নিমন্ত্রণে মহাজনের বাড়ি
হোলি খেলিতে আসিয়াছে।
আধ-ঘণ্টা পরে রাসবিহারী সিং
আসিল এবং আমায় দেখিয়া যেন
অবাক হইয়া গেল। অর্থাৎ আমি যে
তাহার বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা
করিতে যাইব, ইহা যেন সে স্বপ্নেও
ভাবে নাই। যাহা হউক, রাসবিহারী
আমার যথেষ্ট খাতির-যত্ন করিল।
পাশের যে-ঘরে আমায় লইয়া গেল,
সেটায় থাকিবার মধ্যে আছে খান-
দুই-তিন সিসম কাঠের দেশী
ছুতারের হাতে তৈরি খুব মোটা
মোটা পায়া ও হাতলওয়ালা চেয়ার
এবং একখানা কাঠের বেঞ্চি।
দেওয়ালে সিন্দুর-চন্দন লিপ্ত একটি
গণেশমূর্তি।
একটু পরে একটি বালক একখানা বড়
থালা লইয়া আমার সামনে ধরিল।
তাহাতে কিছু আবীর, কিছু ফুল,
কয়েকটি টাকা, গোটাকতক চিনির
এলাচদানা, মিছরিখণ্ড, একছড়া
ফুলের মালা। রাসবিহারী সিং
আমার কপালে কিছু আবীর
মাখাইয়া দিল, আমিও তাহার
কপালে আবীর দিলাম, ফুলের
মালাগাছি তুলিয়া লইলাম। আর কি
করিতে হইবে না-বুঝিতে পারিয়া
আনাড়িভাবে থালার দিকে
চাহিয়া আছি দেখিয়া
রাসবিহারী সিং বলিল-আপনার
নজর, হুজুর। ও আপনাকে নিতে হবে।
আমি পকেট হইতে আর কিছু টাকা
বাহির করিয়া থালার টাকার সঙ্গে
মিশাইয়া বলিলাম-সকলকে
মিষ্টিমুখ করাও এই দিয়ে।
রাসবিহারী সিং তারপর আমাকে
তাহার ঐশ্বর্য দেখাইয়া লইয়া
বেড়াইল। গোয়ালে প্রায় ষাট-
পঁয়ষট্টিটি গরু। সাত-আটটি ঘোড়া
আস্তাবলে-দুটি ঘোড়া নাকি অতি
সুন্দর নাচিতে পারে, একদিন নাচ
আমায় সে দেখাইবে। হাতি নাই
কিন্তু শীঘ্র কিনিবার ইচ্ছা আছে।
এ-দেশে হাতি না-থাকিলে সে
সম্ভ্রান্ত লোক হয় না। আট-শ মন গম
চাষে উৎপন্ন হয়, দু-বেলায় আশি-
পঁচাশিজন লোক খায়, সে নিজে
সকালে নাকি দেড় সের দুধ ও এক
সের মিকানীর মিছরি স্নানান্তে
জলযোগ করে। বাজারের সাধারণ
মিছরি সে কখনো খায় না,
বিকানীর মিছরি ছাড়া। মিছরি
খাইয়া জলযোগ যে করে, সে এ-
দেশে বড়লোক বলিয়া গণ্য হয়-
বড়লোকের উহা আর একটি লক্ষণ।
তারপর রাসবিহারী একটা ঘরে
আমায় লইয়া গেল, সে ঘরের আড়া
হইতে দু-হাজার আড়াই-হাজার ছড়া
ভুট্টা ঝুলিতেছে। এগুলি ভুট্টার বীজ,
আগামী বৎসরের চাষের জন্য
রাখিয়া দেওয়া হইয়াছে। একখানা
লোহার কড়া আমায় দেখাইল,
লোহার চাদর গুল্ বসানো পেরেক
দিয়া জুড়িয়া কড়াখানা তৈরি,
তাতে দেড় মন দুধ একসঙ্গে জ্বাল
দেওয়া হয় প্রত্যহ। তাহার সংসারে
প্রত্যহই ঐ পরিমাণ দুধ খরচ হয়। একটা
ছোট ঘরে লাঠি, ঢাল, সড়কি, বর্শা,
টাঙি, তলোয়ার এত অগুনতি যে
সেটাকে রীতিমতো অস্ত্রাগার
বলিলেও চলে।
রাসবিহারী সিং-এর ছয়জন ছেলে-
জ্যেষ্ঠ পুত্রটির বয়স ত্রিশের কম নয়।
প্রথম চারটি ছেলে বাপের মতোই
দীর্ঘকায়, জোয়ান, গোঁফ ও
গালপাট্টার বহর এরই মধ্যে বেশ।
তাহার ছেলেদের ও তাহার
অস্ত্রাগার দেখিয়া মনে হইল,
দরিদ্র, অনাহারশীর্ণ গাঙ্গোতা
প্রজাগণ যে ইহাদের ভয়ে সঙ্কুচিত
হইয়া থাকিবে ইহা আর বেশি কথা
কি!
রাসবিহারী অত্যন্ত দাম্ভিক ও
রাশভারী লোক। তাহার মানের
জ্ঞানও বিলক্ষণ সজাগ। পান হইতে
চুন খসিলেই রাসবিহারী সিং-এর
মান যায়, সুতরাং তাহার সহিত
ব্যবহার করিতে গেলে সর্বদা সতর্ক
ও সন্ত্রস্ত থাকিতে হয়। গাঙ্গোতা
প্রজাগণ তো সর্বদা তটস্থ অবস্থায়
আছে, কি জানি কখন মনিবের
মানের ত্রুটি ঘটে।
বর্বর প্রাচুর্য বলিতে যা বুঝায়,
তাহার জাজ্বল্যমান চিত্র
দেখিলাম রাসবিহারীর সংসারে।
যথেষ্ট দুধ, যথেষ্ট গম, যথেষ্ট ভুট্টা,
যথেষ্ট বিকানীর মিছরি, যথেষ্ট
মান, যথেষ্ট লাঠিসোঁটা। কিন্তু কি
উদ্দেশ্যে? ঘরে একখানা ভালো
ছবি নাই, ভালো বই নাই, ভালো
কৌচ-কেদারা দূরের কথা, ভালো
তাকিয়া-বালিস-সাজানো
বিছানাও নাই। দেওয়ালে চুনের
দাগ, পানের দাগ, বাড়ির পিছনের
নর্দমা অতি কদর্য নোংরা জল ও
আবর্জনায় বোজানো, গৃহ-স্থাপত্য
অতি কুশ্রী। ছেলেমেয়েরা
লেখাপড়া করে না, নিজেদের
পরিচ্ছদ ও জুতা অত্যন্ত মোটা ও
আধময়লা। গত বৎসর বসন্ত রোগে
বাড়ির তিন-চারটি ছেলেমেয়ে এক
মাসের মধ্যে মারা গিয়াছে। এ
বর্বর প্রাচুর্য তবে কোন্ কাজে
লাগে? নিরীহ গাঙ্গোতা প্রজা
ঠেঙাইয়া এ প্রাচুর্য অর্জন করার
ফলে কাহার কি সুবিধা হইতেছে?
অবশ্য রাসবিহারী সিং-এর মান
বাড়িতেছে।
ভোজদ্রব্যের প্রাচুর্য দেখিয়া
কিন্তু তাক্ লাগিল। এত কি একজনে
খাইতে পারে? হাতির কানের মতো
বৃহদাকার পুরী খান-পনের, খুরিতে
নানা রকম তরকারি, দই, লাড্ডু,
মালপো, চাটনি, পাঁপর। আমার তো
এ চার বেলার খোরাক। রাসবিহারী
সিং নাকি একা এর দ্বিগুণ আহার্য
উদরস্থ করিয়া থাকে একবারে।
আহার শেষ করিয়া যখন বাহিরে
আসিলাম, তখন বেলা আর নাই।
গাঙ্গোতা প্রজার দল উঠানে পাতা
পাতিয়া দই ও চীনা ঘাসের ভাজা
দানা মহা আনন্দে খাইতে
বসিয়াছে। সকলের কাপড় লাল রঙে
রঞ্জিত, সকলের মুখে হাসি।
রাসবিহারীর ভাই গাঙ্গোতাদের
খাওয়ানোর তদারক করিয়া
বেড়াইতেছে। ভোজনের উপকরণ
অতি সামান্য, তাতেই ওদের খুশি
ধরে না।
অনেক দিন পরে এখানে সেই বালক
নর্তক ধাতুরিয়ার নাচ দেখিলাম।
ধাতুরিয়া আর একটু বড় হইয়াছে,
নাচেও আগের চেয়ে অনেক ভালো।
হোলি উৎসবে এখানে নাচিবার জন্য
তাহাকে বায়না করিয়া আনা
হইয়াছে।
ধাতুরিয়াকে কাছে ডাকিয়া
বলিলাম-চিনতে পার ধাতুরিয়া?
ধাতুরিয়া হাসিয়া সেলাম করিয়া
বলিল-জি হুজুর। আপনি
ম্যানেজারবাবু! ভালো আছেন হুজুর?
ভারি সুন্দর হাসি ওর মুখে। আর ওকে
দেখিলেই মনে কেমন একটা
অনুকম্পা ও করুণার উদ্রেক হয়।
সংসারে আপন বলিতে কেহ নাই, এই
বয়সে নাচিয়া গাহিয়া পরের মন
জোগাইয়া পয়সা রোজগার করিতে
হয়, তাও রাসবিহারী সিং-এর মতো
ধনগর্বিত অরসিকদের গৃহপ্রাঙ্গণে।
জিজ্ঞাসা করিলাম- এখানে তো
অর্ধেক রাত পর্যন্ত নাচতে গাইতে
হবে, মজুরি কি পাবে?
ধাতুরিয়া বলিল-চার আনা পয়সা
হুজুর, আর খেতে দেবে পেট ভরে।
-কি খেতে দেবে?
-মাঢ়া, দই, চিনি। লাড্ডুও দেবে বোধ
হয়, আর-বছর তো দিয়েছিল।
আসন্ন ভোজ খাইবার লোভে
ধাতুরিয়া খুব প্রফুল্ল হইয়া
উঠিয়াছে। বলিলাম-সব জায়গায় কি
এই মজুরি?
ধাতুরিয়া বলিল-না হুজুর,
রাসবিহারী সিং বড় মানুষ, তাই
চার আনা দেবে আর খেতেও দেবে।
গাঙ্গোতাদের বাড়ি নাচলে দেয় দু-
আনা, খেতে দেয় না, তবে আধ সের
মকাইয়ের ছাতু দেয়।
-এতে চলে?
-বাবু, নাচে কিছু হয় না, আগে হত।
এখন লোকের কষ্ট, নাচ দেখবে কে।
যখন নাচের বায়না না থাকে,
ক্ষেতখামারে কাজ করি। আর-বছর
গম কেটেছিলাম। কি করি হুজুর,
খেতে তো হবে। এত শখ করে ছক্কর-
বাজি নাচ শিখেছিলাম গয়া
থেকে-কেউ দেখতে চায় না, ছক্কর-
বাজি নাচের মজুরি বেশি।
ধাতুরিয়াকে আমি কাছারিতে নাচ
দেখাইবার নিমন্ত্রণ করিলাম।
ধাতুরিয়া শিল্পী লোক-সত্যিকার
শিল্পীর নিস্পৃহতা ওর মধ্যে আছে।
পূর্ণিমার জ্যোৎস্না খুব ফুটিলে
রাসবিহারী সিং-এর নিকট বিদায়
লইলাম। রাসবিহারী সিং পুনরায়
দুটি বন্দুকের আওয়াজ করিল, আমার
ঘোড়া উহাদের উঠান পার হইবার
সঙ্গে সঙ্গে, আমার সম্মানের জন্য।
দোল-পূর্ণিমার রাত্রি। উদার, মুক্ত
প্রান্তরের মধ্যে সাদা বালির
রাস্তা জ্যোৎস্নাসম্পাতে চিক্চিক্
করিতেছে। দূরে একটা সিল্লী
পাখি জ্যোৎস্নারাতে কোথায়
ডাকিতেছে-যেন এই বিশাল, জনহীন
প্রান্তরের মধ্যে পথহারা কোনো
বিপন্ন নৈশ-পথিকের আকুল কণ্ঠস্বর।
পিছন হইতে কে ডাকিল-হুজুর,
ম্যানেজারবাবু-
চাহিয়া দেখি ধাতুরিয়া আমার
ঘোড়ার পিছু পিছু ছুটিতেছে।
ঘোড়া থামাইয়া জিজ্ঞাসা
করিলাম-কি ধাতুরিয়া?
ধাতুরিয়া হাঁপাইতেছিল। একটুখানি
দাঁড়াইয়া দম লইয়া, এটু ইতস্তত
করিয়া পরিশেষে লাজুক মুখে
বলিল-একটা কথা বলছিলাম, হুজুর-
তাহাকে সাহস দিবার সুরে
বলিলাম-কি, বল না?
-হুজুরের দেশে কলকাতায় আমায়
একবার নিয়ে যাবেন?
-কি করবে সেখানে গিয়ে?
-কখনো কলকাতায় যাই নি, শুনেছি
সেখানে গাওনা বাজনা নাচের বড়
আদর। ভালো ভালো নাচ
শিখেছিলাম, কিন্তু এখানে
দেখবার লোক নেই, তাতে বড় দুঃখ
হয়। ছক্কর-বাজি নাচটা না নেচে
ভুলে যেতে বসেছি। উঃ, কি করেই
ওই নাচটা শিখি! সে কথা শোনার
জিনিস।
গ্রামটা ছাড়াইয়াছিলাম। ধূ ধূ
জ্যোৎস্নালোকিত মাঠ। ভাবে বোধ
হইল ধাতুরিয়া লুকাইয়া আমার
সহিত দেখা করিতে চায়,
রাসবিহারী সিং টের পাইলে
শাসন করিবে এই ভয়ে। নিকটেই
মাঠের মধ্যে একটা ফুলে-ভর্তি
শিমুলচারা। ধাতুরিয়ার কথা
শুনিয়া শিমুলগাছটার তলায় ঘোড়া
হইতে নামিয়া একখণ্ড পাথরের উপর
বসিলাম। বলিলাম-বল তোমার গল্প।
-সবাই বলত গয়া জেলায় এক গ্রামে
ভিটলদাস বলে একজন গুণীলোক
আছে, সে ছক্কর-বাজি নাচের মস্ত
ওস্তাদ। আমার ঝোঁক ছিল ছক্কর-
বাজি যে করে হোক শিখবই। গয়া
জেলাতে চলে গেলাম, গাঁয়ে গঁয়ে
ঘুরি আর ভিটলদাসের খোঁজ করি।
কেউ বলতে পারে না। শেষকালে
একদিন সন্ধ্যার সময় একটা আহীরদের
মহিষের বাথানে আশ্রয় নিয়েছি
সেখানে শুনলাম ছক্কর-বাজি নাচ
নিয়ে তাদের মধ্যে কথাবার্তা
হচ্ছে। অনেক রাত তখন, শীতও খুব।
আমি বিচালি পেতে বাথানের এক
কোণে শুয়ে ছিলাম, যেমন ছক্কর-
বাজির কথা কানে যাওয়া অমনি
লাফিয়ে উঠেছি। ওদের কাছে এসে
বসি। কি খুশিই যে হলাম বাবুজী
সে আর কি বলব। যেন একটা কি
তালুক পেয়ে গিয়েছি! ওদের কাছে
ভিটলদাসের সন্ধান পেলাম। ওখান
থেকে সতের ক্রোশ রাস্তা
তিনটাঙা বলে গ্রামে তাঁর বাড়ি।
বেশ লাগিতেছিল একজন তরুণ
শিল্পীর শিল্পশিক্ষার আকুল
আগ্রহের গল্প। বলিলাম, তারপর?
-হেঁটে সেখানে গেলাম। ভিটলদাস
দেখি বুড়ো মানুষ। একমুখ সাদা
দাড়ি। আমায় দেখে বললেন-কি
চাই? আমি বললাম-আমি ছক্কর-
বাজি নাচ শিখতে এসেছি। তিনি
যেন অবাক হয়ে গেলেন। বললেন-
আজকালকার ছেলেরা এ পছন্দ করে?
এ তো লোকে ভুলেই গিয়েছে। আমি
তাঁর পায়ে হাত দিয়ে বললাম-
আমায় শেখাতে হবে, বহুদূর থেকে
আসছি আপনার নাম শুনে। তাঁর চোখ
দিয়ে জল এল। বললেন-আমার বংশে
সাতপুরুষ ধরে এই নাচের চর্চা। কিন্তু
আমার ছেলে নেই। বাইরের কেউ
এসে শিখতেও চায় নি আমার এত
বয়স হয়েছে, এর মধ্যে। আজ তুমি
প্রথম এলে। আচ্ছা, তোমায় শেখাব।
তা বুঝলেন হুজুর, এত কষ্ট করে শেখা
জিনিস। এখানে গাঙ্গোতাদের
দেখিয়ে কি করব? কলকাতায় গুণের
আদর আছে। সেখানে নিয়ে যাবেন,
হুজুর?
বলিলাম-আমার কাছারিতে একদিন
এসো ধাতুরিয়া, এ-সম্বন্ধে কথা
বলব।
ধাতুরিয়া আশ্বস্ত হইয়া চলিয়া
গেল।
আমার মনে হইল উহার এত কষ্ট
করিয়া শেখা গ্রাম্য নাচ
কলিকাতায় কে-ই বা দেখিবে আর ও
বেচারি একা সেখানে কি-ই বা
করিবে?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now