বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
জঙ্গলের বিভিন্ন অংশ সার্ভে
হইতেছিল। কাছারি হইতে তিন
ক্রোশ দূরে বোমাইবুরুর জঙ্গলে
আমাদের এক আমিন রামচন্দ্র সিং
এই উপলক্ষে কিছুদিন ধরিয়া আছে।
সকালে খবর পাওয়া গেল রামচন্দ্র
সিং হঠাৎ আজ দিন দুই-তিন হইল
পাগল হইয়া গিয়াছে।
শুনিয়া তখনই লোকজন লইয়া
সেখানে গিয়া পৌঁছিলাম।
বোমাইবুরুর জঙ্গল খুব নিবিড় নয়, খুব
ফাঁকা উঁচু-নিচু প্রান্তরে মাঝে
মাঝে বড় বড় গাছ, ডাল হইতে সরু
দড়ির মতো লতা ঝুলিতেছে, যেন
জাহাজের উঁচু মাস্তুলের সঙ্গে
দড়াদড়ি বাঁধা। বোমাইবুরুর জঙ্গল
সম্পূর্ণরূপে লোকবসতিশূন্য।
গাছপালার নিবিড়তা হইতে দূরে
ফাঁকা মাঠের মধ্যে কাশে ছাওয়া
ছোট্ট দুখানা কুঁড়ে। একখানা একটু
বড়, এখানাতে রামচন্দ্র আমিন
থাকে, পাশের ছোটখানায় তার
পেয়াদা আসরফি টিণ্ডেল থাকে।
রামচন্দ্র নিজের কাঠের মাচার
উপর চোখ বুজিয়া শুইয়া ছিল।
আমাদের দেখিয়া ধড়মড় করিয়া
উঠিয়া বসিল। জিজ্ঞাসা করিলাম-
কি হয়েছে রামচন্দ্র? কেমন আছ?
রামচন্দ্র হাতজোড় করিয়া নমস্কার
করিয়া চুপ করিয়া রহিল।
কিন্তু আসরফি টিণ্ডেল সে কথার
উত্তর দিল। বলিল-বাবু, একটা বড়
আশ্চর্য কথা। আপনি শুনলে বিশ্বাস
করবেন না। আমি নিজেই
কাছারিতে গিয়ে খবর দিতাম,
কিন্তু আমিনবাবুকে ফেলে যাই বা
কি করে? ব্যাপারটা এই, আজ ক’দিন
থেকে আমিনবাবু বলছেন একটা কুকুর
এসে রাত্রে তাঁকে বড় বিরক্ত করে।
আমি শুই এই ছোট ঘরে, আমিনবাবু
শুয়ে থাকেন এখানে। দু-তিনদিন এই
রকম গেল। রোজই উনি বলেন-আরে
কোত্থেকে একটা সাদা কুকুর আসে
রাত্রে। মাচার ওপর বিছানা পেতে
শুই, কুকুরটা এসে মাচার নিচে কেঁউ
কেঁউ করে, গায়ে ঘেঁষ দিতে আসে।
শুনি, বড়-একটা গা করি নে। আজ
চারদিন আগে উনি অনেক রাত্রে
বললেন-আসরফি, শিগগির এসো
বেরিয়ে, কুকুরটা এসেছে। আমি তার
লেজ চেপে ধরে রেখেছি। লাঠি
নিয়ে এস।
আমি ঘুম ভেঙে লাঠি-আলো নিয়ে
ছুটে যেতে দেখি-বললে বিশ্বাস
করবেন না হুজুর, কিন্তু হুজুরের
সামনে মিথ্যে বলব এমন সাহস
আমার নেই-একটি মেয়ে ঘরের ভিতর
থেকে বার হয়ে জঙ্গলের দিকে চলে
গেল। আমি প্রথমটা থতমত খেয়ে
গেলাম। তারপর ঘরের মধ্যে ঢুকে
দেখি আমিনবাবু বিছানা হাতড়ে
দেশলাই খুঁজছেন। উনি বললেন-
কুকুরটা দেখলে?
আমি বললাম-কুকুর কই বাবু, একটা কে
মেয়ে তো বার হয়ে গেল।
উনি বললেন-উল্লুক, আমার সঙ্গে
বেয়াদবি? মেয়েমানুষ কে আসবে এই
জঙ্গলে দুপুররাতে? আমি কুকুরটার
লেজ চেপে ধরেছিলাম, এমন কি তার
লম্বা কান আমার গায়ে ঠেকেছে।
মাচার নিচে ঢুকে কেঁউ কেঁউ
করছিল। নেশা করতে শুরু করেছ বুঝি?
রিপোর্ট করে দেব সদরে।
পরদিন রাত্রে আমি সজাগ হয়ে
ছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত। যেই একটু
ঘুমিয়েছি অমনি আমিনবাবু
ডাকলেন। আমি তাড়াতাড়ি ছুটে
বেরিয়ে আমার ঘরের দোর পর্যন্ত
গিয়েছি, এমন সময় দেখি একটি
মেয়ে ওঁর ঘরের উত্তর দিকের বেড়ার
গা বেয়ে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে।
তখনই হুজুর আমি নিজে জঙ্গলের
মধ্যে ঢুকলাম। অতটুকু সময়ের মধ্যে
লুকোবে কোথায়, যাবেই বা কত দূর?
বিশেষ করে আমরা জঙ্গল জরিপ
করি, অন্ধি-সন্ধি সব আমাদের
জানা। কত খুঁজলাম বাবু, কোথাও
তার চিহ্নটি পাওয়া গেল না।
শেষে আমার কেমন সন্দেহ হোলো,
মাটিতে আলো ধরে দেখি কোথাও
পায়ের দাগ নেই, আমার নাগরা
জুতোর দাগ ছাড়া।
আমিনবাবুকে আমি একথা বললাম
না আর সেদিন। একা দুটি প্রাণী
থাকি এই ভীষণ জঙ্গলের মধ্যে হুজুর।
ভয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আর বোমাইবুরু জঙ্গলের একটু দুর্নামও
শোনা ছিল। ঠাকুরদাদার মুখে
শুনেছি, বোমাইবুরু পাহাড়ের উপর
ওই যে বটগাছটা দেখছেন দূরে-
একবার তিনি পূর্ণিয়া থেকে কলাই
বিক্রির টাকা নিয়ে
জ্যোৎস্নারাত্রে ঘোড়ায় করে
জঙ্গলের পথে ফিরছিলেন; ওই
বটতলায় এসে দেখেন একদল
অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়ে হাত-
ধরাধরি করে জ্যোৎস্নার মধ্যে
নাচছে। এদেশে বলে ওদের
‘ডামাবাণু’-এক ধরনের জিনপরী,
নির্জন জঙ্গলের মধ্যে থাকে।
মানুষকে বেঘোরে পেলে মেরেও
ফেলে।
হুজুর, পরদিন রাত্রে আমি নিজে
আমিনবাবুর তাঁবুতে শুয়ে জেগে
রইলাম সারারাত। সারারাত জেগে
জরিপের থাকবন্দির হিসেব কষতে
লাগলাম। বোধ হয় শেষ রাতের
দিকে একটু তন্দ্রা এসে থাকবে-হঠাৎ
কাছেই একটা কিসের শব্দ শুনে মুখ
তুলে চাইলাম-দেখি আমিন সাহেব
ঘুমুচ্ছেন ওঁর খাটে, আর খাটের নিচে
কি-একটা ঢুকেছে। মাথা নিচু করে
খাটের নিচে দেখতে গিয়েই চমকে
উঠলাম। আধ-আলো আধ-অন্ধকারে
প্রথমটা মনে হোলো একটি মেয়ে
যেন গুটিসুটি মেরে খাটের তলায়
বসে আমার দিকে হাসিমুখে চেয়ে
আছে-স্পষ্ট দেখলাম হুজুর, আপনার
পায়ে হাত দিয়ে বলতে পারি। এমন
কি, তার মাথায় বেশ কালো চুলের
গোছা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখেছি।
লণ্ঠনটা ছিল যেখানটাতে বসে
হিসেব কষছিলাম সেখানে-হাত ছ-
সাত দূরে। আরো ভালো করে দেখব
বলে লণ্ঠনটা যেমন আনতে গিয়েছি,
কি একটা প্রাণী ছুটে খাটের তলা
থেকে বেরিয়ে পালাতে গেল,-
দোরের কাছে লণ্ঠনের আলোটা
বাঁকা ভাবে পড়েছিল, সেই
আলোতে দেখলাম একটা বড় কুকুর,
কিন্তু তার আগাগোড়া সাদা, হুজুর,
কালোর চিহ্ন কোথাও নেই তার
গায়ে।
আমিন সাহেব জেগে বললেন-কি,
কি? বললাম-ও কিছু নয়, একটা শেয়াল
কি কুকুর ঘরে ঢুকেছিল। আমিন
সাহেব বললেন-কুকুর? কি রকম কুকুর?
বললাম-সাদা কুকুর। আমিন সাহেব
যেন একটা নিরাশার সুরে বললেন-
সাদা ঠিক দেখেছ? না কালো?
বললাম-না, সাদাই হুজুর।
আমি একটু বিস্মিত যে না
হয়েছিলাম এমন নয়-সাদা না হয়ে
কালো হলেই বা আমিনবাবুর কি
সুবিধা হবে তাতে বুঝলাম না। উনি
ঘুমিয়ে পড়লেন-কিন্তু আমার যে
কেমন একটা ভয় ও অস্বস্তি বোধ
হোলো কিছুতেই চোখের পাতা
বোজাতে পারলাম না। খুব সকালে
উঠে খাটের নিচেটা একবার কি
মনে করে ভালো করে খুঁজতে গিয়ে
সেখানে একগাছা কালো চুল
পেলাম। এই সে চুলও রেখেছি, হুজুর।
মেয়েমানুষের মাথার চুল। কোথা
থেকে এল এ চুল? দিব্যি কালো
কুচকুচে নরম চুল। কুকুর-বিশেষত সাদা
কুকুরের গায়ে এত বড়, নরম কালো চুল
হয় না। এ হোলো গত রবিবার অর্থাৎ
আজ তিন দিনের কথা। এই তিন দিন
থেকে আমিন সাহেব তো এক রকম
উন্মাদ হয়েই উঠেছেন। আমার ভয়
করছে হুজুর-এবার আমার পালা কিনা
তাই ভাবছি।
গল্পটা বেশ আষাঢ়ে-গোছের বটে।
সে চুলগাছি হাতে করিয়া
দেখিয়াও কিছু বুঝিতে পারিলাম
না। মেয়েমানুষের মাথার চুল, সে-
বিষয়ে আমারও কোনো সন্দেহ রহিল
না। আসরফি টিণ্ডেল ছোকরা মানুষ,
সে যে নেশা-ভাঙ করে না, একথা
সকলেই একবাক্যে বলিল।
জনমানবশূন্য প্রান্তর ও বনঝোপের
মধ্যে একমাত্র তাঁবু এই আমিনের
নিকটতম লোকালয় হইতেছে
লবটুলিয়া-ছয় মাইল দূরে।
মেয়েমানুষই বা কোথা হইতে
আসিতে পারে অত গভীর রাত্রে-
বিশেষ যখন এইসব নির্জন
বনপ্রান্তরে বাঘ ও বুনোশুয়োরের
ভয়ে সন্ধ্যার পরে আর লোকে পথ
চলে না!
যদি আসরফি টিণ্ডেলের কথা সত্য
বলিয়া ধরিয়া লই, তবে ব্যাপারটা
খুব রহস্যময়। অথবা এই পাণ্ডববর্জিত
দেশে, এই জনহীন বনজঙ্গল ও ধূ-ধূ
প্রান্তরের মধ্যে বিংশ শতাব্দী
তো প্রবেশের পথ খুঁজিয়া পায়ই
নাই-ঊনবিংশ শতাব্দীও পাইয়াছে
বলিয়া মনে হয় না। অতীত যুগের
রহস্যময় অন্ধকারে এখনো এসব অঞ্চল
আচ্ছন্ন-এখানে সবই সম্ভব।
সেখানকার তাঁবু উঠাইয়া রামচন্দ্র
আমিন ও আসরফি টিণ্ডেলকে সদর
কাছারিতে লইয়া আসিলাম।
রামচন্দ্রের অবস্থা দিন দিন
খারাপ হইতে লাগিল, ক্রমশ সে
ঘোর উন্মাদ হইয়া উঠিল।
সারারাত্রি চিৎকার করে, বকে,
গান গায়। ডাক্তার আনিয়া
দেখাইলাম, কিছুতেই কিছু হইল না,
অবশেষে তাহার এক দাদা আসিয়া
তাহাকে লইয়া গেল।
এই ঘটনার একটা উপসংহার আছে,
যদিও তাহা ঘটিয়াছিল বর্তমান
ঘটনার সাত-আট মাস পরে, তবুও
এখানেই তাহা বলিয়া রাখি। এ
ঘটনার ছ-মাস পরে চৈত্র মাসের
দিকে দুটি লোক কাছারিতে আমার
সঙ্গে দেখা করিল। একজন বৃদ্ধ, বয়স
ষাট-পঁয়ষট্টির কম নয়, অন্যটি তার
ছেলে, বয়স কুড়ি-বাইশ। তাদের
বাড়ি বালিয়া জেলায়, আমাদের
এখানে আসিয়াছে চরি-মহাল
ইজারা লইতে অর্থাৎ আমাদের
জঙ্গলে খাজনা দিয়া তাহারা
গোরু-মহিষ চরাইবে।
অন্য সব চরি-মহাল তখন বিলি হইয়া
গিয়াছে, বোমাইবুরুর জঙ্গলটা
তখনো খালি পড়িয়া ছিল, সেইটাই
বন্দোবস্ত করিয়া দিলাম। বৃদ্ধ
ছেলেকে সঙ্গে লইয়া একদিন মহাল
দেখিয়াও আসিল। খুব খুশি, বলিল,
খুব বড় বড় ঘাস হুজুর, বহুৎ আচ্ছা
জঙ্গল। হুজুরের মেহেরবানি না হলে
অমন জঙ্গল মিলত না।
রামচন্দ্র ও আসরফি টিণ্ডেলের কথা
তখন আমার মনে ছিল না, থাকিলেও
বৃদ্ধের নিকট তাহা হয়তো বলিতাম
না। কারণ, ভয় পাইয়া সে ভাগিয়া
গেলে জমিদারের লোকসান।
স্থানীয় লোকেরা কেহই ও জঙ্গল
ইজারা লইতে ঘেঁষে না, রামচন্দ্র
আমিনের সেই ব্যাপারের পরে।
মাসখানেক পরে বৈশাখের গোড়ায়
একদিন বৃদ্ধ লোকটি কাছারিতে
আসিয়া হাজির, মহা রাগত ভাব,
তার পিছনে সেই ছেলেটি কাঁচুমাচু
ভাবে দাঁড়াইয়া।
বলিলাম-কি ব্যাপার?
বৃদ্ধ রাগে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল-
এই বাঁদরটাকে নিয়ে এলাম হুজুরের
কাছে দরবার করতে। ওকে আপনি পা
থেকে খুলে পঁচিশ জুতো মারুন, ও
জব্দ হয়ে যাক্।
-কি, হয়েছে কি?
-হুজুরের কাছে বলতে লজ্জা করে। এই
বাঁদর, এখানে এসে পর্যন্ত বিগড়ে
যাচ্ছে। আমি সাত-আট দিন প্রায়ই
লক্ষ্য করছি-লজ্জা করে বলতে হুজুর-
প্রায়ই মেয়েমানুষ ঘর থেকে বার
হয়ে যায়। একটা মাত্র খুপরি হাত-
আষ্টেক লম্বা, ঘাসে ছাওয়া, ও আর
আমি দু-জনে শুই। আমার চোখে ধুলো
দিতে পারাও সোজা কথা নয়। দু-
দিন যখন দেখলাম তখন ওকে
জিজ্ঞেস করলাম, ও একেবারে গাছ
থেকে পড়ল হুজুর। বলে-কই, আমি তো
কিছুই জানি নে! আরো দু-দিন যখন
দেখলাম, তখন একদিন দিলাম আচ্ছা
করে ওকে মার। চোখের সামনে
বিগড়ে যাবে ছেলে? কিন্তু তার
পরেও যখন দেখলাম, এই পরশু রাত্রেই
হুজুর-তখন ওকে আমি হুজুরের দরবারে
নিয়ে এসেছি, হুজুর শাসন করে দিন।
হঠাৎ রামচন্দ্র আমিনের ব্যাপারটা
মনে পড়িয়া গেল। জিজ্ঞাসা
করিলাম-কত রাত্রে দেখেছ?
-প্রায়ই শেষরাত্রের দিকে হুজুর। এই
রাতের দু-এক ঘড়ি বাকি থাকতে।
-ঠিক দেখেছ, মেয়েমানুষ?
-হুজুর, আমার চোখের তেজ এখনো তত
কম হয় নি। জরুর মেয়েমানুষ, বয়সেও
কম, কোনোদিন পরনে সাদা ধোয়া
শাড়ি, কোনোদিন বা লাল,
কোনোদিন কালো। একদিন
মেয়েমানুষটা বেরিয়ে যেতেই
আমি পেছন পেছন গেলাম। কাশের
জঙ্গলের মধ্যে কোথায় পালিয়ে
গেল, টের পেলাম না। ফিরে এসে
দেখি, ছেলে আমার যেন খুব ঘুমের
ভান করে পড়ে রয়েছে, ডাকতেই
ধড়মড় করে ঠেলে উঠল, যেন সদ্য ঘুম
ভেঙে উঠল। এ রোগের ওষুধ কাছারি
ভিন্ন হবে না বুঝলাম, তাই হুজুরের
কাছে-
ছেলেটিকে আড়ালে লইয়া গিয়া
জিজ্ঞাসা করিলাম-এ সব কি শুনছি
তোমার নামে?
ছেলেটি আমার পা জড়াইয়া ধরিয়া
বলিল-আমার কথা বিশ্বাস করুন
হুজুর। আমি এর বিন্দুবিসর্গ জানি
না। সমস্ত দিন জঙ্গলে মহিষ চরিয়ে
বেড়াই-রাতে মড়ার মতো ঘুমুই, ভোর
হলে তবে ঘুম ভাঙে। ঘরে আগুন
লাগলেও আমার হুঁশ থাকে না।
বলিলাম-তুমি কোনোদিন কিছু ঘরে
ঢুকতে দেখ নি?
-না, হুজুর। আমার ঘুমুলে হুঁশ থাকে
না।
এ-বিষয়ে আর কোনো কথা হইল না।
বৃদ্ধ খুব খুশি হইল, ভাবিল আমি
আড়ালে লইয়া গিয়া ছেলেকে খুব
শাসন করিয়া দিয়াছি। দিন-পনের
পরে একদিন ছেলেটি আমার কাছে
আসিল। বলিল-হুজুর, একটা কথা
আছে। সেবার যখন আমি বাবার
সঙ্গে কাছারিতে এসেছিলাম, তখন
আপনি ও-কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন
কেন যে আমি কোনো কিছু ঘরে
ঢুকতে দেখেছি কি না?
-কেন বল তো?
-হুজুর, আমার ঘুম আজকাল খুব সজাগ
হয়েছে- বাবা ওই রকম করেন বলে
আমার মনে কেমন একটা ভয়ের দরুনই
হোক বা যার দরুনই হোক। তাই ক-
দিন থেকে দেখছি, রাত্রে একটা
সাদা কুকুর কোথা থেকে আসে-
অনেক রাত্রে আসে, ঘুম ভেঙে এক-
একদিন দেখি সেটা বিছানার
কাছেই কোথায় ছিল-আমি জেগে
শব্দ করতেই পালিয়ে যায়- কোনো
দিন জেগে উঠলেই পালায়। সে
কেমন বুঝতে পারে যে, এইবার আমি
জেগেছি। এ রকম তো ক-দিন
দেখলাম-কিন্তু কাল রাতে হুজুর,
একটা ব্যাপার ঘটেছে। বাপজী
জানে না-আপনাকে চুপি চুপি বলতে
এলাম। কাল অনেক রাতে ঘুম ভেঙে
দেখি, কুকুরটা ঘরে কখন ঢুকেছিল
দেখি নি-আস্তে আস্তে ঘর থেকে
বার হয়ে যাচ্ছে। সেদিকের কাশের
বেড়ায় জানালার মাপে কাটা
ফাঁক। কুকুর বেরিয়ে যাওয়ার পরে-
বোধ হয় পলক ফেলতে যতটা দেরি হয়,
তার পরেই আমার সামনের জানালা
দিয়ে দেখি একটি মেয়েমানুষ
জানালার পাশ দিয়ে ঘরের
পিছনের জঙ্গলের দিকে চলে গেল।
আমি তখুনি বাইরে ছুটে গেলাম-
কোথাও কিছু না। বাবাকেও জানাই
নি, বুড়োমানুষ ঘুমুচ্ছে। ব্যাপারটা
কি হুজুর বুঝতে পারছি নে।
আমি তাহাকে আশ্বাস দিলাম-ও
কিছু নয়, চোখের ভুল। বলিলাম যদি
তাহাদের ওখানে থাকিতে ভয় করে,
তাহারা কাছারিতে আসিয়া শুইতে
পারে। ছেলেটি নিজের
সাহসহীনতায় বোধ করি কিঞ্চিৎ
লজ্জিত হইয়া চলিয়া গেল। কিন্তু
আমার অস্বস্তি দূর হইল না,
ভাবিলাম এইবার কিছু শুনিলে
কাছারি হইতে দুইজন সিপাহী
পাঠাইব রাত্রে ওদের কাছে শুইবার
জন্য।
তখনো বুঝিতে পারি নাই
জিনিসটা কত সঙ্গীন। দুর্ঘটনা
ঘটিয়া গেল অতি অকস্মাৎ এবং
অতি অপ্রত্যাশিত ভাবে।
দিন-তিনেক পরে।
সকালে সবে বিছানা ছাড়িয়া
উঠিয়াছি, খবর পাইলাম কাল
রাত্রে বোমাইবুরু জঙ্গলে বৃদ্ধ
ইজারাদারের ছেলেটি মারা
গিয়াছে। ঘোড়ায় চড়িয়া আমরা
তখনই রওনা হইলাম। গিয়া দেখি
তাহারা যে ঘরটাতে থাকিত
তাহারই পিছনে কাশ ও বনঝাউ-
জঙ্গলে ছেলেটির মৃতদেহ তখনো
পড়িয়া আছে। মুখে তাহার ভীষণ ভয়
ও আতঙ্কের চিহ্ন- কি একটা
বিভীষিকা দেখিয়া আঁৎকাইয়া
যেন মারা গিয়াছে। বৃদ্ধের মুখে
শুনিলাম, শেষ রাত্রির দিকে
উঠিয়া ছেলেকে সে বিছানায় না
দেখিয়া তখনই লণ্ঠন ধরিয়া
খোঁজাখুঁজি আরম্ভ করে-কিন্তু
ভোরের পূর্বে তাহার মৃতদেহ
দেখিতে পাওয়া যায় নাই। মনে হয়,
সে হঠাৎ বিছানা হইতে উঠিয়া
কোনো-কিছুর অনুসরণ করিয়া বনের
মধ্যে ঢোকে-কারণ, মৃতদেহের
কাছেই একটা মোটা লাঠি ও লণ্ঠন
পড়িয়া ছিল, কিসের অনুসরণ করিয়া
সে বনের মধ্যে রাত্রে একা
আসিয়াছিল তাহা বলা শক্ত। কারণ,
নরম বালিমাটির উপরে ছেলেটির
পায়ের দাগ ছাড়া অন্য কোনো
পায়ের দাগ নাই-না মানুষ, না
জানোয়ারের। মৃতদেহেও কোনোরূপ
আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
বোমাইবুরু জঙ্গলের এই রহস্যময়
ব্যাপারের কোনো মীমাংসাই হয়
নাই, পুলিস আসিয়া কিছু করিতে
না-পারিয়া ফিরিয়া গেল,
লোকজনের মনে এমন একটা আতঙ্কের
সৃষ্টি করিল ঘটনাটি যে, সন্ধ্যার বহু
পূর্ব হইতে ও অঞ্চলে আর কেহ যায়
না। দিনকতক তো এমন হইল যে,
কাছারিতে একলা নিজের ঘরটিতে
শুইয়া বাহিরের ধপধপে সাদা,
ছায়াহীন উদাস, নির্জন
জ্যোৎস্নারাত্রির দিকে চাহিয়া
কেমন একটা অজানা আতঙ্কে প্রাণ
কাঁপিয়া উঠিত, মনে হইত
কলিকাতায় পালাই, এসব জায়গা
ভালো নয়, এর জ্যোৎস্নাভরা
নৈশপ্রকৃতি রূপকথার রাক্ষসী
রানীর মতো, তোমাকে ভুলাইয়া
বেঘোরে লইয়া গিয়া মারিয়া
ফেলিবে। যেন এসব স্থান মানুষের
বাসভূমি নয় বটে, কিন্তু
ভিন্নলোকের রহস্যময়, অশরীরী
প্রাণীদের রাজ্য, বহুকাল ধরিয়া
তাহারাই বসবাস করিয়া
আসিতেছিল, আজ হঠাৎ তাদের সেই
গোপন রাজ্যে মানুষের অনধিকার
প্রবেশ তাহারা পছন্দ করে নাই,
সুযোগ পাইলেই প্রতিহিংসা লইতে
ছাড়িবে না।
২
প্রথম রাজু পাঁড়ের সঙ্গে যেদিন
আলাপ হইল, সেদিনটা আমার বেশ
মনে হয় আজও। কাছারিতে বসিয়া
কাজ করিতেছি, একটি গৌরবর্ণ
সুপুরুষ ব্রাহ্মণ আমাকে নমস্কার
করিয়া দাঁড়াইল। তাহার বয়স
পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন হইবে, কিন্তু
তাহাকে বৃদ্ধ বলিলে ভুল করা হয়,
কারণ তাহার মতো সুগঠিত দেহ
বাংলা দেশে অনেক যুবকেরও নাই।
কপালে তিলক, গায়ে একখানি
সাদা চাদর, হাতে একটা ছোট
পুঁটুলি।
আমার প্রশ্নের উত্তরে লোকটি
বলিল, সে বহুদূর হইতে আসিতেছে,
এখানে কিছু জমি বন্দোবস্ত লইয়া
চাষ করিতে চায়। অতি গরিব, জমির
সেলামি দিবার ক্ষমতা তাহার
নাই, আমি সামান্য কিছু জমি
স্টেটের সঙ্গে আধা বখরায়
বন্দোবস্ত দিতে পারি কি না?
এক ধরনের মানুষ আছে, নিজের
সম্বন্ধে বেশি কথা বলিতে জানে
না, কিন্তু তাহাদের মুখের ভাব
দেখিলেই মনে হয় যে, সত্যই বড়
দুঃখী। রাজু পাঁড়েকে দেখিয়া
আমার মনে হইল এ অনেক আশা
করিয়া ধরমপুর পরগণা হইতে এতদূর
আসিয়াছে জমির লোভে, জমি না
পাইলে কিছু না বলিয়াই ফিরিয়া
যাইবে বটে, কিন্তু বড়ই আশাভঙ্গ ও
ভরসাহারা হইয়া ফিরিবে।
রাজুকে দু-বিঘা জমি লবটুলিয়া
বইহারের উত্তরে ঘন-জঙ্গলের মধ্যে
বন্দোবস্ত দিলাম, এক রকম
বিনামূল্যেই। বলিয়া দিলাম, জঙ্গল
পরিষ্কার করিয়া সে আবাদ করুক,
প্রথমে দু বৎসর কিছু লাগিবে না,
তৃতীয় বৎসর হইতে চার আনা
বিঘাপিছু খাজনা দিতে হইবে।
তখনো বুঝি নাই কি অদ্ভুত ধরনের
মানুষকে জমিদারিতে বসাইলাম।
রাজু আসিল ভাদ্র কি আশ্বিন
মাসে, জমি পাইয়া চলিয়াও গেল,
তাহার কথা বহু কাজের মধ্যে
সম্পূর্ণরূপে ভুলিয়া গেলাম। পর বৎসর
শীতের শেষে হঠাৎ একদিন
লবটুলিয়া কাছারি হইতে
ফিরিতেছি, দেখি একটি গাছতলায়
কে বসিয়া কি একখানা বই
পড়িতেছে। আমাকে দেখিয়া
লোকটি বই মুড়িয়া তাড়াতাড়ি
উঠিয়া দাঁড়াইল। আমি চিনিলাম,
সেই রাজু পাঁড়ে। কিন্তু আর-বছর
জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার পর লোকটা
একবারও কাছারিমুখো হইল না, এর
মানে কি? বলিলাম- কি রাজু পাঁড়ে,
তুমি আছ এখানে? আমি ভেবেছি
তুমি জমি ছেড়ে-ছুড়ে চলে গিয়েছ
বোধহয়। চাষ কর নি?
দেখিলাম, ভয়ে রাজুর মুখ শুকাইয়া
গিয়াছে। আমতা আমতা করিয়া
বলিল, হ্যাঁ, হুজুর,-চাষ কিছু-এবার
হুজুর-
আমার কেমন রাগ হইয়া গেল। এইসব
লোকের মুখ বেশ মিষ্টি, লোক
ঠকাইয়া গায়ে হাত বুলাইয়া কাজ
আদায় করিতে বেশ পটু। বলিলাম-
দেড় বছর তোমার চুলের টিকি তো
দেখা যায় নি। দিব্যি স্টেট্কে
ঠকিয়ে ফসল ঘরে তুলছ-কাছারির
ভাগ দেওয়ার যে কথা ছিল, তা বোধ
হয় তোমার মনে নেই?
রাজু এবার বিস্ময়পূর্ণ বড় বড় চোখ
তুলিয়া আমার দিকে চাহিয়া
বলিল-ফসল হুজুর? কিন্তু সে তো ভাগ
দেবার কথা আমার মনেই ওঠে নি-
সে চীনা ঘাসের দানা-
কথাটা বিশ্বাসই হইল না। বলিলাম-
চীনার দানা খাচ্ছ এই ছ-মাস? অন্য
ফসল নেই? কেন, মকাই কর নি?
-না হুজুর, বড্ড গজার জঙ্গল। একা
মানুষ, ভরসা করে উঠতে পারি নি।
পনের কাঠা জমি অতিকষ্টে তৈরি
করেছি। আসুন না হুজুর, একবার দয়া
করে পায়ের ধুলো দিয়ে যান।
রাজুর পিছনে পিছনে গেলাম। এত
ঘন জঙ্গল মাঝে মাঝে যে, ঘোড়ার
ঢুকিতে কষ্ট হইতেছিল। খানিক দূর
গিয়া জঙ্গলের মধ্যে গোলাকার
পরিষ্কার জায়গা প্রায়
বিঘাখানেক, মাঝখানে জংলী
ঘাসেরই তৈরি ছোট নিচু দুখানা
খুপরি। একখানাতে রাজু থাকে, আর
একখানায় ক্ষেতের ফসল জমা আছে।
থলে কি বস্তা নাই, মাটির নিচু
মেঝেতে রাশিকৃত চীনা ঘাসের
দানা স্তূপীকৃত করা। বলিলাম-রাজু,
তুমি এত আল্সে কুঁড়ে লোক তা তো
জানতুম না, দেড় বছরের মধ্যে দু-
বিঘের জঙ্গল কাটতে পারলে না?
রাজু ভয়ে ভয়ে বলিল-সময় হুজুর বড় কম
যে!
-কেন, কি কর সারাদিন?
রাজু লাজুক মুখে চুপ করিয়া রহিল।
রাজুর বাসস্থান খুপরির মধ্যে
জিনিসপত্রের বাহুল্য আদৌ নাই।
একটা লোটা ছাড়া অন্য তৈজস
চোখে পড়িল না। লোটাটা
বড়গোছের, তাতেই ভাত রান্না হয়।
ভাত নয়, চীনা ঘাসের বীজ। কাঁচা
শালপাতায় ঢালিয়া সিদ্ধ চীনার
বীজ খাইলে তৈজসপত্রে কি
দরকার। জলের জন্য নিকটেই কুণ্ডী
অর্থাৎ ক্ষুদ্র জলাশয় আছে। আর কি
চাই।
কিন্তু খুপরির একধারে
সিঁদুরমাখানো ছোট কালো পাথরের
রাধাকৃষ্ণমূর্তি দেখিয়া বুঝিলাম,
রাজু ভক্তমানুষ! ক্ষুদ্র পাথরের বেদি
বনের ফুলে সাজাইয়া রাখিয়াছে,
বেদির এক পাশে দু-একখানা পুঁথি ও
বই। অর্থাৎ, তাহার সময় নাই মানে
সে সারাদিন পূজা-আচ্চা লইয়াই
বোধ হয় ব্যস্ত থাকে। চাষ করে কখন?
এই রাজুকে প্রথম বুঝিলাম।
রাজু পাঁড়ে হিন্দি লেখাপড়া
জানে, সংস্কৃতও সামান্য জানে।
তাও সে সর্বদা পড়ে না, মাঝে
মাঝে অবসর সময়ে গাছতলায় কি
একখানা হিন্দি বই খুলিয়া একটু
বসে-অধিকাংশ সময় দূরের আকাশ ও
পাহাড়ের দিকে চাহিয়া চুপচাপ
বসিয়া থাকে। একদিন দেখি, একটা
ছোট খাতায় খাগের কলমে, বসিয়া
কি লিখিতেছে। ব্যাপার কি?
পাঁড়ে কবিতাও লেখে নাকি? কিন্তু
সে এতই লাজুক, নীরব চাপা মানুষটি,
তাহার নিকট হইতে কোনো কথা
বাহির করিয়া লওয়া বড় কঠিন।
নিজের সম্বন্ধে সে কিছুই বলিতে
চায় না।
একদিন জিজ্ঞাসা করিলাম-
পাঁড়েজী, তোমার বাড়িতে আর কে
আছে?
-সবাই আছে হুজুর, আমার তিন ছেলে,
দুই লেড়কি, বিধবা বহিন।
-তাদের চলে কিসে?
রাজু আকাশের দিকে হাত তুলিয়া
বলিল-ভগবান চালাচ্ছেন। তাদের দু-
মুঠো খাওয়ানোর ব্যবস্থা করব বলেই
তো হুজুরের আশ্রয়ে এসে জমি
নিয়েছি। জমিটা তৈরি করে
ফেলতে পারলে-
-কিন্তু দু-বিঘে জমির ফসলে অতবড়
একটা সংসার চলবে? আর তাই বা
তুমি উঠে পড়ে চেষ্টা করছ কই?
রাজু কথার জবাব প্রথমটা দিল না।
তারপর বলিল-জীবনের সময়টাই বড়
কম হুজুর! জঙ্গল কাটতে গিয়ে কত
কথা মনে পড়ে, বসে বসে ভাবি। এই
যে বন-জঙ্গল দেখছেন, বড় ভালো
জায়গা। ফুলের দল কত কাল থেকে
ফুটছে আর পাখি ডাকছে, বাতাসের
সঙ্গে মিলে দেবতারা পৃথিবীর
মাটিতে পা দেন এখানে। টাকার
লোভ, পাওনা-দেনার কাজ যেখানে
চলে, সেখানকার বাতাস বিষিয়ে
ওঠে! সেখানে ওঁরা থাকেন না।
কাজেই এখানে দা-কুড়ুল হাতে
করলেই দেবতারা এসে হাত থেকে
কেড়ে নেন-কানে চুপি চুপি এমন
কথা বলেন, যাতে বিষয়-সম্পত্তি
থেকে মন অনেক দূরে চলে যায়।
দেখিলাম, রাজু কবি বটে,
দার্শনিকও বটে।
বলিলাম-কিন্তু রাজু, দেবতারা এমন
কথা বলেন না যে, বাড়িতে খরচ
পাঠিও না, ছেলেপুলে উপোস করুক।
ওসব কথাই নয় রাজু, কাজে লাগো।
নইলে জমি কেড়ে নেব।
আরো কয়েক মাস গেল। রাজুর
ওখানে মাঝে মাঝে যাই। ওকে কি
ভালোই লাগে! সেই গভীর নির্জনে
লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলে একা
ছোট একটা ঘাসের খুপরিতে সে
কেমন করিয়া দিনের পর দিন বাস
করে, এ আমি ভাবিয়া উঠিতে পারি
না।
সত্যকার সাত্ত্বিক প্রকৃতির লোক
রাজু। অন্য কোনো ফসল জন্মাইতে
পারে নাই, চীনা ঘাসের দানা
ছাড়া। সাত আট মাস হাসিমুখে
তাই খাইয়াই চালাইতেছে। কারো
সঙ্গে দেখা হয় না, গল্পগুজবের লোক
নাই, কিন্তু তাহাতেও ওর কিছু
অসুবিধা হয় না, বেশ আছে। দুপুরে
যখনই রাজুর জমির উপর দিয়া
গিয়াছি, তখনই দুপুর রোদে ওকে
জমিতে কাজ করিতে দেখিয়াছি।
সন্ধ্যার দিকে ওকে প্রায়ই চুপ
করিয়া হরীতকী গাছটার তলে
বসিয়া থাকিতে দেখিয়াছি-
কোনোদিন হাতে খাতা থাকে,
কোনোদিন থাকে না।
একদিন বলিলাম-রাজু, আরো কিছু
জমি তোমায় দিচ্ছি, বেশি করে
চাষ কর, তোমার বাড়ির লোক না-
খেয়ে মরবে যে! রাজু অতি শান্ত
প্রকৃতির লোক, তাহাকে কোনো
কিছু বুঝাইতে বেশি বেগ পাইতে হয়
না। জমি সে লইল বটে, কিন্তু
পরবর্তী পাঁচ-ছ মাসের মধ্যে জমি
পরিষ্কার করিয়া উঠিতে পারিল
না। সকালে উঠিয়া তাহার পূজা ও
গীতাপাঠ করিতে বেলা দশটা
বাজে, তারপর কাজে বার হয়। ঘণ্টা-
দুই কাজ করিবার পরে রান্না-
খাওয়া করে, সারা দুপুরটা খাটে
বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত! তারপরই
আপন মনে গাছতলায় চুপ করিয়া
বসিয়া কি ভাবে। সন্ধ্যার পরে
আবার পূজাপাঠ আছে।
সে-বছর রাজু কিছু মকাই করিল,
নিজে না খাইয়া সেগুলি সব দেশে
পাঠাইয়া দিল, বড় ছেলে আসিয়া
লইয়া গেল। কাছারিতে ছেলেটা
দেখা করিতে আসিয়াছিল,
তাহাকে ধমক দিয়া বলিলাম-বুড়ো
বাপকে এই জঙ্গলে একা ফেলে
রেখে বাড়িতে বসে দিব্যি ফুর্তি
করছ, লজ্জা করে না? নিজেরা
রোজগারের চেষ্টা কর না কেন?
৩
সেবার শুয়োরমারি বস্তিতে ভয়ানক
কলেরা আরম্ভ হইল, কাছারিতে
বসিয়া খবর পাইলাম। শুয়োরমারি
আমাদের এলাকার মধ্যে নয়, এখান
থেকে আট-দশ ক্রোশ দূরে, কুশী ও
কলবলিয়া নদীর ধারে। প্রতিদিন
এত লোক মরিতে লাগিল যে, কুশী
নদীর জলে সর্বদা মড়া ভাসিয়া
যাইতেছে, দাহ করিবার ব্যবস্থা
নাই। একদিন শুনিলাম, রাজু পাঁড়ে
সেখানে চিকিৎসা করিতে বাহির
হইয়াছে। রাজু পাঁড়ে যে চিকিৎসক
তাহা জানিতাম না। তবে আমি
কিছুদিন হোমিওপ্যাথি ওষুধ
নাড়াচাড়া করিয়াছিলাম বটে,
ভাবিলাম এইসব ডাক্তার-
কবিরাজশূন্য স্থানে দেখি যদি
কিছু উপকার করিতে পারি।
কাছারি হইতে আমার সঙ্গে আরো
অনেকে গেল। গ্রামে পৌঁছিয়া রাজু
পাঁড়ের সঙ্গে দেখা হইল। সে একটা
বটুয়াতে শিকড়-বাকড় জড়ি-বুটি
লইয়া এ-বাড়ি ও-বাড়ি রোগী
দেখিয়া বেড়াইতেছে। আমায়
নমস্কার করিয়া বলিল- হুজুর! আপনার
বড্ড দয়া, আপনি এসেছেন, এবার
লোকগুলা যদি বাঁচে। এমন ভাবটা
দেখাইল যেন আমি জেলার সিভিল
সার্জন কিংবা ডাক্তার গুডিভ
চক্রবর্তী। সে-ই আমাকে সঙ্গে
করিয়া গ্রামে রোগীদের বাড়ি
বাড়ি ঘুরাইয়া লইয়া বেড়াইল।
রাজু ওষুধ দেয়, সবই দেখিলাম ধারে।
সারিয়া উঠিলে দাম দিবে এই
নাকি কড়ার হইয়াছে। কি ভয়ানক
দারিদ্র্যের মূর্তি কুটিরে কুটিরে।
সবই খোলার কিংবা খড়ের বাড়ি,
ছোট্ট ছোট্ট ঘর, জানালা নাই,
আলো-বাতাস ঢোকে না কোনো
ঘরে। প্রায় সব ঘরেই দু-একটি রোগী,
ঘরের মেঝেতে ময়লা বিছানায়
শুইয়া। ডাক্তার নাই, ওষুধ নাই, পথ্য
নাই। অবশ্য রাজু সাধ্যমতো চেষ্টা
করিতেছে, না-ডাকিলেও সব
রোগীর কাছে গিয়া তাহার জড়ি-
বুটির ওষুধ খাওয়াইয়াছে, একটা ছোট
ছেলের রোগশয্যার পাশে বসিয়া
কাল নাকি সারা রাত সেবাও
করিয়াছে। কিন্তু মড়কের তাহাতে
কিছুমাত্র উপশম দেখা যাইতেছে
না বরং বাড়িয়াই চলিয়াছে।
রাজু আমায় ডাকিয়া একটা
বাড়িতে লইয়া গেল। একখানা মাত্র
খড়ের ঘর, মেঝেতে রোগী
তালপাতার চেটাইয়ে শুইয়া, বয়েস
পঞ্চাশের কম নয়। সতের-আঠারো
বছরের একটি মেয়ে দোরের গোড়ায়
বসিয়া হাপুস নয়নে কাঁদিতেছে।
রাজু তাহাকে ভরসা দিয়া বলিল-
কাঁদিস নে বেটি, হুজুর এসেছেন, আর
ভয় নেই, রোগ সেরে যাবে।
বড়ই লজ্জিত হইলাম নিজের
অক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়া।
জিজ্ঞাসা করিলাম-মেয়েটি বুঝি
রোগীর মেয়ে?
রাজু বলিল-না হুজুর, ওর বৌ। কেউ
নেই সংসারে মেয়েটার, বিধবা মা
ছিল, বিয়ে দিয়ে মারা গিয়েছে।
একে বাঁচান হুজুর, নইলে মেয়েটা
পথে বসবে!
রাজুর কথার উত্তরে কি বলিতে
যাইতেছি এমন সময় হঠাৎ চোখ পড়িল
রোগীর শিয়রের দিকে দেওয়ালে
মেঝে থেকে হাত তিনেক উঁচুতে
একটা কাঠের তাকের প্রতি। দেখি
তাকের উপর একটা আঢাকা পাথরের
খোরায় দুটি পান্তা ভাত। ভাতের
উপর দু-দশটা মাছি বসিয়া আছে। কি
সর্বনাশ! ভীষণ এশিয়াটিক কলেরার
রোগী ঘরে, আর রোগীর নিকট হইতে
তিন হাতের মধ্যে ঢাকাবিহীন
খোরায় ভাত।
সারাদিন রোগীর সেবা করার পর
দরিদ্র ক্ষুধার্ত বালিকা হয়তো
পাথরের খোরাটি পাড়িয়া পান্তা
ভাত দুটি নুন লঙ্কা দিয়া আগ্রহের
সহিত খাইতে বসিবে। বিষাক্ত
অন্ন, যার প্রতি গ্রাসে নিষ্ঠুর মৃত্যুর
বীজ! বালিকার সরল অশ্রুভরা চোখ
দুটির দিকে চাহিয়া শিহরিয়া
উঠিলাম। রাজুকে বলিলাম-এ ভাত
ফেলে দিতে বল ওকে। এ-ঘরে খাবার
রাখে!
মেয়েটি ভাত ফেলিয়া দিবার
প্রস্তাবে বিস্মিত হইয়া আমাদের
মুখের দিকে চাহিল। ভাত ফেলিয়া
দিবে কেন? তবে সে খাইবে কি?
ওঝাজীদের বাড়ি থেকে কাল
রাতে ঐ ভাত দুটি তাহাকে খাইতে
দিয়া গিয়াছিল।
আমার মনে পড়িল ভাত এ-দেশে
সুখাদ্য বলিয়া গণ্য, আমাদের দেশে
যেমন লুচি কি পোলাও। কিন্তু একটু
কড়া সুরেই বলিলাম-উঠে এখুনি ভাত
ফেলে দাও আগে।
মেয়েটি ভয়ে ভয়ে উঠিয়া খোরার
ভাত ফেলিয়া দিল।
তাহার স্বামীকে কিছুতেই
বাঁচানো গেল না। সন্ধ্যার পরেই
বৃদ্ধ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করিল।
মেয়েটির কি কান্না! রাজুও সেই
সঙ্গে কাঁদিয়া আকুল।
আর একটি বাড়িতে রাজু আমায়
লইয়া গেল। সেটা রাজুর এক
দূরসম্পর্কীয় শালার বাড়ি। এখানে
প্রথম আসিয়া এই বাড়িতেই রাজু
উঠিয়াছিল। খাওয়াদাওয়া এখানেই
করিত। এখানে মা ও ছেলের
একসঙ্গে কলেরা, পাশাপাশি ঘরে
দুই রোগী থাকে, এ উহাকে
দেখিবার জন্য ব্যাকুল, ও ইহাকে
দেখিবার জন্য ব্যাকুল। সাত-আট
বছরের ছোট ছেলে।
ছেলে প্রথমে মারা গেল। মাকে
জানিতে দেওয়া হইল না। আমার
হোমিওপ্যাথি ওষুধে মায়ের অবস্থা
ভালো হইয়া দাঁড়াইতে লাগিল
ক্রমশ। মা কেবলই ছেলের খবর নেয়,
ও-ঘরে ছেলের সাড়াশব্দ পাওয়া
যাচ্ছে না কেন? কেমন আছে সে?
আমরা বলি-তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া
হয়েছে-ঘুমুচ্ছে।
চুপি চুপি ছেলের মৃতদেহ ঘর হইতে
বাহির করা হইল।
গ্রামের লোক স্বাস্থ্যের নিয়ম
একেবারে জানে না। একটি মাত্র
পুকুর, সেই পুকুরেই কাপড় কাচে,
সেখানেই স্নান করে। স্নান করা
আর জল পান করা যে একই কথা ইহা
কিছুতেই তাহাদের বুঝাইতে
পারিলাম না। কত লোক কত লোককে
ফেলিয়া পলাইয়া গিয়াছে। একটা
ঘরের মধ্যে একটা রোগী দেখিলাম,
সে বাড়িতে আর লোক নাই।
রোগগ্রস্ত লোকটি ঐ বাড়ির
ঘরজামাই, স্ত্রী আর-বছর মারা
গিয়াছে। তত্রাচ লোকটার অবস্থা
খারাপ বলিয়াই হউক বা যে
কারণেই হউক, শ্বশুরবাড়ির লোকে
তাহাকে ফেলিয়া পলাইয়াছে।
রাজু তাহাকে দিনরাত সেবা
করিতে লাগিল। আমি ঔষধপত্রের
ব্যবস্থা করিয়া দিলাম। লোকটা
শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়া গেল। বুঝিলাম,
শ্বশুরবাড়ির অন্নদাস হিসাবে
তাহার অদৃষ্টে এখনো অনেক দুঃখ
আছে।
রাজুকে থলি বাহির করিয়া
চিকিৎসার মোট উপার্জন গণনা
করিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা
করিলাম-কত হোলো, রাজু?
রাজু গুনিয়াগাঁথিয়া বলিল-এক
টাকা তিন আনা।
ইহাতেই সে বেশ খুশি হইয়াছে।
এদেশের লোক একটা পয়সার মুখ
সহজে দেখিতে পায় না, এক টাকা
তিন আনা উপার্জন এখানে কম
নহে। রাজুকে আজ পনের-ষোল দিন,
ডাক্তারকে ডাক্তার, নার্সকে
নার্স, কি খাটুনিটাই খাটিতে
হইয়াছে।
অনেক রাত্রে গ্রামের মধ্যে
কান্নাকাটির রব শোনা গেল।
আবার একজন মরিল। রাত্রে ঘুম হইল
না। গ্রামের অনেকেই ঘুমায় নাই,
ঘরের সামনে বড় বড় কাঠ
জ্বালাইয়া আগুন করিয়া গন্ধক
পোড়াইতেছে ও আগুনের চারিধার
ঘিরিয়া বসিয়া গল্পগুজব
করিতেছে। রোগের গল্প, মৃত্যুর খবর
ছাড়া ইহাদের মুখে অন্য কোনো
কথা নাই-সকলেরই মুখে একটা ভয়,
আতঙ্কের চিহ্ন পরিস্ফুট। কাহার
পালা আসে!
দুপুর রাত্রে সংবাদ পাইলাম,
ওবেলার সেই সদ্য-বিধবা
বালিকাটির কলেরা হইয়াছে।
গিয়া দেখিলাম, তাহার
স্বামীগৃহের পাশে এক বাড়ির
গোয়ালে সে শুইয়া আছে। ভয়ে
নিজের ঘরে আসিয়া শুইতে পারে
নাই, অথচ তাহাকে কেহ স্থান দেয়
নাই সে কলেরার রোগী ছুঁইয়াছিল
বলিয়া। গোয়ালের এক পাশে কয়েক
আঁটি গমের বিচালির উপর পুরোনো
চট পাতা, তাতেই বালিকা শুইয়া
ছটফট করিতেছে। আমি ও রাজু বহু
চেষ্টা করিলাম হতভাগিনীকে
বাঁচাইবার। একটি লণ্ঠন, একটু জল
কোথাও পাওয়া যায় না। উঁকি
মারিয়া কেহ দেখিতে পর্যন্ত
আসিল না। আজকাল এমন আতঙ্কের
সৃষ্টি হইয়াছে যে, কলেরা কাহারো
হইলে তাহার ত্রিসীমানায় লোক
ঘেঁষে না।
রাত ফর্সা হইল।
রাজুর খুব নাড়িজ্ঞান, হাত দেখিয়া
বলিল-এ হুজুর সুবিধে নয় গতিক।
আমি আর কি করিব, নিজে ডাক্তার
নই, স্যালাইন দিতে পারিলে হইত, এ
অঞ্চলে তেমন ডাক্তার কোথাও
নাই।
সকাল ন’টায় বালিকা মারা গেল।
আমরা না থাকিলে তাহার মৃতদেহ
কেহ বাহির করিতে আসিত কি না
সন্দেহ, আমাদের অনেক তদ্বির ও
অনুরোধে জন দুই আহীর চাষী বাঁশ
লইয়া আসিয়া মৃতদেহ বাঁশের
সাহায্যে ঠেলিতে ঠেলিতে নদীর
দিকে লইয়া গেল।
রাজু বলিল-বেঁচে গেল হুজুর। বিধবা
বেওয়া অবস্থায়, তাতে ছেলেমানুষ,
কি খেত, কে ওকে দেখত?
বলিলাম-তোমাদের দেশ বড় নিষ্ঠুর,
রাজু।
আমার মনে কষ্ট রহিয়া গেল যে,
আমি তাহাকে তাহার মুখের অত
সাধের ভাত দুটি খাইতে দিই নাই।
৪
নিস্তব্ধ দুপুরে দূরে মহালিখারূপের
পাহাড় ও জঙ্গল অপূর্ব রহস্যময়
দেখাইত। কতবার ভাবিয়াছি
একবার গিয়া পাহাড়টা ঘুরিয়া
দেখিয়া আসিব, কিন্তু সময় হইয়া
ওঠে নাই। শুনিতাম মহালিখারূপের
পাহাড় দুর্গম বনাকীর্ণ, শঙ্খচূড়
সাপের আড্ডা, বনমোরগ, দুষ্প্রাপ্য
বন্য চন্দ্রমল্লিকা, বড় বড় ভাল্লুক-
ঝোড়ে ভর্তি। পাহাড়ের উপরে জল
নাই বলিয়া, বিশেষত ভীষণ শঙ্খচূড়
সাপের ভয়ে, এ অঞ্চলের
কাঠুরিয়ারাও কখনো ওখানে যায়
না।
দিক্চক্রবালে দীর্ঘ নীলরেখার
মতো পরিদৃশ্যমান এই পাহাড় ও বন
দুপুরে, বিকালে, সন্ধ্যায় কত স্বপ্ন
আনে মনে। একে তো এদিকের সারা
অঞ্চলটাই আজকাল আমার কাছে
পরীর দেশ বলিয়া মনে হয়, এর
জ্যোৎস্না, এর বন-বনানী, এর
নির্জনতা, এর নীরব রহস্য, এর
সৌন্দর্য, এর মানুষজন, পাখির ডাক,
বন্য ফুলশোভা-সবই মনে হয় অদ্ভুত,
মনে এমন এক গভীর শান্তি ও আনন্দ
আনিয়া দেয়, জীবনে যাহা কোথাও
কখনো পাই নাই। তার উপরে বেশি
করিয়া অদ্ভুত লাগে ওই
মহালিখারূপের শৈলমালা ও
মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের
সীমারেখা। কি রূপলোক যে ইহারা
ফুটাইয়া তোলে দুপুরে, বৈকালে,
জ্যোৎস্নারাত্রে- কি উদাস
চিন্তার সৃষ্টি করে মনে!
একদিন পাহাড় দেখিব বলিয়া
বাহির হইলাম। ন’মাইল ঘোড়ায়
গিয়া দুই দিকের দুই শৈলশ্রেণীর
মাঝের পথ ধরিয়া চলি। দুই দিকের
শৈলসানু বনে ভরা, পথের ধারে দুই
দিকের বিচিত্র ঘন বনঝোপের মধ্য
দিয়া সুঁড়িপথ আঁকিয়া বাঁকিয়া
চলিয়াছে, কখনো উঁচু-নিচু, মাঝে
মাঝে ছোট ছোট পার্বত্য ঝরনা
উপলাস্তৃত পথে বহিয়া চলিয়াছে,
বন্য চন্দ্রমল্লিকা ফুটিতে দেখি
নাই, কারণ তখন শরৎকাল,
চন্দ্রমল্লিকা ফুটিবার সময়ও নয়,
কিন্তু কি অজস্র বন্য শেফালিবৃক্ষ
বনের সর্বত্র ফুলের খই ছড়াইয়া
রাখিয়াছে বৃক্ষতলে, শিলাখণ্ডে,
ঝরনার উপলাকীর্ণ তীরে। আরো কত
কি বিচিত্র বন্যপুষ্প ফুটিয়াছে,
বর্ষাশেষে, পুষ্পিত সপ্তপর্ণের বন,
অর্জুন ও পিয়াল, নানাজাতীয় লতা
ও অর্কিডের ফুল-বহুপ্রকার পুষ্পের
সুগন্ধ একত্র মিলিত হইয়া
মৌমাছিদের মতো মানুষকেও
নেশায় মাতাল করিয়া তুলিতেছে।
এতদিন এখানে আছি, এ সৌন্দর্যভূমি
আমার কাছে অজ্ঞাত ছিল।
মহালিখারূপের জঙ্গল ও পাহাড়কে
দূর হইতে ভয় করিয়া আসিয়াছি, বাঘ
আছে, সাপ আছে, ভাল্লুকের নাকি
লেখাজোখা নাই-এ পর্যন্ত তো
একটা ভালুক-ঝোড় কোথাও
দেখিলাম না। লোকে যতটা
বাড়াইয়া বলে, ততটা নয়।
ক্রমে পথটার দু-ধারে বন ঘনাইয়া
পথটাকে যেন দু-দিক হইতে চাপিয়া
ধরিল। বড় বড় গাছের ডালপালা
পথের উপর চন্দ্রাতপের সৃষ্টি করিল।
ঘন-সন্নিবিষ্ট কালো কালো গাছের
গুঁড়ি, তাদের তলায় কেবলই
নানাজাতীয় ফার্ন, কোথাও বড়
গাছেরই চারা। সামনে চাহিয়া
দেখিলাম পথটা উপরের দিকে
ঠেলিয়া উঠিতেছে, বন আরো
কৃষ্ণায়মান, সামনে একটা উত্তুঙ্গ
শৈলচূড়া, তাহার অনাবৃত
শিখরদেশের অল্প নিচেই যে-সব
বন্যপাদপ, এত নিচু হইতে সেগুলি
দেখাইতেছে যেন ছোট ছোট শেওড়া
গাছের ঝোপ। অপূর্ব গম্ভীর শোভা
এই জায়গাটায়। পথ বাহিয়া
পাহাড়ের উপরে অনেক দূর উঠিলাম,
আবার পথটা নামিয়া গড়াইয়া
গিয়াছে, কিছুদূর নামিয়া আসিয়া
একটা পিয়ালতলায় ঘোড়া বাঁধিয়া
শিলাখণ্ডে বসিলাম-উদ্দেশ্য,
শ্রান্ত অশ্বকে কিছুক্ষণ বিশ্রামের
অবকাশ দেওয়া।
সেই উত্তুঙ্গ শৈলচূড়া হঠাৎ কখন
বামদিকে গিয়া পড়িয়াছে; পার্বত্য
অঞ্চলের এই মজার ব্যাপার কতবার
লক্ষ্য করিয়াছি, কোথা দিয়া
কোনোটা ঘুরিয়া গিয়া আধরশি
পথের ব্যবধানে দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন
দৃশ্যের সৃষ্টি করে, এই যাহাকে
ভাবিতেছি খাড়া উত্তরে অবস্থিত,
হঠাৎ দু-কদম যাইতে না যাইতে
সেটা কখন দেখি পশ্চিমে ঘুরিয়া
দাঁড়াইয়াছে।
চুপ করিয়া কতক্ষণ বসিয়া রহিলাম।
কাছেই বনের মধ্যে কোথায় একটা
ঝরনার কলমর্মর সেই
শৈলমালাবেষ্টিত বনানীর গভীর
নিস্তব্ধতাকে আরো বাড়াইয়া
তুলিয়াছে। আমার চারিধারেই উঁচু
উঁচু শৈলচূড়া, তাদের মাথায় শরতের
নীল আকাশ। কতকাল হইতে এই বন
পাহাড় এই এক রকমই আছে। সুদূর
অতীতের আর্যেরা খাইবার
গিরিবর্ত্ম পার হইয়া প্রথম যেদিন
পঞ্চনদে প্রবেশ করিয়াছিলেন, এই
বন তখনো এই রকমই ছিল; বুদ্ধদেব
নববিবাহিতা তরুণী পত্নীকে
ছাড়িয়া যে-রাত্রে গোপনে
গৃহত্যাগ করেন, সেই অতীত
রাত্রিতে এই গিরিচূড়া গভীর
রাত্রির চন্দ্রালোকে আজকালের
মতোই হাসিত; তমসাতীরের
পর্ণকুটিরে কবি বাল্মীকি একমনে
রামায়ণ লিখিতে লিখিতে কবে
চমকিয়া উঠিয়া দেখিয়াছিলেন
সূর্য অস্তাচলচূড়াবলম্বী, তমসার
কালো জলে রক্তমেঘস্তূপের ছায়া
পড়িয়া আসিয়াছে, আশ্রমমৃগ
আশ্রমে ফিরিয়াছে, সেদিনটিতেও
পশ্চিম দিগন্তের শেষ রাঙা আলোয়
মহালিখারূপের শৈলচূড়া ঠিক এমনি
অনুরঞ্জিত হইয়াছিল, আজ আমার
চোখের সামনে ধীরে ধীরে যেমন
হইয়া আসিতেছে। সেই কতকাল
আগে যেদিন চন্দ্রগুপ্ত প্রথম
সিংহাসনে আরোহণ করেন;
গ্রীকরাজ হেলিওডোরাস্ গরুড়ধ্বজ-
স্তম্ভ নির্মাণ করেন; রাজকন্যা
সংযুক্তা যেদিন স্বয়ংবর-সভায়
পৃথ্বীরাজের মূর্তির গলায় মাল্যদান
করেন; সামুগড়ের যুদ্ধে হারিয়া
হতভাগ্য দারা যে রাত্রে আগ্রা
হইতে গোপনে দিল্লী পলাইলেন;
চৈতন্যদেব যেদিন শ্রীবাসের ঘরে
সংকীর্তন করেন; যেদিনটিতে
পলাশীর যুদ্ধ হইল-মহালিখারূপে ঐ
শৈলচূড়া, এই বনানী ঠিক এমনি
ছিল। তখন কাহারা বাস করিত এইসব
জঙ্গলে? জঙ্গলের অনতিদূরে একটা
গ্রামে দেখিয়া আসিয়াছিলাম
কয়েকখানি মাত্র খড়ের ঘর আছে,
মহুয়াবীজ ভাঙ্গিয়া তৈল বাহির
করিবার জন্য দু-খণ্ড কাঠের তৈরি
একটা ঢেঁকির মতো কি আছে, আর এক
বুড়িকে দেখিয়াছিলাম তাহার বয়স
আশি-নব্বুই হইবে, শণের-নুড়ি চুল,
গায়ে খড়ি উড়িতেছে, রৌদ্রে
বসিয়া বোধ করি মাথার উকুন
বাছিতেছিল-ভারতচন্দ্রের
জরতীবেশধারিণী অন্নপূর্ণার
মতো। এখানে বসিয়া সেই বুড়িটার
কথা মনে পড়িল-এ অঞ্চলের বন্য
সভ্যতার প্রতীক ওই প্রাচীন বৃদ্ধা-
পূর্বপুরুষেরা এই বন-জঙ্গলে বহুসহস্র
বছর ধরিয়া বাস করিয়া আসিতেছে।
যীশুখ্রিস্ট যেদিন ক্রুশে বিদ্ধ
হইয়াছিলেন সেদিনও উহারা
মহুয়াবীজ ভাঙ্গিয়া যেরূপ তৈল
বাহির করিত, আজ সকালেও সেইরূপ
করিয়াছে। হাজার হাজার বছর
নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে অতীতের
ঘন কুঞ্ঝটিকায়, উহারা আজও
সাতনলি ও আঠাকাঠি দিয়া
সেইরূপই পাখি শিকার করিতেছে-
ঈশ্বর সম্বন্ধে, জগৎ সম্বন্ধে উহাদের
চিন্তাধারা বিন্দুমাত্র অগ্রসর হয়
নাই। ঐ বুড়ির দৈনন্দিন
চিন্তাধারা কি, জানিবার জন্য
আমি আমার এক বছরের উপার্জন
দিতে প্রস্তুত আছি।
বুঝি না কেন এক-এক জাতির মধ্যে
সভ্যতার কী বীজ লুক্কায়িত থাকে,
তাহারা যত দিন যায় তত উন্নতি
করে-আবার অন্য জাতি হাজার বছর
ধরিয়াও সেই একস্থানে স্থাণুবৎ
নিশ্চল হইয়া থাকে? বর্বর
আর্যজাতি চার-পাঁচ হাজার বছরের
মধ্যে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, কাব্য,
জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি, চরক-
সুশ্রুত লিখিল, দেশ জয় করিল,
সাম্রাজ্য পত্তন করিল, ভেনাস দ্য
মিলোর মূর্তি, পার্থেনন, তাজমহল,
কোলোঁ ক্যাথিড্রাল গড়িল, দরবারি
কানাড়া ও ফিফ্থ্ সিম্ফোনির
সৃষ্টি করিল-এরোপ্লেন, জাহাজ,
রেলগাড়ি, বেতার, বিদ্যুৎ
আবিষ্কার করিল-অথচ পাপুয়া,
নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়ার আদিম
অধিবাসীরা, আমাদের দেশের ওই
মুণ্ডা, কোল, নাগা, কুকিগণ যেখানে
সেখানেই কেন রহিয়াছে এই পাঁচ
হাজার বছর?
অতীত কোনো দিনে, এই যেখানে
বসিয়া আছি, এখানে ছিল
মহাসমুদ্র-প্রাচীন সেই মহাসমুদ্রের
ঢেউ আসিয়া আছাড় খাইয়া পড়িত
ক্যাম্বিয়ান যুগের এই বালুময় তীরে-
এখন যাহা বিরাট পর্বতে পরিণত
হইয়াছে। এই ঘন অরণ্যানীর মধ্যে
বসিয়া অতীত যুগের সেই নীল
সমুদ্রের স্বপ্ন দেখিলাম।
পুরা যতঃ স্রোতঃ পুলিনমধুনা তত্র
সরিতাম্।
এই বালু-প্রস্তরের শৈলচূড়ায় সেই
বিস্মৃত অতীতের মহাসমুদ্র বিক্ষুব্ধ
উর্মিমালার চিহ্ন রাখিয়া
গিয়াছে-অতি স্পষ্ট সে চিহ্ন-
ভূতত্ত্ববিদের চোখে ধরা পড়ে।
মানুষ তখন ছিল না, এ ধরনের
গাছপালাও ছিল না, যে ধরনের
গাছপালা জীবজন্তু ছিল, পাথরের
বুকে তারা তাদের ছাঁচ রাখিয়া
গিয়াছে, যে কোনো মিউজিয়ামে
গেলে দেখা যায়।
বৈকালের রোদ রাঙা হইয়া
আসিয়াছে মহালিখারূপ পাহাড়ের
মাথায়। শেফালিবনের গন্ধভরা
বাতাসে হেমন্তের হিমের ঈষৎ
আমেজ, আর এখানে বিলম্ব করা
উচিত হইবে না, সম্মুখে কৃষ্ণা
একাদশীর অন্ধকার রাত্রি, বনমধ্যে
কোথায় একদল শেয়াল ডাকিয়া
উঠিল। ভালুক বা বাঘ পথ না
আটকায়।
ফিরিবার পথে এইদিন প্রথম বন্য
ময়ূর দেখিলাম বনান্তস্থলীতে
শিলাখণ্ডের উপর। একজোড়া ছিল,
আমার ঘোড়া দেখিয়া ভয় পাইয়া
ময়ূরটা উড়িয়া গেল, তাহার
সঙ্গিনী কিন্তু নড়িল না। বাঘের
ভয়ে আমার তখন দেখিবার অবকাশ
ছিল না, তবু একবার সেটার সামনে
থমকিয়া দাঁড়াইলাম। বন্য ময়ূর
কখনো দেখি নাই, লোকে বলিত এ
অঞ্চলে ময়ূর আছে আমি বিশ্বাস
করিতাম না। কিন্তু বেশিক্ষণ
বিলম্ব করিতে ভরসা হইল না, কি
জানি মহালিখারূপের বাঘের
গুজবটাও যদি এ রকম সত্য হইয়া যায়!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now