বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১
বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ কাটিয়া গিয়া
আষাঢ় পড়িল। আষাঢ় মাসে প্রথমেই
কাছারির পুণ্যাহ উৎসব। এ জায়গায়
মানুষের মুখ বড় একটা দেখিতে পাই
না বলিয়া আমার একটা শখ ছিল
কাছারির পুণ্যাহের দিনে অনেক
লোক নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইব।
নিকটে কোনো গ্রাম না থাকায়
আমরা গনোরী তেওয়ারীকে
পাঠাইয়া দূরে দূরের বস্তির
লোকদের নিমন্ত্রণ করিলাম।
পুণ্যাহের পূর্বদিন হইতে আকাশ
মেঘাচ্ছন্ন হইয়া টিপটিপ বৃষ্টি
পড়িতে শুরু করিয়াছিল, পুণ্যাহের
দিন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল।
এদিকে দুপুর হইতে-না-হইতে দলে
দলে লোক নিমন্ত্রণ খাওয়ার লোভে
ধারাবর্ষণ উপেক্ষা করিয়া
কাছারিতে পৌঁছিতে লাগিল, এমন
মুশকিল যে, তাহাদের বসিবার
জায়গা দিতে পারা যায় না। দলের
মধ্যে অনেক মেয়ে ছেলেপুলে লইয়া
খাইতে আসিয়াছে, কাছারির
দপ্তরখানায় তাহাদের বসিবার
ব্যবস্থা করিলাম, পুরুষেরা যে
যেখানে পারে আশ্রয় লইল।
এ-দেশে খাওয়ানোর কোনো
হাঙ্গামা নাই, এত গরিব দেশ যে
থাকিতে পারে তাহা আমার জানা
ছিল না। বাংলা দেশ যতই গরিব
হোক, এদের দেশের সাধারণ
লোকদের তুলনায় বাংলা দেশের
গরিব লোকেও অনেক বেশি
অবস্থাপন্ন। ইহারা এই মুষলধারে
বৃষ্টি মাথায় করিয়া খাইতে
আসিয়াছে চীনা ঘাসের দানা, টক
দই, ভেলি গুড় ও লাড্ডু। কারণ ইহাই
এখানে সাধারণ ভোজের খাদ্য।
দশ-বারো বছরের একটি অচেনা
ছোকরা সকাল হইতেই খুব
খাটিতেছিল, গরিব লোকের ছেলে,
নাম বিশুয়া, দূরের কোনো বস্তি
হইতে আসিয়া থাকিবে। বেলা
দশটার সময় সে কিছু জলখাবার
চাহিল। ভাঁড়ারের ভার ছিল
লবটুলিয়ার পাটোয়ারীর উপর, সে এক
খুঁচি চীনার দানা ও একটু নুন
তাহাকে আনিয়া দিল।
আমি পাশেই দাঁড়াইয়া ছিলাম।
ছেলেটি কালো কুচকুচে, সুশ্রী
মুখটা, যেন পাথরের কৃষ্ণঠাকুর। সে
যখন ব্যস্তসমস্ত হইয়া মলিন মোটা
মার্কিনী আটহাতি থান কাপড়ের
খুঁট পাতিয়া সেই তুচ্ছ জলখাবার লইল
তখন তাহার মুখে সে কি খুশির
হাসি! আমি বলিতে পারি অতি
গরিব অবস্থারও কোনো বাঙালি
ছেলে চীনার দানা কখনো খাইবেই
না, খুশি হওয়া তো দূরের কথা।
কারণ, একবার শখ করিয়া চীনার
দানা খাইয়া যে স্বাদ পাইয়াছি,
তাহাতে মুখরোচক সুখাদ্যের
হিসাবে তাহাকে উল্লেখ কখনোই
করিতে পারিব না।
বৃষ্টির মধ্যে কোনো রকমে তো
ব্রাহ্মণভোজন এক রকম চুকিয়া গেল।
বৈকালের দিকে দেখি ঘোর
অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মধ্যে অনেকক্ষণ
হইতে তিনটি স্ত্রীলোক উঠানে
পাতা পাতিয়া বসিয়া ভিজিয়া
ঝুপসি হইতেছে-সঙ্গে দুটি ছোট ছোট
ছেলেমেয়েও। তাহাদের পাতে
চীনার দানা আছে, কিন্তু দই বা
ভেলি গুড় কেহ দিয়া যায় নাই,
তাহারা হাঁ করিয়া কাছারিঘরের
দিকে চাহিয়া আছে।
পাটোয়ারীকে ডাকিয়া বলিলাম-
এদের কে দিচ্ছে? এরা বসে আছে
কেন? আর এদের এই বৃষ্টির মধ্যে
উঠোনে বসিয়েছেই বা কে?
পাটোয়ারী বলিল-হুজুর, ওরা জাতে
দোষাদ। ওদের ঘরের দাওয়ায় তুললে
ঘরের সব জিনিসপত্র ফেলা যাবে,
কোনো ব্রাহ্মণ ছত্রী কি
গাঙ্গোতা সে জিনিস খাবে না।
আর জায়গাই বা কোথায় আছে বলুন?
ওই গরিব দোষাদদের মেয়ে-কয়টির
সামনে আমি গিয়া নিজে বৃষ্টিতে
ভিজিয়া দাঁড়াইতে লোকজনেরা
ব্যস্ত হইয়া তাহাদের পরিবেশন
করিতে লাগিল। সামান্য চীনার
দানা, গুড় ও জলো টক দই এক একজন
যে পরিমাণে খাইল, চোখে না
দেখিলে তাহা বিশ্বাস করিবার
কথা নহে। এই ভোজ খাইবার জন্য এত
আগ্রহ দেখিয়া ঠিক করিলাম,
দোষাদদের এই মেয়েদের নিমন্ত্রণ
করিয়া একদিন খুব ভালো করিয়া
সত্যকার সভ্য খাদ্য খাওয়াইব।
সপ্তাহখানেক পরেই পাটোয়ারীকে
দিয়া দোষাদপাড়ার মেয়েকয়টি ও
তাহাদের ছেলেমেয়েদের নিমন্ত্রণ
করিলাম, সেদিন তাহারা যাহা
খাইল-লুচি, মাছ, মাংস, ক্ষীর, দই,
পায়েস, চাট্নি-জীবনে কোনো দিন
সে রকম ভোজ খাওয়ার কল্পনাও
করে নাই। তাদের বিস্মিত ও
আনন্দিত চোখ-মুখের সে হাসি
কতদিন আমার মনে ছিল! সেই
ভবঘুরে গাঙ্গোতা ছোকরা বিশুয়াও
সে দলে ছিল।
২
সার্ভে-ক্যাম্প থেকে একদিন ঘোড়া
করিয়া ফিরিতেছি, বনের মধ্যে
একটা লোক কাশঘাসের ঝোপের
পাশে বসিয়া কলাইয়ের ছাতু
মাখিয়া খাইতেছে। পাত্রের
অভাবে ময়লা থান কাপড়ের
প্রান্তেই ছাতুটা মাখিতেছে-এত
বড় একটা তাল যে, একজন লোকে-হলই
বা হিন্দুস্থানি, মানুষ তো বটে-কি
করিয়া অত ছাতু খাইতে পারে এ
আমার বুদ্ধির অগোচর। আমায়
দেখিয়া লোকটা সসম্ভ্রমে খাওয়া
ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া সেলাম
ঠুকিয়া বলিল- ম্যানেজার সাহেব!
থোড়া জলখাই করতে হেঁ হুজুর, মাফ
কিজিয়ে। একজন ব্যক্তি নির্জনে
বসিয়া, শান্তভাবে জলখাবার
খাইতেছে, ইহার মধ্যে মাফ
করিবার কি আছে খুঁজিয়া পাইলাম
না। বলিলাম-খাও, খাও, তোমায়
উঠতে হবে না। নাম কি তোমার?
লোকটা তখনো বসে নাই, দণ্ডায়মান
অবস্থাতেই সসম্ভ্রমে বলিল-গরিব
কা নাম ধাওতাল সাহু, হুজুর।
চাহিয়া দেখিয়া মনে হইল লোকটার
বয়স ষাটের উপর হইবে। রোগা-লম্বা
চেহারা, গায়ের রং কালো, পরনে
অতি মলিন থান ও মেরজাই, পা
খালি।
ধাওতাল সাহুর সঙ্গে এই আমার
প্রথম আলাপ।
কাছারিতে আসিয়া রামজোত
পাটোয়ারীকে জিজ্ঞাসা
করিলাম-ধাওতাল সাহুকে চেন?
রামজোত বলিল-জ্বি হুজুর। ধাওতাল
সাহুকে এ অঞ্চলে কে না জানে? সে
মস্ত বড় মহাজন, লক্ষপতি লোক,
এদিকে সবাই তার খাতক।
নওগছিয়ায় তার ঘর। পাটোয়ারীর
কথা শুনিয়া খুব আশ্চর্য হইয়া
গেলাম। লক্ষপতি লোক বনের মধ্যে
বসিয়া ময়লা উড়ানির প্রান্তে এক
তাল নিরুপকরণ কলাইয়ের ছাতু
খাইতেছে-এ দৃশ্য কোনো বাঙালি
লক্ষপতির সম্বন্ধে অন্তত কল্পনা
করা অতীব কঠিন। ভাবিলাম
পাটোয়ারী বাড়াইয়া বলিতেছে,
কিন্তু কাছারিতে যাহাকে
জিজ্ঞাসা করি, সে-ই ঐ কথা বলে,
ধাওতাল সাহু? তার টাকার
লেখাজোখা নেই।
ইহার পরে নিজের কাজে ধাওতাল
সাহু অনেকবার কাছারিতে আমার
সহিত দেখা করিয়াছে, প্রতিবার
একটু একটু করিয়া তাহার সহিত
আলাপ জমিয়া উঠিলে বুঝিলাম,
একটি অতি অদ্ভুত লোকোত্তর
চরিত্রের মানুষের সঙ্গে পরিচয়
ঘটিয়াছে। বিংশ শতাব্দীতে এ
ধরনের লোক যে আছে, না দেখিলে
বিশ্বাস করা যায় না।
ধাওতালের বয়স যাহা আন্দাজ
করিয়াছিলাম, প্রায় তেষট্টি-
চৌষট্টি! কাছারির পূর্ব-দক্ষিণ
দিকের জঙ্গলের প্রান্ত হইতে
বারো-তেরো মাইল দূরে নওগছিয়া
নামে গ্রামে তাহার বাড়ি। এ
অঞ্চলে প্রজা, জোতদার, জমিদার,
ব্যবসাদার প্রায় সকলেই ধাওতাল
সাহুর খাতক। কিন্তু তাহার মজা এই
যে, টাকা ধার দিয়া সে জোর
করিয়া কখনো তাগাদা করিতে
পারে না। কত লোকে যে কত টাকা
তাহার ফাঁকি দিয়াছে! তাহার
মতো নিরীহ, ভালোমানুষ লোকের
মহাজন হওয়া উচিত ছিল না, কিন্তু
লোকের উপরোধ সে এড়াইতে পারে
না। বিশেষত সে বলে, যখন সকলেই
মোটা সুদ লিখিয়া দিয়াছে, তখন
ব্যবসা হিসাবেও তো টাকা দেওয়া
উচিত। একদিন ধাওতাল আমার সঙ্গে
দেখা করিতে আসিল, উড়ানিতে
বাঁধা এক বাণ্ডিল পুরোনো
দলিলপত্র। বলিল-হুজুর, মেহেরবানি
করে একটু দেখবেন দলিলগুলো?
পরীক্ষা করিয়া দেখি প্রায় আট-দশ
হাজার টাকার দলিল ঠিক সময়ে
নালিশ না-করার দরুন তামাদি
হইয়া গিয়াছে।
উড়ানির আর এক মুড়ো খুলিয়া সে
আরো কতকগুলি জরাজীর্ণ কাগজ
বাহির করিয়া বলিল-এগুলো দেখুন
দেখি হুজুর। ভাবি একবার জেলায়
গিয়ে উকিলদের দেখাই, তা মামলা
কখনো করি নি, করা পোষায় না।
তাগাদা করি, দিচ্ছি দেব করে
টাকা দেয় না অনেকে।
দেখিলাম, সবগুলিই তামাদি দলিল।
সবসুদ্ধ জড়াইয়া সেও চার-পাঁচ
হাজার টাকা। ভালোমানুষকে
সবাই ঠকায়। বলিলাম-সাহুজী,
মহাজনী করা তোমার কাজ নয়। এ-
অঞ্চলে মহাজনী করতে পারবে
রাসবিহারী সিং রাজপুতের মতো
দুঁদে লোকরা, যাদের সাত-আটটা
লাঠিয়াল আছে, খাতকের ক্ষেতে
নিজে ঘোড়া করে গিয়ে লাঠিয়াল
মোতায়েন করে আসে, ফসল ক্রোক
করে টাকা আর সুদ আদায় করে।
তোমার মতো ভালোমানুষ লোকের
টাকা শোধ করবে না কেউ। দিও না
কাউকে আর।
ধাওতালকে বুঝাইতে পারিলাম না,
সে বলিল-সবাই ফাঁকি দেয় না হুজুর।
এখনো চন্দ্র-সূর্য উঠছে, মাথার উপর
দীন-দুনিয়ার মালিক এখনো আছেন।
টাকা কি বসিয়ে রাখলে চলে, সুদে
না বাড়লে আমাদের চলে না হুজুর।
এই আমাদের ব্যবসা।
তাহার এ-যুক্তি আমি বুঝিতে
পারিলাম না, সুদের লোভে আসল
টাকা নষ্ট হইতে দেওয়া কেমনতর
ব্যবসা জানি না। ধাওতাল সাহু
আমার সামনেই অম্লান বদনে পনের-
ষোল হাজার টাকার তামাদি দলিল
ছিঁড়িয়া ফেলিল-এমনভাবে ছিঁড়িল
যেন সেগুলো বাজে কাগজ-অবশ্য,
বাজে কাগজের পর্যায়েই তাহারা
আসিয়া দাঁড়াইয়াছে বটে। তাহার
হাত কাঁপিল না, গলার সুর কাঁপিল
না।
বলিল-রাঁইচি আর রেড়ির বীজ
বিক্রি করে টাকা করেছিলাম হুজুর,
নয়তো আমার পৈতৃক আমলের একটা
ঘষা পয়সাও ছিল না। আমিই করেছি,
আবার আমিই লোকসান দিচ্ছি।
ব্যবসা করতে গেলে লাভ-লোকসান
আছেই হুজুর।
তা আছে স্বীকার করি, কিন্তু কয়জন
লোক এত বড় ক্ষতি এমন শান্তমুখে
উদাসীনভাবে সহ্য করিতে পারে,
সেই কথাই ভাবিতেছিলাম। তাহার
বড়মানুষি গর্ব দেখিলাম মাত্র
একটি ব্যাপারে; একটা লাল
কাপড়ের বাটুয়া হইতে সে মাঝে
মাঝে ছোট্ট একখানা জাঁতি ও
সুপারি বাহির করিয়া কাটিয়া
মুখে ফেলিয়া দেয়। আমার দিকে
চাহিয়া হাসিমুখে একবার
বলিয়াছিল-রোজ এক কনোয়া করে
সুপুরি খাই বাবুজী। সুপুরির বড় খরচ
আমার। বিত্তে নিস্পৃহতা ও বৃহৎ
ক্ষতিকে তাচ্ছিল্য করিবার ক্ষমতা
যদি দার্শনিকতা হয়, তবে ধাওতাল
সাহুর মতো দার্শনিক আমি তো
অন্তত দেখি নাই।
৩
ফুলকিয়ার ভিতর দিয়া যাইবার সময়
আমি প্রতিবারই জয়পাল কুমারের
মকাইয়ের পাতা-ছাওয়া ছোট্ট
ঘরখানার সামনে দিয়া যাইতাম।
কুমার অর্থে কুম্ভকার নয়, ভুঁইহার
বামুন।
খুব বড় একটা প্রাচীন পাকুড় গাছের
নিচেই জয়পালের ঘর। সংসারে সে
সম্পূর্ণ একা, বয়সেও প্রাচীন, লম্বা
রোগা চেহারা, মাথায় লম্বা সাদা
চুল। যখনই যাইতাম, তখনই দেখিতাম
কুঁড়েঘরের দোরের গোড়ায় সে চুপ
করিয়া বসিয়া আছে। জয়পাল
তামাক খাইত না, কখনো তাকে
কোনো কাজ করিতে দেখিয়াছি
বলিয়াও মনে হয় না, গান গাইতে
শুনি নাই-সম্পূর্ণ কর্মশূন্য অবস্থায়
মানুষ কি ভাবে যে এমন ঠায় চুপ
করিয়া বসিয়া থাকিতে পারে,
জানি না। জয়পালকে দেখিয়া বড়
বিস্ময় ও কৌতূহল বোধ করিতাম।
প্রতিবারই উহার ঘরের সামনে
ঘোড়া থামাইয়া উহার সহিত দুটা
কথা না বলিয়া যাইতে পারিতাম
না।
জিজ্ঞাসা করিলাম-জয়পাল, কি কর
বসে?
-এই, বসে আছি হুজুর।
-বয়েস কত হোলো?
-তা হিসেব রাখি নি, তবে যেবার
কুশীনদীর পুল হয়, তখন আমি মহিষ
চরাতে পারি।
-বিয়ে করেছিলে? ছেলেপুলে ছিল?
-পরিবার মরে গিয়েছে আজ বিশ-
পঁচিশ বছর। দুটো মেয়ে ছিল, তারাও
মারা গেল। সেও তের-চোদ্দ বছর
আগে। এখন একাই আছি।
-আচ্ছা, এই যে একা এখানে থাক,
কারো সঙ্গে কথা বলো না, কোথাও
যাও না, কিছু করও না-এ ভালো
লাগে? একঘেয়ে লাগে না?
জয়পাল অবাক হইয়া আমার দিকে
চাহিয়া বলিত-কেন খারাপ লাগবে
হুজুর? বেশ থাকি। কিছু খারাপ
লাগে না।
জয়পালের এই কথাটা আমি কিছুতেই
বুঝিতে পারিতাম না। আমি
কলিকাতার কলেজে পড়িয়া মানুষ
হইয়াছি, হয় কোনো কাজ, নয়তো
বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা, নয় বই, নয়
সিনেমা, নয় বেড়ানো-এ ছাড়া
মানুষ কি করিয়া থাকে বুঝি না।
ভাবিয়া দেখিতাম, দুনিয়ার কত কি
পরিবর্তন হইয়া গেল, গত বিশ-বৎসর
জয়পাল কুমার ওর ঘরের দোরটাতে
ঠায় চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া তার
কতটুকু খবর রাখে? আমি যখন
ছেলেবেলায় স্কুলের নিচের ক্লাসে
পড়িতাম, তখনো জয়পাল এমনি
বসিয়া থাকিত, বি.এ. যখন পাশ
করিলাম তখনো জয়পাল এমনি
করিয়া বসিয়া থাকে। আমার
জীবনেরই নানা ছোট বড় ঘটনা যা
আমার কাছে পরম বিস্ময়কর বস্তু,
তারই সঙ্গে মিলাইয়া জয়পালের এই
বৈচিত্র্যহীন নির্জন জীবনের
অতীত দিনগুলির কথা ভাবিতাম।
জয়পালের ঘরখানা গ্রামের
একেবারে মাঝখানে হইলেও কাছে
অনেকটা পতিত জমি ও মকাই-ক্ষেত,
কাজেই আশপাশে কোনো বসতি
নাই। ফুলকিয়া নিতান্ত ক্ষুদ্র গ্রাম,
দশ-পনের ঘর লোকের বাস, সকলেই
চতুর্দিকব্যাপী জঙ্গলমহলে মহিষ
চরাইয়া দিন গুজরান করে।
সারাদিন ভূতের মতো খাটে আর
সন্ধ্যার সময় কলাইয়ের ভুসির আগুন
জ্বালাইয়া তার চারিপাশে
পাড়াসুদ্ধ বসিয়া গল্পগুজব করে,
খৈনি খায় কিংবা শালপাতার
পিকার ধূমপান করে। হুঁকায় তামাক
খাওয়ার চলন এদেশে খুবই কম। কিন্তু
কখনো কোনো লোককে জয়পালের
সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখি নাই।
প্রাচীন পাকুড় গাছটার মগডালে
বকেরা দল বাঁধিয়া বাস করে, দূর
হইতে দেখিলে মনে হয়, গাছের
মাথায় থোকা থোকা সাদা ফুল
ফুটিয়াছে। স্থানটা ঘন ছায়াভরা,
নির্জন, আর সেখানটাতে দাঁড়াইয়া
যে দিকেই চোখ পড়ে, সে দিকেই
নীল নীল পাহাড় দূরদিগন্তে হাত
ধরাধরি করিয়া ছোট
ছেলেমেয়েদের মতো মণ্ডলাকারে
দাঁড়াইয়া। আমি পাকুড় গাছের ঘন
ছায়ায় দাঁড়াইয়া যখন জয়পালের
সঙ্গে কথা বলিতাম, তখন আমার
মনে এই সুবৃহৎ বৃক্ষতলের নিবিড়
শান্তি ও গৃহস্বামীর অনুদ্বিগ্ন,
নিস্পৃহ, ধীর জীবনযাত্রা ধীরে
ধীরে কেমন একটা প্রভাব বিস্তার
করিত। ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইয়া
লাভ কি? কি সুন্দর ছায়া এই শ্যাম
বংশী-বটের, কেমন মন্থর যমুনাজল,
অতীতের শত শতাব্দী পায়ে পায়ে
পার হইয়া সময়ের উজানে চলিয়া
যাওয়া কি আরামের!
কিছু জয়পালের জীবনযাত্রার
প্রভাব ও কিছু চারিধারের
বাধাবন্ধনশূন্য প্রকৃতি আমাকেও
ক্রমে ক্রমে যেন ঐ জয়পাল কুমারের
মতো নির্বিকার, উদাসীন ও নিস্পৃহ
করিয়া তুলিতেছে। শুধু তাই নয়,
আমার যে চোখ কখনো এর আগে
ফোটে নাই সে চোখ যেন ফুটিয়াছে,
যে-সব কথা কখনো ভাবি নাই
তাহাই ভাবাইতেছে। ফলে এই মুক্ত
প্রান্তর ও ঘনশ্যামা
অরণ্যপ্রকৃতিকে এত ভালবাসিয়া
ফেলিয়াছি যে, একদিন পূর্ণিয়া কি
মুঙ্গের শহরে কার্য উপলক্ষে গেলে
মন উড়ু উড়ু করে, মন টিকিতে চায়
না। মনে হয়, কতক্ষণে জঙ্গলের মধ্যে
ফিরিয়া যাইব, কতক্ষণে আবার সেই
ঘন নির্জনতার মধ্যে, অপূর্ব
জ্যোৎস্নার মধ্যে, সূর্যাস্তের মধ্যে,
দিগন্তব্যাপী কালবৈশাখীর
মেঘের মধ্যে, তারাভরা নিদাঘ-
নিশীথের মধ্যে ডুব দিব!
ফিরিবার সময় সভ্য লোকালয়কে
বহুদূর পিছনে ফেলিয়া, মুকুন্দি
চাকলাদারের হাতের বাবলাকাঠের
খুঁটির পাশ কাটাইয়া যখন নিজের
জঙ্গলের সীমানায় ঢুকি, তখন
সুদূরবিসর্পী নিবিড়শ্যাম বনানী,
প্রান্তর, শিলাস্তূপ, বনটিয়ার ঝাঁক,
নীলগাইয়ের জেরা, সূর্যালোক,
ধরণীর মুক্ত প্রসার আমায় একেবারে
একমুহূর্তে অভিভূত করিয়া দেয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now