বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
¤¤¤ চক্র ¤¤¤
( ৭ম / শেষ পর্ব )
---------------------
ডিবির এসআই একরামুল গত চব্বিশ ঘন্টায় কিছু মুখে
গুজার সময় পায়নি। পুরো দিনটা কেটেছে দৌড়ের
উপর।
হাফিজুর রহিম পুরো ব্যপারটাকে ভীষণ
ঘোড়ালো করে তুলেছিলো। এএসপি আকবর
আর সে মিলে এখন পুরো বিষয়টা নিজেদের
মতো করে সাজাচ্ছে। সারা দিন পেটে একটা দানা
না পড়লেও কোনো অনুযোগ করেনি এনামুল।
এর পেছনে দুটো কারণ কাজ করছে। প্রথমটি
হচ্ছে, টাকা। একরামুল জানে, এই কাজের বিনিময়ে
পকেটে আসবে অনেকগুলো কড়কড়ে
নোট। খাবার না জুটলেও সারাদিনই আসন্ন টাকার
গন্ধটা উপভোগ করেছে। এই গন্ধটা তার কাছে
যে কোনো সুস্বাদু খাবারের চেয়ে অনেক
বেশি উপদেয়। দ্বিতীয় কারণটা হলো ঘটনার
গুরুত্ব। আবু সাঈদ এবং হাফিজুর রহিমের স্ত্রীকে
হত্যা করা, হাফিজুর রহিমের গ্রেপ্তার এবং তন্ময়ের
পেছনে পুরো পুলিশ ফোর্সকে লেলিয়ে
দেওয়ার বিষয়গুলোই এ ঘটনাটির গুরুত্ব নিরূপণের
জন্য যথেষ্ট। তার উপর সকাল থেকে মন্ত্রী
নিজে একটু পর পর ফোন দিয়ে কাজের
অগ্রগতি জানতে চাইছেন। মন্ত্রীর ফোন রিসিভ
করতে করতে ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে উঠেছে
আকবর খান।
দীর্ঘ দিনের চাকরি জীবনে ছোট-বড় নানা
জাতের দুর্নীতি করে বিস্তর টাকা কামিয়েছে
একরামুল। ঢাকা শহরে তার জায়গা সম্পত্তির
কোনো অভাব নেই। তবে এবারের ঘটনা
একেবারে আলাদা। এটা তো বিরাট দাঁও। প্রস্তাবটি
পেয়ে প্রথমে একটু চমকে উঠলেও দ্রুতই
নিজেকে সামলে নিয়েছে। জীবনে উন্নতির
জন্য মানুষকে তো কতো কাজই করতে হয়।
সে তুলনায় এটা তেমন কোনো কঠিন কাজ না। তা
ছাড়া বিবেকের কথা ভেবে সে যদি কাজটা না
করে তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে এটা করানো
হবে। সে ক্ষেত্রে মোটা ইনাম থেকে
বঞ্চিত হবে সে। এসব সাত-পাঁচ ভেবে আবু
সাঈদকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটি
হাতে নিয়েছে। সরাসরি খুনটি অবশ্য নিজ হাতে
করতে হয়নি। মন্ত্রীর পাঠানো দুই পেশাদার খুনি
নিখুঁতভাবে খুব অল্প সময়ে শ্বাসরোধ করে
হত্যা করে আবু সাঈদকে। পুরো ব্যপারটি
তত্বাবধান করে একরামুল। শমসের আর মবিনের
মানুষ হত্যার দক্ষতা দেখে রীতিমতো মুগ্ধ
একরামুল। এরকম ভাবলেসহীন ভাবে অনায়াস
দক্ষতায় যে মানুষ হত্যা করা সম্ভব, তা নিজের
চোখে না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস হতো না।
একরামুলের মতো সকাল থেকে মুখ বুজে কাজ
করে যাচ্ছে আকবর খান। কাজ মানে অকাজ।
দিনকে রাত বানানো। নিখুঁত ঘটনা সাজাতে এবং
ফাইলে চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ফলানোতে
সিদ্ধহস্ত এই আকবর। এসব কাজে সে
রীতিমতো একটি প্রতিভা। পাকা জহুরির মতো
তাকে ঠিক ঠিক চিনে নিয়েছেন ডিআইজি। তার
নির্দেশেই আকবরকে এ কেসটার দায়িত্ব দেওয়া
হয়েছে। ধানমন্ডিতে একটা ফ্যাটের বুকিং দিয়ে
ছিলো আকবরের স্ত্রী। কেসটা ঠিকঠাক শেষ
করতে পারলে এককালীন দাম পরিশোধ করে
ফ্যাটটাতে উঠে যাওয়া যেতো। সেখান থেকে
আদনানের স্কুলটাও খুব কাছে, হেঁটেই যাওয়া যায়।
এ কারণেই সুষমা তাড়া দিচ্ছে দ্রুত ওই ফ্যাটে উঠার
জন্য। ব্যাচমেট রুশোর নতুন প্রিমিওটা দেখে
স্ত্রীর খায়েস হয়েছে একটা নতুন গাড়ি কেনার।
এই সুযোগে সেটাও সম্ভব হবে। একটা সিগারেট
ধরিয়ে টেবিলে দু পা তুলে দিয়েছে আকবর।
চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে
থাকে।
স্যার..একরামুলের ডাকে সংবিত ফিরে পায়।
কী ব্যপার?
স্যার রাত তো অনেক হলো, বাড়ি যাবেন না?
আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, হাতের কাজটা একটু গুছিয়ে
নেই। বুঝতেই পারছো, আজকের মধ্যেই
যতোটা সম্ভব কাজ গুছিয়ে ফেরতে হবে।
ব্যপারটা ক্রমেই ঘোড়ালো হয়ে উঠছে। আবু
সাঈদ এবং মুনমুনের মৃত্যু নিয়ে মিডিয়া গুলো হৈচৈ শুরু
করেছে। এদিকে ওই সাংবাদিকেরও কোনো
পাত্তা নাই। তার কাছে নাকি কিসব কাগজপত্র আছে।
সেগুলোও উদ্ধার করা জরুরি। সবকিছু মিলে
ব্যপারটা একেবারে জট পাকিয়ে আছে।
আমাদেরকে তাই খুব দ্রুত ফাইল গুছিয়ে ফেলতে
হবে। ঠিক আছে?
ঠিক আছে স্যার। বিরস বদনে উত্তর দেয়
একরামুল।
কাজ শেষে একরামুল যখন বাড়ির দিকে রওনা হয়
তখন ঘড়িতে রাত দুটো। ফাকা রাস্তায় দ্রুতই
শাহজাহানপুরের বাড়িতে ফিরে আসে একরামুল।
কলাপসেবল গেইটের তালায় চাবি ঢোকানো
মাত্রই জমে যায় একরামুল। ঘাড়ের উপর চেপে
বসা ধাতব স্পর্শটিতে মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল
স্রোত নেমে আসে। রিভলবারের নল দিয়ে
খোচা মেরে একরামুলকে ভেতরে ঢোকায়
তন্ময়। পুরান ঢাকার টপ টেরর বোমা লিটনের কাছ
থেকে ধার করে এনেছে অস্ত্রটি। দীর্ঘদিন
ক্রাইম বিটে কাজ করার সুবাদে ঢাকার আন্ডার
ওয়ার্ল্ডের লিডারদের সঙ্গে ভালোই জানাশোনা
আছে। সেই পরিচয়ের সূত্রটিই এখন কাজে
দিচ্ছে।
মবিন আর শমসেরের পরিচয়ও তন্ময় বের করে
আন্ডারওয়ার্ল্ডের শুভাকাঙ্খীদের কাছ থেকে।
রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এবং হাঙ্গামার জন্য সাধারণত মবিন
আর শমসেরকে ভাড়া করা হয়। যখন যে দল
ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের হয়ে কাজ করে এই
মানিকজোড়। এক একটি পলিটিক্যাল কিলিংয়ের জন্য
অবিশাস্য রকম বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকে তারা।
তাহলে তন্ময়কে ধরতে এই দুই পেশাদার খুনিকে
কেন কাজে লাগিয়েছে মন্ত্রী? তন্ময়ের
কাছে এটা এখন একটা বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্ন
লিটনেরও।
’বস, আপনে কি মন্ত্রীর মাইয়ারে রেপ
করছেন নি? হালায় আপনের পিছে শমু-মবুরে
লাগাইছে কেলা?’ অপরাধ জগতে মবিন আর
শমসের এ নামেই পরিচিত। ছোটখাট অপরাধে
এদের কখনো দেখা যায়নি। পুলিশের খাতায় এই
জুটির নামে কোনো রেকর্ড নেই। কারণ সব
সময়ই এরা ‘সরকারের’ হয়ে কাজ করে। তন্ময়ও
সেই কথাই ভাবছিলো। এখন আর কোনো কিছুই
তাকে বিষ্মিত করছে না। এতোসব ঘটনার
মধ্যেদিয়ে যেতে হচ্ছে, কোনো কিছুকেই
অপ্রত্যাশিত লাগছে না।
ডিবি অফিসে আমিনুলের সোর্স আজহারের কাছ
থেকে খবর পেয়েছে, এই কেসে হাফিজুর
রহিমের সহকারী হিসেবে ছিল এসআই একরামুল।
স্ত্রীর দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে রহিম অফিস
ছেড়ে চলে যায়। আবু সাঈদ তখন একরামুলের
তত্বাবধানে ছিল। সে অবস্থাতেই মৃত্যু হয়
সাঈদের। সাঈদ হত্যার সঙ্গে একরামুলের সংশিষ্টতা
বোঝার জন্য এর চেয়ে বেশি তথ্যের
প্রয়োজন নেই। তারেক আহমেদের বাড়ি
থেকে বের হয়ে তাই সোজা শাহজাহানপুরে
এসেছে তন্ময়। তাকে নামিয়ে দিয়ে পাত্রিকা
অফিসে গেছে আমিনুল। সে কি পারবে
শরীফের ড্রয়ার থেকে প্যাকেটটা উদ্ধার
করতে? এ চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে তন্ময়। ওই
কাগজের প্যাকেটটাই এখন তার একমাত্র সম্বল।
জানেনা এটার ভেতরে কী আছে। কিন্তু সে
নিশ্চত, এটি হাতে পেলে অনেক কিছু পরিষ্কার
হয়ে যাবে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য
এটি হবে একটি মোক্ষম অস্ত্র।
পঁয়তালিশ মিনিট ধরে অন্ধকারে ঠায় দাঁড়িয়ে।
শরীরে প্রতিটি লোমকুপে কমপক্ষে একটি
করে মসা বসে আছে। থাপ্পর দিয়ে মারতে
হচ্ছে না। শরীরের যে কোনো অংশে হাত
বুলালেই চাপা পড়ে আট-দশটার মৃত্যু হচ্ছে।
নিজের রক্তে চটচটে হয়ে গেছে হাতের
তালু। প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যের মতো কঠোর
অধ্যাবসায়ে দাঁড়িয়ে ছিলো তন্ময়। এক একটি
সেকেন্ডের ব্যপ্তি বেড়ে যেন ঘন্টায়
দাঁড়িয়েছে। সব রাতই ভোরে শেষ হয়। তেমনি
এক সময় তন্ময়ের অপেক্ষার পালাও শেষ
হলো।
একরামুলের ঘাড়ে বন্দুক ঠেকিয়ে দোতলার
ল্যান্ডিংয়ে নিয়ে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসা রুমাল
দিয়ে সিড়িকোঠার অন্ধকারে হাত-পা বাঁধে। মুখে
গুজে দেয় রুমাল। অমানুষিক আতঙ্কে
চোখদুটো ঠিকে বের হয়ে আসে
একরামুলের। মুখে গোজা রুমাল নিয়ে
গোঙ্গাতে থাকে। খুব শান্ত ভঙ্গীতে তার বাঁ
হাতের কনে আঙ্গুলটি মুঠ করে ধরে তন্ময়। মট্
করে চাপ দিয়ে আঙ্গুলের হাড়টা ভেঙ্গে দেয়।
চাপা স্বরে গোঙ্গানি বেড়ে যায়। একরামুলের দু
চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়তে থাকে।
একটা টু শব্দ করলে এভাবে সবগুলো আঙ্গুল
ভেঙ্গে দেবো। এর পর কপালে ঠেকিয়ে
গুলি। আমার জীবন তো এমনিতেই শেষ। মাদক
ব্যবসার সহযোগী হিসেবে পুলিশ খঁজছে। এর
সঙ্গে একটা খুনের অপরাধ যুক্ত হলে আর
কতোটাইবা বেশি হবে।
তন্ময়ের কথা শুনে চুপ হয়ে যায় একরামুল। একটু
সময় দিয়ে মুখের বাঁধন খুলে দেয় তন্ময়। বড়
বড় শ্বাস নিয়ে হাঁপাতে থাকে একরামুল। বুকটা
হাঁপড়ের মতো উঠানামা করে।
এখন ভালো মানুষের মতো এক এক করে আমার
সবগুলো প্রশ্নের জবাব দাও। প্রথম প্রশ্ন,
পুলিশের কে কে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, তারেক আহমেদ ছাড়া এই
চক্রেও সঙ্গে সাংবাদিক মহলে আর কারা যুক্ত?
তৃতীয় প্রশ্ন, মন্ত্রী ও আমলাদের মধ্যে কারা
এর পেছনে আছে? চটপট উত্তর দাও।
চুপ করে থাকে একরামুল। মুখের ভেতর আবার
রুমালটা গুজে দিয়ে এবার একরামুলের ডান হাতের
কড়ে আঙ্গুল মুঠোয় পুরে তন্ময়। ওঁ ওঁ করে
শব্দ করে দুদিকে মাথা নাড়তে থাকে একরামুল।
রুমালটা সরিয়ে নেয় তন্ময়।
এবার মুখ খোলে একরামুল। তার জানা নামগুলো
একে একে বলে যায়। সবার আগে জানায় নিজের
পরিচয়। তন্ময়ের বুক পকেটে রাখা ডিজিটাল
রেকর্ডারটি সক্রিয় হয়। মেমোরিতে নিয়ে নেয়
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো। বিষ্ময়ের বুঝি আরো বাকি
ছিলো। দু-একটি নাম শুনে মুখটা হা হয়ে যায়
তন্ময়ের। রাগে-ঘৃণায় ফেটে পড়তে ইচ্ছে
করে। তাকে গুটি বানিয়ে কী জঘন্য খেলায়
মেতেছে সম্পাদক!
একরামুলকে ছেড়ে বেরুবার আগে আছড়ে তার
মোবাইল ফোনটি নষ্ট করে দিয়ে যায় তন্ময়।
কোনো বাপের সঙ্গে একরামুল যোগাযোগ
করার আগে অন্তত কিছুক্ষণ সময় পেতে হবে।
বেড়িয়ে আসতে আসতে মনে মনে ভাবে
তন্ময়, যে কোনো বিষয়ে এক্সপার্ট
ওপিনিয়নের কোনো বিকল্প নেই। বোমা
লিটনের বাতলে দেওয়া তরিকা অ্যাপ্লাই করে
এতো সহজে একরামুলের পেট থেকে সবকিছু
বের করা গেছে। লিটনের পরামর্শ ছাড়া ডিপি
পুলিশের এই দুর্নীতিবাজ সদস্যটিকে কোনো
ভাবেই বাগে আনতে পারতো না তন্ময়।
নীল আলো জ্বেলে নি:শব্দে বেজে
উঠে মোবাইল ফোনটি। আমিনুলের ফোন।
সবুজ বোতাম চেপে কলটি রিসিভ করে তন্ময়।
বস্ আপনের সিমটা ভরেন।
কোনো রকমে কথাটা বলেই লাইন কেটে
দেয় আমিনুল। বোকার মতো কিছুক্ষণ ফোনটির
দিকে তাকিয়ে থাকে তন্ময়। ষষ্ঠ ইদ্রিয় সতর্ক
বার্তা পাঠায়; বড় কোনো বিপদে পড়েছে
আমিনুল। দ্রুত মোবাইল ফোনে নিজের সিম
কার্ডটা ভরে অপেক্ষা করতে থাকে তন্ময়।
***********************
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সানডিয়াগোর
বিজনেস স্কুলের মাঠে বসে ল্যাপটপে কাজ
করছিলো জাফর। সামহয়্যারইন ব্লগে এই মাত্র
দেওয়া পোস্টটিতে চোখবুলিয়ে ঘাড়ের কাছে
লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠলো তার। চার দিকে
ঝকঝকে রোদ। মেঘমুক্ত আকাশ। চীর
বসন্তের শহর সানডিয়াগোতে আজকের আবহাওয়া
অত্যন্ত মনোরম। এসব কিছুই চোখে পড়ছে না
জাফরের। বিস্ফোরিত চোখে কম্পিউটার
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বন্ধু তন্ময়ের
অমঙ্গল আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠে জাফরের।
কেমন আছে তন্ময়?
পকেট থেকে সেল ফোনটা বের করে দ্রুত
বোতাম টেপে। মার্কিন মুলুকে প্রত্যেক
বিদেশী ছাত্রকে প্রতিটি পাই-পয়সা হিসেব করে
খরচ করতে হয়। এ মুহুর্তে হিসাবের ধার ধারেনা
জাফর। নিজের মোবাইল ফোন থেকেই
আইএসডি কল করে বসে। মাস শেষে একগাদা
ডলার গুনতে হবে; সেটা গ্রাহ্য করে না।
তন্ময়ের ফোন বন্ধ। জাফরের অস্থিরতা বাড়তে
থাকে।
এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ,
মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালি
ব্লগারদের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে
পড়ে এই পোস্টের তথ্যগুলো।ব্লগকে উদ্ধৃত
করে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাও এ বিষয়ে
প্রতিবেদন প্রচার করে। ভোরের আলো
ঠিকভাবে ফোটার আগেই বাংলাদেশে সরকারের
উচ্চ পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়।
ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে তন্ময়ের।
বাইরে পাখির কিচিরমিচির শুরু হয়েছে। পশ্চিম আকাশ
ফরসা হচ্ছে। মাইকে মুয়াজজিনের সুললিত কন্ঠে
ভেসে আসছে.. .. আসসালাতুল খাইরুল মিনাননাউম..
.. ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।
ল্যাপটপের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজ
গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে তন্ময়। এতোদিন
এই বোমগুলো অবহেলায় পড়ে ছিল! ইস্,
আগে যদি একবার অন্তত কাগজগুলো
উল্টেপাল্টে দেখতো! আবু সাঈদের বাড়ি
থেকে নিয়ে আসা ফাইলটিতে কয়েক জন
উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা,
রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকের নামের তালিকা পাওয়া
গেছে। এদের প্রত্যেকেই মরননেশা ইয়াবার
চোরাই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সবগুলো কাগজ
ঘেটে এর অকাট্য প্রমাণও মিলেছে। কয়েকটি
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা
জমা করতো সাঈদ। ফাইলটিতে ব্যাংকের টাকা জমার
রশিদগুলোও সুন্দরভাবে মাসওয়ারি সাজানো আছে।
টাকার অঙ্ক দেখে মাথা ঘুরে যায় তন্ময়ের। যে
অ্যাকাউন্টগুলোতে নিয়মিত টাকা দেওয়া হতো,
সেসব অ্যাকাউন্টধারীর নাম ভিন্ন হলেও তন্ময়
নিশ্চিত খুব সহজেই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত
আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে এসব
অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের সম্পর্ক আবিষ্কার করা
যাবে।
এর বাইরে ইয়াবা চক্রের হোতাদের পরিচয়
উন্মোচনের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে
তন্ময়ের হাতে রয়েছে ডিবি পুলিশের এসআই
একরামুলের জবানবন্দী। তন্ময়ের জেরার মুখে
তোতা পাখির মতো গড়গড়িয়ে সবকিছু স্বীকার
করেছে একরামুল। সাজানো দুর্ঘটনায় হাফিজুর
রশিদের স্ত্রীকে হত্যা এবং আবু সাঈদকে হত্যার
অভিযোগে রহিমকে ফাসানো, তন্ময়কে ইয়াবা
চক্রের সঙ্গে জড়ানো, গোপন দলিলের
খোঁজে তন্ময়ের বাড়ি ও অফিসে তলাসী এবং
তন্ময়কে ধরার জন্য পুলিশের পাশাপাশি মন্ত্রীর
পোষা সন্ত্রাসী মবিন ও শমসেরকে লেলিয়ে
দেওয়া-- সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা করেছে
একরামুল।
আমিনুলের তোলা ছবিগুলো ব্লগের
পোস্টটিকে সচিত্র করেছে। প্রায় সবগুলোই
সন্ত্রাসী মবিন আর শমসেরের ছবি। তবে
রাতের বেলা মবিন ও শমসেরের নিউজ এডিটর
তারেকের ঘরে প্রবেশ এবং মন্ত্রী পাড়ায়
মন্ত্রীর বাড়িতে দিনে-দুপুরে এই
মানিকজোড়ের আগমনের ছবিও তুলেছে
আমিনুল। এ ছবিগুলো ব্লগে আপলোড করে
দিয়েছে। সাঈদের বাড়ি থেকে আনা ডক্যুমেন্ট
গুলোও দিয়ে দিয়েছে ব্লগে। স্ক্যান করার
সুবিধা নেই বলে এ কাগজগুলোর ছবি তুলে তা
পোস্টেও সঙ্গে জুরে দিয়েছে তন্ময়।
আমিনুলের অত্যাধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরাটা বেশ
কাজে দিয়েছে। আরো আপলোড করেছে
একরামুলের রেকর্ডেড ভয়েস।
বোমা লিটানের দেওয়া একটি অপরিচ্ছন্ন
একচিলতে ঘরে বসে কাজগুলো করেছে
তন্ময়। বিকট শব্দে মাথার উপর তীব্র গতিতে
একটি ফ্যান ঘুরছে। সেটি মোটেও স্বস্তি দিতে
পারছে না। বরং ঘরের গরম বাতাসটিকে আরো
ছড়িয়ে দিচ্ছে। বসে বসে দর দর করে ঘামছে
তন্ময়। গায়ের জামাটি ভিজে চুপচুপে। এখন
ল্যাপটপের দায়িত্ব নিয়েছে বন্ধু ওহিদুল।
তন্ময়ের বক্তব্য টি পেন ড্রাইভে নিয়ে নিচ্ছে।
সকালেই এটি প্রিন্ট করে সবগুলো ছবি এবং
একরামুলের স্বীকারোক্তির সিডির একটি সেট
প্রতিটি পত্রিকা, রেডিও এবং টিভি চ্যানেলের
অফিসে দিয়ে আসবে।
নোংড়া বিছানায় গা এলিয়ে দেয় তন্ময়। এবার
নিজের পরিচয়ে ফেরা যাক। মোবাইলে নিজস্ব
সিমটি ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেটি
বেজে উঠে। নিশ্চই ব্লগে দেওয়া পোস্টের
রিঅ্যাকশন। অদ্ভুত এক অভিমান ভর করে তন্ময়ের
মনে। কেন তাকে সারা দিন প্রাণ ভয়ে পালিয়ে
বেড়াতে হয়েছে? কী অপরাধ ছিলো তার।
হাফিজুর রহিমের মতো সৎ পুলিশ অফিসারের কেন
এই করুন পরিণতি হবে? আপন বড় ভাইয়ের মতো
যাকে শ্রদ্ধা করতো সেই তারেক ভাইয়ের
আসল চেহারাটি এতো কুৎসিত!
সারা দিন সিগারেট আর চা ছাড়া কিছুই জোটেনি।
পেটের ভেতরটা মোচর দিচ্ছে। পুরান ঢাকার
অন্ধকার গলিতে সূর্যেও প্রথম আলো আসতে
শুরু করেছে। ঘুম ঘুম চোখে জানালায় তাকিয়ে
থাকে তন্ময়। আরে, কী আশ্চর্য, জানালায়
দুটো ঘুঘু পাখি এসে বসেছে।
(শেষ)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now