বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হাইপারমেট্রোপিয়ার
রোগী হওয়া সত্ত্বেও
অবসরপ্রাপ্ত
চাকুরিজীবী আব্দুল
কাদের নিজেকে
একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্
ন মানুষ বলেই ভাবেন।
বর্তমান নয় বরং
ভবিষ্যতের কথা
চিন্তা করেই যে
আমাদের কাজ করা
উচিৎ এ কথাও তিনি
পরিচিতজনদের বলে
বেড়ান।
একসময় সকাল হলেই
অফিসে যেতে হত,
ফিরতে ফিরতে
বিকেল কিংবা সন্ধ্যা।
রাতের সময়টা
টেলিভিশন চালিয়েই
কেটে গেছে। অবসরের
পর এখন তিনি দেশ
এবং জনগণের ভবিষ্যৎ
নিয়ে চিন্তা করার
সময় পেয়েছেন। কেমন
করে জাতিকে
সম্ভাব্য অন্ধকারের
থেকে রক্ষা করা যায়
এ নিয়ে তিনি সারাদিন
নানারকম পরিকল্পনা
করেন।
তার দূরদৃষ্টির টানেই
হোক কিংবা বাড়ির
খাবারের লোভেই হোক,
কয়েকজন সঙ্গী
কাদের সাহেবের জুটে
গেছে। এদের
অধিকাংশই স্কুল-
কলেজে পড়া
ছেলেপিলে, প্রায়ই
দেখা যায় কাদের
সাহেব ওদের সাথে বসে
নানারকমের প্ল্যান-
প্রোগ্রাম করার
প্ল্যান-প্রোগ্রাম
করছেন।
মাঝখানে ভেবেচিন্তে
কাদের সাহেব বের
করলেন ভবিষ্যতের
জন্য গাছ লাগানোর
থেকে ভালো কিছু হতে
পারে না। নিজের
বাহিনীকে নিয়ে এক
সপ্তাহের মাঝেই
পাড়ার একটি খালি
জায়গায় তিনি অসংখ্য
গাছ লাগিয়ে ফেললেন।
বেশ কিছুদিন কাদের
সাহেবের এই কাজ
নিয়ে পাড়ার সবাই বাঃ
বাঃ করলো, দুয়েকজন
ফেসবুকে এ খবর
জানিয়ে বেশ
জনপ্রিয়তা কুড়োলো।
তবে দুইমাস পর খোঁজ
করে সেই গাছগুলোর
কোন সন্ধান পাওয়া
যায় নি, জায়গার
মালিক সেখানে নতুন
দালান বানাচ্ছেন কি
না।
সবাই ভাবলো কাদের
সাহেব এই ঘটনার পর
উৎসাহ হারিয়ে
ফেলবেন, কিন্তু
একেবারেই তা ঘটল না।
বরং তার মাঝে নতুন
করে বিদ্রোহী চেতনা
তৈরী হল, তিনি আরও
দ্বিগুণ সময় নিয়ে
চিন্তা ভাবনা করতে
লাগলেন।
এরপর আরও কিছুদিন
চলে গেল। হঠাৎ
একদিন জানা গেল
কাদের সাহেব একটা
বই লিখেছেন। বই
প্রকাশ করার জন্য
পাড়ার শংকর দত্তকে
ধরেছিলেন, তার একটা
পাবলিশিং কোম্পানি
আছে। শংকর দত্ত
পাণ্ডুলিপি পড়ে মানা
তো করেছেনই এমনকি
রীতিমত হুমকি
দিয়েছেন যেন এই লেখা
অন্য কোন
প্রকাশকের চোখে না
পড়ে।
এ কথা শুনে সবাই
অবাক হলো। শংকর
দত্ত নিরীহ চুপচাপ
মানুষ। একটা মাঝারি
প্রকাশনা সংস্থা
চালানোর জন্য যতটুকু
কঠোর হতে হয় তিনি
ঠিক ততটুকুই কঠোর,
এর বাইরে কেউ তাকে
তেমন রাগারাগি করতে
দেখেনি। কাদের সাহেব
তাহলে কী লিখেছেন
যে শংকর বাবু পর্যন্ত
ক্ষেপে গেলেন?
এলাকার মানুষজন
প্রায় প্রতিদিনই
চায়ের আড্ডায় বসেন।
কয়েকজন নিয়মিত,
কারও মাঝে মাঝে দেখা
পাওয়া যায়। সেখানে
পেসমেকার নিয়ে যেমন
আলোচনা হয়, পেস
বোলার নিয়েও
আলোচনা হয়। সেদিন
শংকর দত্ত উপস্থিত
হওয়ার সাথে সাথে
সবাই তাকে ঘিরে
ধরল, “ঘটনা সত্য
নাকি? আপনি নাকি
কাদের সাহেবকে
বলেছেন আবার
আপনার কাছে বই
প্রকাশের কথা বললে
ঠ্যাঙঠুঙ গুড়িয়ে
দিবেন?”
শংকর বাবু হতাশ হয়ে
বললেন, “তা কি বলা
যায় আপনারাই বলুন?
শুধু বলেছি আমার
পরিচিত কয়েকজন
প্রকাশক আছেন তারা
আপনার বই পড়লে
রেগেমেগে পিটুনি দিতে
পারে। তবে আমি বলতে
পারলে ভালোই হতো
বুঝেছেন? লোকটার
মাথা একেবারেই গেছে।
দাড়ান, দেখাই কী
লিখেছে।"
মোবাইলে তিনি
পাণ্ডুলিপির কিছু
কিছু অংশের ছবি
তুলে রেখেছিলেন
প্রমাণ হিসেবে, সেই
ছবিগুলোর একটা দেখে
পড়তে শুরু করলেন,
“এই যে, প্রথম দিকেই
চোখে পড়ে ছিল।
কাদের সাহেব এখানে
লিখেছেন মহাকবি
হোমারের বিখ্যাত
কাব্য ইলিয়াডে
বর্ণিত হয়েছে
গ্রীকদের বদান্যতার
কথা। ট্রোজান
রাজপুত্র প্যারিস
স্পার্টার রাণী
হেলেনকে
ভালোবাসতেন। এই
কথা জানতে পেরে
রাজা মেনেলাউস
হেলেনের সাথে বিবাহ
বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তাকে
তুলে দেন প্যারিসের
হাতে। ট্রয় রাজ্যে মহা
ধূমধামের সাথে
প্যারিস এবং হেলেনের
বিয়ে হয়, তাতে
দাওয়াত দেওয়া হয়
সমগ্র গ্রীসের
যোদ্ধাদের। গ্রীকরা
ট্রোজানদের এই
বিয়েতে একটি বিশাল
কাঠের ঘোড়া উপহার
দিয়েছিলেন।
এরপর……...আর পড়তে
পারছি না। কী এইসব
ভাই? ট্রোজান যুদ্ধের
কাহিনী পাল্টে উনি
বানিয়ে দিলেন বিবাহ
উৎসব!”
রাজপুত্র প্যারিস
হেলেনকে চুরি করে
আনার কারনে পুরো
গ্রীস এক হয়ে
আক্রমণ করে যে ট্রয়
নগরী ছাড়খাড় করে
ফেলেছিল এই কাহিনী
সবারই জানা। যাদের
জানা নেই তারাও খুব
অসন্তুষ্ট হয়ে মাথা
দুলোতে লাগল। শংকর
বাবু বললেন, “এটা কি
শেষ? আমি মার্ক করে
রেখেছি কয়েকটা
পৃষ্ঠা, লাল কালি দিয়ে
মার্ক করে রেখেছি।
এই যে, এটা। উনি
লিখেছেন গ্যালিলিও
যখন আবিষ্কার করেন
সূর্য পৃথিবীর
চারদিকে ঘুরে না তখন
চার্চের যাজকগণ
সবাই মিলে তার জন্য
সংবর্ধনার আয়োজন
করেন। স্বয়ং পোপ সেই
অনুষ্ঠানে উপস্থিত
থাকেন এবং
বিজ্ঞানীদের
গবেষণায় সকল প্রকার
সাহায্য সহযোগীতার
আশ্বাস দেন।"
আরেকটা ছবি বের
করলেন, “মাঝখানে
যেসব ছাইপাশ আছে
সেগুলো বাদ দিলাম।
এইযে এখানে দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধকে কাদের
সাহেব লিখেছেন
দ্বিতীয়
বিশ্বমহাউৎসব।
জার্মান চ্যান্সেলর
হিটলার এবং বৃটেনের
প্রধানমন্ত্রী
চার্চিল নাকি ছিলেন
ঘনিষ্ট বন্ধু। শুধু
কফির দাওয়াত রক্ষা
করতে হিটলার
জার্মানি থেকে বৃটেনে
উড়ে গেছেন এই
রেকর্ড আছে। এরপর
ধরা যাক এই লাইনটা,
হিটলার সাহেব
ইহুদিদের উন্নতির
জন্য ইহুদি জনতা
উন্নয়ন সংঘ প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন।"
এবারও অনেকেই
মিথ্যা ইতিহাস শুনে
খুব রেগে গেলেন।
একজন বললেন, “এটা
একেবারেই ঠিক
হয়নি। হোলোকাস্টকে
অস্বীকার করা
অনেক দেশে দণ্ডগত
অপরাধ। এত বড়
অপকর্মকে উনি এত
সহজে পাল্টে ফেললেন
কেমন করে সেটাই তো
মাথায় আসছে না।”
শংকর বাবু বললেন,
“এটা শেষ নাকি
আপনার ধারনা?
সবচেয়ে বড়
চাপাবাজিটা তো তিনি
করেছেন এই যে
এখানে। লিখেছেন,
দ্বিতীয়
বিশ্বমহাউৎসবের
উপহার হিসেবে
যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে
যে উপহার দিয়েছিল
তা আজও স্মরণীয়
হয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের
বিমানবহর হিরোশিমা
ও নাগাসাকি শহরে
চকলেটের বস্তা
নিক্ষেপ করে।
চকলেটের বস্তা? কত
বড় ফাজলেমি
দেখেছেন? অ্যাটম
বোমা চকলেটের
বস্তা।"
আব্দুল কাদেরকে
এতদিন সবাই বেশ
পছন্দই করতেন,
কিন্তু আজ খুব বেশি
কেউ নিজেকে
সামলাতে পারল না।
সবাই সেদিন প্রাণভরে
তাকে গালিগালাজ
করতে লাগলো এমন
নির্জলা কিছু মিথ্যা
লিখার জন্য।
কয়েকজন বলাবলি
করতে লাগল, কী
কারনে কাদের সাহেব
এই ধরনের কিছু কথা
লিখতে যাবেন? শংকর
বাবুর ভাষ্যমতে তিনি
মানুষের ইতিহাসকে
একেবারে উলট-পালট
করে ছেড়ে দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, পৃথিবীর
নানাদেশের
শাসনব্যবস্থানিয়ে যে
কথাগুলো লিখা আছে
সেগুলো একশভাগ
বানোয়াট। পুরো বইয়ে
প্রশংসা করার মত
একটি মাত্র বাক্য
আছে এবং সেটা হচ্ছে
শেষের বাক্যটি।
একেবারে শেষে কাদের
সাহেব লিখেছেন 'এই
শান্তির পৃথিবী কেউ
যদি ধ্বংস করার
চেষ্টা করে তবে
আমরা নিশ্চিৎ বলতে
পারি সে কাঁঠালপাতা
খায়।"
আব্দুল কাদেরের মাথা
খারাপ হয়ে গেছে এবং
খুব তাড়াতাড়ি তাকে
পাগলা গারদে পাঠানো
হতে পারে এমন কথা
পুরো এলাকায় ছড়িয়ে
গেল। কেউ কেউ বলল
কঠিন ষড়যন্ত্র,
কাদের সাহেব আসলে
আমেরিকান স্পাই।
এতে তার ভক্ত সংখ্যা
যে কমে গেল তেমন নয়।
বরং স্পাই বলে কাদের
সাহেবের কদর দুইদিনে
স্কুলের বাচ্চাদের
কাছে দ্বিগুণ হয়ে গেল।
যাকে নিয়ে এত
আলোচনা তিনি কিন্তু
কোন মুখ খুললেন না।
তবে এবার বই
প্রকাশের চিন্তা
তিনি বাদ দিলেন।
কয়েকদিন পর দেখা
গেল নিজের বাসার
পিছনে লোক লাগিয়ে
অনেক গভীর একটা
গর্ত খুড়ছেন। কেউ
বলল মাথা খারাপের
দ্বিতীয় ধাপ, কেউ
বলল সি.আই.এ.
আন্ডারগ্রাউন্ড ঘাটি
খুলছে।
কয়েকদিন পর সেই
গর্তে একটা কনক্রিট
আর সীসা দিয়ে একটা
বাক্স বানানো হল।
আব্দুল কাদের সাহেব
নিজের বইটি খুব ভাল
কাগজে ছেপে যত্ন
করে সেখানে রেখে
গর্ত বুজিয়ে দিলেন।
পুরো ঘটনার মাথামুণ্ডো
কেউ বুঝতে পারল না।
কেউ কেউ বলল
পাণ্ডুলিপির নামে
গোপন নথিপত্র রাখা
হয়েছে। কিন্তু সে
কথাও বেশিদিন টিকল
না কারন জানা গেল
এলাকার কয়েকজন
বাচ্চার অনুরোধে
তাদের লেখা কিছু
গল্প-কবিতাও সেখানে
রাখা হয়েছে। প্রকাশক
শংকর দত্তর ছোট
ছেলেও একটি কবিতা
লিখেছে যার শুরু
এইভাবে,
'যারা করে প্রশ্ন ফাঁস
পিটাও তাদের বার
মাস।;
আব্দুল কাদের সাহেব
আর কোন বই লিখলেন
না। আস্তে আস্তে এই
ঘটনা সবাই ভূলে যেতে
লাগল। দেড়বছর পর
কাদের সাহেব আবার
যখন বৃক্ষরোপন
কর্মসূচি চালু করলেন
তখন এলাকার সবার
বাড়ি থেকেই কিছু না
কিছু চাঁদা পাওয়া গেল।
দুই.
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি
হয় তবে তা যে কেবল
অস্ত্রের লড়াই হবে
না তা অনেকেই পূর্বে
অনুমান করে গেছেন।
সেই যুদ্ধটা কখনও শুরু
হবে কি না কিংবা
আদৌ শুরু হবে কি না
এই ভবিষ্যৎবাণী
অবশ্য কেউ করে
যাননি।
আস্তে একটা সময় এল
যখন প্রযুক্তির উপর
মানুষের
নির্ভরশীলতা
কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
পৃথিবীর মানুষের খুব
একটা পরিবর্তন
হয়নি, কিন্তু জীবনে
পরিবর্তন হয়েছে।
আস্তে আস্তে
পৃথিবীতে থাকা তেল-
গ্যাস ফুরোতে লাগল।
কিন্তু পারমাণবিক
শক্তিকে ততদিনে
এতটা উন্নত করা
হয়েছে যে জ্বালানি
নিয়ে কারও খুব বেশি
চিন্তা রইল না।
বিজ্ঞানীদের সামনে
বড় ধরনের কোন
আবিষ্কার অপেক্ষা
করছে এই সম্ভাবনাও
দেখা দিচ্ছে। জ্ঞান-
ইতিহাস-সাহিত্য
সংরক্ষণ করার জন্য
আর কাগজের
প্রয়োজন থাকল না,
সারা পৃথিবীতে ছড়ানো
অসংখ্য সার্ভারে
সেগুলো যুক্ত হয়ে গেল।
নেটওয়ার্কে থাকলে যে
কেউ সেগুলো দেখতে
পারে।
কিন্তু মানুষের শক্তি
এবং ক্ষমতার লোভ
গেল না। কেমন করে
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল কেউ
বুঝতেই পারল না। এই
যুদ্ধর শুরু রক্তক্ষয়ী
নয়। একদল
আরেকদলের
তথ্যভান্ডারের উপর
হামলা চালাতে লাগল।
যে বেশি ধ্বংস করতে
পারে সেই জয়ী। হিংসা
কখনোই ভালো কিছু
করতে পারে না। এই
আক্রমণে পৃথিবীর সব
তথ্য আস্তে আস্তে
ধ্বংস হয়ে যেতে শুরু
করল।
যুদ্ধবাজরা
প্রোগ্রামারদের ধরে
কাজে লাগিয়ে দিল।
যুদ্ধ-ধ্বংস-অস্ত্র
সম্পর্কিত সবকিছু
নিরাপদ রাখার জন্য
একদলকে নিয়োগ করা
হল। বাকি সবার কাজ
একটাই, শত্রুকে
আঘাত কর। গল্পগুলো
বাঁচিয়ে রাখার কেউ
রইল না।
যুদ্ধ একবার যখন শুরু
হয় তখন রক্ত
ঝড়াবেই। এতদিন যে
যুদ্ধ ছিল কম্পিউটারে
সীমাবদ্ধ একদিন সে
যুদ্ধ সত্যিকারের যুদ্ধ
হয়ে উঠল।
বিমান উড়ল, বোমা
পড়ল, মানুষ মরল।
আগুন জ্বলে উঠল।
ফিউশানের অতিকায়
শক্তির ব্যবহার
হতেও বেশিদিন লাগল
না। কেউ বাকি রইল
না। আগে একদল
অপরদলকে আঘাত
করেছিল, এবার
ক্ষমতালোভীরা
নিজেরাই নিজেদের
ধ্বংস করতে শুরু করে
দিল। যে মানুষ চিন্তা
করতে পারে সে
মানুষকে বশ করা
কঠিন। সেই চিন্তা
বন্ধ করার ব্যবস্থা
হল। শিল্প-সাহিত্যের
শেষ কণাটুকুও
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল,
বই আর ছবিগুলো পুড়ে
গেল।
মানুষের ইতিহাসে এত
লম্বা, এত ভয়ানক
যুদ্ধ কখনও হয়নি।
পৃথিবীর চেহারা
আস্তে আস্তে পাল্টে
যেতে শুরু করল।
শহরের পর শহর
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
সবার মুখে শুধু একটাই
শব্দ, যুদ্ধ! যারা
এতদিন হাতে রংতুলি
নিয়ে ক্যানভাসে
স্বপ্নের দুনিয়া
এঁকেছে তাদের
তাকিয়ে থাকতে হয়
আক্রমণের ম্যাপের
দিকে। যার সাধনা ছিল
সুরের তাকে পূজা
করতে হল অসুরের।
যার হাতে যত
শক্তিশালী প্রযুক্তি
তার ক্ষমতা সবচেয়ে
বেশি এ কথা ততদিনে
সবাই বুঝে গেছে। তাই
কেবল বিজ্ঞানীদের
তাদের কাজ করতে
দেওয়া হল। কিন্তু
তাদের মহাবিশ্বের
পরিণতির গবেষণা না
করে বলা হল আরও
ভয়ানক অস্ত্র তৈরী
করতে।
অন্য মানুষের কাছে যা
ছিল না সেটা
বিজ্ঞানী এবং
গবেষকদের খুব
সামান্য রয়ে গেল, আর
তা হচ্ছে স্বাধীনতা।
তারা এক হয়ে আস্তে
আস্তে পৃথিবীর সব
বড় বড় গবেষণা গোপনে
সংরক্ষণ করতে শুরু
করলেন। পুরনো
পৃথিবীর বিজ্ঞান
টিকে রইল, এছাড়া যত
সম্পদ মানুষের ছিল তা
ধ্বংস হয়ে গেছে।
মানুষ স্বভাবতই
শান্তি চায়। ইতিহাসে
যতবারই মানুষকে
কোনঠাসা করা হয়েছে
ততবারই বড় কিছু
হয়ে গেছে। যুদ্ধের মোড়
আবার পাল্টাল।
কয়েকজন অস্ত্র
তুলে নিল অন্য
জাতির বিরুদ্ধে নয়
বরং যারা এই
সর্বনাশকে ডেকে
এনেছে তাদের
বিরুদ্ধে। প্রথম দফায়
এই বিদ্রোহীদের খুন
করা হল পতঙ্গদের
মত। কিন্তু দিন দিন
ওদের সংখ্যা বাড়তে
লাগল। এক হাজার
থেকে দশ হাজার, দশ
হাজার থেকে এক লাখ।
যুদ্ধ আরও ভয়ানক
হয়ে উঠল। একসময়
পৃথিবীর জনসংখ্যা যা
ছিল তার ১ শতাংশেরও
কম মানুষ এই যুদ্ধে
লড়াই করতে শুরু
করল।
শেষপর্যন্ত যখন এই
যুদ্ধ শেষ হল তখন
মানবজাতি প্রায়
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
এখানে সেখানে ছোট
ছোট কিছু কলোনি
ছাড়া মানুষের আর
কোন অস্তিত্ব রইল
না। এভাবে কয়েক বছর
গেল, সবাই বুঝতে
পারল এভাবে বসবাস
সম্ভব নয়। তাই
পৃথিবীর প্রায় সব
মানুষ একসাথে হয়ে
নতুন করে সভ্যতা গড়ে
তুলার চেষ্টা করতে
শুরু করল।
তারপর কতদিন গেল
কেউ বলতে পারে না।
হয়তো কয়েক যুগ,
হয়তে কয়েক শতাব্দী।
মানুষ বাঁচার মত একটা
অবস্থা গড়ে তুলেছে।
কিন্তু সেই বেঁচে
থাকায় কোন প্রাণ নেই।
একসময় মানুষ অসংখ্য
কিছু সৃষ্টি করেছে
আনন্দের জন্য, তার
কিছুই আর অবশিষ্ট
নেই। নতুন করে কেমন
করে শুরু করা যায় কেউ
বলতে পারে না। মানুষ
হতাশায় ঢেকে গেল,
সবার মাঝে কোন
উদ্যম উৎসাহ রইল না।
অনেক চিন্তা ভাবনা
করে পৃথিবীর প্রান্তে
প্রান্তে অসংখ্য রোবট
ছাড়া হল মানব
সভ্যতার যাই টিকে
আছে তা উদ্ধার করার
জন্য। খুব বেশি কিছু
পাওয়া গেল না, কারন
সব যে অনেক আগেই
নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
তারপর একদিন মাটির
অনেক নিচের একটা
ছোট সেল থেকে
উদ্ধার করা গেল কিছু
কাগজ। খুব শক্ত করে
তৈরী করা হয়েছিল
বলে সেটা অক্ষতই
রয়ে গেছে।
আমাদের আব্দুল
কাদের সাহেব কিন্তু
বুড়ো হয়ে অনেক
আগেই মারা গেছেন।
তার ভাগ্য ভাল এই
ভয়ানক যুদ্ধ তাকে
দেখে যেতে হয়নি।
তিন.
নতুন পৃথিবীতে অনেক
কিছু বদলে গেছে।
মানুষ এখন আর
বাচ্চাদের নাম নিয়ে
মাথা ঘামায় না। নাম
রাখার প্রোগ্রাম আছে
তার ক্যালকুলেশন
করে একটা নাম দিয়ে
দেয়।
লিডার কুকুরুকু
টাকিটাকি নিজের
অফিসের ব্যালকনিতে
দাড়িয়ে একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মাঝে মাঝে তার মনে
হয় এই নামটা
স্বাভাবিক কোন নাম
নয়। এ পৃথিবী যদি
আগের পৃথিবী হত
তাহলে এ নাম নিয়ে
তাকে অনেক
ভোগান্তি পোহাতে হত।
কিন্তু এখন সত্যিই
মানুষ নাম নিয়ে আর
মাথা ঘামায় না। নাম
রাখার প্রোগ্রাম যা
ঠিক করে দেয় সবাই
তা মেনে নেয়।
আর আধঘন্টা পরই
একটি প্রাচীন
কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানে
যোগ দিতে যেতে হবে।
কুকুরুকু টাকিটাকি
এসব কাজ খুব আগ্রহ
দিয়ে করেন, কিন্তু
আজ তার মন অশান্ত।
আজ খুব ভয়ানক
একটি কাজ তিনি
করতে যাচ্ছেন। এত
বড় অপরাধ আগে
কখনও তার করা হয়ে
উঠেনি। তিনি
নিজেকে সান্ত্বনা
দিলেন এ বলে যে তিনি
সবকিছু পৃথিবীর
ভালর জন্যই করছেন।
দুইবছর আগেও
পৃথিবীর এই অবস্থা
কল্পনা করা যেত?
যুদ্ধের সময়
মানবজাতি পার করে
এসেছে কিন্তু
নিজেদের সাথে যে যুদ্ধ
সেটা কি এত সহজে
বন্ধ করা যায়? একদল
মানুষ যাদের নিজের
বলার মত কিছু নেই,
যাদের কাজ শুধু বেঁচে
থাকা তারা এত সহজে
কি বেঁচে থাকতে পারে?
একটা সময় এল যখন
মানুষ আত্মহত্যা
করতে শুরু করল। সবার
বড় ভয়, আবার না এক
যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
সবার ধারনা মানুষের
ধর্মই যুদ্ধ, অশান্তি
না থাকলে মানুষের
শান্তি নেই। আর এই
ধারনা ভূল কি ঠিক
তাও জানার কোন উপায়
নেই।
ঠিক তখন পাওয়া গেল
এই সময়ের সবচেয়ে
বড় আবিষ্কার, মানব
ইতিহাসের দলিল।
কোন বিচক্ষণ
ব্যক্তি অত্যন্ত
গোপনে এবং নিরাপদে
মানুষের ইতিহাস লিখে
রেখে গিয়েছিলেন, সেই
ইতিহাস এক
অনুসন্ধানী রোবট
খুঁজে পেল। সেই লেখার
ভাষা প্রথমে বুঝা
সম্ভব হয়নি। একসময়
পৃথিবীতে অসংখ্য
ভাষা ছিল। এখন ভাষা
একটাই, আগের
পৃথিবীর অসংখ্য ভাষা
মিশে গিয়ে কখন যে
এমন তৈরী হয়ে গেছে
কেউ টের পায়নি।
কম্পিউটারের
ডাটাবেসে কিন্তু
পুরনো ভাষাগুলো রয়ে
গেছে। জানা গেল সেই
ঐতিহাসিক রেকর্ড
যে ভাষায় লেখা হয়েছে
তার নাম বাংলা।
কম্পিউটার সেই ভাষা
অনুবাদ করে ফেলল,
এবং মানবজাতি
জানতে পারল তাদের
ইতিহাস মোটেও
যুদ্ধের নয়।
পৃথিবীতে আসলে
কোনকালেই
যুদ্ধবিগ্রহ ছিল না,
সবাই শান্তিতে বাস
করত। ইতিহাসের বড়
বড় নেতারা ছিলেন
শান্তিপ্রিয়, তাঁরা
মানুষের কথা চিন্তা
করতেন। যুদ্ধ যা হত
তা কেবল দাবার ছকে।
একজন বিখ্যাত
শান্তিবাদী জর্জ
প্যাটনের ওখানে ছিল
যা কুকুরুকুর এখনও
মনে আছে 'The object
of peace is not to live
for your country but to
make the other live for
his.’
হঠাৎ করে কেন
পৃথিবীতে যুদ্ধ শুরু
হয়েছিল এ কথা বইয়ে
লেখা নেই। তবে একটা
জায়গায় ইঙ্গিত দেওয়া
আছে যে যারা
কাঁঠালপাতা খায়
তাদের সাথে এই যুদ্ধের
গভীর সম্পর্ক আছে।
সেই সম্পর্কটা কেমন
তা কেউ এখনও বের
করতে পারেনি। কিন্তু
মানুষের শহরের
আশেপাশে কাঁঠাল গাছ
এখন লাগানো নিষিদ্ধ।
সেই ইতিহাসের সাথে
ছিল আরও কিছু
অমূল্য কির্তি।
মানুষের তৈরি শিল্প
এবং সাহিত্যের কিছু
অসাধারন নিদর্শনও
সেই মহান ব্যক্তি
সংরক্ষণ করে গেছেন।
তাতে আছে অসাধারন
কিছু ছবি এবং গভীর
কিছু কবিতা। এ
সময়ের মানুষের এ
বিষয়ে ধারনা কম
কিন্তু কবিতাগুলো
পড়ার পর সবারই মনে
হয়েছে এর মানে খুব
গভীর, সাধারন কারও
পক্ষে বুঝা সম্ভব নয়।
কুকুরুকু টাকিটাকি
আবার দীর্ঘশ্বাস
ফেললেন। মানবজাতি
এত সহজে আর একটা
যুদ্ধ শুরু হতে দেবেনা
বলেই তার বিশ্বাস।
কিন্তু তবু একটা ভয়
থেকে যায় যে আবার
কোন অশান্তি শুরু
হবে, আবার মানুষের
সব ইতিহাস নষ্ট হয়ে
যাবে। তখন যদি
কয়েকজন টিকে থাকে
শেষপর্যন্ত তাহলে
হঠাৎ করে মানুষের
বদলে যাওয়া, হঠাৎ
করে রক্তারক্তি শুরু
করার ইতিহাস তাদের
কি ভাল লাগবে?
লিডার কুকুরুকু
একটা উপায় বের
করেছেন। তিনি যা
করতে যাচ্ছেন তা খুব
বড় অন্যায়, কিন্তু
ভবিষ্যৎ পৃথিবীর
মানুূষের জন্য তিনি তা
করবেন। তিনিও ওই
মহান লেখকের মত
মানব সভ্যতার
ইতিহাস লিখে যাবেন।
নিজের মত করে।
কুকুরুকু লিখতে শুরু
করলেন 'মানবজাতি
কখনোই কোন যুদ্ধের
সম্মুখিন হয়নি। এক
ভয়াবহ দূর্ঘটনার
কারনে পৃথিবীর
কম্পিউটারের
ডাটাবেস থেকে যখন
মানবসভ্যতার
ইতিহাস ধ্বংস হয়ে
যায় তখন পৃথিবীর সব
মানুষ এক
হয়ে…………………………….’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now