বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মোহনার দ্বিতীয় জীবন (দ্বিতীয় অংশ)

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান selfiAan Razon (০ পয়েন্ট)

X আচ্ছা, বিকেলে দিও। বলে রাগীব সিগারেট ধরায়। রউফ মিঞা কাপ নিয়ে চলে যায়। লায়লা কে ফোন করে রাগীব । সব ঠিক আছে তো? লায়লা জানতে চায়। এখন পর্যন্ত। কখন? রাত বারোটা। এত দেরি? রাগীব বলল, সি বিচে রাস্তার কাজ চলছে। তাই বারোটার আগে সম্ভব না। তাছাড়া বাড়িতে একজন কেয়ারটেকারও আছে। লোকটা কখন ঘুমাবে কে জানে। লায়লা বলল, ওকে, তার আগেই আমি পৌঁছে যাব। ওকে। ফোন অফ করে মুচকি হাসে রাগীব। লায়লা গত সপ্তাহে এ দিকটা ঘুরে গেছে। ‘নার্গিস ভিলা’ ওর চেনা। রাগীব ধোঁওয়া ছাড়ে। চারপাশে তাকায়। দিনের আলোয় বাড়িটা এখন স্বাভাবিক লাগছে। ইয়াসির ওর বউ লীনা কে নিয়ে এসেছিল এ বাড়িতে । বাথটাবে লাশ দেখেছিল লীনা । লাশটা কি সেই সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ীর ছেলের? এসব কথা অবশ্য মোহনাকে বলেনি রাগীব। মোহনা ভয় পেলে আসত না। আজ রাতেই মোহনা সমস্ত ভয়ের উর্ধে চলে যাবে। মোহনা বাথরুমে ঢুকে থমকে গেল। বিশাল বাথরুম। ওপরে বড় ভেন্টিলেটার। উজ্জ্বল রোদ এসে পড়েছে পুরনো আমলের ঘিয়ে রঙের বাথটাব-এর ওপর। রোদে তিরতির করছে পানি। নগ্ন হয়ে বাথটবে নামে মোহনা। আহ্ । এখন একা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে। কাঁদতে পারবে বলে ভালো লাগছে। ইজাজের জন্য কাঁদবে । আজ ইজাজকে দেখল। কতদিন পর দেখল ... নিজের জন্যও কাঁদবে মোহনা। মাত্র ছ-মাস হল বিয়ে হয়েছে ওর। এরই মধ্যে রাগীব অনেক বদলে গেছে। রাগীব আর আগের মতো ওর প্রতি আকর্ষন বোধ করে না। মোহনা ঠিকই টের পায়। রাগীব আজ বাথরুমে এল না। অথচ বিয়ের পর ... আজকাল আর সেভাবে স্পর্শ করে না। রাগীবকে কেমন ক্লান্ত মনে হয়। কারও সঙ্গে জড়িয়েছে রাগীব? প্রমান নেই অবশ্য । লুকিয়ে রাগীবের মোবাইল চেক করেছে মোহনা । অপরিচিত কোনও মেয়ের নম্বর তো নেই। তাহলে? আজ সকাল থেকে লং জার্নি হয়েছে। দুপুরে খেয়ে ওরা ঘুম দিল। চারটের দিকে মোহনার ঘুম ভেঙে যায়। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দোতলার টেরেসে এসে বসল। বাতাসে শীত আছে। শাল জড়িয়ে নেয় মোহনা। অপরাহ্নের সমুদ্র চিকচিক করছে । বালিয়ারিতে ট্রাক। আর্মির লোকজন। হলুদ ক্যাপ পরা কয়েকজন চিনাও রয়েছে। সৈতকের ওপর দিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ রাস্তা তৈরি করছে। রেললাইন হলে অবশ্য বেশ হত। সাগর দেখতে দেখতে যাত্রী কুউউ ঝিকঝিক রেলে চড়ে টেকনাফ পৌঁছে যেত। রউফ মিঞা চা নিয়ে আসে। মোহনা অবাক। আমি যে এখানে তা লোকটা কী ভাবে জানল? রউফ মিঞা নীচে থাকে। আমি টেরেসে বসেছি এক মিনিটও তো হয় নি। আশ্চর্য! লোকটাকে দেখলে কী রকম ছমছমে অনুভূতি হয়। তবে লোকটার রান্না ভালো। আজ দুপুরে খিচুরি আর ঝাল-ঝাল মুরগীর মাংস রেঁধেছিল। রাগীবও প্রশংসা করল। রাগীব সহজে রান্নার প্রশংসা করে না। চায়ের কাপ নিল মোহনা। তারপর জিগ্যেস করল, এই বাড়িতে আপনি একা থাকেন? রউফ মিঞা বলল, হ। কন্ঠস্বর কেমন খসখসে। ভয় করে না? রউফ মিঞা মাথা নাড়ে। হাসে। আপনি বেশ সাহসী। আমি একা থাকতে পারব না। মোহনা বলে। রউফ মিঞা চুপ করে থাকে। এক তলায় বসার ঘরে একটা মেয়ের ছবি দেখলাম। ছবিটা কার জানেন? বলে চায়ে চুমুক দেয় মোহনা। রউফ মিঞা বলে, হ। ছবিটা হইল আরশাদ চৌধরির মেয়ে নার্গিসের। আরশাদ চৌধরি জালিয়া পালং-এর খানদান বংশের সন্তান। তার বাপ-দাদারা বিস্তর জমিজমার মালিক। একমাত্র মেয়ে নার্গিসের বিয়ার আগে মেয়ের জামাইরে যৌতুক দিব বইলা মেয়ের নামে আরশাদ চৌধরির এই বাড়ি তৈয়ার করেন । এইসব হইল পাকিস্তান আমলের ঘটনা। ওহ্।মোহনার বিকেল আর সন্ধ্যা কাটল রাগীবের সঙ্গে বাড়ির ছাদ আর বাগানে ঘোরাঘুরি করে। রউফ মিঞার কাছ থেকে নীচে গেটের চাবি নিয়ে রাখল রাগীব। রাতে খেয়ে এসে টেরেসে বসল। নভেম্বরের মাঝামাঝি বলেই ফুটফুটে জোছনা ফুটেছে। চারপাশ নির্জন হয়ে আছে। পাশাপাশি বসে অনেকটা সময় কাটে। রাগীব ঘড়ি দেখে। প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। বলে, চল, বিচে যাই। চল। বলে মোহনা উড়ে দাঁড়ায়। রউফ মিঞা এসে দাঁড়াল। বলল, স্যার। কি হল? রাগীব বিরক্ত হয়। একবার নীচে আসেন সার। কেন? কি হয়েছে? গেটের বাইরে কার জানি লাশ পইড়া আছে। লাশ! কার! মোহনা আর্তচিৎকার করে ওঠে। চিনিনা সার। মহিলা মানুষ সার। আপনে যদি একবার আসতেন। মহিলা শুনে রাগীবের মুখের ভাব কেমন বদলে গেল । ওরা দ্রুত নীচে নেমে এল। নীচের বাগান চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল। যেন সার্চ লাইট জ্বেলেছে। তবে কুয়াশাও আছে। গেট খোলা। কুয়াশায় সাদা রঙের টয়োটা আভানজা ঠিকই চিনতে পারল রাগীব। ভয়ানক চমকে উঠল । লায়লার গাড়ি । লায়লা কোথায়? রাগীব দৌড়ে যায়। গাড়ির পাশে শিশির ভেজা ঘাসের ওপর পড়ে আছে লায়লা। পরনে জিন্স। সোয়েটার। দেখেই মনে হল ডেড। ফ্যাকাশে মুখে চাঁদের আলো সরাসরি এসে পড়েছে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই। শ্বাসরোধ করে। জিভ বেরিয়ে আছে। কিন্তু কে ওকে খুন করল? রাগীব, পুলিসে ফোন কর । প্লিজ। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মোহনা বলে। না। কেন? মোহনা অবাক। পুলিস এলে ঝামেলা হবে। রাগীব বলল। রাগীবকে কেমন অস্থির আর উদ্ভ্রান্ত লাগছে । হঠাৎ রাগীব মেয়েটির নিষ্প্রাণ দেহের ওপর পড়ে কাঁদতে থাকে। বারবার বলে, আমায় ক্ষমা কর লায়লা। আমায় ক্ষমা কর । মোহনা স্তব্দ হয়ে যায় । মনে হল পায়ের তলার মাটি থরথর করে কাঁপছে। তীক্ষ্ম কন্ঠে প্রশ্ন করে, তুমি ওকে চেন? হ্যাঁ। চিনতাম বলে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় রাগীব। তারপর চোখের পলকে টয়োটা আভানজায় উঠে স্টার্ট নেয়। দেখতে দেখতে গাড়িটা কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। মোহনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ওর আর এ জীবনে আমার সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস হবে না। হঠাৎ মুক্তি পেয়ে গাঢ় ক্লান্তি বোধ করে মোহনা। রউফ মিঞার দিকে তাকালো। তারপর লায়লার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে মোহনা বলল, আপনি খালি খালি ঝামেলায় পড়লেন। রউফ মিঞা মাথা নেড়ে বলে, না আফা, কুনও ঝামেলা হইব না। লাশটাস এইহানে বেশিক্ষণ থাকব না। কেন? মোহনা অবাক। মহিলারে যে মারছে লাশ হেই সরাই ফেলব। আপনি তাকে কখনও দেখেছেন? রউফ মিঞা বলে, হ মাঝে মাঝে ত দেখি। অনেক দিন ধইরা এই বাড়িত আছি। না দেইখা পারি? আপনার কোনও ক্ষতি করে না? না। আমার ক্ষতি করব ক্যান? যাগো মন পরিস্কার তাগো তারা ক্ষতি করে না। আমি কি কারও খুন করার বুদ্ধি করি নি? এ বাড়িতে কে থাকে ? প্রশ্নটি না-করে পারল না মোহনা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রউফ মিঞা বলল, আরশাদ চৌধরির মেয়ে নার্গিস। মোহনার শরীর জমে ওঠে। শীতের মধ্যেও ঘামতে থাকে। কি হয়েছিল? রউফ মিঞা বলে, নার্গিস বিয়ার পর এই বাড়িত থাকত। বিয়ার পর নার্গিসের স্বামী এই বাড়িতেই এক দাসীবান্দির লগে মইজা যায় আর কি । বলে মুখ ফিরিয়ে নেয় রউফ মিঞা। তারপর বলে, সেই খানকির পুতে নার্গিসকে খুন করে। বলে থুঃ করে থুতু ফেলে রউফ মিঞা।মোহনা চমকে ওঠে। এক নিমিষে ওর কাছে সব পরিস্কার। ছোট্ট শ্বাস ফেলে ও। তারপর দূরের ধূসর কুয়াশার দিকে তাকিয়ে মোহনা ভাবল: এই সব ঘটনা কে যেন সাজিয়ে রেখেছে। আড়াল থেকে দেখছে। নইলে ইজাজ কেন উখিয়ার জালিয়া পালং -এ থাকবে? মোহনা কি মনে করে দোতলার দিকে তাকায়। বারান্দায় কে যেন দাঁড়িয়ে। একটা মেয়ে । ধবধবে চাঁদের আলোয় স্পস্ট দেখা যায়। যাকে আজ দুপুরে একতলায় ড্রইংরুমের ছবিতে দেখেছে। শাড়ি পড়া। মোহনার শরীর কেঁপে ওঠে। রউফ মিঞা বলে, আপনে এখন সোজা নীচের দিকে হাঁটতে থাকেন আফা। যারে দেখবার চান তার লগে আপনের দেখা হইয়া যাইব। মোহনা ভীষণ চমকে ওঠে। আপনি ...আপনি কি ভাবে জানেন? খসখসে কন্ঠে রউফ মিঞা বলে, আমি আরশাদ চৌধরির দাদার আমল থেইকাই এই জায়গায় থাকি। মোহনার শরীর কেঁপে ওঠে। কাঁপা কাঁপা স্বরে জিগ্যেস করে, আপনার .. আপনার বয়স কত? আমার বয়ষ অনেক। এইসব কথা অখন থাউক । আপনি অখন যান। খসখসে কন্ঠে রউফ মিঞা বলে। মোহনা এলোমেলো পায়ে হাঁটতে থাকে। ইজাজ-এর মুখটা ভেসে উঠছে বারবার । শেষবার দেখা হওয়ার সময় ইজাজ বলেছিল: তোমাকে আমি খুঁজব মোহনা। সারা জীবন। তোমার আমার বিরহ সাময়িক। এর অন্য কোনও মানে আছে ...একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে। কথাটা শুনে মোহনা কেঁপে উঠেছিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ভোর হয়ে যায়। জীবনে এই প্রথম নিজেকে নির্ভার লাগছে মোহনার । হাঁটতে-হাঁটতে ও প্রায় বড় রাস্তার প্রায় কাছাকাছি চলে এল। হর্ন বাজিয়ে মহাসড়কে একটি ট্রাক চলে যায়। কুয়াশায় ডিজেলের গন্ধ মিশে আছে। স্কুলের কাছে চলে আসে মোহনা। মাঠ এখন কুয়াশায় ঢেকে আছে। স্কুলের বাইরে চায়ের স্টলটি বন্ধ। ... কুয়াশার ভিতর কে যেন হেঁটে হেঁটে আসছে। লম্বা। ঝুঁকে-ঝুঁকে হাঁটছে। গায়ে চাদর। শ্যামলা। মুখে চাপ দাড়ি। চোখে চশমা। ইজাজ? মোহনা জানে ইজাজ ভোরবেলা হেঁটে বেড়াতে ভালোবাসে। তখন যে অনুভূতি হয় ... সে অনুভূতিই শব্দরূপে ‘অরণ্য ও সমুদ্রের দিনলিপি’ বইয়ে ঠাঁই পায়। ... পৌঁছে বুক ভরে শ্বাস নিল ...


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now