বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রাকপুরুষের চশমা-১২ (শেষ)

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ¤¤¤ প্রাকপুরুষের চশমা ¤¤¤ (শেষ পর্ব) লিখেছেনঃ সানজিদা সুলতানা সুমা। আরিফ অনেক কষ্টে টলতে টলতে বেডরুমে ফোনের কাছে যায়। তারপর কন্ট্রাক্ট লিস্ট খুজে ছেলেকে ফোন দেয়। কয়েকবার ফোন বাজতেই ছেলেটা ওপাশ থেকে রিসিভ করে, সজীব: "আসসালামুয়ালাইকুম বাবা। কেমন আছো?" আরিফ: "এইতো রে খোকা, আছি ভালই। তুই কেমন? " সজীব: "আমিও ভালই আছি, আম্মু কি করেন? " আরিফের আর তর সয় না। এ সব কেমন আছেন, কি করেন এসব প্রশ্নে ও বরং বিরক্ত হয়। কিন্তু তবুও ছেলেকে সেটা বুঝতে দেয় না। আরিফ: "ও তো রান্নাঘরে, লাঞ্চ বানাচ্ছে। ওর সাথে পরে কথা বলবি, কেমন? আগে আমার জরুরি কটা প্রশ্নের জবাব দে তো।" সজীব: "কি প্রশ্ন বল!" আরিফ: "১৯৭২ সালে আলফ্রেড পেলনস্কি নামের এক ডাক্তার তোদের ওখানে কাজ করতো। ওখানে কাজ করার সময় ও একটা স্কান্ডালে জড়িয়ে যায়। আমি ওর সম্পর্কে আগা গোড়া সকল তথ্য জানতে চাই।" সজীব: "ওটা তো অনেক আগের ঘটনা। এসব তো আমার জানার কথা না।" আরিফ: "তারপরেও রেকর্ড পাতি ঘেটে তুই যদি একটু খুঁজে দেখতি রে খোকা তো আমার খুব উপকার হত।" সজীব: "ঠিক আছে, ভেবো না। আমি তোমাকে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ফোন ব্যাক করে জানাচ্ছি। এখন রাখি। ডিউটিতে যেতে হবে।" আরিফ: "মরিয়া হয়ে বলে, "আরে শুনশুন, ওর বিরুদ্ধে একটা নার্সও সাক্ষি দিয়েছিলো। আমি ওর সম্পর্কেও জানতে চাই।" সজীব: "ঠিক আছে। একটু পরে লাঞ্চ আওয়ারে আমি সব ডকুমেন্টারি ঘেটে দেখবো, ওদের ব্যাপারে কি পাওয়া যায়।" আরিফ: "আরেকটা কথা। তোর মা কে বলিস না আমি এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি। সময় হলে আমিই ওকে জানাবো। ঠিক আছে? " সুজীব: "ওকে বলব না। এখন রাখি। ভাল থেকো।" সজীব দ্রুত ফোনটা কেঁটে দিলো। আরিফের মনে হল ছেলেটা কেমন যেন প্রফেশনাল টাইপের হয়ে গেছে। ঠিক যেন সেই উকিল মিঃ জোন্সের মতো। ভাবলেশহীন কথাবার্তা আর সবকিছুতেই তাড়াহুড়া। ব্যাপারটা মোটেও ভাল লাগে না ওর। ও দিকে সুজানা কিচেনে ব্যাস্ত থাকায় এসবের কিছুই টের পায় না। আজ ও পায়েশ রেঁধেছে সাথে ডিমের পুডিং। আরিফ ছোটবেলা থেকেই পায়েশের প্রতি আসক্ত। এমনিতেই ও সারাদিন বাহিরে বাহিরে থাকতো কিন্তু যেদিন বাড়িতে পায়েশ রান্না হতো সেদিন আর ও ঘর ছেড়ে বেরুতোই না। চাতক পাখির মতো রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে থাকতো, কখন পায়েশ চুলা থেকে নামবে আর ও তাতে ঝাপিয়ে পড়বে। ছোটবেলার কথা ভেবে হাসি পেল সুজানার। পায়েশের সুখবরটা বুড়োটাকে একবার জানিয়ে আসা উচিৎ। বার্ধক্যে ঘ্রাণশক্তি নিঃশেষিত হওয়ায় ও হয়তো পায়েশের মৌ মৌ সুগন্ধটা এখনো পায় নি। স্টোভের আগুনটা কমিয়ে সুজানা কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে। প্রথমেই খোঁজ নেয় ড্রয়িংরুমে। বুড়োটা তো ওখানেই ছিল এতক্ষণ। কিন্তু এখন গেল কোথায়? সুজানার বুকটা ধক করে উঠে। আরিফ ফের সানগ্লাসটা লাগিয়ে বসে পড়লো না তো? দ্রুত ও বেডরুমের দিকে ছুটে যায়। আচ্ছা, ও কি এখন গতকালের মতই বেলকনিতে বসে আছে? সুজানা যখন বেডরুমে ঢুকলো আরিফ তখন কথা শেষে ফোনটা রেখে দিচ্ছিলো। তা দেখে সুজানার চোখে সন্দেহ ডানা বাধে। লুকিয়ে লুকিয়ে কার সাথে কথা বলছিলো বুড়োটা! ওকে দেখেই ফোন রেখে দিল কেন ও। সুজানা সন্দেহটা চেপে রেখে বলে, "এই শুনছিস! কোথাও বেরিয়ে যাসনে আজ। তোর জন্যে পায়েশ রাঁধছি। বেরিয়ে পড়লে আমি একাই সবটা খেয়ে নেব।" আরিফ: "আচ্ছা। খেয়ে নিস।" এই মুহুর্তে সুজানার আকর্ষিক উপস্থিতিটা মোটেও আশা করেনি আরিফ। বুড়িটার সামন থেকে পালাতে পারলেই যেন বাঁচে ও। তাই একটা দায়সারাভাবে জবাব দিয়ে বেলকনিতে সটকে পড়লো। পায়েশের লোভ এত সহজে ত্যাগ করা আরিফের স্বভাব বিরুদ্ধ। কিছু একটা গড়মিল হয়েছে ওর। সুজানার চোখে ব্যাপারটা স্পষ্ট ধরা পড়ে। কিন্তু ও জানে না গড়মিলটা ঠিক কি নিয়ে হয়েছে। হতাশ সুজানা বেডরুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে ফিরে যায়। ততক্ষণে অল্প আঁচে পায়েশটা প্রায় হয়ে এসেছে। সামান্য দারুচিনি আর এলাচি ছিটিয়ে ওটাকে চুলো থেকে নামিয়ে নেয় ও। তারপর পুডিং সহ টেবিলে পরিবেশন করে। সুজানা: "টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। পারলে খেয়ে নিস।" সুজানার হাঁক শুনেই আরিফ তরতরিয়ে নেমে আসে। কিছুতেই সুজানার মনে সন্দেহ জাগাতে চায় না ও। কিন্তু ও তো আর জানে না বুড়িটা আগে থেকেই সবকিছু আঁচ করে বসে আছে। খেতে খেতেই সুজানা প্রশ্ন করে, "খানিক আগে কার সাথে কথা বলছিলি? খুব জুরুরী ফোন ছিল বুঝি।" খাবার টেবিলে মাথা নিচু করে নিরবে খেয়ে যাচ্ছিলো আরিফ। সুজানার প্রশ্ন শুনে ওর গলায় খাবার আটকে যায়। প্রচন্ড ভিষম খায় ও। সুজানা ওকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয়। পানি খেয়ে কিছু শান্ত হয়ে আরিফ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে "এক পুরনো বন্ধু ফোন দিয়েছিলো। তুই চিনবি না।" ওর বা চোখের পিটপিটানোই সুজানাকে বলে দেয় যে ও মিথ্যা বলছে। কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন যে আজ বুড়িটা ওকে সত্য বলতে চাপাচাপি করে না। বাকিটা সময় নিরবেই লাঞ্চ সারে ওরা দুজন। আজ লাঞ্চ শেষে আরিফ আর সুজানাকে থালাবাসন ধুতে সাহায্য করে না। বরং তাকে উপেক্ষা করে বেডরুমে যেয়ে ফোনটার পাশে বসে থাকে। সজীবের কলের অপেক্ষায়। ওদিকে সুজানা একা একা থালা বাটি ধুতে ধুতে ভাবে বুড়োর হয়তো মানসিক কোন সমস্যা হয়েছে। ছেলেটার সাথে এ নিয়ে একবার গোপনে কথা বলতেই হবে। যেকোন রোগ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই চিকিৎসা করালে সেরে উঠার সম্ভাবনা বেশী থাকে। কিচেনের কাজ শেষ করে সুজানা বেডরুমে ফেরে। আরিফও সেখানেই ফোনের অপেক্ষায় বসে ছিলো। সুজানা রুমে ঢুকতেই আরিফের হার্টবীট বেড়ে যায়। কুটনি বুড়িটা চলে এসেছে জ্বালাতে। আরিফ কেবল মাথা নিচু করে বসে বসে আশা করতে থাকে বুড়িটা শিঘ্রই এখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু সুজানা যায় না। বরং ক্লান্ত শরীর টা বিছানায় এলিয়ে দেয়। অগত্যা আরিফই উঠে বেলকনিতে চলে যায়। প্রিয় ইজি চেয়ারে বসে সাগর দেখতে থাকে ও। পকেটের সানগ্লাসটায় একবার হাত বুলিয়ে নেয়। কিন্তু বুড়ির উপস্থিতিতে ওটা চোখে পড়ার সাহস হয় না। সহসাই ফোনটা বেজে উঠে। আরিফ বেলকনি ছেড়ে হুড়মুড় করে বেডরুমে ঢুকে কলটা রিসিভ করতে। কিন্তু ততক্ষণে বুড়িটা ফোন ধরে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে। সুজানা: "হ্যালো খোকা, কেমন আছিস রে তুই? এখন তো আর নিয়মিত ফোন দিস না। বুড়ো মা বাবা কে ভুলে গেছিস না কি? আরিফ দাড়িয়ে দাড়িয়ে ওদের কথা শুনছে। অপাশ থেকে সজীব কি যেন বলে। সেটা শুনে সুজানা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। সুজানা: "কি! মায়ের সাথে কথা বলতে চাও না? বাপের খুব দরদি হয়েছো তাই না? তা তো হবেই। তোর বাপটা যা শুরু করেছে শিঘ্রই ওকে তোদের ওখানে পাঠাতে হবে যে। তখন বাপ বেটা এক সাথে পাগলামি করবি। আমি দেখবো ও না, বাধাও দেব না,,, উজবুক ছেলে কোথাকার, ,,,,,," রেগেমেগে সুজানা আরো কিছু বলতে চাইছিলো। কিন্তু আরিফ ওর হাত থেকে ফোনটা ছো মেরে ছিনিয়ে নেয়। আরিফ: "এই সুজানা, কি শুরু করলি ছেলেটার সাথে। দেখি ফোনটা দে তো আমায়,,,," ছেলের উপর ঝালটা মেটাতে না পেরে সুজানা আরিফের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। আরিফ সেদিকে ফিরেও তাকায় না। এক নাগাড়ে ছেলের সাথে কথা বলতে থাকে। সজীব: "কি ব্যাপার আব্বু? আম্মুর সাথে ঝগড়া করেছো না কি? " আরিফ: "তোকে কে বলেছে? " সজীব: "কে বলবে আবার। অনুমান করে নিয়েছি। তোমার কাছে ফোনটা দিতে বলায় যা ঝাড়ি দিলো না। তার পরেও কি আর বুঝতে বাকি থাকে যে আম্মু তোমার উপর প্রচন্ড খেঁপেছে।" আরিফ গলাটা নামিয়ে আস্তে করে বলে, "তুই তো জানিস, তোর মায়ের মাথায় একটু সিট আছে। কথায় কথায় রেগে যায়। ওকে রাগানোর জন্যে আবার ঝগড়া করা লাগে না কি? " সজীব মৃদু হেসে বলে, "তাও ঠিক। আম্মুর রাগটা একটু বেশীই। সেজন্যেই তো এতো দুশ্চিন্তা। বুড়ো বয়সে বেশী রাগ করলে হাইপারটেনশন, হার্ট আট্যাক, নিউরোজেনিক শক,,,,,,,,,," সজীব তার সভাব সুলভ ডাক্তারি বিদ্যার রেলগাড়ি ছোটাতে যাচ্ছিলো। কিন্তু আরিফ স্টেশন পেরুতে না পেরুতেই রেলগাড়ির শেকল টেনে দেয়। আরিফ: "হয়েছে রে খোকা হয়েছে। এবার ওসব বাদ দে। এখন বল আমার কাজটা কতদুর হল? আলফ্রেডের সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছিস।" সজীব: "হা বাবা। আলফ্রেড ডুকান্ডার পেলনস্কি নামের একজন সাইকোলজিস্ট ১৯৭২ সালে আমাদের ওখানে কাজ করতো। ১৯৩৭ সালে ও সার্জন হিসেবে ওয়ারশো ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়ন্স থেকে ডাক্তারি পাশ করে। তারপর ১৯৩৯ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ও পোলিশ রেজিস্টান্টের প্যারামেডিক ইউনিটে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষে তার অসাধারণ অবদানের জন্যে তাকে পোলিশ সরকার স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।" আরিফ: "যুদ্ধে ওর ভুমিকাটা আমি ভাল করেই জানি। কিন্তু এর পরে কি হলো? " সজীব: "যুদ্ধ শেষে ও ফের ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। সাইকোলজিতে দু বছরের পোস্ট গ্রেডুয়েশন ডিপ্লোমা করে ও। তার পরপরই আমাদের এখানে যোগ দেয়।" আরিফ: "তারপর কি হল? " সজীব: "বলছি বাবা বলছি। একটু দম তো নিতে দাও। আমাদের এখানে ও ১৯৭২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত কাজ করেছে। একটা দিন ও ছুটি নেয় নি। বলতে পারো ছুটি না নেওয়ার প্রতিযোগিতায় বিশ্বরেকর্ড গড়েছে ও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের নিয়ে কাজ করতো আলফ্রেড।" আরিফ: " তোদেরটা ওটা তো সাইকোলজিক্যাল ফ্যাসিলিটি? কেবল মানসিক ভারসাম্যহীনদেরই তো ওখানে থাকার কথা। যুদ্ধাহতদের নিয়ে আলফ্রেড ওখানে কাজ করতে যাবে কেন? " সজীব: "সেটাই তো বলতে চাচ্ছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেনারেলাইজড পেইন কিলার হিসেবে মরিফিন ব্যবহার করা হত। অনেক আহত সৈন্যকেই বেদনানাশক হিসেবে মরিফিনের হাই ডোজ লম্বা সময় ধরে দেওয়া হত। পরে ব্যাথা সেরে গেলেও মরিফিনের প্রতি এদের আসক্তিটা থেকেই যায় ওদের। যুদ্ধের পরপরই এমন শতশত মরিফিন আসক্ত আমাদের এখানে ভর্তি হয়। ডাক্তার আলফ্রেড ওদের একে একে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে দেন। ১৯৭২ সালে ওর স্কান্ডালে জড়িয়ে পড়ার আগ মুহুর্তে ও সেই আসক্তদের সংখ্যা কে কয়েকশো থেকে মাত্র তিন জনে নামিয়ে এনেছিলো। চিকিৎসা জগতে এ এক অভাবনীয় সাফল্য!" ২১, ২২ ও ২৩ তম সেলে থাকা রোগিদের উদ্ভট আচরণের কারণটা এবার আরিফের কাছে উদ্ভাসিত হয়। ওরা শেষ তিন হতভাগা মরিফিন আসক্ত। আলফ্রেড যদি আরো কিছুদিন এদের উপর কাজ চালাতে পারতো তো হয়তো এরাও অন্যদের মতো সুস্থ হয়ে উঠতো। সজীব কথা চালিয়ে যায়। সজীব: "সব মিলিয়ে ভালই চলছিলো দিনকাল। কিন্তু ১৯৭২ সালে হঠাৎ একটা ভুল করে বসে আলফ্রেড। একটা আসক্ত মেয়েকে অজ্ঞান অবস্থায় যৌন হয়রানি করে ।সে দিনের আগ পর্যন্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব ছিলো ও। তারপর হঠাৎ করেই আমাদের লজ্জাতে পরিণত হয়। সে ঘটনায় আমাদের প্রতিষ্টানের মান সম্মান সব ধুলায় মিশে যায়। বিশেষ করে তৎকালীন এক উদীয়মান দৈনিকে সে ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন ছাপানোর পর থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে রোগি আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুবছর আমাদের ফ্যাসিলিটিটা বন্ধ পড়ে থাকে।" আরিফ: "তারপর কি আলফ্রেডেকে জেল খাটতে হয়েছিলো? কত বছরের সাজা হয়েছিলো ওর? " সজীব: " ওর আসলে কোন সাজাই হয় নি। বলতে গেলে ও আদালতকে সাজা দেওয়ার সুযোগই দেয় নি। বিচার চলাকালীন সময়েই ওকে কয়েদখানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ও কিভাবে মারা গেল সেটা জানা যায় নি। সে তখন ষাটউর্ধ বৃদ্ধ ছিলো। বিয়ে শাদী করে নি। তাই কেউ ওর মৃত্যু নিয়ে মাথাও ঘামায় নি। আপন বলতে ওর এক ভাই ছিলো, কিন্তু লোক লজ্জায় সে ভাই টি ও তার সাথে যোগাযোগ রাখে নি। ওর লাশটা বেওয়ারিশ হিসেবেই কারাগারের সিমেট্রিতে দাফন করে দেওয়া হয়।" সাংবাদিক নামক একটা জানোয়ারের জন্যে পোল্যান্ডের এক জাতীয় বীরের এমন করুণ মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারে না আরিফ। কপোল বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে ওর। তাৎক্ষণাত নিজেকে সামলে নিয়ে ফের সজীবের সাথে কথা চালিয়ে যায় ও। আরিফ: "আর ওই সাক্ষি নার্সটার ব্যাপারে জানতে পেরেছিস কিছু? ও কি এখনো বেঁচে আছে? " সজীব: "ওই মহিলার নাম ছিল সুসান। বেশ সুন্দরী যুবতী ছিল ও। কথিত আছে সে বুড়ো আলফ্রেডের প্রেমে পড়েছিলো। কিন্তু ওর অপরাধটা কখনোই মেনে নিতে পারেনি সুসান। প্রিয়তমের বিরুদ্ধে কোর্টে সাক্ষি দিয়েছিলো সে। তারপর আলফ্রেডের মৃত্যুর পরদিন সেও ফ্যাসিলিটির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। ওর ব্যাপারে আর বেশী কিছু জানতে পারিনি।" এবার আরিফের কাছে সম্পুর্ণ ব্যাপারটাই স্বচ্ছ ঝর্ণার পানির মতোই পরিষ্কার হয়ে যায়। আলফ্রেড একটা নার্সকে ভালবাসতো যে কি না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের হাতে ওর চোখের সামনেই মারা যায়। তারপর ও আর কোন সম্পর্কে জড়ায় নি। রোগিদের সেবায় ডুবে থেকেই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছে । ১৯৭২ সালে সাইকোলজিক্যাল ফ্যাসিলিটিতে কাজ করার সময় সুসান নামক আরেকজন নার্স ওর প্রেমে পড়ে। বয়সে বৃদ্ধ হলেও আলফ্রেডের পর্বত প্রমাণ ব্যাক্তিত্ব তরুনী সুসানকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে। মনে মনে বুড়োটাকে ভালবেসে ফেলে ও। কিন্তু আলফ্রেড ওকে খুব সম্ভবত প্রত্যাক্ষাণ করে। এতে প্রচন্ড মনোক্ষুন্ন হয় সুসান। ধুর্ত আন্দ্রে সেই সুযোগটাই কাজে লাগায়। ও সুসানকে ফুসলিয়ে আলফ্রেডকে ফাঁসানোর ফাঁদ বানায়। সুসানের সহায়তায় ও ফ্যাসিলিটির ভেতরে ঢুকে সেদিনের সেই দুর্ধর্ষ অপকর্মটি সম্পাদন করে। তারপর সুসানের কাছ থেকে মিথ্যা সাক্ষ্য বাগিয়ে নেয়। আলফ্রেডের মৃত্যুতে সুসানের মনে তীব্র অনুশোচনা জেগে উঠে। যার চুড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মেয়েটা ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। সব কিছুর নাটের গুরু ওই শয়তান আন্দ্রে ডি মারে। রাগে দাঁতে দাঁত পিষে আরিফ। কি আজব পৃথিবী! আলফ্রেডের মতো ভাল লোকগুলিকে মিথ্যা অপবাদ নিয়ে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু আন্দ্রের মতো শয়তান গুলি ঠিকই জনমত বাগিয়ে বাল্টিসের নগরপিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কি নিষ্ঠুর এ পৃথিবী। এখানে ভালদের কোন স্থানই নেই, কেবল খারাপের রাজত্ব! না, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। শয়তানটা না জানি কত ভাল মানুষের সর্বনাশ করেছে। এখন মেয়র হওয়ার পর তো আরো কত জনের সর্বনাশ করার জন্যে মুখিয়ে আছে। ওকে যে করেই হোক থামাতেই হবে। মনে মনে সেই দৃঢ় সংকল্পে দীক্ষা নেয় আরিফ। "হ্যালো। হ্যালো আব্বু! তুমি শুনতে পাচ্ছো? ফোন রেখে দিলে না কি? হ্যালো!" ছেলেটার ডাকে আরিফ স্তম্ভিত ফিরে পায়। আরিফ: "হা খোকা বল।" সজীব: "না, মানে, ,,, হঠাৎ আলফ্রেডের ব্যাপারে এতটা আগ্রহী হয়ে উঠলে কেন?" আরিফ: "সেটা তোকে আরেকদিন বলব, আজ রাখি, ভাল থাকিস।" খট করে ফোনটা রেখে দেয় আরিফ। সুজানা অপেক্ষা করছিলো আরিফের কথা শেষ হলে ছেলেটার সাথে দুটো কথা বলবে বলে। কিন্তু ওকে হতাশ করে আরিফ ফোনটা কেটে দেয়। এমনিতেই মেজাজটা ভাল ছিল না সুজানার। সকাল থেকেই মাথার ভেতরে রাগ দানা বাঁধছিল ওর। এ ঘটনার পর সেটা বিস্ফোরিত হয়। "তুই ফোন রেখে দিলি কেন রে হাঁদা? ছেলেটা কি শুধুই তোর? তোর পেট চিরে বেরিয়েছিলি না কি ওকে? খোকার সাথে কথা বলতে দিলি না কেন আমায়? ছেলেটাকে আমার কাছ থেকে আগলে রাখতে চাস বুঝি? " এতগুলি প্রশ্ন এক সাথে করে সুজানা হাঁপিয়ে উঠে। ওর কথা গুলি আরিফের কাছে বজ্রনিনাদের মতো মনে হয়। খোকার প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতেই ফোনটা রেখে দিয়েছিল ও। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে ভাবতে থাকে এবার ও বুড়িটাকে কি করে সামলাবে! আরিফ: "সরি ডার্লিং। আজ না হয় আমার সাথেই কথা বলে কাটিয়ে দে। প্লীজ।" সুজানা: "যাহ। তোর সাথে কথা বলতে আমার বয়েই গেছে।" আরিফ: "তোকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার ছিলো, প্লীজ, আমার সাথে কথা না বলিস, অন্তত আমার কথা গুলি শোন।" সুজানা: "আচ্ছা, আচ্ছা। কি কথা? বলে ফেল তাড়াতাড়ি।" সেদিন বিকাল থেকে শুরু করে সন্ধা পর্যন্ত আরিফ সুজানাকে সবকিছু খুলে বলে। সব শুনে সুজানা বিষ্ময়ে হাঁ হয়ে যায়। আরিফের বর্ণনার সাথে ওর শোনা সেই সব অদ্ভুত শব্দ গুলি খাপেখাপে মিলে যাচ্ছে। পাহাড়ের উপর থেকে দুরদর্শী সৈন্যের সেই সতর্কবার্তাটা "বায়বীয় আক্রমণ, সবাই লুকাও " তো সুজানাও শুনতে পেয়েছে। আরিফের দেখা সেই হাত হারানো সৈন্যের করুণ আর্তনাদ, সেই ভুরি বেরিয়ে থাকা সৈন্যের মৃত্যু যন্ত্রনা কিংবা মরিফিনের জন্য আসক্ত যুদ্ধাহতদের হাহাকার সুজানা ও অনুভব করেছে। বুড়োবুড়ি দুটো একই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। বুড়িটা কেবল শব্দ শুনেছে আর বুড়োটা চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে সবকিছু চাক্ষুষ দেখেছে। উৎকন্ঠিত সুজানা আরিফকে জিজ্ঞেস করে, "এবার কি করবে? এই ভৌতিক ব্যাপারগুলি আমরা সবাইকে বললেও কেউই বিশ্বাস করবে না। কোর্টে যেয়েও লাভ নেই। এত বছর পর আন্দ্রের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণই আমরা দাঁড় করাতে পারবো না। কেবল ওই ক্রিমিনালটাকে সারাক্ষণ টিভিতে দাঁত কেলিয়ে হাসতেই দেখা যাবে। ওর পিত্তি জ্বালানো হাসিটা দেখাই বুঝি আমাদের নিয়তি? আরিফ হুঙ্কার দিয়ে উঠে, "কক্ষণো না। এর একটা বিহিত করতেই হবে। আগামীকালই তো রবিবার। আমরা যাব ওর ডিনার পার্টিতে। সেখানে ওর একটা এসপার না হয় ওসপার করেই ছাড়বো।" সুজানা মতলবটা বুঝতে পারে না। তবুও মাথা নেড়ে তাতে সায় জানায়। রোববার সন্ধা ৭ বেজে তিরিশ মিনিট। টাউনহলে মেয়র আন্দ্রের সৌজন্যে এক জাঁকজমকপূর্ণ ডিনারপার্টি চলছে। বালেরুমে অনেক যোগলই নাচে মশগুল। কেউ বা আবার আকন্ঠ গিলে বিলাসবহুল কাউচে নেতিয়ে পড়েছে। পার্টিতে এক বৃদ্ধ বাদামী চামড়ার যোগল মাত্র যোগ দিল। পার্টি উপভোগের চেয়ে মেয়রের খোঁজেই ওদের মনোযোগ বেশী। ওরা হাত ধরে বালেরুমে ঢুকলো। সবার সাথে নাচে তাল মিলাতে না পাড়লেও একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে দু এক কদম পা ফেললো ওরা। নাচের তালে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্ষে এসে সুজানা আরিফের কানে কানে বলল, "তোর প্লানটা কি? আসলে ঠিক কি করতে চাইছিস এখানে?" আরিফ ওর গালে চুমু খেয়ে বলল, "বেটাকে উচিৎ শিক্ষা দেব আজ।" সুজানা: "কিন্তু কি করে দিবি? একটু ইঙ্গিত দে না আমায়। প্লীজ।" আরিফ: "একটু সবুর কর, নিজেই দেখতে পাবি। " সুজানা: "তোর যা ইচ্ছা কর, আমায় এবার নিস্তার দে। এই গাদাগাদিতে তোর মতো উল্লুকের সাথে নাচতে যেয়ে আমার দম বেরিয়ে যাচ্ছে। খুব টায়ার্ড ফিল করছি।" আরিফ সুজানাকে একটা খালি কাউচ দেখিয়ে বলে, "ওখানে বসে একটু রেস্ট নে। আমি আসছি। " সুজানা বাধ্য মেয়ের মতো কাউচে গিয়ে বসে। ওদিকে আরিফ ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। খানিক পরে বালেরুমের দুতলার বেলকনিতে মিস্টার & মিসেস আন্দ্রে এসে দাঁড়ান। তারা হাত নেড়ে নিচে উপস্থিত জনতার অভিবাদন গ্রহণ করেন। আন্দ্রেকে দেখেই সুজানা এক টানটান উত্তেজনা অনুভব করে। ওর সাথে ঠিক কি করতে যাচ্ছে আরিফ? কিছুই মাথায় ঢুকে না ওর। হঠাৎ সুজানার চোখ যায় দোতালায় উঠার সিড়িটার দিকে। আরিফ পা টিপেটিপে সবার অলক্ষে দোতালায় উঠে যাচ্ছে। চোখে সেই আন্টিক সানগ্লাসটা পড়া। সানগ্লাসে চোখ ঢাকা থাকলেও সুজানার বুঝতে অসুবিধা হয় না ওর লক্ষ হল সেই বেলকনিটায় স্থির। যেখানে আন্দ্রে স্বপত্নিক দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ওর মতলবটা কি? কি করতে চলেছে ও? কাউচটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সুজানা। তারপর রুদ্ধশ্বাসে দেখতে থাকে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ। বেলকনির সামনে একজন নিরাপত্তাকর্মী আরিফকে থামিয়ে দেয়। ওদের মধ্যে কিছুক্ষণ মৃদুস্বরে আলাপ হয়। আরিফ ওকে কি বুঝিয়েছে সে ই জানে। নিরাপত্তাকর্মীটা স্বসম্মানে ওর পথ ছেড়ে দিল। আর কোন বিশেষ বাধা ছাড়াই আরিফ বেলকনিতে পৌছে যায়। আন্দ্রে যোগল বেলকনির রেলিং ধরে ঝুকে জনতার অভিনন্দন গ্রহণ করছিলো। তাই পেছনে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসতে থাকা আরিফের উপস্থিতিটা তাদের অজ্ঞাতই থেকে যায়। আন্দ্রের থেকে এক হাতের মতো দুরত্বে এসে আরিফ হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে ধরে প্রচন্ড একটা ধাক্কা দেওয়ার জন্যে তৈরি হয়। ব্যাপারটা সুজানা সহ উপস্থিত আরো কয়েকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবার সুজানা বুঝতে পারে আরিফের আসল উদ্দেশ্যটা কি! এই ভরা মজলিশে ও আন্দ্রেকে খুন করতে এসেছে। ও কেবল প্রতিশোধ চায়, চরম প্রতিশোধ। সুজানা চেঁচিয়ে উঠে, "না, না। আরিফ! থাম বলছি! খবরদার, ,,,,," হেভী মেটাল মিউজিকের কান ঝালাপালা করা শব্দে সুজানার ক্ষীণ চিৎকার ঢাকা পড়ে। আতংকে সুজানা চোখ বন্ধ করে ফেলে। সাথে সাথেই ধরামমমমম করে একটা বিকট শব্দ হয়। আরিফের ধাক্কা খেয়ে রেলিঙের উপর ঝুকে থাকা বদমাইশটা শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়েছে। সাথেসাথেই পার্টিতে হুলস্থুল বেঁধে যায়। কাজ শেষে আরিফ সানগ্লাসটা খুলে পকেটে ভরে। তাৎক্ষণাত দুজন গার্ড এসে ওকে দুপাশ থেকে আটকে ধরে। নীচে থেকে সুজানা চিৎকার করতে থাকে, "হায় আরিফ, এ তুই কি করলি? জলদি নেমে আয়, পালিয়ে যা এখান থেকে।" কিন্তু অন্যান্য আতংকিত অথিতীদের চিৎকারের মাঝে তার কণ্ঠটা হারিয়ে যায়। বুড়োটা পালায় না বরং ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসতে থাকে। সুজানার উপর চোখ পড়তেই হাসি মুখে একটা ফ্লাইং কিস ছুড়ে আরিফ। বিদায় মুহুর্তে বুড়িকে শেষ বারের রাগিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। রাগে লাল হয়ে যাওয়া সুজানার অম্লান বদনটা আর একটিবার দেখার লোভ সামলাতে পারছিলো না ও। কিন্তু বুড়িটা রাগের বদলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিরাপত্তারক্ষীরা আরিফকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একটা পুলিশ কার এ বসিয়ে দেয়। তারপর রী রী সাইরেন তুলে ওকে নিয়ে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সুজানার কাছে সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই একটা দুঃস্বপ্ন মনে হয়। ও আশা করতে থাকে হয়তো শিঘ্রই ভোরের আভায় এ দুঃস্বপ্নটা কেটে যাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই বুঝতে পারে জীবনের আমাবশ্যার কালো রাতটা কেবল শুরু। দু মাস পর,,,,, আজ আন্দ্রে হত্যা মামলার রায় হল। মেয়র আন্দ্রেকে সজ্ঞানে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে বিজ্ঞ আদালত ডাক্তার আরিফকে ২০ বছরের কারাদণ্ডে দন্ডিত করে। রায় শেষে আরিফকে বাল্টিসের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সুজানা সেখানে ওর সাথে সাক্ষাৎ করে। আরিফ: "তুই অনেকটা শুকিয়ে গেছিস রে। শরীর খারাপ করেছে বুঝি? " সুজানা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে, "শরীর খারাপ হবে না আবার? ওরা আমার কলিজাটাকে খুলে নিয়ে এখানে আটকে রেখেছে যে।" আরিফ: "আহ, এত কাঁদিস না তো। কাঁদলে তোকে বিশ্রী দেখায়।" সুজানা: "একি হল রে আরিফ! আমাদের জীবনটা এভাবে তছনছ হয়ে গেল যে! এরপরেও কি করে কান্না থামাই বল।" আরিফ: "শোন। কান্না কাটি বাদ দিয়ে বাড়ি যেয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করবি। মাত্র তো বিশ বছর। এ সময়টা পেরুলেই আমি ঘরে ফিরে আসবো।" কথাটা বলার সময় আরিফের বা চোখটা ফের পিটপিট করে। ওরা দুজনই জানে আরো বিশ বছর ওদের কেউই বাঁচবে না। বার্ধক্যের কাছে হার মেনে তার আগেই পরপারে পাড়ি দিতে হবে। তবুও আরিফ চায় এই মিছে আশায় সুজানা বুক বাঁধুক। অন্তত এতে ওর কান্নাটা যদি বন্ধ হয় তো মন্দ কি? কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়। আরিফ ফের মিথ্যা বলছে বুঝতে পেরে হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠে সুজানা। বন্দিশালার দর্শনার্থী কক্ষের ভারী কাচে কিল মারতে শুরু করে ও। যে করেই হোক আজ এ বন্দিশালা ভেঙেই ওর প্রিয়তমকে ছাড়িয়ে আনবেই। আরিফ: "কি করছিস সুজানা, শান্ত হ। পাগল হয়ে গেছিস না কি?" কিন্তু আরিফের কথা গুলি সুজানার কানেই ঢুকে না। সে কাঁচের দেয়ালে দমাদম কিল মারতে মারতে চেঁচিয়ে উঠে, "এ কি হয়ে গেল রে আরিফ! এ তুই কি করলি? কেন করলি?" আরিফ ওকে সান্তনা দেয়, "যা করেছি ভালর জন্যেই করেছি। সমস্ত শহরবাসীকে ওই শয়তানের থাবা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছি। এতে আমার কোন আফসোস নেই।" সুজানার চিৎকার শুনে দুজন কারারক্ষী সেখানে চলে আসে। ওদের উপস্থিতি উপেক্ষা করে সুজানা কাঁচের দেয়ালে কিল মারা চালিয়ে যায়। ওতো আর জানে না যে এটা বুলেটপ্রুফ কাঁচ। ওর আঘাতে এ কাঁচের টিকি টি ও ভাঙবে না। কারারক্ষীরা উদভ্রান্ত বুড়িটাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যায়। সুজানা চোখের আড়াল হতেই আরিফের চোখ ফেটে জল পড়তে থাকে। এতক্ষণ জলটা আটকে রাখতে কি যে কষ্ট হচ্ছিল ওর! সেদিনের উদ্ভট আচরণের জন্যে বাল্টিস কারাকর্তৃপক্ষ সুজানাকে ৮০০ ইউরো জরিমানা করে। সেই সাথে ওকে একটা লিখিত নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয় যে ও আর কখনো ওই কারাগারে গিয়ে বুড়োর সাথে দেখা করতে পারবে না। আরো দুমাস পর,,,,, আজ আরিফের জন্ম দিন। কিচেনে বসে আরিফের প্রিয় পায়েশ রান্না করছে সুজানা। বাল্টিসের সেই বাড়িটায় এখন একাই থাকে ও। আরিফের জেল হবার পর সজীব অনেক চেষ্টা করেছে মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওর কাছে ওয়ারশোয় ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু সুজানার একই কথা। এ বাড়িটা ছেড়ে কোথাও যাবে না ও। এ বাড়ির পরতে পরতে আরিফের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এখানে থাকলে অন্তত আরিফের স্মৃতিটুকু সারাক্ষণ ওর পাশে থাকবে। চুলা থেকে পায়েশ নামিয়ে দুটো বাটিতে করে টেবিলে সাজিয়ে রাখে সুজানা। তখনই সজীবের ফোন আসে। ফোন ধরতে বেডরুমে চলে যায় ও। ফোনে মাকে ওয়ারশোতে ফিরে আসার জন্যে মিনতি জানায় ছেলেটা। কিন্তু সুজানা তার সিদ্ধান্তে এখনো অটল। মাকে কিছুতেই রাজি করাতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিয়ে ফোনটা রেখে দেয় সজীব। এহেন টানাহেঁচড়ায় ছেলের প্রতি মনটা বীষিয়ে উঠে সুজানার। ফোন রেখে খাবার টেবিলে ফিরে দেখে ওর এত স্বাধের পায়েশটুকু একটা বিড়ালে খেয়ে সাবাড় করছে। সুজানা ওটাকে বাধা দেয় না। যার খাবার কথা সে তো আর নেই। তাই পায়েশটুকু না হয় বিড়ালের পেটেই যাক। জীবনের শেষ খাবারটা না খেয়েই সুজানা বেডরুমে চলে যায়। আজ বিকালে একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ও। বুড়োটা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে এই নিয়ে চার মাস কেঁটে গেছে। এই সময়টাতে সে একটা রাতও একটু শান্তিতে পারেনি । । ঘুমের অভাবে ফোলা ফোলা চোখ দুটোর নিচে কালি জমেছি। আর সহ্য করতে পারছে না সুজানা। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ রাতে ও প্রাণ ভরে ঘুমাবে। সন্ধায় নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে পাঁচ পাতা ঘুমের ট্যাবলেট কিনেছিলো সুজানা। পোল্যান্ডের ড্রাগস ডিলিং আইন খুব কড়া। একসাথে এতগুলি ট্যাবলেট জনসাধারণের কাছে বিক্রি করা নিষিদ্ধ। কিন্তু ওর ফার্মাকোলজির সার্টিফিকেটটা দেখাতেই আর খুব একটা সমস্যা হয় না। দোকানদার হাসি মুখেই পাঁচ পাতা ঘুমের ঔষধ হাতে ধরিয়ে দেয়। সেগুলি নিয়ে খুশি মনে বাড়ি ফিরে ও। অনেকদিন পর আজ রাতে একটা জম্পেশ ঘুম হবে সুজানার। বেডরুমে ফিরে একে একে সবগুলি ট্যাবলেটই গিলে ফেলে বুড়িটা। তারপর লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। চারদিন পর সুজানার পঁচা গলা লাশটা স্থানিয় পুলিশ অফিসারেরা উদ্ধার করে। ময়না তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ পর ওকে বাড়ির পেছনের উঠোনে দাফন করা হয়। সুজানার মৃত্যুর সংবাদ শুনে আরিফ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। প্রচন্ড মানসিক আঘাতে ওর মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দেয়। অবশেষে একদিন ওর মানসিক ভারসাম্যহীনতা চরমে পৌছে। বাল্টিসের কারাকর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই তাকে ওয়ারশোয় সাইকোলজিক্যাল ফ্যাসিলিটিতে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে আপন ছেলে ডাক্তার সজীবের অধিনেই ওর মানসিক চিকিৎসা চলে। কিন্তু লাভ হয় না মোটেও। দিন দিন ওর অবস্থার কেবল অবনতিই ঘটতে থাকে। ফ্যাসিলিটির ভেতর নিজের সেলে সারাক্ষণ সেই সানগ্লাসটা লাগিয়ে বসে থাকতো আরিফ। নাওয়া খাওয়ার কোন বালাই নেই। কেউ ডাকলেও জবাব দিতো না। শেষের দিকে তিন মাস ও একটা দানাপানিও মুখে দেয় নি। কেবল স্যালাইনের উপরই বেঁচে ছিলো। আরিফ ভাবতো সুজানাকে ছাড়া ও একটা মুহুর্তও বাঁচতে পারবে না। কিন্তু বিষ্ময়কর ভাবে বুড়ির মৃত্যুর পরেও প্রায় আট মাস বেঁচে ছিলো ও। তারপর একদিন এক কর্তব্যরত নার্স সেলের ভেতরে ওকে মৃত অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে। খবর পেয়ে সজীবতাৎক্ষণাত সেই সেলে ছুটে আসে। আরিফের মৃত্যুতে একমাত্র অভিবাবক কে হারিয়ে ঢুকরে কেঁদে উঠে ও। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সজীব। ও একজন ডাক্তার। পেশাগত কারণে জীবনে অনেক মৃত্যুই দেখতে হয়েছে। এবার হয়তো পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন। শায়িত লোকটা ওর একান্ত আপনজন, ওর জন্মদাতা পিতা। কিন্তু তাই বলে এভাবে ভেঙে পড়া ওকে একেবারেই মানায় না। সজীব নিজেকে সান্তনা দিয়ে আরিফের জানাজার আয়োজন শুরু করে। কাকতালীয় ভাবে আরিফের মৃত্যুর দিনই রুকন ওয়ারশো এয়ার স্টেশনে পা রাখে। বছর ঘুরে ওর আন্যিভার্সারির দিনটা চলে এসেছে। বিচ্ছেদের স্মৃতিময়, মিলনের এই দিনটাকে বন্ধুদের সাথে আনন্দ করে কাটাতে এসেছিল ও। গত একটা বছর রুকনের সাথে আরিফ বা সোজানার সাথে তেমন কোন যোগাযোগ হয় নি । তাই ওদের করুন পরিণতিটা ওর কাছে অজ্ঞাতই থেকে যায়। সজীবের কাছ থেকে ফোনে সব কিছু জেনে রুকন বেদনায় নির্বাক হয়ে পড়ে। প্রিয় বন্ধুদের এই আকর্ষিক প্রস্থান ও কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। বিশেষ করে সুজানার আত্মহত্যা টা। আরিফের লাশটাকে আম্বুল্যান্সে করে সজীব বাল্টিসে নিয়ে চলে। রুকনও পথে সঙ্গী হয়। বাল্টিসে আরিফ & সুজানা টেন্টে ই রুকনের শেষ আশ্রয় হতে চলেছে। লাশবাহী আম্বুল্যান্সটা খোলা ফটক দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। প্যারামেডিকেরা স্ট্রেচারে করে আরিফের লাশটা গাড়ি থেকে নামায়। সুজানার কবরের পাশেই ওর জন্যে নতুন কবর খোঁড়া হয়েছে। পড়ন্ত বিকালে ওর লাশটা কবরে নামানো হয়। ক্লান্তিকর দিন শেষে নীড়ের পাখি দুটো নিড়েই ফিরে এসেছে। তবে জীবিত নয়, মৃত। সুজানার পাশে আরিফকে শুয়ে পড়তে দেখে রুকনের কিছুটা হিংসা হয়। আরিফের বদলে ওর লাশটা ওখানে থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো? সারাটি জীবনই তো সোজানা আরিফের সাথেই কাটিয়ে এসেছে। মৃত্যুর পর না হয় ওর পাশেই থাকতো। কিন্তু রুকনের ভাগ্যটাই খারাপ। বিধির লিখন অনুযায়ী আরিফ ও সুজানা জীবনে মরণে এক সাথেই থাকবে। দাফন শেষে সজীব ও রুকন সে রাতটা ওই বাড়িতেই কাটিয়ে দেয়। পরদিন সকালে বুড়োবুড়ির কবর জিয়ারত শেষে ওয়ারশোর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে ওরা। ওয়ারশোয় ফিরে রুকন এয়ারস্টেশনের পথ ধরে। ওদিকে সজীব গাড়ি ঘুরিয়ে ফ্যাসিলিটির দিকে চলে যায়। বিদায় মুহুর্তে সজীব রুকনকে সেই সানগ্লাসটা ধরিয়ে দিয়ে বলে, "চাচা, এটা আব্বার অনেক প্রিয় চশমা ছিলো। সারাক্ষণ ও এটা পড়ে বসে থাকতো। উনার স্মৃতিটা আজ থেকে আপনার কাছেই থাকুক। আমি ভাববো আব্বু নেই তো কি হয়েছে, আপনি তো আছেন।" সজীবের হাত থেকে চশমাটা নিয়ে রুকন ওকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। ছেলেটাকে খুব আপন মনে হয় ওর। আলিঙ্গন শেষে ওরা দুজন যার যার পথে আলাদা হয়ে যায়। এয়ারপোর্টে বসে রুকন ক্ষানিকের জন্যে স্মৃতির অস্পৃশ্য জগতে হারিয়ে যায়। গত আন্যিভার্সারিটা সে আরিফ আর সুজানার সাথে কতই না হাসি খুশি করে কাটিয়েছিল। কথা ছিল আগামী বছরও এই দিনটায় সে বেড়াতে আসবে। ও তার কথা রেখেছে। কিন্তু এই এক বছরের ভেতরেই ওদের সুখের ঘরটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। পৃথিবীতে প্রতিদিনই এভাবে কত ঘর ভাঙে আবার কত নতুন ঘর বেধে উঠে তার হিসাব কেবল উনি ছাড়া আর কেউ জানে না। রুকন গুনগুনিয়ে তার প্রিয় গানটা ধরে, "নদীর এপাড় ভাঙে ওপাড় গড়ে, ওওও এপাড় ভাঙে ও পাড় গড়ে, এই তো নদীর খেলা রে ভাই, এই তো নদীর খেলা।" এয়ারপোর্টে ওর কাঙ্খিত বিমানের আগমনি ঘোষণা রুকনকে ফের বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। চোখ মুছে ও উঠে দাঁড়ায় আর চেকপয়েন্টের দিকে এগিয়ে যায়। প্রাথমিক চেকিং শেষে বিমানে উঠে পড়ে ও। ভাগ্যগুণে ওর সিটটা জানালার পাশেই পড়েছে। ক্লান্তিকর এই যাত্রাটা আকাশ দেখতে দেখতেই কাটিয়ে দেয়া যাবে। আধাঘন্টার মধ্যেই প্লেনটা ওকে নিয়ে আকাশে উড়াল দেয়। ওয়ারশো শহরটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে। দেখতে দেখতে প্লেনটা আকাশে উঠে সাম্যাবস্থায় চলে এলো। আরিফ সীটবেল্ট খুলে আরাম করে বসে জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে থাকে। এই আকাশটা এক অদ্ভুত জিনিস। কেউ যদি সারাটি জীবন কেবল এই আকাশ দেখেই কাটিয়ে দেয় তবে ওর জীবনটাকে কখনোই ব্যার্থ বলা যাবে না। সারিসারি সাদা মেঘ আকাশে ভেসে চলছে। ধাতব ডানা দিয়ে সেই মেঘের পশম কেঁটে প্লেনটাও সামনে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ কি মনে হতেই রুকন চশমাটা বের করে চোখে পড়লো। তারপর তাকালো আকাশে ভেসে চলা সেই মেঘ গুলির দিকে। বিশাল বিশাল সাদা মেঘমালা হঠাৎ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে ভাগ হয়ে গেল। তারপর হঠাৎ খণ্ডগুলি একত্রে ডাকতে লাগলো, "ব্যা ব্যা ব্যা আ আ আ।" রুকন সবিষ্ময়ে দেখোলো আকাশের মেঘমালা মুহুর্তেই জলজ্যান্ত ভেড়ায় পরিণত হয়েছে। ও আর প্লেনের ভেতরে বসে নেই। তার বদলে একপাল সাদা ভেড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। অদুরেই একটা বিশাল সাইনবোর্ডে পোলিশ ও ইংলিশ দুই ভাষাতেই লেখা রয়েছে "আরনোল্ড ফার্মস লিমিটেড"। এটা সেই খামার যেখানে আরিফ কাজ করতো। রুকন এসবের আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারে না। ও তো আর জানে না যে এটা প্রাকপুরুষের চশমা। এটা তার পূর্বতন মালিকের জীবনকে বর্তমান মালিকের চোখে হুবহু প্রদর্শন করে। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now