বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার বাবা মারা যান যখন আমার বয়স পনেরো মাস।
বাবার অভাব আমি বোধ করিনি, কারণ বাবা সম্পর্কে আমার কোনোস্মৃতি নেই। স্মৃতি থাকলেই অভাববোধের ব্যাপারটা চলেআসত। আমাকে মানুষ করেছেন আমার মা। তিনি অত্যন্ত সাবধানি মহিলা। বাবার অভাব যাতে আমি কোনদিন বুঝতে না পারি তার সবরকম চেষ্টা তিনি বাবার মৃত্যুর পর থেকেই করে আসছেন। তিনি যা যা করেছেন তার কোনোটিই কোনো সুস্থ মহিলা করবেন না। মা হচ্ছেন একজন অসুস্থ, অস্বাভাবিক মহিলা। যেহেতু জন্ম থেকেই আমি তাঁকে দেখে আসছি, তাঁরঅস্বাভাবিকতা আমার চোখে ধরা পড়তে অনেক সময় লেগেছে।
বাবার মৃত্যুর পর ঘর থেকে তাঁর সমস্ত ছবি, ব্যবহারি জিনিস সরিয়ে ফেলা হয় – কিছু নষ্ট করে দেয়া হয়, কিছু পাঠিয়ে দেয়া হয় আমার দাদার বাড়িতে। মা’র যুক্তি ছিল – বাবার স্মৃতিজড়িত কিছু তাঁর চারপাশে রাখতে পারবেন না। স্মৃতির কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা তাঁর নেই।
বাবাকেমন ছিলেন, তিনি কী করতেন, কী গল্প করতেন এসব নিয়েও মা কখনো আমার সঙ্গে কিছু বলেননি। বাবার সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই তাঁর নাকি অসম্ভব কষ্ট হয়। মা এই কষ্ট থেকেক মুক্তি পাওয়ার জন্যে বাবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। বাবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। আমার নাম ‘তিতলি’ যা বাবা আগ্রহ করে রেখেছিলেন তাও বদলানো হল। আমার নতুন নাম হল রূপা। তিতলি নাম মা বদলালেন, কারণ এই নাম তাঁকে বাবার কথা মনে করিয়ে দিত।
মা অসম্ভব রূপবতী। আরেকটি বিয়ে করাই মা’র জন্যে স্বাভাবিক ছিল। পাত্রের অভাব ছিল না। রূপবতীদের পাত্রের অভাব কখনো হয় না। মা বিয়ে করতে রাজি হলেন না। বিয়ের বিপক্ষে একটি যুক্তি দিলেন – যে-ছেলেটিকে বিয়ে করব তার স্বভাব-চরিত্র যদি রূপার বাবার চেয়ে খারাপ হয় তাহলে কখনো তাকে ভালবাসতে পারব না। দিনরাত রূপার বাবার সঙ্গে তার তুলনা করে নিজেই কষ্ট পাব, তাকেও কষ্ট দেব।সেতা ঠিক হবে না। আর যদি ছেলেটি রূপার বাবার চেয়ে ভাল হয় তা হলে রূপার বাবাকে আমি ক্রমে ক্রমে ভুলে যাব। তাও ঠিক হবে না। এই মানুষটিকে আমি ভুলতে চাই না।
আমার মামারা ছাপোষা ধরনের মানুষ। মাকে নিয়ে তাড়া দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কন্যাসহ বোনের বোঝা মাথায় নেবারমতো সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনটাই তাঁদের ছিল না। তবু মা তাঁদের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে রইলেন। কিছুদিন তিনি এক ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন, তারপর যান অন্য ভাইয়ের বাসায়। মামারা ধরেই নিলেন মা তাঁর জীবনটা এভাবেই পার করবেন। তাঁরা মা’র সঙ্গে কুৎসিত গলায় ঝগড়া করেন। গালাগালি করেন। মা নির্বিকার। আমার বয়স যখন পাঁচ হল তখন আমাকে বললেন, রূপা, তোকে তো এখন একটা স্কুলে দিতে হয়। ঘুরে ঘুরে জীবন পার করলে হবে না। আমাকে থিতু হতে হবে। আমি এখন একটা বাসা ভাড়া নেব। সম্ভব হলেএকটা বাড়ি কিনে নেব। আমি বললাম, টাকা পাবে কোথায়? মা বললেন, টাকা আছে। তোর বাবার একটা পয়সাও খরচ করিনি,জমা করে রেখেছি।
বাবা বিদেশি এক দূতাবাসে চাকরি করতেন। চাকরিকালীন রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান বলে ইনশুরেন্স থেকে এবং দূতাবাস থেকে বেশ ভাল টাকাই পেয়েছিলেন। মা সেই টাকার অনেকখানি খরচ করে নয়াটোলায় দোতলা এক বাড়ি কিনে ফেললেন। বেশ বড় বাড়ি। প্রায় এক বিঘা জমি নিয়ে বাড়ি। একতলা দোতলা মিলে অনেকগুলি ঘর। ভেতরের দিকে দুটো আমগাছ, একটা সজনেগাছ, একটা কাঁঠালগাছ। বাড়ি পুরান হলেও সব মিলিয়ে খুব সুন্দর। একতলাটা পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া হল। আমরা থাকি দোতলায়। পাঁচিল দিয়েঘেরা বাড়ি। মা সেই পাঁচিল আরও উঁচু করলেন। ভারী গেটকরলেন। একজন দারোয়ান রাখলেন। আমাদের নতুন জীবন শুরুহল।
নতুন জীবন অনেক আনন্দময় হওয়া উচিত ছিল। মামাদের ঝগড়া গালাগালি নেই। অভাব-অনটন নেই। এত বড় দোতলায়আমরা দুজনমাত্র মানুষ। বাড়িটাও সুন্দর। দোতলায় রেলিং দেয়া টানা বারান্দাও আছে। আমার খেলার সঙ্গীসাথিও আছে। একতলার ভাড়াটের দুটি আমার বয়েসি যমজ মেয়ে আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের নিজস্ব বাড়িতে আমার ভয়াবহজীবন শুরু হল। মা সারাক্ষণ আমাকে আগলে রাখেন। নিজে স্কুলে নিয়ে যান, যে-চারঘণ্টা স্কুল চলে মা মাঠে বসেথাকেন। ছুটি হলে আমাকে নিয়ে বাসায় ফেরেন। দুপুরে খাবার পরই আমাকে আমার ঘরে আটকে দেন। ঘুমুতে হবে। বিকেলে যদি বলি, মা নিচে খেলতে যাই? তিনি গম্ভীর মুখে বলেন, না। দোতলার বারান্দায় বসে খেলো। খেলার জন্যে নিচেযেতে হবে কেন?
‘নিচে গেলে কী হবে মা?’
‘তুমি নিচে গেলে আমি এখানে একা একা কী করব?’
আসল কথা হচ্ছে মা’র নিঃসঙ্গতা। আমি তাঁর একমাত্র সঙ্গী। সেই সঙ্গী তিনি এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করবেন না। দিনের পর দিন রাগারাগি করেছি, কান্নাকাটি করেছি, কোনো লাভ হয়নি।
কতবার বলেছি, মা সবাই কত জায়গায় বেড়াতেযায় – চলো আমরাও যাই। বেড়িয়ে আসি।
‘কোথায় যাবে?’
‘চলো কক্সবাজার যাই।’
‘না।’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now