বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ফড়িঙের ডিঙ্গি নৌকো

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ** ঐ যে দেখছো, বৃষ্টি ভেজা আকাশ ছুঁয়ে রং ধনুর মেলা, তার ওপারেই আছে ছবির মতো তুলির আঁচরে আঁকা পদ্মদিঘী গাঁ। সে গাঁয়ের-ই ষোড়শী, চঞ্চলা টগর নামের মেয়েটি। শ্যাম বর্ণের মুখশ্রীতে পটল চেরা চোখ দুটো দুষ্টুমির আঁচে ঝলকে উঠছে প্রতিনিয়ত। চাঁপা নাক নিয়ে কত্ত কথা শুনতে হয় তাকে!কেউ বলে ‘বুচি’ কেউ বা ‘টেঁপি’।প্রতিউত্তরে ঠোটের কোনে জিভ ঠেকিয়ে ভেংচি কেটে দেয় টগর। স্কুলের পড়ালেখায় মন বসে না ওর।ভারি ভারি বই গুলো থেকে কারও গাছের আম চুরি করে পালানো,গাছের ডালে দোলনা ঝুলিয়ে পুকুরের জল ছুঁয়ে মাঝ অব্দি চলে যাওয়া,এগুলোই টেনে নেয় ওকে। ফড়িঙের ডিঙি নৌকোর মতো শুধু উড়োউড়ি এথায় সেথায়...। বাবার কাছে রোজ রোজ কত্ত নালিশ যে আসছে! কপালের কোনে হাত ঠেকিয়ে বাবা মা দুজনই ভাবে, মেয়েটা এত দস্যি কি করে হল... ! মাঝে মাঝে মেয়ের গালে ঠাস ঠাস চড় বসিয়ে দেয় মা। ‘পাজী মেয়ে, তোর জন্যে আর কত কথা শুনাইব মানুষ? একটু শরম হ্যায়া কর্...!’ বড়বড় চোখ দুটো থেকে মুক্ত ঝড়িয়ে দৌড়ে দূরের সবুজে মিলিয়ে যায় টগর। মায়ের পিছু ডাক কর্ণপাত হয় না। সন্ধ্যার আগে ফিরছে না সে। খাওয়া দাওয়া?সে হবে ক্ষণ,ফল ফলাদির গাছ তো আর কম নেই এ গাঁয়ে! ঠিক এমনি ভাবে আজ আবার মায়ের বকুনি খেয়ে ঘর থেকে পালিয়েছে টগর। আশ্রয় নিয়েছে আম বাগানের গাছের ডালে। এখানটা বেশ প্রিয় ওর, কেউ সহজে খুঁজে পায় না। অথচ উপরে বসে সে সবাই কে দেখতে পায়। মাঝে মাঝে মেঠো পথের পথিকদের ভয়ও দেখায়। থমকে দাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দ্রুত হাটা দেয় পথিক। দেখতে বেশ মজা লাগে। কিন্তু আজ কাউকে নজরে আসছে না। দীঘল চুলের দুই বেণী দুলাতে দুলাতে প্রশস্ত ডালে হেলান দিয়ে আনমনে দূরে তাকিয়ে থাকে টগর।এই ভরদুপুরে খাঁ খাঁ করছে চারপাশ। আরে,আরে!ওই তো কে যেন আসছে!টগর যতটা সম্ভব নিজেকে ডাল-পালার আড়ালে লুকিয়ে নিলো। ছাতা মাথায় টিংটিঙে বুড়ো কে চিনতে অসুবিধে হল না। গেদু ঘটক। এই পাজী বুড়োই ওদের গাঁয়ের লায়লাবু’র বিয়েটা দিয়েছিলো। এখন যৌতুকের জন্য রোজ স্বামীটা লায়লাবুকে পিটায়। সব এই ঘটকের দোষ। আজ আচ্ছা মতন মজা দেখাতে হবে একে। দাঁতে দাঁত ঘষে তৈরি হয় টগর। গেদু ঘটক কাছাকাছি আসতেই অদ্ভুত ভাবে হেসে উঠে সে। গেদু ঘটক চমকে দাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার দ্রুত হেটে চলে। তখন আরও ভয়ঙ্কর ভাবে কণ্ঠ কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে হাসতে থাকে টগর। সাথে একটা আম ছিঁড়ে নিয়ে গেদু ঘটক বরাবর ছুঁড়ে মারে। ছাতার উপর ঢিল পড়ার অস্তিত্ব টের পেতেই লুঙ্গি গুটিয়ে দৌড় শুরু করে গেদু ঘটক। এই দৃশ্য দেখে হেসে প্রায় গাছ থেকে গড়িয়ে পড়তে যেয়েও পড়লো না টগর। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের সোনালী রোদ ছড়িয়ে পড়তেই বাড়ির পথে পা বাড়ায় টগর। উঠোনের পাশে ডালিম তলায় আসতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠে।ওদের ঘরের ভেতর গেদু ঘটক বসে আছে।হায় আল্লাহ্,বুড়োকে যে সে-ই ভয় দেখিয়েছে এটা কি টের পেয়ে গেলো নাকি?! ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুগালে হাত বুলায় টগর। আবারও বোধহয় ওখানে মায়ের আঙুলের ছাপ পড়তে যাচ্ছে। গেদু ঘটক চলে যাওয়া অব্দি গাছের আড়ালেই বসে রইলো সে। রাতের বেলা টগর বিস্ময় নিয়ে সে লক্ষ্য করলো, মা একদম-ই রেগে নেই। বাবাও কেমন হাসিহাসি মুখে কথা বলছে। কোথায় গালের উপর ফটাফট বেশ কয়টা চড় পরার কথা, তা না, উল্টো আদর করে মা তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা একদম-ই অস্বাভাবিক! মনের ভেতর এক গাদা প্রশ্ন নিয়ে ঘুমুতে যায় টগর।তারপর সুখরাজ্যের পরীর মতন ঠোঁটের কোনে এক চিলতে সুখময় হাসি টেনে তলিয়ে যায় গভীর নিদ্রায়...। তখনও সে জানতো না, গেদু ঘটক দুপুরে ভয় দেখাবার বিচার দিতে নয়, বরং ওর ১৬ বছর বয়সের চঞ্চলা জীবন গতিকে বদলে দিতে নিয়ে এসেছে বার্তা। বিয়ের বার্তা। যা সম্পর্কে এই ছোট্ট বালিকা এখন এটুকুই বোঝে, যৌতুক দিতে না পারলে স্বামীর লাঞ্ছনা নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় একটি মেয়েকে...। *** শ্রাবন মাসের এক মেঘলাটে সন্ধ্যায় টগরের বিয়ে হয়ে গেলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ডাগর চোখ দুটোকে ফুলিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। বিকেল অব্দি পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিল সে,‘আমি বিয়া করব না... মা, আমি বিয়া করব না...।’ মেয়েকে ভালো ঘরে বিয়ে দেয়ার এই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চায়নি টগরের বাবা মা। পাশের গ্রামের খান্দানি পরিবারের জালাল উদ্দিনের ছেলে নবাব উদ্দিন। বয়স সবে ২৮।ছেলের মাথায় চুল নেই, সে তাদের জন্য এমন কোন মুখ্য ব্যাপার নয়। সংসারে বাবা না থাকলেও মা এবং দাদী আছে। মেয়েটা রানীর মতোই ভাল থাকবে ওখানে। কাম কাজের জন্য দাসী বাদী তো আছেই। ঝকঝকে চোখে মেয়ের সুখের দিনগুলোর কথা ভেবে যায় তারা। টগর কে বুঝায়,‘ও মা, কান্দিস না মা, তুই এহন বুজবিনা, একদিন দেখবি কি সুখে আসসছ।’ টগর এসবের কিছুই শুনতে চায় না। পিঠ থেকে মায়ের হাত ঝেড়ে সরিয়ে দেয়। কিচ্ছু ভাল লাগে না ওর,কিচ্ছু না। মনে হচ্ছে সুবিশাল এক সবুজ প্রান্তর থেকে টেনে হেঁচড়ে শ্যাওলাটে চার দেয়ালে বন্দী করে দিচ্ছে ওকে। যখনি ভাবে, আর গাছে উঠে আম খাওয়া হবে না। নদীর রুপালী চাদরে হাত চাপড়ে জল ছিটিয়ে দেয়া হবে না। জ্যোৎস্না রাতে বাতির আলোয় পড়তে পড়তে জোনাকির সাথে গল্প দেয়া শেষ,তখনি ডুকরে কেঁদে উঠে মেয়েটা। কষ্টের পিণ্ড গলা ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসতে চায়। কাউকে বুঝাতে পারে না, কি নিদারুণ ব্যাথা অনুভব হয় ছোট্ট অন্তরে। এই ব্যাথার পিণ্ড দুমড়ে মুচড়ে নিজের ভেতর দহন করেই এক নতুন জীবনের দরজার সন্নিকটে এসে দাড়ায় টগর।এখন শুধু দরজাটা খুলে ওপাশে যাওয়ার পালা। দেখার পালা, কি এমন আশ্চর্য সুখ আছে ওখানে, যার কারনে কিনা বাবা মা এমন নিষ্ঠুরের মতো দূরে ঠেলে দিলো তাকে! উৎসবের সমস্ত পাঠ চুকিয়ে বউ নিয়ে রওয়ানা দিলো বর যাত্রী। কোথা থেকে যেন একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,‘আরে জামাই দেখি নাইড়া মাথা রে!’ টগর ভাবলেশহীন শুনে যায়। জামাই কেমন ওটা নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। বিয়ে তো হয়েই গেছে, এখন জামাই যদি ভূতও হয় কি-ই বা করার আছে? বিদায় বেলার কান্না কাটি শেষে ওরা নৌকায় উঠে বসলো। তখন দিনের আলোকে নিজের ভেতর লুকোতে ব্যস্ত রাত্রি।আবছা অন্ধকারে দূরের মিটি মিটি আলোগুলোর দিকে চেয়ে থাকে টগর। সাথে চাচাতো ২ ভাই বোন আছে ঠিকই,তবুও মা বাবার জন্য বুকের ভেতর হু হু করছে।চিরচেনা এই গ্রামটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে,নৌকার ছলক ছলক শব্দ টগরের অন্তরে তীরের ন্যায় আঘাত করে।কে যেন কান ফাটানো আওয়াজে গান ছেড়ে দিলো। সেই সাথে উল্লাসে হই হই করে উঠলো সবাই। কেউ অনুধাবন করলো না, একজনের চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাসের আঁচে মুখ থুবড়ে পড়েছে পুরোটা গ্রাম। এ গাঁয়ের দস্যি মেয়েটা যে হারিয়ে যাচ্ছে,ওর মতো কেউ যে আর ভালবাসবে না এখানকার ঘাস ফুল।কেউ যে আর হাত বুলাবে না বাছুরের গায়। ক’টা ডিম হল,পাখির বাসায় ঢু মেরে গুনবে না কেউ।ভাঙ্গা কণ্ঠের গুনগুনানি শুনবে না লজ্জাবতী। ধঞ্চে গাছ দু-ভাগ করে শ্যাম বর্ণের মুখ খানা বাড়িয়ে ওপারের আকাশে উঁকি দেবে না কেউ আর। গাঁয়ের তো মন খারাপ হবেই। সমস্ত চঞ্চলতা নিয়ে যে চলে যাচ্ছে চঞ্চলা টগর... নীরবে চোখের জল ফেলে টগর। ওর পাশে বসে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে নবাব। এত সুন্দর একটা মেয়ে তার বউ হয়েছে, ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগছে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, মেয়েটা একবারও তাকাচ্ছে না ওর দিকে!আয়না দেখার সময়ও না।তবে কি ওকে টগরের পছন্দ হয় নি ? মন খারাপ করে চাপা শ্বাস ফেলে নবাব। এ পর্যন্ত কতো বিয়ে দেখল মা, কেউ তাকে পছন্দ করলো না। এই বিয়েটা কিভাবে কিভাবে যেন হয়ে গেলো! গেদু ঘটক মাকে বলেছিল,‘আম্মাজী, মেয়ে গরীব ঘরের, শ্যাম বর্ণের। তবে বড়ই মায়াবী চেহারা। এমুন মেয়ে ওই গাঁয়ে আর একটাও নাই।’ ‘আমার পয়সা ওয়ালা পরিবার লাগবে না ঘটক। পয়সা আলহামদুলিল্লাহ্অঢেল আছে।আমার নবাবের জন্য মনমতো কনে বউ চাই। যেন পুরা গ্রাম দেখে, আমার ছেলেও কম যায় না।’ মায়ের দেয়া জবাবটা এমনই ছিল। ভাবনার মাঝেই ডুবে ছিল নবাব, হঠাৎ হাতের উপর পানির অস্তিত্ব টের পেতেই চমকে উঠলো। বলা নেই কওয়া নেই, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। হইহুল্লোরে ক্ষান্ত দিয়ে সবাই নিজেকে ছৈ এর নিচে গুটিয়ে নিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। আর বেশী পথ বাকি নেই। ইশ!এমন পাগলাটে মাস আর একটাও নেই,যখন তখন বৃষ্টি। ভাগ্যিস, কিছুক্ষণের মধ্যেই পাড়ে এসে পৌছে গেলো ওরা।তবে আরও এক ফ্যাসাদ বাকি ছিল বটে, বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কাঁচা রাস্তা কাঁদা মাটিতে ডুবে আছে।ওখানে পা ফেলতেই তা পাতা অব্দি ডুবে যাচ্ছে এবং চুম্বুকের মতো আটকে থাকছে। কি আর করা, ওভাবেই যার যার জুতোজোড়া হাতে নিয়ে এগুচ্ছে সবাই। বৃষ্টির ঝাট অনেকটা কমে আসলেও ভিজিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। টগর টলে টলে এগুচ্ছে। বাজারের সবচাইতে ভারী শাড়িটাই যেন ওর জন্য কেনা হয়েছে। তার উপর ভিজে ওটার ওজন দ্বিগুণ হয়েছে। আবছা অন্ধকারে এক পা বাড়িয়ে দিয়ে অপর পা টেনে তুলতে গেলেই মনে হচ্ছে এই বুঝি তাল হারিয়ে পরে যাবে। রাগ দুঃখ আর হতাশায় ঠোঁট ফুলায় টগর। কোথায় আছে, কেন আছে, কার সাথে আছে সে কথা ভুলে গিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কান্না জুড়ে দেয়। নবাব হকচকিয়ে দাড়িয়ে পড়ে,সাথে অন্যরাও। টগরের চাচাতো বোন এসে ওকে জড়িয়ে ধরে,‘কান্দিস কেনরে পাগলী, ক’দিন পরেই তো আবার মায়েরে দেখবার যাবি।’ টগর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অভিমানী চোখের জল মুছে নেয়। সব কিছু অসহ্য লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে সবাইকে এখানে রেখে পালিয়ে যেতে। আবার ফিরে যেতে সেই চিরচেনা পদ্মদিঘী গাঁয়ে...। *** বাইরে অবিরত ঝমঝম শব্দ, এই মাত্র কোথাও বাজ পড়লো। সন্ধ্যার পরে বৃষ্টির বেগ আবারও তীব্র হয়েছে। সমস্ত নিয়ম রীতি সেরে অবশেষে একটু অবসর সময় পেতেই ঘুমে ঢলে পড়তে চায় টগর। কিন্তু তার সম্মুখে বসে থাকা মানুষটার দিকে ভালোভাবে তাকাতেই ঘুম উবে যায়। পুরো মাথা ন্যাড়া লোকটার! শুধু তাই না, ভ্রু, চোখের পাপড়ি বলতে কিছুই তো নেই! কি অদ্ভুত লাগছে দেখতে তাকে! টগর ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নাক বোঁচা বলে এমন একজনের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো বাবা, মা। নবাব ইতস্তত করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে টগর তাকে দেখে হতাশ। আসলে ওর এই বংশগত আশ্চর্য রোগের কারনে গ্রামের অনেকেই ক্ষ্যাপায়। আড়ালে ব্যাঙ্গ করে ‘নাইড়া নবাব’ ডাকে। এ পর্যন্ত যত বিয়ে ভেঙ্গেছে তা এই রোগের কারনেই। টগরের চোখে তাকিয়ে নবাব গভীর অনীহা দেখতে পায়। বুকের ভেতর কেমন চিনচিন করে উঠে। চোখ ছলছল করে উঠতেই হ্যারিকেনের কেঁপে উঠা আলোর দিকে দৃষ্টি ফেরায় সে,‘ভাল আছ,টগর?’ ‘জ্বী।’ ‘অনেক কষ্ট হইলো সারাদিন। ঘুমাও একটু।’ ‘জ্বী।’বলেই এক কোনে জড়সড় হয়ে শুয়ে পরে চোখ বুঝে টগর। ঘুমটা আবার ফিরে এসেছে। নবাব মৃদু হেসে টগরের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে, দেখতে কি এতোটাই খারাপ সে? যাকে স্বামী হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে ভালোবাসা যায় না? ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক কোনে গুটি শুটি মেরে শুয়ে পড়লেও ঘুম আসে না তার। বিছানায় ফুলের পাপড়িতে ভরা। সেই পাপড়ি শরীরে লাগতেই গা কুটকুট করছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে উঠে বসে নবাব। মাঝরাতে টগরের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ পিটপিট করে তাকাতেই দেখে আলতো আলোতে টেবিলে বসে লেখালেখি করছে নবাব। নাহ, মানুষটা দেখতে এতোটা খারাপ না। গায়ের রং ওর মতো কালো না, ফকফকা সাদা। নাকটাও কি সুন্দর তীরের মতো। দোষের মধ্যে চুল দাড়ি নাই। সবার সব থাকে না। ভাবতে ভাবতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় টগর। আধোঘুমেই অচেনা এক ভালোলাগা ছড়িয়ে পরে সমস্ত মনে... নবাব একমনে কাগজে কলম ঘষে যাচ্ছে। তার একটি গোপন গুণ রয়েছে যা কিনা কেউ জানে না। সে ছবি আঁকতে ভালোবাসে। এখন টগরের ঘুমন্ত অবয়বটা ধরে রাখার প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছে। কি সুন্দর নিষ্পাপ মুখ! যেন রূপকথা থেকে সদ্য উঠে আসা ভোলাভালা এক কিশোরী রাজকন্যা। পাপড়িহীন দু’চোখে অদ্ভুত ভালোবাসা নিয়ে টগরের দিকে তাকিয়ে থাকে নবাব।টগর জেগে থাকলে দেখতে পেতো,পাপড়িহীন চোখ ও অনেক সময় সুন্দর লাগে, যদি সে চোখে ভালোবাসা থাকে। *** নিত্যদিনের সকাল থেকে ভিন্ন এক সকাল অপেক্ষা করছিলো টগরের জন্য। সব নতুনের মাঝে সেও নতুন রূপে আরেক টগর যেন। গাঁয়ের সেই চপলা কিশোরীকে নিজের ভেতর দমিয়ে রেখে ভীত চোখে সংসারটাকে দেখে সে। শাশুড়ি, দাদী শাশুড়ি, নবাব আর সে। এই ৪ জন নিয়েই সংসার। নতুন বউ দেখতে দল বেঁধে গ্রামের লোকজন আসছে। টগরের শাশুড়ি বেশ জোর গলায়ই বলে যায়,‘পদ্মদিঘী গাঁয়ের রত্নটারেই নিয়া আসছি আমার নবাবের জন্য।’ এ কথা শুনে টগরের ভীষণ লজ্জা হয়।আর হবেই না বা কেন? ওদের গাঁয়ের দস্যি মেয়েই যে সে। রত্ন হল কবে আবার?! নাতবৌ ভীষণ পছন্দ হয়েছে রাফিয়া বেগমের। রং একটু ময়লা,ও কিছু না। চেহারা ভরা এত মায়া থাকলে রং দেখে কে? মেয়েটা কে দেখে তার অতীত মনে পরে গেলো। তার যখন বিয়ে হয়, বয়স ছিল সবে ১১ কি ১২, কিছুই বুঝতেন না। তিনি আর তার স্বামী দুজন মিলে টো টো করে পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াতেন। দেখলে মনেই হতো না তারা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। ঝগড়া ঝাটি হলে দুজনই আড়ি দিতেন। তার হাতের কতো লাঠি পেটা যে খেয়েছেন তার স্বামী। নিজের অজান্তেই ফোকলা দাঁতে হেসে উঠেন রাফিয়া বেগম। তারপর ছেলের বউ এর উদ্দেশে হাঁক ছাড়েন,‘ও বউ,ও নবাবের মা, এদিকে আসো।’ শাশুড়ির ডাকে সাড়া দেয় ছেলের বউ,’জী আম্মা।’ ‘আমার নাত বউরে নিজের মতো চলতে বলবা। কোন ভয় ভীতি যেন না রাখে মনে। এখন আমরাই ওর আপন। ছোট মানুষ, ভুলভালগুলা বুঝাইয়া কইবা। একবার না বুঝলে বারবার বুঝাইবা। তবুও কটু কথা কইবা না,বুঝলা?’ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে মৃদু হাসেন নবাবের মা। *** ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের জড়তা কাটিয়ে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠে টগর। খুঁজে পায় সেই পুরোনো নিজেকে। শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে তার ধারনা ছিল জেলখানার ন্যায়। সেই ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত করে সংসারের মানুষগুলো পরম ভালোবাসায় বরণ করে নিলো ওকে। বাবা মায়ের কথা মনে হলেই শাশুড়ি নাইওর পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যতদিন খুশি থেকে আসছে সে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এখন আর চিরচেনা ঐ গাঁয়ে মন টেকে না ওর।সারাক্ষণ মনে হয়, কখন ফিরবে নিজের সংসারে। মেয়ের ছটফটানি দেখে ভীষণ ভাল লাগে টগরের মায়ের। শেষ পর্যন্ত তাহলে উড়ন্ত পাখিটা নিজ বাসা খুঁজে নিলো। এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিনগুলো।সময় অনেক কিছু গুছিয়ে দেয়, তেমনি গুছিয়ে দিয়েছে টগরকে। নিজের চেনা জগৎ এ সঙ্গী করে নিয়েছে আরেক জন মানুষকে। নবাব। কেউ জানে না, কি পরম ভালোবাসা এই মানুষটার অন্তরে বহমান!ভাগ্যিস ওর সাথে বিয়ে হওয়ার আগের প্রস্তাবগুলো সব ভেস্তে গিয়েছিলো! নাহলে কোথায় পেত এত ভালোবাসা? এমন একটি পরিবার? টগরের কত্ত কত্ত যন্ত্রণা যে সয়ে যায় নবাব। রাত বিরাতে মেয়েটা কান্না জুড়ে দেয় মায়ের কাছে যাবে। আবার সকাল হলেই বলবে,‘না যাব না, আপনাগো জন্য মায়া লাগতেছে।’ সবচাইতে কঠিন যন্ত্রণা হচ্ছে ভরদুপুরে বেরিয়ে পরে অন্যের গাছে ঢিল ছুঁড়ে ফল ফলাদি চুরি করা। নবাবের করুন আকুতি ওখানে টেকে না। এর জন্য দাদীকে দায়ী করে নবাব। বুড়ির লাই পেয়ে পেয়ে টগর এত দুষ্ট হয়েছে। বুড়ি কে কিছু বললেই হলো, কণ্ঠে ঝাঁজ ঝরিয়ে বলবে,‘তোর বউ কি এমন জ্বালায় তরে? এইটাই সামাল দিতে পারস না। মাথা ভর্তি খালি গোবর। হে হে হে।’ সেই সাথে যুক্ত হয় তার মা এবং টগরের চাপা হাসির শব্দ। ক্ষীণ রাগ দেখিয়ে বেড়িয়ে যায় নবাব। যেতে যেতেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে,মনে হয়, জীবনটা আল্লাহ্পাক সত্যি অনেক সুন্দর করে গড়েছেন। *** দেখতে দেখতে ৭ মাস অতিবাহিত হল। এরমধ্যে সংসারে নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছে টগর। রান্না বান্নায় হাত পেকেছে। স্বামী, দাদী এবং শাশুড়ির যত্ন-আত্তি করছে। কখন যে এত দায়িত্বশীল হয়েছে পাগলাটে মেয়েটা, নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। তবে কিছু কিছু ছেলে মানুষী থেকেই যায়, যেমন দাদীর মুখে রূপকথার গল্প শুনতে শুনতে তার কোলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে যাওয়া। বটে যাওয়া হাতে নাতবৌয়ের চুলে বিলি কেটে দেন রাফিয়া বেগম। এরপর খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলে উঠেন,‘খালি কি ঘুমাইলেই হইব গো নাত বউ,আমগোরেও খেলনা পাতি আইনা দেও খেলি।’ হাপুস হুপুস নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমায় টগর।দাদীর কথা শুনলে হয়তো লজ্জায় লাল হয়ে যেত। রাফিয়া বেগমের মুখে চন্দন ঝরিয়ে সেই শুভ ক্ষণ একদিন দরজায় টোকা দিল ঠিকই। এক ফুরফুরে বসন্তের শুভ্র সকালে, যখন সৌরভ ছড়িয়ে ফুটছে রং বেরঙা ফুলগুলো। হাহাকার অথবা ভালোবাসার সুর বেঁধেছে কোকিল।উঠোনের এক পাশ যখন ভেসে যাচ্ছে শিমুলের লাল আভায়,তখনি আরেকটি সুখ বার্তা নিয়ে এলো প্রকৃতি।রাফিয়া বেগম মিষ্টি আনিয়ে বিলিয়ে দিলেন সমস্ত গ্রামে। কি সৌভাগ্য তার,নাতীর ঘরের পুতি দেখে যাচ্ছেন। আপন মনে হাসেন তিনি। সেই সাথে হাসে সমস্ত গ্রাম। এক নবজাতকের আগমনের আভাসে ভরপুর হয়ে উঠে বসন্ত... *** টগরের বেশ খেয়াল রাখছে সবাই। কখন কি লাগবে, কি খাবে, সে নিয়ে শাশুড়ির চিন্তার শেষ নেই। দাদীর এত্ত এত্ত উপদেশ,‘ও নাত বউ, সন্ধ্যাকালে একলা কোথাও যাইবা না। ঘাটলায় যাওয়ার দরকার নাই, নাইতে হইলে কল পারে নাইবা। নামাজ পড় গো বেটি, আল্লাহর কাছে শুকরগুজার তো করতে হইব নাকি?’ এরকম আরও কত কিছু! আর নবাব? সেতো আনন্দে প্রায় আত্মহারা। অনাগত সন্তানের কী নাম রাখবে,ওসব ভেবেই দিনের শুরু আর শেষ তার। খেলনা পাতি এনে ঘর ভরিয়ে ফেলেছে। এত ভালোবাসা পেয়ে টগরের চোখ ভিজে উঠে। মনে হয়,কোন সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। গ্রামেরই আশু খালা, সবাই আশু পাগলী ডাকে। অদ্ভুত ঘাগরা জাতীয় রং-বেরঙের পোশাক পরে কিশোরীদের মতো পুরো গ্রাম চষে বেড়ায় বৃদ্ধা। টগরের সুখবর জানতেই দৌড়ে ছুটে আসে সে। মাথা দুলিয়ে হেসে হেসে দু’আ করে যায় টগরের জন্য। করবে নাই বা কেন? এই মেয়েটা তাকে ‘আশু পাগলী’ না ডেকে ‘আশু খালা’ ডাকে। ক্ষুধা পেলে এখানে আসলে কখনো খালি পেটে ফিরে যেতে হয়নি তাকে। পাগলরাও যে ভালোবাসা বোঝে। এভাবেই উজাড় করা ভালোবাসা নিয়ে একদিন চলে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত... তবে বয়স অল্প হওয়াতে নানান রকম জটিলতার সম্মুখীন হয় টগর। উপায়ান্তর না দেখে হাসপাতালে ছোটে সবাই। কিন্তু ওখানেও কিছু করার ছিল না। বুড়ো ডাক্তার শুধু চোখ লাল করে নবাব কে বলছিলেন,‘এত অল্প বয়সে কেন বিয়েটা করলেন? আর কেনই বা সন্তান নিতে গেলেন?আর কতো কাল এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলবেন আপনারা?’ শেষের কথাগুলো নবাবের মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন। নবাব পাগলের মতো করিডোর ধরে পায়চারি করছে। ডাক্তার বলেছে টগর এবং সন্তান, দুজনের জীবনই সঙ্কটে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের কারনে ডেলিভারি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। নবাবের কিছু ভাল লাগছে না, হাত পা থর- থর করে কাঁপছে। ঘাম হচ্ছে, সেই ঘাম ঝরে পড়ছে কপাল বেয়ে। দাদী এক কোনে দু’য়া দুরুদ পড়ছে আর চোখ মুছছে। মায়ের কপালে হাত দিয়ে বিলাপ সমস্ত হাসপাতালে যেন বিষন্নতা ছড়িয়ে দিয়েছে। টগরের বাবা মা এই মাত্র এসে পৌছালো। এসেই তারা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। কতক্ষণ কেটেছে সঠিক ধারণা নেই নবাবের। হ্যাংলা মতন এক ডাক্তার এসে জানাল, মা কে বাঁচাতে না পারলেও সন্তান বেঁচে গেছে, এবং সুস্থ আছে। কথাগুলো ওর কর্ণপাত হল না। সে একটু আগের বুড়ো ডাক্তারকে খুঁজছে, সেই সঠিক খবর দিতে পারবে। এই হ্যাংলা ডাক্তার হয়তো ভুল করছে..। নবাবের হাতে ফুলের মতো ফুটে আছে ‘মায়া’। মেয়ে হলে ‘মায়া’ নামই ঠিক করেছিলো সে আর টগর মিলে। টগর বলতো,‘দেখবেন, আমাদের ‘মায়া’ আমাগোরে মায়ায় মায়ায় বাইন্ধা রাখবো।’ টপটপ করে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়েই মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে নবাব। মেয়েটার চোখ দুটো কি টগরের মতো হয়েছে? হ্যাঁ,গায়ের রং টাও শ্যাম বর্ণ, একদম মায়ের মতো... মেয়ের কপালে চুমু খায় নবাব। পাশেই হাহাকার আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। বুক চাপড়ে কেঁদে যাচ্ছে টগরের জগৎ ঘেরা মানুষগুলো... টগর চলে যেতেই অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিলো কিছু মানুষের জীবনগতি।বিষাদে ভরে উঠেছিলো পদ্মদিঘী গাঁ।অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আত্মগ্লানিতে প্রলাপ বকে টগরের মা এবং বাবা। আর নবাব?চারপাশের চাপা কান্না গলা টিপে ধরতে চায় ওর।আগের মতো সুখগুলো উড়ে বেড়ায় না এ বাড়ির আঙিনায়।মানুষগুলো বড্ড পাল্টে গেছে।আশু পাগলী রোজ এসে টগরকে না পেয়ে বিড়বিড় করে ফিরে যায়।উঠানের কোনে পরে থাকা ফুলের পাপড়ি কুড়িয়ে কেউ মালা গেঁথে রাখে না নবাবের জন্য।‘দাদী গল্প বলেন না’ বলে বায়না ধরে না কেউ। শাশুড়ির মাঝে মায়ের মুখ খুঁজে জড়িয়ে ধরে না আর অবুঝ মেয়েটা। তবুও সব কিছু এগিয়ে চলে, ‘মায়ার’ মায়ায়।টগর চলে গিয়েও নিজের একটি অংশ রেখে গেছে। মায়াবতীর ‘মায়াকে’ নিয়েই বেঁচে থাকার প্রয়াসে আরেকটি ভোরের অপেক্ষায় দিন গোনে নবাব। এরপর...... এক শুভ্র ভোরে টুকটুক পায়ে এক পুতুল মেয়ে হেটে বেড়ায় পুরো উঠোন।ছোট্ট হাতে মুঠো করে তুলে আনে ফুলের পাপড়িগুলো। কিছু হাতে রয়,কিছু হাত গলে ঝরে যায়।ওগুলো আর তুলে নেয় না নবাব।না হয় টগরের জন্যই রইলো... উৎসর্গঃ টগর এবং নবাবদের,যারা আমাদের আশে পাশেই আছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২২৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now