বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৭

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-২৭ মাজহারুল মোর্শেদ কন্যাকুমারী মন্দির অনেকটা পথ পেরিয়ে, ঘুরে ঘুরে কখন যে বেলা গড়িয়ে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে সেটা টেরই পেলাম না। এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করছে। তাই আর দেরি না করে ফিরে আসছি হোটেল ‘সান ওয়ার্ল্ড সি-বিচ’ (Sun World Sea beach) আমরা কোথাও যেতে চাইলে বোউদি মুখ ভেংচিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছে। কিন্থু আমাদের ফেরার পথে হাতের ঠিক ডানে ভগবতী আম্মমান টেম্পল বা কন্যাকুমারী মন্দির যাওয়ার প্রবেশদ্বার। বাইরে অনেক দোকান রয়েছে যেখানে সমুদ্রের পাশে যা যা পাওয়া যায় তার সবকিছুই এখানে পাওয়া যাচ্ছে। মন্দিরের সাইনবোট দেখেই বোউদির চকচক করে উঠলো, তার সব ক্লান্তি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলো। আমাদের কারও সাথে কোন কথা নেই উনি হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন সেই রাস্তায়। কি আর করার আছে, আমরাও তার পিছে পিছে হাঁটা শুরু করলাম। আমরা পৌছে গেছি মন্দির প্রাঙ্গণে। এই মন্দির দর্শন করার একটা নিয়ম রয়েছে। ছেলেদের জামা খুলে খালি গায়ে দর্শন করতে হয়। আমি অর্ণবকে বললাম তুই সবাইকে নিয়ে ভেতরে যা আমি তোদের সব পাহারা দিচ্ছি। উর্মীও মন্দিরে গেলো না। আমরা দু’জনে মন্দিরের বাহিরে সমুদ্রের ধারে বসে রইলাম। এখানে প্রচুর লোকের সমাগম ঘটেছে। অনেকে সাগরের পানিতে গোসলও করছে। আবার কয়েক জন বৃদ্ধকে দেখলাম তাদের মাথায় জঠাচুল, মুখভর্তি দাঁড়ি-মোচ পরনে গেরুয়া ধুতি। স্নান সেরে তারা পরনের ভেজা কাপড় দু’হাতে ধরে ঘুড়ির মতো বাতাসে উড়িয়ে শুকাচ্ছে। আমি ধরে নিলাম এনারা মন্দিরের ভক্ত-সন্নাসী। তাদের কাছে মন্দির সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বলেন- ‘কন্যাকুমারী মন্দির ৫১ টি শক্তিপীঠের একটি। মহাদেবী এখানে কন্যারূপে পূজিত হয় বলে এই মন্দিরের নাম কন্যাকুমারী। পৌরাণিক কাহিনী মতে, কন্যাকুমারী হলেন দেবী (পার্বতী) কুমারী অবতার। মহাশক্তির এই রূপটি বাণাসুর নামক অসুরকে বধ করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিল। কন্যাকুমারী দেবী কিশোরী হিসাবে শিবের প্রতি অগাধ ভক্তি ছিলো। দেবী কন্যাকুমারী দেবাবতার শিবকে বিবাহ করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের নির্দিষ্ট লগ্নে শিব সেখানে উপস্থিত হতে না পারায়, নারদ মুনির হস্তক্ষেপে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে দেবী আজীবন চিরকুমারী রূপেই থেকে যান। জনশ্রæতি রয়েছে যে এখনও মন্দিরে দেবীর পদচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে’। মন্দিরের বাইরে অনেক প্রসাদের দোকান রয়েছে যেখানে নানা রকম প্রসাদ পাওয়া যাচ্ছে। মন্দির থেকে বেরিয়ে আমরা সোজা চলে এলাম ‘হোটেল তাজ’ এটা একটা বাঙালি হোটেল। হোটেলের কর্মচারিাও বাঙালি। এখানে সাদাভাত ডাল সামুদ্রিক মাছ আলু ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করে আমরা ফিরে এলাম SunWorld Sea beach ‘হোটেলে একটু রেস্ট নেয়ার জন্য কারণ বিকেলে সূর্যাস্ত দেখার জন্য যেতে হবে সমুদ্র তীরে। শেষ বিকেলের মায়াময় আলো ছড়িয়ে পড়েছে কন্যাকুমারীর গায়ে। তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে আমারা সূর্যাস্ত দেখার জন্য কন্যাকুমারীর সমুদ্র সৈকত যাচ্ছি যেখানে আরব মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর একই মোহনায় এসে মিলে গেছে। হঠাৎ কেন জানি বোউদির সৈকতে যাওয়ার সখটা উথলে উঠলো। বোউদি রেডি হচ্ছে দেখে অর্ণব একটা মুচকি হাসি দিয়ে কৌতুহলে আমার দিকে তাকালো। উর্মী ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সেও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে হয়তো তার মাকে নিয়ে আমার অনুভুতির একটা যোগ্যতম যাচাই করার জন্য অপেক্ষমান। হাজার হলেও মা বলতে কথা। আর মাকে নিয়ে কেউ নূন্যতম বিরক্তি বোথ করুক এটা পৃথিবীর কোন সন্তানেরই কাম্য নয়। আমার আর এতোটু বুঝতে বাকি রইলো না যে, অর্ণবের উপর প্রচণ্ড একটা অভিমানের স্তর জমে উর্মীকে বিষে বিষে নীল করে তুলছে। আমিও সেটা নিরসণের জন্য একটা উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় আছি। SunWorld Sea beach থেকে সমুদ্র হেঁটে যেতে মিনিট পাঁচেক লাগে। হোস্টেল থেকে নেমে দাদা-বোউদিসহ পুরোটিম হাঁটতে হাঁটতে কচ্ছপ গতিতে আগাতে শুরু করলাম। কন্যাকুমারীর ত্রিবেণী সঙ্গম। অর্থাৎ একই মোহনায় তিন সাগরের মিলন। কি অপূর্ব সে দৃশ্য! চোখ জুড়িয়ে যায়। ভিন্ন ভিন্ন রঙে তিন সাগরের মাতাল ঢেউ এসে আঁচড়ে পড়ছে একই মোহনায়। এতো বিশালতা নিয়েও সাগর একাকী চলতে পারে না, অন্যের উপর নির্ভশীল হয়ে শেষে কিনা ঘর বাঁধতে হয় অন্যের সাথে একই মোহনায়। আহা! প্রকৃতির কি অমোঘ নিয়োমের বন্ধন। ভালোবাসার কি অপূর্ব মিলন। সাগরের দিকে সোজাসুজি তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সামনে ভারত মহাসাগরের হালকা নীল জলের ঢেউ, বামে বঙ্গোপসাগরের ঘোলাটে জলের ঢেউ আর ডানদিকে আরব সাগরের স্বচ্ছ সাদা জলের ঢেউ যেন সব দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একই সাথে, একই মোহনায় এসে হারিয়ে যায় মিলনের সুখে। ত্রিবেণী সঙ্গমে সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকদের উঁপচে পড়া ভিড়। আজকে হালকা মেঘের কারণে সূর্যাস্তের দেখা পাওয়াটা একটু কঠিণ হয়ে পড়ছে। কিন্তু তাতে কি? মনের উৎসুক চোখ তো তাকিয়ে আছে দিগন্তের শেষ প্রান্তে যেখানে সমস্ত দিনের কর্মময় অধ্যায়ে এক রঙিন আলোকময় জবনিকার পরিসমাপ্তি। কি অপরূপ সুন্দর দৃশ্য! দারুণ লাগছে দারুণ! হলুদ বরণ মেঘের ফাঁকে রক্তিম সূর্য়ের ক্লান্তির অবসান, একেবারে দৃষ্টির সামনে খুব কাছ থেকে সূর্যকে পাওয়া। এতোটাই কাছাকাছি মনে হচ্ছে যে, হাত বাড়ালেই বুঝি ছোঁয়া যাবে। এভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে দিনের আলো বিদায় নিয়েছে সেটা বুঝতে পারিনি। অস্তমান সূর্যটাকে খুব কাছে পাওয়ার জন্য, খুব আপন করে পাওয়ার জন্য কোলাহল ছেড়ে সবার কাছ থেকে আমি একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। যেখানে ভারত মহাসাগরের ঢেউ, আর আমার জন্মভুমি বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এসে আলিঙ্গন করছে। আমি বাম হাতে ভারত মহাসাগরের ঢেউ আর ডান হাতে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ স্পর্শ করে উভয় সাগরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে দেখ হে সাগর, সব ভালোবাসা শুধু তোমাদের একার দখলে নয় আমাদের মাঝেও কম নয়। দিনের আলো নিভে গেলে একএক করে পর্যটকরা সবাই চলে যাচ্ছে, উর্মীও তার মা-বাবার সাথে চলে গেছে। এভাবে কতোটা সময় পেরিয়ে গেছে সেটা টেরই পাই নি। হঠাৎ বিশাল একটা ঢেউ ছলাৎ করে আঁচড়ে পড়ে আমার পরনের কাপড় সব ভিজিয়ে দেয়। আমি পিছন ফিরে দেখি সমুদ্র তীরে কেউ নেই, আমি একা। আমার খুব হাসি পেতে লাগলো, কি একাকিত্ব, কি ভষিণ একাকিত্ব! মাথার উপর খোলা আকাশ, দৃষ্টির সামনে বিশাল সমুদ্র, চারিদিকে শূন্যতা- বিশাল শূন্যতা, দু’হাত বাড়িয়ে সাগরকে আলিঙ্গন করে কেবলি মনে হয় আহা! কি সুন্দর, কি পবিত্র, কি মায়াময়, কি নিষ্পাপ এ সাগরের ঢেউ। জলের সাথে ঢেউ এসে কথা কয়, কথা কয় আপন মনে, একান্ত আপনায়। হয়তো এ কারনেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘মরিতে চাহিনা আমি-এ সুন্দর ভুবনে’। হু-হু বাতাস যেন উড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে উত্তাল ঢেউকে। সমুদ্রের মহামিলনে উঁচু ঢেউয়ের আছড়ে পড়া রূপ, তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিবেকানন্দ রক, ঢেউয়ের দোলায় ভেসে চলা রঙিন বোট, মাছ ধরার ট্রলার, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, উড়িয়ে যাওয়ার মাতাল বাতাস সবকিছুই মন কেড়ে নেয়। ঝিরঝিরে শীতল বাতাস, নীল জলরাশির বুকে অলস সময়ে অনেক দিনের লালিত স্বপ্নের সীমানা ছুঁতে মহাসমুদ্রের মহামিলনে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে স্বপ্ন পূরণের শিহরণে পুলকিত আজ দেহ-মন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now