বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-১৯

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-১৯ মাজহারুল মোর্শেদ আলেপ্পি (Alleppey) কেরল রাজ্যের ১৪টি জেলার মধ্যে প্রকৃতির রূপে ভরপুর আলেপ্পি জেলা। দৃষ্টিনন্দন সকল প্রাকৃতিক সম্পদের উপস্থিতির জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে নারিকেলের ছোবড়া থেকে তন্তু তৈরীর কারখানা। আজকের পরিকল্পনা ছিলো আলেপ্পির ব্যাকওয়াটারে নৌকা ভ্রমণ, তারপর ভেম্বনাদ লেকে হাউসবোটে রাত্রিযাপন। পরিকল্পনা করার সময় একটা বড় প্রশ্ন ছিলো হাউসবোটে থাকব, নাকি হোটেলে ফিরবো? অনেক ভাবনা-চিন্তার পর বুঝলাম, হাউসবোটে না থাকলে ভেম্বনাদ লেকের জলে ভেসে রাত কাটানোর স্বপ্নটা-স্বপ্নই থেকেই যাবে। তাই হাউসবোটকেই রাত্রি যাপনের সঙ্গী হিসেবে বেঁচে নিলাম। থেক্কাডি থেকে আলেপ্পির (আলাপ্পুঝা) দূরত্ব প্রায় ১৩৮ কিমি। গাড়িতে সব মিলিয়ে ৩ থেকে ৪ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। এখানে আলেপ্পুঝা সৈকত (Alappuzha Beach), ঐতিহাসিক জেটি, পাথিরামাল দ্বীপ, সেন্ট এ্যান্ড্র ব্যাসিলিকা, ভেম্বানাদ লেক, এসকল প্রকৃতিক নৈস্বর্গ ও ঐতিহাসিক নির্দশণ দৃশ্যমান বলে একে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ বলা হয়। আলেপ্পিতে হাউসবোট ভ্রমণ, ক্যায়াকিং (ডিঙ্গি নৌকায় বৈঠা বেয়ে ভেসে বেড়ানো), মাছ ধরা, পাখিদের সাথে খেলা করা এসব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে সমুদ্র সৈকতে ভেসে সেই ক্লান্তি দূর করা যায়। প্রকৃতি প্রেমিকদের কাছে এর আকাশ-বাতাস, পাহাড়-ঝরনা, ফুল-পাখির ভালোবাসার এক মিষ্টি আবেশ ভেসে বেড়ায়। এটি প্রকৃতির খুব কাছাকাছি এবং মহাবিশ্বের সৌন্দর্যকে পূর্ণরূপে তুলে ধরে। এর সবুজ শ্যামল ভূদৃশ্য এবং শান্ত পরিবেশের কারণে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা শুটিংয়ের জন্য মুন্নারের এমন জায়গাগুলোতে এসে ভিড় জমায়। বাদবাকি সব ঠিকঠাক আছে, তাই সকাল সকাল আমরা বেরিয়ে পড়লাম আলেপ্পির দিকে। পাহাড়ী এলাকা দিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশের মনোরম দৃশ্য আপনাকে মাঝে মধ্যে এমনিতে থামিয়ে দেবে। সকালে রওনা হওয়ার পিছনে যে কারণটা ছিলো আমরা যেন দুপুরের মধ্যে আলেপ্পি পৌঁছে হাউসবোটের যাত্রা উপভোগ করতে পারি। আলেপ্পি যাওয়ার পথে রাস্তার দু’ধারে ছোট বড়ো অনেক পাহাড় আর দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগান। দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ি প্রথমে এসে দাঁড়ালো একটা চা ফ্যাক্টরির কাছে। কাঁচা চাপাতার মনভোলানো সৌরভ আর ১৩০ রুপি পার কেজি চা পাতা। ফ্যাক্টরিতে কম দামে ফ্রেস চাপাতা কেনার জন্য ড্রাইভার রবীন যে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা তার চাপাতা কেনার দৃশ্য দেখেই বুঝতে পারলাম। আমরাও ফ্যাক্টরির ভেতরে প্রবেশ করলাম। তার আগে ফ্যাক্টরির প্রধান গেটে কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আসতে হলো। সাধারণত আমরা দোকান থেকে যে চাপাতা কিনে বাসায় নিয়ে গিয়ে মজা করে চা পান করি তা কোন সহজ সাধ্য কাজ নয়। চা বাগানের কচি পাতাগুলোকে পানাহারের যোগ্য করে তোলার জন্য হাজারো মানুষের শরীরের ঘাম মাথা থেকে গড়িয়ে পায়ে এসে পড়ে। এখানে এস সেটাই দেখতে পেলাম। বিশাল আকৃতির একটা যন্ত্রের উঁচু প্রান্তে চাপাতাগুলোকে ঢেলে দেয়া হচ্ছে আর সেই চা পাতাগুলো ধাপে ধাপে মেশিনের এক প্রান্ত খেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে পানাহারের যোগ্য চাপাতায় রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে এখানে মেশিন দিয়ে বেশ কয়েক প্রকার চা বেড় হচ্ছে। কতোগুলো বেশ মোটা আকারের আবার কতোগুলো চিকন। ফ্যাক্টরির পাশেই রয়েছে চায়ের শপ। যেখানে নরমাল চা পাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফ্লেভারের গ্রিন টি পাওয়া যাচ্ছে। এখানে আধাঘন্টার মতো ব্রেক নিয়ে আবার চলতে শুরু করলো আমাদের গাড়ি। এতক্ষণ আমরা রাস্তার দুপাশে চায়ের বাগান দেখতে দেখতে আসছিলাম কিছুদূর আসার পর দৃশ্যপট কিছুটা বদলে গেলো। এখন রাস্তার দু’পাশে সারি সারি পাইন গাছ আর ঘন জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি। পথে যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়লো একটা ঝরনা। খুব বেশি উঁচু পাহাড় না হলেও ঝরনার শুভ্র জলরাশি হালকা রোদের ঝলকে যেন মুক্তোর দানার মতো ঝলমল করছে। অনেক পর্যটক সেখানে দাঁড়িয়ে ঝরনার এই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছে তাই আমিও লোভ সামলাতে পারলাম না। অবশ্য বোউদি আমার দিকে কেমন বিরক্তমাখা রক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। আমি গাড়ি থেকে পা নামাতেই উর্মী এক লাফ দিয়ে নিচে চলে এলো। অর্ণবকেও দেখলাম দু’হাত দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে নিচে নেমে এলো। হয়তো এতোক্ষণ সে ঘুমের দেশে ডুবেছিলো। উর্মী দু’হাতে আমাদের দু’জনার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ঝরনার দিকে। মূল রাস্তা থেকে ঝরনাটা দেখে এতোটাই কাছে মনে হচ্ছে যেন হাত বাড়ালে ছোঁয়া যাবে। কিন্ত বাস্তবে তা নয়, ঝরনার কাছে যেতে হলে পাহাড়ি আঁকা বাঁকা ও উঁচু নিচু রাস্তা পেরিয়ে ঘুরে ফিরে প্রায় অর্ধ কি.মি তো হয়েই যাবে। কাজে ঝরনার কাছে যাওয়ার ইচ্ছেটাকে আপাতত দমিয়ে রেখে আমরা গাড়িতে ফিরে এলাম। আমাদের গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। এবার সত্যি সত্যি আমিও বোধয় একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ খুলে দেখি ছোট বড়ো অনেকগুলো ছোট বড় বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইলোনা যে, আমরা চলে এসেছি আলেপ্পি শহরে। ড্রাইভার রবীন বেশ খানিকটা জায়গা ঘুরিয়ে আমাদের নিয়ে এলো শ্যালোম বিচ হোটেলে। আমরা সবাই ফ্রেস হয়ে হোটেলে হালকা নাস্তা ও গরম চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে। ভারত মহাসাগরের তীরে আলেপ্পি সমুদ্র সৈকত। অনেক বড় সৈকত দেখলাম এটি আর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে। নৗকা ভ্রমণের জন্য যেখান থেকে নৌকাগুলো ছাড়ে সে জায়গাটা সামান্য একটু দূরে। আমরা একপা দু’পা করে এগিয়ে যেতে যেতে পৌছে গেলাম সেখানে। একটা বোটে সাধারণত ৭-৮ জন যাওয়া যায়, কিন্তু আমরা পাঁচ জনের জন্য ছোট একটা বোট বুক করে নিলাম তিন থেকে চার ঘন্টার জন্য। একটু দরদাম করেই সেটা করতে হলো কারণ নৌকার মাঝিগুলো একেজন পর্যটকের কাছে একেক রকমভাবে ভাড়া আদায় করে। আমাদের টার্গেট হলো মোটামুটিভাবে গোটা সৈকতটাকে প্রাণ ভরে উপভোগ করা। আমাদের নৌকা ছেড়ে দিলো সৈকতের দুপাশে সারি সারি নারকেল গাছ, মাঝখানে শান্ত জলের বুক চিঁড়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের ছোট্ট বোটখানা। তবে মাঝে মাঝে দু’একটা বড় ঢেউ এসে বুকের ভেতরটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বিশাল সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট নৌকাখানি দু’পাশে এলে দুলে দোল খাচ্ছে। আর যখনি নৌকাটা ঢেউয়ের দোলায় একটু বেশি ঝুকে পড়ছে অমনি বোউদির মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে আসছে হায় ভগবান! ভ্রমণটা আরো সুন্দর হয়ে উঠেছিল যখন মাঝিভাই কফি ও স্ন্যাকসের জন্য বোটটা ছোট্টএকটা দ্বীপে এসে থেমে গেলো। সেটা একটা দ্বীপ, কিন্তু দেখে মনে হলো না কারণ সেখানে এতোটাই মানুষের ভিড় যে কেউ মনে করতে পারে এটা একটা ছোট্ট শহর। কড়-কড়ে মাছভাজা, কাকড়া ভাজা, গরুর সিক কাবাব আর গরম কফির মনভোলানো গন্ধ যেমন লোভনীয়, তেমনই নতুন চমক ছিলো ওদের পোষা ঈগলের সাথে খেলা করা। ভারতের কোনো এলাকায় প্রকাশ্যে এভাবে গরুর কাবাব বিক্রি হচ্ছে এবং সবাই তা খাচ্ছে এটা অবাক করার মতো বিষয়। দ্বীপ ছেড়ে আমরা ফেরার পথে। কী এক নয়নাভিরাম দৃশ্য! শান্ত জলের স্নিগ্ধ ঢেউ, চারিদিকে সবুজের সমারোহ সারিসারি জলযান আর আমরা ভেসে বেড়াচ্ছি দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির উপরে। যেদিকে তাকাই সাদা ঢেউয়ে শুধু রূপালি আলোর ঝলকানি। নৌকার একেবারে সামনে যদিও যাওয়ার কোন অনুমতি নেই তবে বোট চালককে অনেকবার অনুরোধ করে অতি স্বল্প সময়ের জন্য একাই যাওয়ার অনুমতি মেলে। দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির যতোদূর চোখ যায় শুধুই জলের ঢেউ। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঘোলা জলে হাত ভিজিয়ে কীবনের সাথে সমুদ্রের একটা মিল খোঁজার চেষ্টা করছি। দেখতে দেখতে আমরা ফিরে এলাম গন্তব্যে। হোটেলে এসে লাঞ্চ সেরে একটু রেস্ট নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম ভেম্বনাদ লেক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now