বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
আহমেদ উল্লাহ্র সাঁঝের সবিতা: বিরহ, অন্বেষণ ও না-পাওয়ার নান্দনিক উপাখ্যান
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
বাংলা কথাসাহিত্যে প্রেমের উপন্যাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু সব প্রেমের গল্প মিলনের গল্প নয়; বরং অনেক সময় না-পাওয়া, অপেক্ষা, অন্বেষণ, স্মৃতি ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই প্রেম তার গভীরতম সৌন্দর্য প্রকাশ করে। আহমেদ উল্লাহ্ রচিত সাঁঝের সবিতা সেই ধরনের এক ব্যতিক্রমী প্রেমকেন্দ্রিক উপন্যাস, যেখানে প্রেম কেবল দুজন মানুষের পারস্পরিক আকর্ষণের নাম নয়; এটি হয়ে ওঠে এক অন্তহীন অনুসন্ধান, এক অমোচনীয় আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরার মানসিক অভিযাত্রা। উপন্যাসটির সূচনাতেই যে দীর্ঘ অন্বেষণের চিত্র পাওয়া যায়—“কালের সীমাহীন পথ” পেরিয়ে লোকালয়, হাওড়-বাওড়, গিরি-অরণ্য, মরু-ময়দান, সাগর-নদীর তীর, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-স্টেশন ও অলি-গলিতে প্রিয়তমাকে খুঁজে বেড়ানো—তা পাঠককে বুঝিয়ে দেয়, এখানে প্রেমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘পাওয়া’ নয়, বরং ‘খোঁজা’। এই খোঁজই ধীরে ধীরে উপন্যাসের জীবনদর্শনে পরিণত হয়েছে।
সাঁঝের সবিতা নামটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সাঁঝ’ দিনের শেষপ্রহর, যেখানে আলো ও অন্ধকার পাশাপাশি অবস্থান করে। আর ‘সবিতা’ শব্দের সঙ্গে সূর্যের, আলোর এবং সৌন্দর্যের একটি প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নামের মধ্যেই যেন উপন্যাসের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বটি নিহিত—আলোকে খোঁজা হচ্ছে সন্ধ্যার অন্ধকারে। প্রেমের কাঙ্ক্ষিত মানুষটি যেন সেই হারিয়ে যাওয়া আলো, যার সন্ধানে জীবন ক্রমশ সাঁঝের দিকে এগিয়ে যায়। নামটি তাই শুধু কোনো চরিত্রের পরিচয় নয়; এটি উপন্যাসের আবহ, অনুভূতি ও দার্শনিক তাৎপর্যেরও প্রতীক। প্রেমিকের জীবন যত এগোয়, প্রাপ্তির সম্ভাবনা যেন তত ক্ষীণ হয়ে আসে; কিন্তু অনুসন্ধান থেমে থাকে না। এখানেই সাঁঝের সবিতার মূল সৌন্দর্য।
উপন্যাসটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর প্রেমের ধারণা। প্রচলিত প্রেমকাহিনিতে সাধারণত আকর্ষণ, পরিচয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচ্ছেদ এবং শেষ পর্যন্ত মিলন বা বিয়োগান্ত পরিণতির মধ্য দিয়ে কাহিনী এগোয়। কিন্তু সাঁঝের সবিতা প্রেমকে আরও বিস্তৃত অস্তিত্বগত পরিসরে নিয়ে যায়। এখানে প্রেম মানে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের প্রতি আকর্ষণমাত্র নয়; প্রেম যেন একটি অধরা আদর্শ, একটি কাঙ্ক্ষিত সৌন্দর্য, একটি পূর্ণতার স্বপ্ন। তাই প্রিয়তমাকে খুঁজতে গিয়ে নায়ক শুধু একজন নারীকে খোঁজেন না, তিনি নিজের কল্পনার এক পরম সৌন্দর্যকেও অনুসরণ করেন। পথে যত নারী, যত মুখ, যত হাসি, যত সংগীত ও প্রকৃতির যত রূপ তার সামনে আসে, সবকিছুর মধ্যে তিনি সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির ছায়া দেখতে চান। কিন্তু প্রত্যেকবারই বাস্তবতা তাকে ফিরিয়ে দেয় শূন্যতার কাছে।
এই শূন্যতাই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বিষয়। মানুষের জীবনে এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা থাকে, যা কোনো বাস্তব প্রাপ্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না। বরং আকাঙ্ক্ষা যত দীর্ঘ হয়, তার সঙ্গে তত বেশি জড়িয়ে পড়ে কল্পনা। সাঁঝের সবিতায় প্রেমের এই অপূর্ণতা ধীরে ধীরে একটি নান্দনিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। প্রিয়জনকে না-পাওয়ার বেদনা এখানে কেবল দুঃখ নয়; সেই দুঃখের মধ্যেই প্রেমিক তার ভালোবাসার গভীরতা আবিষ্কার করে। ফলে বিরহ এখানে প্রেমের বিপরীত নয়, বরং প্রেমেরই অন্য রূপ। যে মানুষকে পাওয়া যায়, তার সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা তৈরি হয়; কিন্তু যে মানুষ অধরা থেকে যায়, সে কল্পনা, স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষার জগতে আরও গভীরভাবে বেঁচে থাকে। এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটিই লেখক উপন্যাসের আবেগের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।
উদ্ধৃত অংশে “কত মানুষের রূপ আমি দেখেছি ব্যাকুল-চিত্তে”—এই স্বীকারোক্তির মধ্যে প্রেমিকের মানসিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। সে পৃথিবীর নানা নারীর মুখে তার প্রিয়তমার মুখ খুঁজেছে। কোনো উচ্ছল হাসি তাকে আকৃষ্ট করেছে, কোনো কণ্ঠস্বর তাকে থমকে দিয়েছে, কোনো সংগীত তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত সুরের কথা। অর্থাৎ তার বাস্তব জীবন ক্রমে এক বিশাল প্রতীকের জগতে পরিণত হয়েছে। বাইরের পৃথিবীর প্রতিটি সৌন্দর্য তার কাছে হয়ে উঠেছে সবিতাকে খোঁজার একটি সূত্র। অথচ কোনো সূত্রই তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেনি। এই ব্যর্থ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে লেখক মানুষের মনের একটি সূক্ষ্ম প্রবণতা তুলে ধরেছেন—আমরা অনেক সময় বাস্তব মানুষকে নয়, নিজের মনের নির্মিত মানুষটিকেই খুঁজি।
আহমেদ উল্লাহ্র ভাষাশৈলী সাঁঝের সবিতার অন্যতম আকর্ষণ। তাঁর গদ্যে কাব্যিকতা প্রবল। প্রকৃতি, ঋতু, সময়, পথ, নদী, আকাশ, প্রভাত, সন্ধ্যা, কুয়াশা—এসব উপাদান কেবল পরিবেশ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়নি; এগুলো চরিত্রের অন্তর্জগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। “কুয়াশাভেজা প্রভাতের সবুজ ঘাস”, “গ্রীষ্মের মেঘ”, “হেমন্তের সন্ধ্যা-গোধূলি”—এ ধরনের চিত্রকল্প পাঠকের সামনে শুধু একটি দৃশ্য তৈরি করে না, বরং একটি অনুভূতিরও জন্ম দেয়। প্রকৃতির পরিবর্তন যেন মানুষের মনের পরিবর্তনের সঙ্গে সমান্তরালে চলে। ঋতুর পালাবদল যেমন সময়ের অগ্রগতিকে নির্দেশ করে, তেমনি প্রেমিকের দীর্ঘ অপেক্ষারও প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই কাব্যিক গদ্যের কারণে সাঁঝের সবিতাকে নিছক প্রেমের উপন্যাস হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অদেখা থেকে যায়। এটি একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক উপন্যাস। এখানে জীবন ও প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন আছে, আছে মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি নিয়ে ভাবনা। মানুষ কেন এমন কিছুর পেছনে ছুটে, যা তার নাগালের বাইরে? কেন ব্যর্থতার পরও অনুসন্ধান থামে না? কেন মানুষ জানে যে তার প্রত্যাশা পূরণ নাও হতে পারে, তবু সে প্রত্যাশা করতে থাকে? উপন্যাসের অন্তর্নিহিত বোধ এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না; বরং পাঠককে সেই প্রশ্নের ভেতরেই নিয়ে যায়। এই প্রশ্নমুখরতা উপন্যাসটিকে নিছক আবেগনির্ভর রচনা না করে একটি জীবনদর্শনমূলক সাহিত্যকর্মে উন্নীত করেছে।
সময়ও সাঁঝের সবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। “কালের সীমাহীন পথ”—এই ধারণাটি উপন্যাসের আবহের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্যক্তিজীবনের সময় সীমিত, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন। মানুষ জন্ম নেয়, ভালোবাসে, অপেক্ষা করে, ব্যর্থ হয়, আবারও স্বপ্ন দেখে এবং একসময় জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তি থাকে না। এই সীমিত জীবন ও অসীম আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব থেকেই উপন্যাসের বিষণ্ন সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে। “অনির্বাণদের জীবনের প্রদীপ নিভে যায়”—এই ভাবনাটি তাই শুধু একজন প্রেমিকের ব্যর্থতার কথা নয়; এটি মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বের একটি করুণ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
উপন্যাসে ‘পথ’ একটি শক্তিশালী প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। পথ মানে যাত্রা, অনুসন্ধান এবং অনিশ্চয়তা। যে পথের শেষ কোথায়, তা জানা নেই, তবু মানুষ চলতে থাকে। প্রেমিকের অনুসন্ধানও তেমনই। সে জানে না কোথায় তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা মিলবে, আদৌ মিলবে কি না; তবু সে পথ চলে। এই পথচলার মধ্যেই তার জীবন। অর্থাৎ গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাটিই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার চেয়ে তাকে খুঁজে ফেরার অভিজ্ঞতা, অপেক্ষার উত্তেজনা, ব্যর্থতার বেদনা এবং আশার পুনর্জন্ম—এসবই প্রেমকে তার কাছে অর্থবহ করে তোলে।
এখানে প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতির পারস্পরিক সম্পর্কও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নদী, সাগর, হাওড়-বাওড়, পাহাড়, অরণ্য, মরু, প্রভাত ও গোধূলি—ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে আবেগের বৈচিত্র্যকে যুক্ত করা হয়েছে। প্রেমিকের অনুসন্ধান যেন ব্যক্তিগত ভূগোল অতিক্রম করে মহাজাগতিক ভূগোলে পৌঁছায়। সে এক জায়গার মানুষ নয়; তার খোঁজ পৃথিবীব্যাপী। ফলে প্রেমের অনুভূতিও ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। একজন মানুষ তার হারানো প্রিয়জনকে খুঁজছে—এই সরল কাহিনি তখন প্রত্যেক মানুষের নিজের কোনো না কোনো অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
সাঁঝের সবিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বিষণ্নতার মধ্যেও সৌন্দর্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা। উপন্যাসের আবহে হতাশা, ব্যর্থতা ও বিরহ আছে; কিন্তু তা কখনো একঘেয়ে বিষাদে পর্যবসিত হয় না। বরং লেখক বিষাদকে নান্দনিক করে তুলেছেন। প্রেমিকের না-পাওয়া তার অনুভূতিকে নিঃশেষ করে না; বরং আরও গভীর করে। এই কারণে উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে পাঠক শুধু কষ্ট অনুভব করেন না, সেই কষ্টের মধ্যেও এক ধরনের মুগ্ধতা খুঁজে পান। বাংলা সাহিত্যের বিরহধর্মী প্রেমকাহিনির একটি বড় শক্তি এখানেই—বিচ্ছেদকে কখনো কখনো মিলনের চেয়েও অধিক স্মরণীয় করে তোলা যায়।
চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও লেখকের মনোযোগ বাহ্যিক ঘটনার চেয়ে অন্তর্গত অনুভূতির দিকে বেশি। প্রেমিক চরিত্রটি মূলত তার অনুভব, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। তার বাইরের যাত্রার চেয়ে ভেতরের যাত্রা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্রমে বুঝতে শেখে যে প্রিয়জনকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রিয়জনকে ঘিরে নিজের কল্পনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই আত্ম-উপলব্ধিই চরিত্রটিকে সাধারণ প্রেমিকের পর্যায় থেকে একটি অস্তিত্বসন্ধানী মানুষের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
সবিতা চরিত্রটির তাৎপর্যও সম্ভবত এখানেই—তিনি যতটা বাস্তব, তার চেয়ে বেশি প্রতীকী। তিনি একজন নারী, আবার একই সঙ্গে প্রেম, সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা ও পূর্ণতার প্রতীক। তিনি উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতির মধ্যেই বেশি শক্তিশালী। কারণ বাস্তব উপস্থিতি অনেক সময় কল্পনার সীমা নির্ধারণ করে দেয়; কিন্তু অনুপস্থিতি কল্পনাকে সীমাহীন করে। তাই সবিতা যেন প্রেমিকের জীবনে একটি ‘অধরা পূর্ণতা’। তাকে খোঁজার মধ্যেই প্রেমিক নিজের অস্তিত্বকে অর্থ দিতে চায়।
শিরোনামের ‘সাঁঝ’ তাই আরও একবার ফিরে আসে। সাঁঝ হলো এমন এক সময়, যখন দিনের আলো নিভে আসছে, কিন্তু রাত এখনো পুরোপুরি নামেনি। এটি শেষ ও শুরুর মধ্যবর্তী সময়। সাঁঝের সবিতার প্রেমও যেন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির মাঝখানে, আশা ও হতাশার মাঝখানে, বাস্তব ও কল্পনার মাঝখানে। প্রেমিকের জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সবিতা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। কারণ সময় যত ফুরোয়, আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা তত বাড়ে। এই প্রতীকী ব্যঞ্জনা বইটির নামকে গভীরতর অর্থ দিয়েছে।
সাহিত্যিক মূল্যায়নের দিক থেকে সাঁঝের সবিতার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—লেখক প্রেমকে সরল রোমান্টিক আবেগের গণ্ডি থেকে তুলে এনে জীবন ও অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর গদ্যে আবেগ আছে, কিন্তু আবেগের সঙ্গে আছে চিন্তা; কাব্যিকতা আছে, কিন্তু কাব্যিকতার সঙ্গে আছে জীবনবোধ; বিরহ আছে, কিন্তু বিরহের সঙ্গে আছে আত্মঅনুসন্ধান। ফলে বইটি শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প হয়ে থাকে না; এটি হয়ে ওঠে মানুষের চিরন্তন না-পাওয়ার গল্প।
তবে একটি সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে এর সীমাবদ্ধতার কথাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কাব্যিকতা কখনো কখনো কাহিনির গতিকে ধীর করে দিতে পারে। দীর্ঘ অনুভূতিনির্ভর বর্ণনা ও আত্মমগ্নতা সব পাঠকের কাছে সমান আকর্ষণীয় নাও হতে পারে। যারা দ্রুতগতি কাহিনি, নাটকীয় সংঘাত বা ঘটনাবহুল উপন্যাস পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে সাঁঝের সবিতা কিছুটা ধীর ও অন্তর্মুখী মনে হতে পারে। কিন্তু এই ধীরতাই আবার উপন্যাসটির প্রকৃত প্রকৃতি বোঝার জন্য জরুরি। কারণ এটি মূলত ঘটনার চেয়ে অনুভূতির উপন্যাস; বাহ্যিক অভিযানের চেয়ে অন্তর্জগতের অভিযাত্রার উপন্যাস।
সবশেষে বলা যায়, সাঁঝের সবিতা এমন একটি প্রেমকাহিনি, যার মূল সুর মিলনে নয়, অনুসন্ধানে; প্রাপ্তিতে নয়, অপ্রাপ্তিতে; উচ্ছ্বাসে নয়, গভীর বিষণ্নতায়। আহমেদ উল্লাহ্ এখানে দেখিয়েছেন, মানুষ কখনো কখনো তার কাঙ্ক্ষিত মানুষকে পাওয়ার জন্য নয়, তাকে খুঁজে চলার জন্যই বেঁচে থাকে। জীবনের পথে অসংখ্য মুখ, দৃশ্য, শব্দ ও ঋতু তাকে ভুলিয়ে দেয়, আবার মনে করিয়ে দেয় তার সেই অধরা আকাঙ্ক্ষাকে। শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনের দেখা পাওয়া না-পাওয়ার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ভালোবাসার সেই অনন্ত অনুসন্ধান। তাই সাঁঝের সবিতা পাঠকের মনে কেবল একটি প্রেমের গল্পের স্মৃতি রেখে যায় না; রেখে যায় এক ধরনের অস্তিত্বগত প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই তার প্রিয়তমকে খোঁজে, নাকি নিজের হৃদয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অসম্পূর্ণতাকেই সারাজীবন অনুসরণ করে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো উপন্যাস সরাসরি দেয় না। বরং তার কাব্যিক গদ্য, বিরহময় আবহ এবং অনিঃশেষ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে পাঠককেই উত্তরটি খুঁজে নিতে বাধ্য করে। আর এখানেই আহমেদ উল্লাহ্র সাঁঝের সবিতার সাহিত্যিক সার্থকতা—না-পাওয়ার বেদনাকে তিনি এমন এক নান্দনিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছেন, যেখানে বিরহই শেষ পর্যন্ত প্রেমের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি হয়ে ওঠে।
মোহাম্মদ শাহজামান শুভঃ শিক্ষক ও লেখক
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now