বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
বই পড়া নিছক একটি অভ্যাস নয়; অনেকের কাছে তা জীবনযাপনেরই একটি অন্তর্গত রীতি। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো বন্ধুত্বের, কখনো প্রেমের, কখনো আত্মসংলাপের। সুমন রায়হানের ‘লেখালেখির আলোছায়া’ মূলত সেই পাঠ-সম্পর্কেরই এক আন্তরিক দলিল। বইটি প্রচলিত অর্থে সাহিত্য-সমালোচনার গ্রন্থ নয়—লেখক নিজেই সে কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, তিনি বড় লেখক নন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একজন গুণমুগ্ধ পাঠক; কোনো ভালো লেখা তাঁকে মুগ্ধ করলে সেই মুগ্ধতার অনুভূতি প্রকাশের তাগিদ অনুভব করেন। সেই অনুভূতি থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর পাঠপ্রতিক্রিয়াগুলো। ফলে *‘লেখালেখির আলোছায়া’*কে বিচার করতে গেলে একে কেবল ‘বই আলোচনা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি মূলত একজন নিবেদিত পাঠকের পাঠ-অভিজ্ঞতার সাহিত্যিক ভাষ্য।
বইটির নামের মধ্যেই এর স্বরূপের একটি সুন্দর ইঙ্গিত আছে—‘আলোছায়া’। বই পাঠের আলো যেমন লেখককে আকৃষ্ট করেছে, তেমনি সেই পাঠের ভেতর দিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা, দ্বিধা, বিস্ময় ও অনুভূতির ছায়াও তিনি দেখতে পেয়েছেন। এই দ্বৈততা গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে অন্যের লেখা আলো ছড়ায়, আর সেই আলো এসে প্রতিফলিত হয় লেখকের নিজস্ব পাঠ-মননে। ফলে যে বইগুলো নিয়ে তিনি লিখেছেন, সেগুলো একদিকে আলোচনার বিষয়, অন্যদিকে তাঁর নিজের পাঠকসত্তারও আয়না।
গ্রন্থটির ভূমিকা পাঠ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো লেখকের আত্মস্বীকারের স্বর। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং বলেছেন, বই পড়ে আনন্দ পান, বইয়ের জগতে নিমগ্ন হওয়াকে তিনি প্রেমের সঙ্গে তুলনা করেন। এমনকি রসিকতার সঙ্গে জানিয়েছেন, তাঁর স্ত্রীও বইকে তাঁর ‘সতিন’ মনে করেন। এই বক্তব্যের মধ্যে নিছক হাস্যরস নেই; বইয়ের প্রতি লেখকের আসক্তির একটি প্রাণবন্ত পরিচয়ও রয়েছে। বই তাঁর কাছে কেবল জ্ঞান আহরণের বস্তু নয়, এক ধরনের সঙ্গী। সেই কারণেই তিনি বলেন—বই তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু, প্রাণপ্রিয় প্রেমিকা। এই ব্যক্তিগত ও রসিক স্বীকারোক্তি গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিকতার আবরণ সরিয়ে পাঠকের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে।
সুমন রায়হানের পাঠপদ্ধতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর ‘মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা’। সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রে সমালোচকের চোখ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পাঠকের হৃদয়ও। কোনো রচনা কেন ভালো, তার কাঠামোগত বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা এক ধরনের কাজ; আর কোনো লেখা পড়ে হৃদয়ের মধ্যে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তাকে ভাষায় রূপ দেওয়া অন্য ধরনের সৃজনশীলতা। ‘লেখালেখির আলোছায়া’ মূলত দ্বিতীয় ধরনের কাজের উদাহরণ। লেখক নিজেই বলেছেন, তাঁর উদ্দেশ্য পাঠোদ্ধার বা আনুষ্ঠানিক বই-সমালোচনা নয়। তিনি নিজের মতো করে অনুভূতি ব্যক্ত করেন। ফলে তাঁর লেখাগুলোকে পাঠপ্রতিক্রিয়া বলা যায়। এই আত্মসচেতনতা বইটির একটি বড় গুণ।
তবে পাঠপ্রতিক্রিয়া ও সাহিত্য-সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একেবারে বিচ্ছিন্নতা নেই। একটি ভালো পাঠপ্রতিক্রিয়াও অনেক সময় একটি ভালো সমালোচনার দরজা খুলে দিতে পারে। কোনো রচনার বিশেষ শক্তি, ভাষা, বিষয়, চরিত্র, নির্মাণ কিংবা শিল্পরীতি সম্পর্কে পাঠকের সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া পরবর্তী বিশ্লেষণের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। সুমন রায়হানের গ্রন্থে সেই সম্ভাবনাটিই বিভিন্ন লেখায় দেখা যায়। তিনি কোনো কোনো বইয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন, কোথাও লেখকের সাহিত্যিক প্রবণতা নিয়ে কথা বলেছেন, কোথাও কোনো বইয়ের সামাজিক বা ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সূচিপত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর পাঠের পরিধি বেশ বিস্তৃত। আল মাহমুদ, আহমদ ছফা, মহিউদ্দিন আকবর, নাজমুদ্দিন এরবাকান, মুহিব খান, মুনীরুল ইসলাম, জানে আলম, তাজ ইসলাম, মোজাম্মেল প্রধান, সায়ীদ উসমান, নকীব মাহমুদ, সরদার আব্বাস উদ্দিন, মিযানুর রহমান জামিল, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখের বিভিন্ন গ্রন্থ ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তিনি লিখেছেন। কবিতা, উপন্যাস, কাব্যিক গদ্য, পুঁথি, মঞ্চনাটক, স্মারকগ্রন্থ, শিশুসাহিত্য, পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্যপত্রিকা—বিষয়ের এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে তাঁর পাঠজগৎ কোনো একটি সাহিত্যধারায় আবদ্ধ নয়।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই গ্রন্থটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিহিত। সাধারণত সাহিত্য-আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত লেখক ও বহুল আলোচিত গ্রন্থের বাইরে অনেক সৃষ্টিশীল কাজ আড়ালে পড়ে থাকে। সুমন রায়হানের পাঠপ্রতিক্রিয়ায় সমকালীন বহু লেখক, কবি ও গ্রন্থ আলোচনার পরিসরে প্রবেশ করেছেন। ফলে বইটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পাঠ-অনুভূতির সংগ্রহ নয়; সমকালীন বাংলা সাহিত্যচর্চার একটি ক্ষুদ্র দলিল হিসেবেও এর মূল্য রয়েছে। কোন সময়ে কোন বই নিয়ে পাঠকেরা ভাবছিলেন, কোন বিষয়গুলো সাহিত্যিকদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল এবং নতুন লেখকেরা কী ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন—এসবের আভাসও এ ধরনের গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়।
আল মাহমুদকে নিয়ে “প্রথম দেখা প্রথম শেখা” এবং আহমদ ছফার ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে গ্রন্থের শুরুতেই বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। এখানে ব্যক্তিগত পাঠস্মৃতি, সাহিত্যিক প্রভাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার সংযোগ তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার “একজন আধুনিক দরবেশ কবি” কিংবা “একটি হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধার্ঘ্য”—এ ধরনের শিরোনামে লেখকের মূল্যায়নের পাশাপাশি আবেগের সুরও প্রবল। এই আবেগই তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্য; তবে একই সঙ্গে এটিই কখনো কখনো কঠোর সমালোচনামূলক দূরত্বকে কিছুটা কমিয়ে দেয়।
গ্রন্থটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো লেখকের ভাষায় রসিকতা ও আত্মীয়তার উপস্থিতি। বইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে যে প্রাণবন্ত উপমা ব্যবহার করেছেন, তা তাঁর গদ্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে। তিনি জটিল সমালোচনামূলক পরিভাষায় পাঠককে দূরে সরিয়ে রাখেননি; বরং কথোপকথনের মতো করে তাঁর পাঠের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ফলে বইটি সহজে পড়া যায়। তাঁর গদ্যের এই সহজতা দুর্বলতা নয়; বরং পাঠককে সাহিত্যের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি কার্যকর কৌশল।
তবে সাহিত্যিক মূল্যায়নের বিচারে এখানেই একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে—সহজতা কতটা গভীরতার সঙ্গে যুক্ত? পাঠপ্রতিক্রিয়া যখন ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়, তখন বিশ্লেষণের নিরপেক্ষতা ও কাঠামোগত গভীরতা কখনো কখনো কমে যেতে পারে। সুমন রায়হানের ক্ষেত্রেও কোথাও কোথাও এই সীমাবদ্ধতা অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি যেহেতু নিজেই বলেছেন, তাঁর লেখাগুলো কোনো লেখকের মূল্যায়ন নয়, বরং তাঁর অনুভূতি, তাই তাঁর রচনাগুলোকে একাডেমিক সমালোচনার মানদণ্ডে বিচার করা সমীচীন হবে না। বরং এগুলোকে পাঠক-সমালোচনার একটি স্বতন্ত্র ধারার অংশ হিসেবে পড়াই অধিক ফলপ্রসূ।
এই জায়গায় ‘লেখালেখির আলোছায়া’ বাংলা সাহিত্যে পাঠপ্রতিক্রিয়ার গুরুত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। সাহিত্য কেবল লেখকের সৃষ্টিতে পূর্ণতা পায় না; পাঠকের গ্রহণের মধ্য দিয়েও তার একটি নতুন জীবন শুরু হয়। একটি কবিতা লেখা হয়ে শেষ হয়ে যায় না, একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েই তার যাত্রা শেষ করে না। পাঠকের চোখে, মনে ও অভিজ্ঞতায় তা নতুন অর্থ লাভ করে। সুমন রায়হানের বই সেই পাঠ-পর্বের একটি লিখিত দলিল। তাঁর লেখায় অন্যের সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি তাঁর নিজের পাঠকসত্তাও ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
গ্রন্থের শেষভাগের “লেখালেখির টুকরো গল্প”, “নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৩, প্রথম শ্রেণির বাংল বই কী আছে কী নেই”, “সংসার ও সাহিত্য যখন মুখোমুখি”, “বউয়ের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক দুই সতিনের মতো”, “লেখালেখির আলোছায়া”, “গল্প ও উপন্যাস লেখার কলাকৌশল” এবং “ছড়া লেখার কৌশল ও শিল্পগুণ”—এসব লেখা গ্রন্থটির চরিত্রকে আরও বিস্তৃত করেছে। এখানে বই আলোচনা থেকে লেখকের নিজের লেখালেখির অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যবোধের দিকে যাত্রা ঘটেছে। অর্থাৎ গ্রন্থটি শেষ পর্যন্ত শুধু ‘অন্যের বই নিয়ে লেখা’ গ্রন্থ থাকে না; এটি লেখকের নিজস্ব সাহিত্য-চিন্তারও একটি অনানুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ।
বিশেষ করে “সংসার ও সাহিত্য যখন মুখোমুখি” কিংবা “বউয়ের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক দুই সতিনের মতো”—এ ধরনের বিষয় গ্রন্থটিতে ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যজীবনের সংঘাতকে রসাত্মকভাবে সামনে আনে। একজন লেখক বা পাঠকের জীবনে বইয়ের উপস্থিতি কখনো নিছক ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না; তার প্রভাব সংসার, সময় ও দৈনন্দিন জীবনের ওপরও পড়ে। সুমন রায়হান এই অভিজ্ঞতাকে হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যভাবনা কেবল তাত্ত্বিক নয়; জীবনঘনিষ্ঠ।
“নতুন শিক্ষাক্রম ২০২৩, প্রথম শ্রেণির বাংল বই কী আছে কী নেই”—এই বিষয়টি আবার তাঁর পাঠকসত্তার সঙ্গে শিক্ষকসত্তার সম্ভাব্য সংযোগের একটি দিক উন্মোচন করে। সাহিত্য পাঠ কেবল কবিতা-উপন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিশুর পাঠ্যবই, শিক্ষাব্যবস্থা ও ভাষাশিক্ষার মধ্যেও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিহিত। এই ধরনের লেখার উপস্থিতি গ্রন্থটিকে সমকালীন শিক্ষা ও সাহিত্যচিন্তার সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
তাঁর পাঠের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস, ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ। “গণঅভ্যুত্থানের পুঁথি : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনঃপাঠ”, “দাওয়াম : সংগ্রাম ও সাফল্যের ঐতিহাসিক দলিল”, “কলকাতায় বাংলা চর্চা”, “আলাক অর্থ ‘জমাট বাধা রক্ত’ নাকি ‘ঝুলে থাকা বস্তু’—বিজ্ঞান কী বলে”—এ ধরনের বিষয় দেখায় যে লেখকের পাঠকৌতূহল সাহিত্যের প্রচলিত সীমানা ছাড়িয়ে যায়। তিনি ভাষা, ইতিহাস, ধর্মীয় চিন্তা, বিজ্ঞান ও সমাজবাস্তবতার মধ্যেও পাঠের উপাদান খুঁজে নেন। এই আন্তঃবিষয়ক কৌতূহল তাঁর গ্রন্থকে একমাত্রিক হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে।
অন্যদিকে, এই বিস্তৃত বিষয়বৈচিত্র্য গ্রন্থটির সম্পাদনাগত একটি চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। বইয়ের বিভিন্ন লেখা ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এবং ভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তাদের ভাষা ও নির্মাণরীতিতে বৈচিত্র্য থাকার কথা। লেখক নিজেই জানিয়েছেন—কিছু লেখা পত্রিকায়, কিছু ফেসবুকে, কিছু মোবাইলে ছড়িয়ে ছিল। এই বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে লেখা সংগ্রহ করে বই তৈরি করার ফলে গ্রন্থটি অনেকটা একটি সাহিত্যিক ডায়েরির মতো চরিত্র পেয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতাই একদিকে বইটির স্বাভাবিকতা, অন্যদিকে এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
তবে সংকলিত গ্রন্থের ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্নতা সবসময় দুর্বলতা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে একজন পাঠকের রুচি, চিন্তা ও প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তনও এর মধ্যে ধরা পড়ে। আজকের পাঠক যখন বইটি পড়বেন, তখন তিনি শুধু আলোচিত গ্রন্থগুলোর পরিচয় পাবেন না; একটি নির্দিষ্ট সময়ের পাঠ-সংস্কৃতিরও আভাস পাবেন। কোন বই একজন পাঠককে আলোড়িত করেছে, কোন বিষয় তাকে ভাবিয়েছে, কোন লেখকের প্রতি সে মুগ্ধ হয়েছে—এসবও সাহিত্য-ইতিহাসের উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
‘লেখালেখির আলোছায়া’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তাই সম্ভবত এর আন্তরিকতা। লেখক নিজেকে বড় সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেননি। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই পাঠের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন। এই বিনয় পাঠকের কাছে তাঁকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কারণ একজন পাঠক যখন বলেন, “আমি মুগ্ধ হয়েছি”—তখন সেই মুগ্ধতা সবসময় তাত্ত্বিক যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা না গেলেও তার মধ্যে একটি সত্যিকারের মানবিক অভিজ্ঞতা থাকে। সাহিত্য শেষ পর্যন্ত সেই অনুভূতিরও নাম।
তবে নির্মোহতার যে দাবি লেখক করেছেন, তার ক্ষেত্রেও কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার। ব্যক্তিগত মুগ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ নির্মোহ থাকা কঠিন। বিশেষ করে কোনো লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক পরিচয় বা সাহিত্যিক বন্ধুত্ব থাকলে পাঠপ্রতিক্রিয়ায় তার প্রভাব পড়তে পারে। এই বাস্তবতা সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। তাই ‘নির্মোহ’ শব্দটির চেয়ে ‘আন্তরিক ও সৎ পাঠ’ তাঁর গ্রন্থের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। কারণ তাঁর লেখার শক্তি নিরাসক্ত দূরত্বে নয়; বরং অনুভূতিশীল অংশগ্রহণে।
এখানে বইটির নাম আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—‘লেখালেখির আলোছায়া’। আলো এসেছে অন্যের লেখা থেকে; ছায়া এসেছে পাঠকের নিজের অবস্থান থেকে। তিনি অন্যের সাহিত্যকর্মকে আলোকিত করতে গিয়ে নিজের পাঠকসত্তার ছায়াটিও সামনে এনেছেন। ফলে গ্রন্থটি এক অর্থে দ্বৈত আত্মপ্রতিকৃতি—একদিকে আলোচিত লেখকদের সাহিত্যিক উপস্থিতি, অন্যদিকে সুমন রায়হানের পাঠকসত্তা। এই দ্বৈততার কারণেই বইটি নিছক পর্যালোচনা-সংকলনের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠেছে।
সবশেষে বলা যায়, ‘লেখালেখির আলোছায়া’ এমন এক গ্রন্থ, যার মূল বিষয় বই হলেও গভীরতর বিষয় পাঠক। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, পাঠের আনন্দ, মুগ্ধতার প্রকাশ, সাহিত্যিক বন্ধুত্ব, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং সমকালীন সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ মিলিয়ে এটি একজন সক্রিয় পাঠকের মানসিক ভুবনের দলিল। এর শক্তি কঠোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নয়; এর শক্তি আন্তরিক পাঠে। এর মূল্য একাডেমিক সমালোচনার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পাঠক-সমালোচনার একটি স্বতন্ত্র ও প্রাণবন্ত রূপ হিসেবে।
সুমন রায়হান আমাদের মনে করিয়ে দেন—সাহিত্য শুধু লেখকের একার সম্পত্তি নয়; একজন পাঠক যখন কোনো লেখায় মুগ্ধ হন, তখন সেই মুগ্ধতারও একটি সৃজনশীল মূল্য আছে। পাঠের আনন্দকে ভাষায় রূপ দেওয়া নিজেই এক ধরনের লেখালেখি। সেই লেখালেখির মধ্যে কখনো আলো থাকে, কখনো ছায়া; কখনো প্রশংসা, কখনো প্রশ্ন; কখনো স্মৃতি, কখনো ব্যক্তিগত বেদনা। ‘লেখালেখির আলোছায়া’ সেই বহুরঙা পাঠ-অভিজ্ঞতারই সংকলিত রূপ।
বাংলা সাহিত্যে বই নিয়ে লেখার পরিসরকে আরও পাঠকঘনিষ্ঠ, প্রাণবন্ত ও মানবিক করার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থের গুরুত্ব এখানেই। এটি কোনো চূড়ান্ত সাহিত্য-রায় দেওয়ার বই নয়; বরং বইয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, পাঠের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এবং অন্যের সৃষ্টির মধ্যে নিজের অনুভূতির প্রতিধ্বনি শোনার বই। তাই ‘লেখালেখির আলোছায়া’ শেষ পর্যন্ত একটি বই নিয়ে লেখা বই নয়—এটি বইকে ভালোবাসার একটি সাহিত্যিক স্বীকারোক্তি।
মোহাম্মদ শাহজামান শুভঃ শিক্ষক ও লেখক
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now