বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রকৃতির আপন দেশ কেরালা’-৩
মাজহারুল মোর্শেদ
এদিকে গোধুলি পেরিয়ে ক্রমশঃ আঁধার ঘনিয়ে আসছে। বাহিরে আর তেমন কিছুই চোখে পড়ছেনা। এবার অর্ণব তার মাথা থেকে প্রশ্নের বোঝাটাকে ঝাড়িয়ে ফেলতে আমার পাশে এসে বসলো এবং আমি কেন জানালা খুলতে গেলাম খুব কৌতুল ভরে জানতে চাইলো। উপেন শর্মার মধ্যবয়সী অর্ধাঙ্গিনী বঁধুর হালকা শীতের মাঝেও অহেতুক পেপারসিট দিয়ে খুব আদরমাখা বাতাস করার প্রেমময় দৃশ্যটার পূনরাবৃত্তি করি। আমি তাকে এটাও বলি যে, অকল্পনীয় সেই দৃশ্যটা আমার অমরত্ব। আমার যাত্রা জীবনে নিঃসঙ্গ আকাশ প্রদীপের সান্নিধ্য যেন পূর্ণতায় মিলনের সুর বেজে ওঠে। আমার কথা শেষ হতে না হতেই অর্ণব হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে। এবার পাশের সিটে বসে থাকা উপেন শর্মার মধ্যবয়সী অর্ধাঙ্গিনী বঁধু উৎফুল্ল চিত্তে বলে ওঠে- ‘আরে মশাই, তোমাদের আনন্দ-বিনোদনের সিটে-ফোটা আমাদেরকেও দাও’। তাহলে এ সুদীর্ঘ পথটা বেশ চলে যাবে।
অর্ণব হাসি থামিয়ে একটু স্বাভাবিক হয়ে ভেজা চোখ মুছতে মুছতে বলে, হ্যাঁ বোউদি-ঠিক বলেছেন। আপনার মতো বোউদি পাশে থাকলে শুধু কেরালা কেন? উত্তপ্ত মরু সাহারাও অনায়াসে হেঁটেই পার হওয়া যাবে।
অর্ণবের প্রশংসায় বোউদি আনন্দে গদগদ হয়ে একবার দাদার দিকে তাকিয়ে লাজুক লাজুক চেহারায় মাথা নিচু করে কি যেন ভাবতে শুরু করলো।
এখন বাজে দুপুর আড়াইটার মতো, আমরা এসে গেলাম অন্ধ্রপ্রদেশের ‘বিশাখা নগর রেলওয়ে জংশনে’। কতৃপক্ষের কাছে জানতে পারলাম এখানে ট্রেনের ইঞ্জিন পাল্টানো হবে। কাজেই বেশ কিছুটা সময়তো পাবো নিচে নামার জন্য। ‘বিশাখা নগর রেইলওয়ে জংশনে’র প্রধান আকর্ষণ হলো ইস্টার্ন ঘাটের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। ছোট ছোট পাহাড় আর ঝোপ-ঝাড়ে ভরা চারপাশের প্রকৃতি। অনেকটা লালচে মাটির উপর পিঙ্গল আভা দিগন্ত যেন ভরে গেছে এক সুদৃশ্য মায়াময় মহুয়া জগতে। আমি স্টেশনের একেবারে শেষ প্রন্তে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি এসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি আর বনস্পতি মায়াময় মহুয়া জগতের সাথে নিজের সংযোগ ঘটানোর চেষ্টা করছি।
এমন সময় পিছন থেকে এসে উর্মী বলে, এভাবে একা একা কি ভাবছো কাক্কু? আমাদেরকেও তো ভাগিদার বানাতে পারো।
অর্ণব বলে- ও কি আর এ জগতে আছে উর্মী?
তোমরা ঐদিকটায় একবার চেয়ে দেখ, পাহাড়ের গায়ে সবুজ প্রকৃতি, সারি সারি গাছ-গাছালি তার সাথে মিশে আছে হালকা মেঘের পরশ অনেকটা শুভ্র আভা যেন দিগন্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রকৃতি যে এতোটা সুন্দর হতে পারে সেটা মাঝে মাঝে আমার নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারিনা।
উর্মী আমার হাতটা ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলে, তুমি সত্যি সত্যি এবার পাগল হয়ে যাবে কাক্কু। চলো এখনি ট্রেন ছেড়ে দেবে।
আমরা যেই মাত্র ট্রেনে পা রাখলাম অমনি ট্রেন ছেড়ে দিলো। সাপে বর, উর্মীও একটু মাতব্বরি করার মতো বড় একটা চান্স পেয়ে গেলো। সে তার মাকে বলতে শুরু করলো-জানো মা, আমি না হলে এখনি মোর্শেদ কাক্কু ট্রেন ফেল করে যেতো। এদিকে ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে আর উনি স্টেশনের বাইরে গিয়ে আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত নিয়ে গবেষণা করছেন। শুধু কি তাই! মহাঋষির মতো একেবারে ধ্যানে মগ্ন হয়ে পড়েছে। আমি হাত ধরে টেনে না আনলে নির্ঘাৎ ট্রেন ফেল।
বোউদি এই প্রথম আমার সাথে মসকরা করার একটা সুযোগ খুঁজে পেলো আর সেটা মা-মেয়ে মিলে বেশ কাজে লাগাতে নেমে পড়লো। কবি-সাহিত্যিকরা তো এমন পাগলই হয়, নইলে কি আর চলন্ত ট্রেনে কেউ এভাবে জানালা খুলতে যায়?
বোউদির মুখে জানালা খোলার বিষয়টি শোনার পর আমার খুব লজ্জা হতে লাগলো, তবে সেই সাথে মনের ভেতর একটা প্রতিবাদী সুরও বেজে উঠলো এই বলে যে, আমার এহেন কর্মকাণ্ডের গিনিপিক তো আপনি নিজেই। সেটা অর্ণব ছাড়া আর কেউ জানে না, আর কাউকে হয়তো বলাও সম্ভব না।
সূর্যটা এখন যে মধ্য গগনে সেটা পেটের ক্ষুধাই বলে দিলো। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি লাঞ্চের প্যাকেট এসে গেছে। ১৩০ রূপিতে ডাল, ভাত, আলুর দম, পাপর, চাটনি আর ছোট মাছ। যদিও আমরা এতে অভ্যস্ত নই, কিন্তু ক্ষুধার পেটে বেশ অমৃত লাগছে। এ কয়েক দিনে সেটা অনেক খানি মিলিয়েও গেছে জীবনের সাথে। এভাবে আনন্দ-বেদনার অনুভুতি নিয়ে কাঙ্খিত সময়ের প্রতিক্ষা আর দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে আমাদের ট্রেন।
আমরা চলে এলাম অন্ধ্রপ্রদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী স্টেশন বিজয়বারা। এখানে আমি নিচে নামার চেষ্টা করলাম কিন্ত ট্রেন সুপারভাইজার ইশারায় আমাকে নিচে নামতে মানা করলো। কারণ এখানে ট্রেনের সংক্ষিপ্ত বিরতী হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা অন্ধ্রপ্রদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কৃষ্ণা নদীর ব্রিজ পেলাম। কৃষ্ণা নদী অন্ধ্রপ্রদেশের অনেক বড় নদী। লম্বা ব্রিজ ব্রিজের দু’পাশে বৈদ্যতিক আলো দ্বারা সুসজ্জিত। সাধারণত রেইল সেতুগুলো এমন সুসজ্জিত হয়না।
রাতের খাওয়া সেরে সবাই ঘুমের ঘোরে আছন্ন আর বিরামহীন ট্রেন চলছে তার মতো করে। আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। চোখ খুলে দেখি পূর্বাকাশে আলোর রেখা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ভোর প্রয় সাড়ে চারটা বাজে। আঁধারের সাথে যুদ্ধ করে রাতজাগা পাপিয়া বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই ক্ষীণস্বরে ডাকছে পিউকাহা-পিউকাহা। রেলরাইনের পাশের একটা তামিল ও ইংরেজিতে লেখা সাইনবোড দেখে বুঝতে পারলাম এখন আমরা তামিলনাডু রাজ্যের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। দেখতে দেখতে আমরা প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে চলে এসেছি তামিনাডুর একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও রেলওয়ে জংশন কাঠপাট্টি। এটি অনেক বড় রেলস্টেশন। এটি তামিলনাডু রাজ্যের ভেলোরে অবস্থিত। বিশ্ববিখ্যাত “ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ (সি.এম.সি) হাসপাতাল যেখানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের যে কোন প্রন্ত থেকে মানুষ আসে চিকিৎসা নেয়ার জন্য। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায় যে, বৃটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা বীরযোদ্ধা টিপুসুলতানের স্মৃতিবিজড়িত একটি দুর্গের ভগ্নাবশেষ ভেলোর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে।
দিনের আলোয় যখন ট্রেনটি একটা প্রদেশ ছেড়ে অন্য প্রদেশে প্রবেশ করছে ঠিক তখনই প্রকৃতিটাও কেমন হঠাৎ করে বদলে যাচ্ছে। যেমন ওড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশে দেখলাম ধুসর লালমাটি, রুক্ষ-শুষ্ক প্রকৃতি ছোট ছোট ঝোপঝাড়। তামিলনাডুতে যেন আরোও অন্য রকম প্রকৃতি। চারিদিকটাই পাহাড়ে ঘেরা, জন-মানবহীন বিশাল প্রান্তর, বড় বড় গাছ গাছালিতে ভরা। ধুসর মাটি সারি সারি নারকেল গাছ। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের সকালের নাস্তা চলে এলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রয় আটটা বেজে গেছে। আমাদের ট্রেননিও হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলো। বাহিরে তাকিয়ে দেখি এটা তামিলনাডু রাজ্যের একটি বৃহত্তর একটি রেইলওয়ে জংশন ‘শালেম’। এখানে ট্রেনটি নাকি মিনিট দশেক দাঁড়াবে। তাই আমরাও ট্রেন থেকে নিচে নামিয়ে পড়লাম একটু ঘোরাঘুরি করে দেখার জন্য।
দিনের আলোয় শরীরে যতো ক্লান্তি আর চোখে ঘুমের রেশ থাকুক না কেন জানালার বাহিরের প্রাকৃতিক দৃশ্য যেন সব কিছুকেই ভুলিয়ে দেয়। বেশকিছুক্ষণ ধরে বাহিওে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেহ-মনের ক্লান্তিটা যেন এবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ছোট বড় অনেক স্টেশনকে পিছনে ফেলে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে আমাদের ট্রেন। এবার এসে থামিয়ে গেলো একটি স্টেশনে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রয় সোয়া এগারোটা বেজে গেছে। স্টেশনের সাইন বোডে বড় করে তামিল ও ইংরেজি অক্ষরে লেখা ‘কোয়েম বাটোর জংশন। এটিই তামিল নাডু রাজ্যের শেষ স্টেশন। যেহেতু জীবনের প্রথম এ জায়গাগুলো দেখছি তাই দেখার আগ্রহটা কোনভাবেই মাথা থেকে সরছে না। সময় থাক আর না থাক অন্তত ট্রেন থেকে নিচে নেমে মাটির স্পর্শটুকু পাওয়ার যে প্রাপ্তি আপাতত সেটাই অনেক বলে মনে হচ্ছে।
ট্রেন ছেড়ে দিলে আমরাও তামিলনাডুর সীমানা অতিক্রম করে চলছি। তবে তামিলনাডু আর কেরালার সীমানা কোথায় সেটা না জানলে প্রাকৃতিক পার্থক্যটা অনেকটা চোখে পড়ার মতো। একটা রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে প্রবেশ করলে প্রাকৃতিক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। যদিও তামিলনাডু আর কেরালার ক্ষেত্রে সেটা খুবই সুন্দর। দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম কেরালার প্রথম স্টেশন ‘পলাক্কার জংশনে’। স্টেশনটি প্রকৃতির মাঝে ঘেরা একটি ছিমছাম স্টেশন। বেলা গড়িয়ে মাথার উপর থেকে ক্রমে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে তাই পেটের ক্ষুধাও অনেটা চাপ সৃষ্টি করছে। তাই অপেক্ষায় কখন লাঞ্চের প্যাকেট আসে। এরই মধ্যে ট্রেনটি ‘ত্রিশুরে’ স্শেন পার হয়ে গেলো।
কেরালা রাজ্যের প্রকৃতি সত্যি যেন বদলে দিলো মন। ‘ঈশ্বরের নিজস্ব দেশ’ (এড়ফং ড়হি পড়ঁহঃৎু) নামে পরিচিত। যার পশ্চিমে আরব সাগর, পূর্বে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা এবং পরস্পর যুক্ত ৪৪টিরও বেশি নদী। ভৌগলিক এ বৈশিষ্টের কারণে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ট্রাভেলার’ কেরালাকে বিশ্বের দশটি স্বর্গরাজ্যের একটি ঘোষণা করে।
"কের'" মালয়ালম ভাষায় অর্থ 'নারকেল গাছ' এবং "আলম" অর্থ 'ভূমি বা পৃথিবী। ' শব্দ দুটির সমন্বয়ে সৃষ্ট "নারকেল বৃক্ষের দেশ"। এক দীর্ঘ তটভূমি, মাঝে মাঝে শান্ত ও পরিস্কার বেলাভূমি, পান্নার রঙের ব্যাক ওয়াটার, মাতাল করা হিল স্টেশন, নারকেল বীথির সারি, দিগন্ত বিস্তৃত চায়ের বাগান, বিচিত্র প্রাণী জগত, এমন বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে কেরালা প্রকৃতির আপন দেশ।
সাগর থেকে আসা পানির জলধারা ছবির মতো সুন্দর। এ রাজ্য প্রকৃতি তার আপন সৌন্দর্যকে এমনভাবে ঢেলে দিয়েছে যে দ্রæত গতিতে চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকাতে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের প্রকৃতি যেমন নিজেকে পরিবর্তন করছে সেই সাথে আমার মনের ভেতরও এমনিতে একটা পরিবর্তনের হাওয়া খেলা করছে। কেন কেরালা প্রদেশকে প্রকৃতির লীলাভূমি বলা হয়? সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না যতোক্ষণ না সে নিজের চোখে দেখে। কেরালা সত্যি যেন এক স্বপ্নের রাজ্য, যেখানে পাহাড়ের সবুজ মিশে গেছে সমুদ্রের নীল জলে। আর সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এসে মিশে গিয়েছে পাহাড়ের সবুজ গায়ে। কেরালার প্রতিটি ইট পাথরেই রয়েছে হাজার বছরের পুরনো সে ইতিহাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, সুস্বাদু খাবার ও বিশ্বখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। সুদূর প্রাচীনে আরব, ফিনিশ, রোমান, গ্রিক ও চীনা বনিকেরা এ অঞ্চলে বাণিজ্য করতে আসতেন। গোল, মরিচ, দারুচিনি এবং এলাচের জন্য কেরালা পরিচিত ছিলো স্পাইস কোস্ট নামে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now