বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বাবার ঋণ

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আব্দুল্লাহ বিন মালিক (০ পয়েন্ট)

X শিরোনামঃ বাবার ঋণ। লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন মালিক। মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলোকে কোনো দিন ভুলে থাকা যায় না। সময় যতই এগিয়ে যাক, যতই নতুন মানুষ আসুক, যতই নতুন স্বপ্ন জন্ম নিক—সেই মুহূর্তগুলো বুকের ভেতর ঠিকই বেঁচে থাকে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে তারা ফিরে আসে। নিঃশব্দে এসে বসে থাকে মনের এক কোণে। তারপর মনে করিয়ে দেয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা পৃথিবীর সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গেই লড়ে। আমার জীবনেও এমন একটি সময় এসেছিল। আজ যখন সেই দিনগুলোর কথা লিখতে বসি, তখনও হাত কেঁপে ওঠে। মনে হয়, যেন অন্য কারও গল্প লিখছি। কারণ সেই সময়ের আমি আর আজকের আমি—দুইজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। একসময় আমি খুব সহজ-সরল ছিলাম। মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করতাম। কারও মুখের হাসিকে সত্যি মনে করতাম। কারও দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে জীবনের শেষ কথা ভাবতাম। আমি জানতাম না, সব হাসির পেছনে ভালোবাসা থাকে না। সব প্রতিশ্রুতির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা থাকে না। আর সব সম্পর্কের শেষ গন্তব্য একসঙ্গে বেঁচে থাকা নয়। আমি একজন মানুষকে আমার পুরো পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছিলাম। তার হাসি মানেই আমার ভালো থাকা। তার কষ্ট মানেই আমার অস্থিরতা। তার স্বপ্ন মানেই আমার ভবিষ্যৎ। আমি নিজের সব পরিকল্পনার মাঝখানে তাকে বসিয়েছিলাম। ভাবতাম, একদিন নিজের পরিবারকে রাজি করাব, পৃথিবীর সব বাধা অতিক্রম করব, শুধু তাকে নিজের জীবনের অংশ করব। সেই সময় আমার নিজের কোনো স্বপ্ন ছিল না। যা ছিল, সবই তাকে ঘিরে। আমি বিদেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলাম। বাবা প্রবাসে ছিলেন। অনেক কষ্ট করে টাকা পাঠিয়েছিলেন। ভিসা, কাগজপত্র, দালাল—সব মিলিয়ে পরিবারের প্রায় সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছিল। আমি তখনও বুঝিনি, একজন বাবা তাঁর সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের কত স্বপ্ন নীরবে কবর দিয়ে দেন। আমার চোখে তখন শুধু একটি মুখ। একটি মানুষ। একটি ভবিষ্যৎ। কিন্তু জীবন অন্য গল্প লিখছিল। একদিন সবকিছু বদলে গেল। যে মানুষটিকে আমি নিজের পৃথিবী ভেবেছিলাম, সে ধীরে ধীরে দূরে যেতে শুরু করল। আগের মতো কথা বলত না। অপেক্ষা করাত। অজুহাত দিত। আমি তখনও নিজেকে বুঝিয়েছিলাম— "হয়তো ব্যস্ত আছে।" "হয়তো কোনো সমস্যায় আছে।" আমি তার সব পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি খুঁজে বের করতাম। কারণ ভালোবাসার মানুষকে সন্দেহ করতে মন চায় না। একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "তুমি কি আগের মতো আমাকে ভালোবাসো?" অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলেছিল, "জানি না..." সেদিন বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। কিন্তু তখনও আমি বিশ্বাস হারাইনি। ভাবছিলাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়নি। একদিন সে খুব শান্ত গলায় এমন একটি কথা বলেছিল, যা আজও কানে বাজে। "আমি তোমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছি।" একটি বাক্য। মাত্র কয়েকটি শব্দ। কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দ আমার সমস্ত পৃথিবী ভেঙে দিয়েছিল। আমি বুঝতেই পারছিলাম না, এতদিন যার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিলাম, সে কীভাবে এত সহজে বলে দিতে পারল—সবকিছু অভিনয় ছিল! সেদিন আমার ভেতরে যেন সব আলো নিভে গিয়েছিল। মানুষের ভিড়ের মাঝেও নিজেকে একা লাগছিল। নিজের ঘরটাও অপরিচিত মনে হচ্ছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ঘুম হারিয়ে গেল। রাতে বালিশ ভিজে যেত। কিন্তু কাউকে কিছু বলতাম না। কারণ ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়— "কাঁদতে নেই।" কিন্তু কেউ শেখায় না, বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাগুলো কোথায় রাখবে। আমি ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করলাম। ফোন বন্ধ রাখতাম। বন্ধুদের এড়িয়ে চলতাম। হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হতো, আমার আর বেঁচে থাকার কোনো কারণ নেই। আজ বুঝি, সেটি ছিল শয়তানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা। কিন্তু তখন সেই অন্ধকারের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার অবস্থায় ছিলাম না। এক রাতে আমি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিলাম, যা আজ মনে হলে নিজেরই গা শিউরে ওঠে। আমি ঠিক করেছিলাম— এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। ভাবছিলাম, আমি চলে গেলে হয়তো সব কষ্ট শেষ হয়ে যাবে। আমি বুঝিনি— একজন মানুষের মৃত্যু তার নিজের কষ্ট শেষ করতে পারে, কিন্তু তার পরিবারের জন্য এমন এক আজীবনের কষ্ট রেখে যায়, যার কোনো শেষ নেই। সেই রাতের অনেক কিছুই আমার মনে নেই। শুধু মনে আছে, চারপাশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছিল। তারপর... নিস্তব্ধতা। অনেক পরে জেনেছিলাম, আমার খবর বিদেশে থাকা বাবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই খবর শুনে তিনি নাকি প্রথমে কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারেননি। তারপর কাঁপা কণ্ঠে শুধু বলেছিলেন, "আমার ছেলেকে বাঁচাও।" সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার মামাকে ফোন করেছিলেন। মামা কোনো দেরি না করে ছুটে এসেছিলেন। সেদিন যদি তিনি কয়েক মিনিট দেরি করতেন, তাহলে হয়তো আজ আমি এই গল্প লিখতে বসতে পারতাম না। আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আমার বাবা? তিনি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন—নিজের নয়, নিজের সন্তানের জন্য। সেদিনই হয়তো প্রথমবার একজন বাবার বুক সত্যিকার অর্থে ভেঙে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর বাবার ফোন এল। আমি ফোনটা কানে তুলতেই কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলছিল না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর বাবা ধীরে ধীরে বললেন, — "কেমন আছিস?" এই একটি প্রশ্ন শুনেই আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি ভেঙে পড়লাম। শিশুর মতো কাঁদতে লাগলাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম, — "বাবা, আমি আর পারছি না..." আমি জীবনের সব কথা খুলে বললাম। মেয়েটির কথা বললাম। আমার কষ্টের কথা বললাম। আমার ভেঙে পড়ার কথা বললাম। আমার ভুল সিদ্ধান্তের কথাও বললাম। সব শুনে বাবা একবারও আমাকে থামাননি। একবারও বলেননি, "তুই ভুল করেছিস।" বরং তিনি নীরবে শুনছিলেন। হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে চাপা কান্নার শব্দ পেলাম। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেদিন প্রথমবার আমি আমার বাবাকে কাঁদতে শুনেছিলাম। ছোটবেলা থেকে বাবাকে সব সময় শক্ত মানুষ হিসেবেই দেখেছি। তিনি সংসারের সব সমস্যার সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন। কখনো তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখিনি। কিন্তু সেদিন... তিনি কাঁদছিলেন। আর সেই কান্নার কারণ ছিলাম আমি। সেদিন আমি বুঝলাম— সন্তানের কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট একজন বাবার জীবনে আর কিছু নেই। আমাকে কয়েক দিনের জন্য নানাবাড়িতে রাখা হয়েছিল। সবার ধারণা ছিল, আমি যেন একা না থাকি। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। বারবার বাবার কান্নার শব্দটা কানে বাজছিল। ভোরের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে ঘুম ভাঙল। স্ক্রিনে লেখা— "আব্বু" ফোন ধরতেই তিনি বললেন, — "তুই কোথায়?" আমি বললাম, — "নানাবাড়িতে।" তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, — "বাড়িতে চলে আয়।" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, — "কেন?" তিনি শুধু বললেন, — "আমি বাড়িতে আছি।" কথাটা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো ভুল শুনেছি। তিনি তো বিদেশে ছিলেন! কীভাবে এত দ্রুত দেশে এলেন? পরে জানতে পারলাম, খবর পাওয়ার পরই তিনি জরুরি টিকিট কেটে দেশে ফিরে এসেছেন। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। হার্টে সাতটি রিং বসানো একজন মানুষ... ডাক্তার যাঁকে বিশ্রামে থাকতে বলেছিলেন... যাঁর নিজের জীবনই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ... সেই মানুষটি নিজের শরীরের কথা একবারও ভাবলেন না। তিনি শুধু ভাবলেন— "আমার ছেলে আমাকে দরকার।" আমি আজও সেই দৃশ্যটা ভুলতে পারি না। বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম বাবা বসে আছেন। তাঁর মুখটা অনেক ক্লান্ত। চোখের নিচে কালি। মনে হচ্ছিল, কয়েক রাত তিনি ঠিকমতো ঘুমাননি। আমি ধীরে ধীরে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু সালাম করলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না। কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল শুধু এক সমুদ্র মায়া। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমি কাঁদছিলাম। খুব কাঁদছিলাম। বারবার বলছিলাম, — "আমাকে মাফ করে দাও, বাবা..." বাবা আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন, — "চুপ কর। তুই বেঁচে আছিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।" এই একটি বাক্য আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। আমি তখন বুঝতে শুরু করলাম— আমি যে মৃত্যুকে মুক্তি ভেবেছিলাম, সেটাই আমার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে যেত। সেদিন রাতে বাবা আমার পাশে বসে ছিলেন। অনেকক্ষণ। তিনি নিজের অসুস্থতার কথা একবারও বললেন না। বিদেশে কাজের ক্ষতির কথা বললেন না। টাকার কথাও বললেন না। তিনি শুধু তাঁর ছেলেটাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। রাত গভীর হলে তিনি ধীরে ধীরে বললেন, — "শোন, জীবনে মানুষ চলে যায়।" আমি চুপ। তিনি আবার বললেন, — "কিন্তু একটা মানুষের জন্য নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া কখনো সমাধান না।" আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। কারণ তখনও আমার বুকের ভেতরে সেই মেয়েটার স্মৃতি জ্বলছিল। বাবা বুঝতে পারছিলেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বললেন, — "তুই এখন বিশ্রাম নে। বাকিটা আমি দেখব।" সেদিন প্রথমবার অনুভব করলাম— একজন বাবা কখনো সন্তানের কষ্ট নিজের কাঁধে তুলে নিতে ক্লান্ত হন না। তিনি নিজে যতই অসুস্থ হোন, সন্তানের চোখের জল দেখলে নিজের ব্যথা ভুলে যান। আর সেই রাতটা আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাতগুলোর একটি ছিল। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম, কিন্তু ঘুম আসছিল না। বাবার প্রতিটি কথা মাথার ভেতর ঘুরছিল। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল, আমি যেন একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে আছি। আবার মনে হচ্ছিল, যদি সকালে ঘুম ভেঙে দেখি সব আগের মতো হয়ে গেছে! কিন্তু বাস্তবতা কখনো মানুষের ইচ্ছেমতো বদলায় না। ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখলাম বাবা নামাজ শেষ করে কুরআন তিলাওয়াত করছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও এক ধরনের প্রশান্তি ছিল। আমি চুপচাপ বসে তাঁকে দেখছিলাম। একজন মানুষ... হার্টে সাতটি রিং। শরীর অসুস্থ। তবুও ফজরের নামাজ শেষে সন্তানের জন্য দোয়া করছেন। আর আমি? আমি একটি মানুষের জন্য নিজের জীবনটাই শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। সেদিন নিজের কাছেই নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। নাস্তা শেষ হওয়ার পর বাবা আমাকে পাশে ডাকলেন। তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর আমাকে বললেন, — "তুই কি এখনও ওকে ভালোবাসিস?" আমি মাথা নিচু করে বললাম, — "হ্যাঁ বাবা।" তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা আজও মনে পড়লে চোখ ভিজে যায়। — "ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব, ওকে তোর কাছে এনে দিতে।" আমি বিস্মিত হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। একজন বাবা... যিনি নিজের অসুস্থতার কথা ভাবলেন না। নিজের সম্মানের কথা ভাবলেন না। সমাজ কী বলবে, সেটাও ভাবলেন না। তিনি শুধু তাঁর ছেলের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে চাইলেন। আজ ভাবলে বুঝি, পৃথিবীতে বাবা ছাড়া আর কে এমন করতে পারে? হয়তো তিনি জানতেন, ফল হবে না। হয়তো বুঝতেন, সব শেষ হয়ে গেছে। তবুও তিনি চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, ভেঙে পড়া ছেলেটাকে বাঁচাতে হলে শেষ আশাটুকুও নিভতে দেওয়া যাবে না। তবে তিনি একটি শর্তও দিয়েছিলেন। খুব শান্তভাবে বলেছিলেন, — "যদি সব চেষ্টা করেও কিছু না হয়, তাহলে আর পেছনে তাকাবি না। নিজের জীবন নিজেকেই গড়তে হবে। এরপর আমি আর কিছু করতে পারব না।" আমি কোনো উত্তর দিইনি। মনের ভেতর তখনও একটি বিশ্বাস ছিল। হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো সে ফিরে আসবে। হয়তো আমার ভালোবাসা একদিন জিতে যাবে। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, আল্লাহ সব সময় তা লেখেন না। কিছুদিন পর সত্যিটা আমার সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি শেষবারের মতো তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। হয়তো সে রাগ করেছে। হয়তো আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু সে খুব শান্ত গলায় এমন একটি কথা বলল, যা আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হয়ে রইল। সে বলল, "আমি তোমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছি।" আমি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, আমার বুকের ভেতর কেউ ছুরি চালিয়ে দিল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, — "একবারও কি আমাকে সত্যি ভালোবাসোনি?" সে উত্তর দিল, — "না।" সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, এতদিন যাকে নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছি, সে কীভাবে এত সহজে সবকিছু অস্বীকার করে দিল। আমি তো তার জন্য নিজের পরিবারকেও ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম। নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম। নিজের জীবন পর্যন্ত শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। আর সে? সে বলল, সবটাই অভিনয় ছিল। সেদিন আমি প্রথম বুঝলাম— মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আল্লাহর চেয়ে কোনো মানুষকে বেশি ভালোবেসে ফেলা। যাকে আমরা চিরদিনের ভাবি, সে-ও একদিন চলে যেতে পারে। কিন্তু আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে ছেড়ে যান না। আমি ভেঙে পড়েছিলাম। তবে এবার আগের মতো একা ছিলাম না। আমার পাশে বাবা ছিলেন। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব বুঝে ফেলেছিলেন। কিছু জিজ্ঞেস করেননি। শুধু বলেছিলেন, — "দেখলি তো? আমি আগেই বলেছিলাম। এখন আর নিজেকে শেষ করার কথা ভাববি না। মানুষ চলে যায়, কিন্তু জীবন থেমে থাকে না।" আমি মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিল। আজ এত বছর পরে বুঝি... তিনি ঠিকই বলেছিলেন। সেদিন যদি সেই বিশ্বাসঘাতকতা না হতো, তাহলে হয়তো আমি কখনো বুঝতেই পারতাম না—কোন ভালোবাসা সত্যিকারের, আর কোনটা শুধু ক্ষণিকের অভিনয়। সেদিন আমি একজন মানুষকে হারিয়েছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে ফিরে পেতে শুরু করেছিলাম আমার বাবাকে... আমার রবকে... আর নিজেকেও। মানুষ যখন সব হারিয়ে ফেলে, তখন তার সামনে সাধারণত দুটি পথ খোলা থাকে। একটি পথ তাকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। অন্যটি তাকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনে। আমি জানি না, সেদিন যদি আমার বাবা আমার পাশে না থাকতেন, তাহলে আমি কোন পথ বেছে নিতাম। মেয়েটির শেষ কথাগুলো এখনও কানে বাজছিল। "আমি তোমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছি।" এই একটি বাক্য প্রতিদিন আমাকে নতুন করে হত্যা করত। আমি মানুষের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছিলাম। বাইরে যেতাম না। মোবাইল ফোন হাতে নিলেই পুরোনো ছবিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠত। পুরোনো চ্যাট পড়তাম। প্রতিটি মেসেজ পড়ে ভাবতাম— "এগুলোও কি অভিনয় ছিল?" রাতগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। সবার ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আমি একা ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, পুরো পৃথিবীতে আমার মতো অসহায় মানুষ আর কেউ নেই। কিন্তু একজন মানুষ প্রতিদিন আমাকে নীরবে দেখতেন। তিনি কিছু বলতেন না। শুধু লক্ষ্য করতেন। তিনি ছিলেন আমার বাবা। একদিন সকালে তিনি বললেন, — "চল, কোথাও যাব।" আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি। শুধু তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। পথে বাবা খুব কম কথা বলছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম, তিনি আমাকে কোনো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আমরা একজন সম্মানিত আলেমের বাড়িতে পৌঁছালাম। আমি আগে থেকেই উনাকে খুব ভালো করে চিনতাম। তিনি আমাদের খুব আন্তরিকভাবে বসালেন। বাবা শুধু বললেন, — "হুজুর, আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করবেন।" তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর খুব শান্তভাবে বললেন, — "বাবা, মানুষের ওপর অতিরিক্ত ভরসা করলে মানুষ ভেঙে দেয়। আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আল্লাহ কখনো ভেঙে দেন না।" আমি মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। তিনি আমার কাছ থেকে কোনো টাকা নিলেন না। কোনো তাবিজ দিলেন না। কোনো ব্যবসা করলেন না। তিনি শুধু কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন। তারপর বললেন, — "নামাজ শুরু করো। কুরআন পড়ো। মানুষের জন্য নয়, আল্লাহর জন্য বাঁচো। দেখবে, একদিন এই কষ্ট তোমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে যাবে।" সেদিনের সেই কথাগুলো আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে আমি অনেক দিন পর অজু করলাম। জায়নামাজে দাঁড়ালাম। সিজদায় গিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমি কাঁদছিলাম। অনেক কাঁদছিলাম। কিন্তু সেই কান্না আর কোনো মানুষের জন্য ছিল না। সেই কান্না ছিল আমার রবের কাছে। আমি বলেছিলাম, "হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি। আমি একজন মানুষকে আপনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে আবার বাঁচতে শিখিয়ে দিন।" সেদিনের পর ধীরে ধীরে আমার ভেতরের ঝড় থামতে শুরু করল। না, একদিনে সব ঠিক হয়ে যায়নি। কষ্ট তখনও ছিল। স্মৃতিও ছিল। কিন্তু আগের মতো আর আমাকে ভেঙে দিতে পারত না। কারণ এবার আমি একা ছিলাম না। আমার পাশে ছিলেন আল্লাহ। আর আমার মাথার ওপর ছায়া হয়ে ছিলেন আমার বাবা। এরপর আমি বাবাকে নতুন করে চিনতে শুরু করলাম। ছোটবেলায় কখনো বুঝিনি, একজন বাবা কত বড় যোদ্ধা। আমরা শুধু দেখতাম, তিনি টাকা এনে দিতেন। আমাদের পড়াশোনার খরচ দিতেন। ঈদে নতুন কাপড় কিনে দিতেন। কিন্তু কখনো ভাবিনি, এই টাকার পেছনে কত রাতের ঘুম হারাম হয়েছে। কত অপমান সহ্য করেছেন। কত কষ্ট লুকিয়েছেন। আমার বাবা বছরের পর বছর প্রবাসে থেকেছেন। ঈদের দিনও পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেননি। আমার জন্মদিনে অনেক সময় পাশে থাকতে পারেননি। আমার ছোট ছোট সাফল্য নিজের চোখে দেখতে পারেননি। কিন্তু দূরে থেকেও তিনি প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের জন্যই বেঁচে ছিলেন। একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, — "বাবা, তুমি এত কষ্ট করো কেন?" তিনি হেসে বলেছিলেন, — "তোরা যেন আমার মতো কষ্ট না করিস, সেই জন্য।" এই একটি বাক্যের ভেতরে একজন বাবার পুরো জীবন লুকিয়ে আছে। আজ বুঝি... বাবারা নিজেদের জন্য খুব কম বাঁচেন। তাঁদের স্বপ্নের নাম—সন্তান। তাঁদের সুখের নাম—সন্তানের হাসি। তাঁদের দোয়ার নাম—সন্তানের সফলতা। তাঁদের ক্লান্তিরও কোনো অধিকার নেই। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁরা থেমে গেলে পুরো পরিবার থেমে যাবে। আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছিলাম। কিন্তু এখনও জানতাম না... আমার বাবার ত্যাগের গল্প আসলে আমি তখনও পুরোটা জানিই না। আমি শুধু তাঁর দেওয়া ভালোবাসা পেয়েছি। তিনি কত কিছু হারিয়ে আমাকে সেই ভালোবাসা দিয়েছেন—সেটা বুঝতে আমার আরও অনেক সময় লাগবে। সময় মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। যে শিক্ষা বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না, কোনো শিক্ষকও শেখাতে পারেন না—সেই শিক্ষাগুলো আসে জীবন থেকে। আমার জীবনও আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। শিখিয়েছে, সব ভালোবাসা সত্যিকারের হয় না। শিখিয়েছে, সব প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছে—এই পৃথিবীতে একজন বাবার ভালোবাসার মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুব কমই আছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বাবার কষ্ট কোনো দিন চোখে পড়েনি। কারণ সন্তান হিসেবে আমরা শুধু পাওয়াটাই দেখি। কীভাবে পাওয়া গেল, সেটা দেখি না। ঈদের নতুন জামা পেয়েছি... কিন্তু বাবা নিজের জন্য নতুন জামা কিনেছিলেন কি না, সেটা কোনো দিন জানতে চাইনি। স্কুলের ফি সময়মতো জমা হয়েছে... কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করতে বাবা কত রাত জেগেছেন, কত অতিরিক্ত কাজ করেছেন, সেটা ভাবিনি। আমি যখন কিছু চাইতাম, বাবা শুধু বলতেন, — "ঠিক আছে, এনে দেব।" আজ বুঝি, সেই "এনে দেব" কথাটার পেছনে কত শত ত্যাগ লুকিয়ে ছিল। আমার বাবা কখনো আমাকে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে বড় করতে চাননি। তিনি কখনো বলেননি, "যাও, কাজ করো।" কখনো বলেননি, "টাকা উপার্জন করো।" বরং সব সময় চেয়েছেন, আমি যেন ভালো থাকি। আমি যেন নিজের জীবনটা সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারি। আমি বাড়ির কোনো কাজে সাহায্য করতাম না। তিনি কোনো দিন রাগ করেননি। আমি অনেক ভুল করেছি। তিনি অনেকবার কষ্ট পেয়েছেন। তবুও মুখে কিছু বলেননি। একজন বাবা আসলে এমনই। তিনি নিজের কষ্টটুকু নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখেন। কারণ তিনি জানেন, তাঁর মুখের কষ্ট দেখে সন্তান যদি আরও ভেঙে পড়ে? আজ যখন বাবার দিকে তাকাই, তখন দেখি তাঁর চুলে আগের মতো কালো রং নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সাদা হয়ে গেছে। মুখে বয়সের রেখা পড়েছে। হাঁটার গতি ধীর হয়ে গেছে। কিন্তু আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা একটুও কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। আজও আমি বাড়ি ফিরতে দেরি করলে তিনি ফোন করেন। খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করেন। অসুস্থ হলে নিজে না খেয়ে আমার পাশে বসে থাকেন। আমি তখন ভাবি... যে মানুষটা হার্টে সাতটি রিং নিয়ে বেঁচে আছেন, তিনি এখনও নিজের শরীরের আগে আমার শরীরের খবর নেন! এমন ভালোবাসার প্রতিদান কী দিয়ে দেওয়া যায়? টাকা দিয়ে? উপহার দিয়ে? বড় বাড়ি বানিয়ে? না। একজন বাবার ভালোবাসার দাম পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে শোধ করা যায় না। কারণ তিনি যা দিয়েছেন, তার নাম ভালোবাসা নয়—তার নাম আত্মত্যাগ। একসময় আমি একটি মেয়েকে হারানোর ভয়ে নিজের জীবন শেষ করতে চেয়েছিলাম। আজ ভাবলে নিজের ওপরই লজ্জা লাগে। কারণ আমি বুঝতেই পারিনি, আমি যদি সেদিন মারা যেতাম, তাহলে আমার বাবা বেঁচে থেকেও প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যেতেন। একজন সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো বাবার বেঁচে থাকা আসলে বেঁচে থাকা নয়। আজ আমি বেঁচে আছি। আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। আর একজন বাবার দোয়ার কারণে বেঁচে আছি। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো দিনের পেছনে যদি কারও সবচেয়ে বেশি অবদান থাকে, তাহলে তিনি আমার বাবা। তবুও... আমার বুকের ভেতরে একটি কষ্ট আজও রয়ে গেছে। আমি আজও মুখ ফুটে বাবাকে বলতে পারিনি— "বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দিও।" বলতে পারিনি— "আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।" বলতে পারিনি— "আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।" জানি না কেন। হয়তো ছেলেরা এমনই হয়। বাবাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, কিন্তু পারে না। ভালোবাসি বলতে চায়, কিন্তু মুখে শব্দ আসে না। ক্ষমা চাইতে চায়, কিন্তু চোখের জল আগে চলে আসে। আমি প্রায়ই ভাবি... যদি কোনো দিন বাবাকে হারিয়ে ফেলি, আর যদি সেই তিনটি বাক্য কোনো দিন বলা না হয়... তাহলে সেই আফসোস নিয়ে আমাকে সারাজীবন বাঁচতে হবে। তাই আজ এই লেখার মাধ্যমে আমি আমার বাবাকে বলতে চাই— বাবা, যদি কখনো আমার কোনো কথায় আপনার মন ভেঙে থাকে, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আপনি শুধু আমার বাবা নন, আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আপনি না থাকলে হয়তো আজ আমি বেঁচেই থাকতাম না। আর যারা এই লেখাটি পড়ছেন, তাঁদের কাছে আমার একটি অনুরোধ। যদি আপনার বাবা এখনও জীবিত থাকেন, তাহলে দয়া করে তাঁর সঙ্গে সময় কাটান। তাঁকে সম্মান করুন। তাঁর পাশে বসুন। হয়তো তিনি কখনো বলবেন না যে তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পৃথিবীতে আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি দোয়া করা মানুষদের একজন তিনি। আমরা প্রায়ই মায়ের ভালোবাসার কথা বলি, যা অবশ্যই অমূল্য। কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেক সময় নীরব থাকে। তিনি কাঁদেন আড়ালে। চিন্তা করেন একা। রাত জেগে হিসাব মিলান। নিজের অসুস্থতা লুকিয়ে রাখেন। শুধু যাতে সন্তানটা ভালো থাকতে পারে। আমরা বড় হতে হতে শুধু চাইতে শিখি। নতুন মোবাইল চাই। নতুন জামা চাই। ভালো কলেজ চাই। ভালো চাকরি চাই। আর বাবা? তিনি দিতে থাকেন। আমাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। তাঁর বয়সও বাড়তে থাকে। একদিন আমরা সফল হই। কিন্তু ততদিনে বাবার হাতের শক্তি কমে যায়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। চুল সাদা হয়ে যায়। তারপর একদিন বুঝতে পারি— যে মানুষটা সারাজীবন আমাদের জন্য বেঁচেছিলেন, তাঁর জন্য আমরা খুব কমই বেঁচেছি। জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো— আমরা বাবার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে শিখি তখনই, যখন সময় আর আগের মতো থাকে না। তাই আজই বাবাকে একটি ফোন করুন। যদি পাশে থাকেন, তাঁর পাশে গিয়ে বসুন। কোনো বিশেষ উপলক্ষের দরকার নেই। শুধু বলুন— "বাবা, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।" বিশ্বাস করুন, এই একটি বাক্য হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়ে থাকবে। শেষ কথা আজ আমি জানি, মানুষ আমাকে ছেড়ে যেতে পারে। বন্ধুরা বদলে যেতে পারে। ভালোবাসার মানুষও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। কিন্তু একজন সত্যিকারের বাবা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সন্তানের জন্যই বাঁচেন। আমি আল্লাহর কাছে শুধু একটি দোয়াই করি— "হে আল্লাহ, আমার বাবার জীবনের প্রতিটি কষ্টের উত্তম প্রতিদান আপনি দিন। তাঁর গুনাহ মাফ করুন। তাঁকে সুস্থতা, দীর্ঘ হায়াত এবং জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আর আমাকে সেই সন্তান হওয়ার তাওফিক দিন, যে সন্তানকে নিয়ে তিনি কিয়ামতের দিনও গর্ব করতে পারবেন। আমীন।"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বাবার ঋণ
→ ​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ২
→ ​“বাবার দেওয়া জমি” অধ্যায় - ১
→ আদর্শ মা-বাবার যোগ্য ছেলে পড়তে
→ বাবার জুতা
→ সন্তানকে চরিত্রবান করে গড়ে তোলা বাবার দায়িত্ব
→ কেয়ামতের ময়দানে হাফেজের মা-বাবার মর্যাদা
→ ♥ বাবার তুবা ♥
→ মেয়ের কাছে বাবার চিঠি
→ মা-বাবার ভালোবাসা
→ "বাবার প্রেমের চিঠি"
→ বাবার ভালোবাসা
→ "বাবার ছেলে"
→ বাবার প্রতি ভালবাসা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now