বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পাহাড় জানে আমার গল্প।

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Abdullah Bin malik (০ পয়েন্ট)

X শিরোনামঃ পাহাড় জানে আমার গল্প। লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন মালিক। অনেক মানুষ ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বড় ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন মালিকের স্বপ্নটা ছিল একটু ভিন্ন। সে স্বপ্ন দেখত—একদিন মানুষের নেতা হবে। ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এমন একজন মানুষ হবে, যার দরজায় কোনো অসহায় মানুষ এসে কখনো খালি হাতে ফিরে যাবে না। এই স্বপ্নের শুরু খুব ছোটবেলায়। গ্রামের মাটিতে বড় হতে হতে সে দেখেছে—কেউ অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারে না, কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস পায় না, আবার কেউ শুধু পরিচয় বা প্রভাব না থাকার কারণে ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। এসব দৃশ্য তার কিশোর মনকে নাড়া দিত। মাত্র পনেরো বছর বয়স থেকেই সে রাজনীতির মাঠে সময় দিতে শুরু করে। অনেকেই ভেবেছিল, এটা হয়তো কিশোর বয়সের সাময়িক আগ্রহ। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ততই বেড়েছে। উনিশ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই এলাকার প্রায় সব দলের নেতা-কর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়ে যায়। আব্দুল্লাহর একটি বিশেষ গুণ ছিল—সে কখনো দল বা মতের কারণে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করত না। এক দলের নেতার সঙ্গে যেমন সম্মান রেখে কথা বলত, অন্য দলের কর্মীকেও ঠিক একই সম্মান দিত। তার কাছে মানুষ আগে, রাজনীতি পরে। সে কখনো জাত-পাতের ভেদাভেদে বিশ্বাস করত না। সমাজ যাদের নিচু চোখে দেখত, তাদের পাশে বসে চা খেতে তার সংকোচ হতো না। কারও বাড়িতে গেলে সে আগে মানুষের হৃদয় দেখত, ঘরের আকার নয়। অনেকেই অবাক হয়ে বলত, "তুই সবার সঙ্গে এত সহজে মিশিস কীভাবে?" আব্দুল্লাহ শুধু হাসত। তার বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ কোনো মানুষকে ছোট বানায়নি। তার জনপ্রিয়তার কারণ বক্তৃতা ছিল না, কাজ ছিল। কারও রক্ত লাগলে সে ছুটে যেত। কারও হাসপাতালে লোক দরকার হলে নিজের কাজ ফেলে পাশে দাঁড়াত। কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর বইয়ের প্রয়োজন হলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা করার চেষ্টা করত। টাকা তার হাতে খুব কমই থাকত, কিন্তু মানুষের জন্য সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে সে কখনো হিসাব করত না। অনেক সময় নিজের পকেটে ভাড়া না থাকলেও অন্যের সমস্যার সমাধান করতে বেরিয়ে পড়ত। কেউ তাকে ডাকলে "না" বলতে তার কষ্ট হতো। এসএসসি পরীক্ষায় সে সফল হতে পারেনি। এই ব্যর্থতাকে অনেকে তার অযোগ্যতার পরিচয় মনে করেছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিশ্বাস করত, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবনে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া নয়। সে বই পড়ত। ইতিহাস পড়ত। ইসলাম নিয়ে পড়ত। সফল মানুষের জীবনী পড়ত। সুযোগ পেলেই ছোটদের বলত, "শিক্ষা শুধু সনদে না, মানুষের চরিত্রেও প্রকাশ পায়।" কেউ কষ্টে থাকলে ধৈর্য ধরতে বলত। কেউ অন্যায় করলে ক্ষমা চাইতে বলত। কেউ হতাশ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখাত। তার নিজের জীবন হয়তো খুব গোছানো ছিল না, কিন্তু সে চাইত অন্যরা যেন সঠিক পথে হাঁটে। তার এই রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন একজন মানুষ—তার বাবা। প্রবাসে থেকেও বাবা সবসময় খবর রাখতেন। তিনি জানতেন, রাজনীতি শুধু সম্মানই দেয় না, কখনো কখনো বড় বিপদও ডেকে আনে। তাই বারবার বলতেন, "রাজনীতি থেকে দূরে থাক। নিজের জীবন গড়।" কিন্তু আব্দুল্লাহ বাবার কথার অবাধ্য হয়ে নয়, নিজের বিশ্বাস থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছাড়তে পারেনি। অদ্ভুত বিষয় ছিল—তার পরিবারের অনেকেই জানতেনই না, সে এতটা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করে। কারণ সে কখনো বাড়িতে এসব নিয়ে বড়াই করত না। ছবি তুলে প্রচার করাও তার অভ্যাস ছিল না। মানুষের উপকার করলে সেটাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখানোর চেয়ে নীরবে করতে সে বেশি স্বস্তি পেত। রাজনীতির পাশাপাশি তার আরেকটি বড় পরিচয় ছিল—সে ছিল ভ্রমণপিপাসু। যখনই মন খারাপ হতো, সে বেরিয়ে পড়ত। কখনো পাহাড়ের দিকে। কখনো ঝর্ণার কাছে। কখনো সবুজ চা-বাগানের সরু পথে। কখনো নদীর তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখত। আবার কখনো কোনো গন্তব্য ছাড়াই একটি রিকশায় উঠে শহরের অলিগলি ঘুরে বেড়াত। রিকশার ধীর গতি, বাতাসের ছোঁয়া আর চারপাশের মানুষের ব্যস্ত জীবন তাকে অদ্ভুত এক শান্তি দিত। তার বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতি মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পাহাড় তাকে শিখিয়েছে—মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। ঝর্ণা শিখিয়েছে—বাধা পেলেও থেমে না যেতে। নদী শিখিয়েছে—চলতে থাকাই জীবনের নাম। আর রিকশার ধীর চাকা তাকে শিখিয়েছে—জীবনে সব গন্তব্য দ্রুত পৌঁছাতে হয় না। অনেকেই বিদেশে গিয়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু আব্দুল্লাহর স্বপ্ন ছিল নিজের দেশেই কিছু করা। সে একটি সফল ব্যবসা গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যাতে কারও কাছে হাত না পেতে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। সে অনেক পরিকল্পনা করেছিল। অনেকবার শুরু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু একটার পর একটা ব্যর্থতা তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তবুও সে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেনি। তার বিশ্বাস ছিল, নিজের মাটির মানুষের জন্য কাজ করার আনন্দ পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। জীবনের এই সময়ে আরেকটি বিষয় নিয়ে সবাই অবাক হতো। তার সমবয়সী অনেকেই প্রেম নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আব্দুল্লাহ মেয়েদের থেকে সবসময় দূরে থাকত। কোনো মেয়ে পরিচিত হলে সে তাকে নিজের বোনের মতোই সম্মান করত। কখনো সীমা অতিক্রম করত না। সে মনে করত, একজন নারীর সম্মান রক্ষা করাও একজন পুরুষের চরিত্রের পরিচয়। কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। কখন, কোথায়, কোন মানুষ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে—তা কেউ বলতে পারে না। একদিন একজন অসুস্থ পরিচিত মেয়েকে সাহায্য করতে গিয়ে সে বুঝতেই পারেনি, তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় এক কিশোরীর সঙ্গে। প্রথম পরিচয়ে কোনো বিশেষ অনুভূতি ছিল না। মেয়েটি তাকে "ভাই" বলেই ডাকত, আর আব্দুল্লাহও তাকে ছোট বোনের মতোই দেখত। তাদের যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত—কখনো কোনো প্রয়োজনে, কখনো কোনো সমস্যার সমাধানে। একদিন মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য সাহায্য চায়। আব্দুল্লাহ নিজের পরিচিত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে, হাসপাতালে নিয়ে যায়, ওষুধের ব্যবস্থা করে এবং নিয়মিত খোঁজ নিতে থাকে। এক রাতে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। সে ভয় পেয়ে যায়। নিজের ঘুমের কথা ভুলে সারারাত জেগে থেকে তাকে সাহস দেয়, চিকিৎসকদের পরামর্শ পৌঁছে দেয় এবং বারবার বলে, "কিছু হবে না, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।" সেই দীর্ঘ রাতেই প্রথমবার দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমে আসে। মেয়েটি নিজের জীবনের অনেক কষ্টের কথা খুলে বলে। পরিবারের অশান্তি, একাকীত্ব, ভাঙা বিশ্বাস—সবকিছু। আব্দুল্লাহ শুধু শুনেছিল। বিচার করেনি, সুযোগও নেয়নি। তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার। সেই দিনগুলোর পর থেকে তাদের যোগাযোগ বাড়তে থাকে। আব্দুল্লাহ লক্ষ্য করত, মেয়েটি প্রায়ই কষ্ট পেত। কখনো পরিবারের কারণে, কখনো অতীতের কিছু ঘটনার কারণে। সে যতটুকু পারত, তাকে সাহস দিত। নিজের সমস্যা ভুলে অন্য একজন মানুষকে হাসানোর চেষ্টা করত। একদিন হঠাৎ মেয়েটি জানাল—সে অনেক দিন ধরে একজনকে ভালোবাসে। আব্দুল্লাহ মুচকি হেসে বলেছিল, "তাহলে বলে দাও।" মেয়েটি বলেছিল, "সাহস হয় না।" সে মজা করে বলেছিল, "চাইলে আমি বলে দিই।" কিছুক্ষণ নীরবতার পর একটি ছোট্ট বার্তা এসে পৌঁছাল... বার্তাটি ছিল তারই জন্য। আব্দুল্লাহ অবাক হয়ে গিয়েছিল। যাকে সে এত দিন নিজের ছোট বোন ভেবেছে, সেই মানুষটি নাকি অনেক আগেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। সে প্রথমেই না করে দিয়েছিল। নিজের জীবনের বাস্তবতা খুলে বলেছিল। "আমার প্রতিষ্ঠিত জীবন নেই।" "আমার হাতে টাকা নেই।" "ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।" কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর ফিরে আসত— "আমি মানুষটাকে চাই, সম্পদকে নয়।" এই কথাগুলো ধীরে ধীরে তার কঠিন মনও গলিয়ে দেয়। একদিন সে নিজের মনকেও হার মানিয়ে ফেলে। শুরু হয় তাদের নতুন পথচলা। তারা একসঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ছোট্ট একটি সংসার। সৎভাবে উপার্জন। নিজের দেশে একটি ব্যবসা। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। আব্দুল্লাহ ভাবতে শুরু করেছিল, হয়তো আল্লাহ তার জীবনে এমন একজন মানুষই পাঠিয়েছেন, যে সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে। তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল—অল্পতেই আনন্দ খুঁজে নেওয়া। কখনো ছোট্ট একটি পার্কে বসে গল্প। কখনো শহরের রাস্তায় রিকশায় ঘোরা। কখনো সবুজে ঘেরা কোনো নিরিবিলি জায়গায় কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া। আব্দুল্লাহ প্রকৃতিকে ভালোবাসত। আর মেয়েটি ভালোবাসত আব্দুল্লাহর সঙ্গে সেই প্রকৃতির সৌন্দর্য ভাগ করে নিতে। পাহাড়, ঝর্ণা, চা-বাগান—সব জায়গাতেই তারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন এঁকেছিল। কিন্তু মানুষ যখন ভবিষ্যৎ আঁকে, তখন ভাগ্য নীরবে নিজের গল্প লিখতে থাকে। ধীরে ধীরে শুরু হলো বাধা। পরিবারের আপত্তি। ভুল বোঝাবুঝি। অকারণ সন্দেহ। দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেল। ফোনে কথা বলাও কঠিন হয়ে উঠল। তবুও আব্দুল্লাহ হাল ছাড়েনি। সে বিশ্বাস করত—সত্যিকারের ভালোবাসা ধৈর্য শেখায়। একসময় পরিস্থিতি এমন হলো, মেয়েটি প্রায় প্রতিদিন কাঁদত। বলত, "কিছু একটা করো।" আব্দুল্লাহ তাকে কখনো পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়নি। বরং বলত, "যদি আমাদের জন্য কল্যাণ থাকে, আল্লাহ অবশ্যই পথ খুলে দেবেন।" সে তাকে দোয়া করতে শিখিয়েছিল। সবর করতে শিখিয়েছিল। হালাল পথে অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল। কিন্তু অপেক্ষা সব সময় মিলনের গল্প লেখে না। একদিন হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল। যে মানুষ একদিন বলেছিল— "এক কাপড়ে থাকব।" "পানি-ভাত খেলেও তোমার সঙ্গেই থাকব।" সেই মানুষই একসময় দূরে সরে যেতে শুরু করল। অজুহাত বাড়তে লাগল। কথা কমতে লাগল। বিশ্বাসের জায়গায় সন্দেহ জন্ম নিল। শেষ পর্যন্ত এমন কিছু শর্ত সামনে এলো, যা শুধু অসম্ভবই ছিল না, বরং সেই পুরোনো ভালোবাসার প্রতিটি কথাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে দিল। সেদিন আব্দুল্লাহ বুঝতে পারল— সবচেয়ে বড় প্রতারণা সেই মানুষই করতে পারে, যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছিলে। তার বুক ভেঙেছিল ভালোবাসা হারানোর জন্য নয়। ভেঙেছিল এই ভেবে— সে যাকে সত্য ভেবেছিল, হয়তো সে কখনো সত্য ছিলই না। সেদিনের পর তার পৃথিবী আর আগের মতো রইল না। যে ছেলেটি একদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের জন্য ছুটে বেড়াত, ধীরে ধীরে সে নিজেকেই চিনতে পারত না। বাইরে থেকে সবাই তাকে আগের মতোই দেখত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল তার রাজনৈতিক জীবনে। মাত্র পনেরো বছর বয়স থেকে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, উনিশ বছর বয়সে এসে সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। মানুষের ভালোবাসা ছিল, জনপ্রিয়তা ছিল, এলাকাজুড়ে পরিচিতি ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করত, একদিন সে বড় নেতা হবে। তার বাবা বহুবার বলেছিলেন, "রাজনীতি ছেড়ে দে।" কিন্তু মানুষের সেবা করার স্বপ্নের কাছে সে কখনো হার মানেনি। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বাবার এত অনুরোধেও যে সিদ্ধান্ত সে নেয়নি, ভালোবাসার মানুষটির কথা ভেবেই সে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। নির্বাচনের সময় তার নাম ঘোষণার আগেই সে নিজেই প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নেয়। কারণ তখন তার মনে হয়েছিল, হয়তো একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিও তার জীবনে রইল না। একসঙ্গে হারিয়ে গেল ভালোবাসা, স্বপ্ন, আর রাজনৈতিক পথচলার একটি বড় অধ্যায়। তার আরেকটি স্বপ্ন ছিল—নিজের দেশেই একটি সফল ব্যবসা গড়ে তোলা। সে বিশ্বাস করত, অর্থ থাকলে মানুষের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়ানো যায়। অনেক পরিকল্পনা করেছিল। বারবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই সফল হয়নি। তবুও সে কখনো দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে চায়নি। সে বলত, "আমি এই দেশের মাটিতেই থাকতে চাই। এখানকার মানুষের জন্যই কিছু করতে চাই।" কিন্তু জীবনের একের পর এক আঘাত তাকে মানসিকভাবে এতটাই ক্লান্ত করে দেয় যে, একসময় সবকিছুই অর্থহীন মনে হতে থাকে। যে ছেলেটি মানুষকে ধৈর্য শেখাত, একদিন সেই ছেলেই নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তবুও আল্লাহ তাকে ফিরিয়ে আনেন। তার পরিবার তাকে আগলে রাখে। বিশেষ করে তার বাবা। একজন অসুস্থ বাবা, যিনি ছেলের চোখের পানি সহ্য করতে পারেননি। সেদিন আব্দুল্লাহ বুঝেছিল— পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যদি কোথাও থাকে, তবে সেটি বাবা-মায়ের হৃদয়ে। ধীরে ধীরে সে নামাজে ফিরে আসে। আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। শিখে যায়—যে মানুষ চলে যাওয়ার, তাকে শত চেষ্টা করেও ধরে রাখা যায় না। আর যাকে আল্লাহ রেখে দেন, তাকে কেউ কেড়ে নিতে পারে না। আজও সে কাউকে দোষ দেয় না। কারণ সময় তাকে শিখিয়েছে— ক্ষমা করতে পারা প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়েও বড় শক্তি। তবুও সত্যিটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সে এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। কোনো কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। হঠাৎ কোনো গান, কোনো রাস্তা, কোনো বিকেলের আকাশ কিংবা বৃষ্টির শব্দ তাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কখনো মনে হয়, সব ভুলে গেছে। আবার কোনো এক নির্জন রাতে মনে হয়, কিছুই ভুলতে পারেনি। এই কারণেই সে আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে গেছে। পাহাড়ের নীরবতা তাকে এখনও ডাকে। ঝর্ণার পানির শব্দ এখনও তাকে শান্ত করে। রিকশায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো এখনও তার কাছে এক ধরনের চিকিৎসা। সূর্যাস্তের শেষ আলোয় দাঁড়িয়ে সে মনে মনে বলে— "হয়তো জীবন এখানেই শেষ নয়।" আজও তার মানুষের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা মরে যায়নি। সে এখনও বিশ্বাস করে— একদিন হয়তো আবার নতুন করে দাঁড়াবে। কিন্তু এবার কারও ওপর ভরসা করে নয়। নিজের পরিশ্রম, নিজের ঈমান এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে। আব্দুল্লাহ বিন মালিকের গল্প কোনো প্রেমের গল্প নয়। এটি একজন অল্পবয়সী স্বপ্নবাজ তরুণের গল্প। যে শিখেছে— মানুষের ভালোবাসা বদলে যেতে পারে, কিন্তু বাবা-মায়ের ভালোবাসা বদলায় না। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, চরিত্র চিরস্থায়ী। প্রতারণা মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু শেষ করে দিতে পারে না। আর পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়াতে চাইলে, ঝর্ণার মতো বারবার পড়েও আবার উঠে দাঁড়াতে জানতে হয়। আজ সে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে চায়। হয়তো পথটা কঠিন হবে। হয়তো সময় লাগবে। তবুও তার বিশ্বাস— যে মানুষ একবার ভেঙে গিয়েও বেঁচে থাকতে শিখেছে, তাকে আর কোনো ঝড় সহজে হারাতে পারে না। — সমাপ্ত —


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now