বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
তৃষ্ণানগর নামের একটি অদ্ভুত রাজ্য ছিল। রাজ্যের চারদিকে নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাশয়—সবই ছিল, কিন্তু মানুষ পানির চেয়ে বেশি ভালোবাসত পানির আলোচনা। সেখানে এমন অনেক লোক ছিল, যারা দিনে দশবার পানির উপকারিতা নিয়ে বক্তৃতা দিত, কিন্তু এক গ্লাস পানি খেতে বললে বলত, “আজ সময় নেই, কাল থেকে নিয়মিত শুরু করব।”
রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন জলমন্ত্রী শুষ্কানন্দ। তাঁর নামের সঙ্গে বাস্তবতার অদ্ভুত মিল ছিল। তিনি নিজে খুব কম পানি খেতেন, কিন্তু পানি নিয়ে বক্তৃতা দিতেন সবচেয়ে বেশি। প্রতি সপ্তাহে তিনি “জাতীয় জলসচেতনতা দিবস” পালন করতেন। দিবসের অনুষ্ঠানে বিশাল ব্যানারে লেখা থাকত—“পানি জীবন”, “পানি পান করুন”, “পানি ছাড়া প্রাণ নেই”। অনুষ্ঠানের শেষে সবাইকে এক বোতল কোমল পানীয় দেওয়া হতো।
তৃষ্ণানগরে তখন প্রচণ্ড গরম পড়েছে। সূর্য যেন রাজ্যের ওপর ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে নেমেছে। দুপুরবেলা রাস্তায় হাঁটলে মনে হতো কেউ মাথার ওপর বিশাল একটি তাওয়া ধরে রেখেছে। গাছেরা পাতার ফাঁকে ফাঁকে হাঁপাচ্ছিল, কুকুরেরা জিভ বের করে ছায়া খুঁজছিল, আর মানুষজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছিল—“গরমে সবাই সাবধানে থাকুন”—তারপর নিজেরাই এক ফোঁটা পানি না খেয়ে পাঁচ ঘণ্টা কাটিয়ে দিচ্ছিল।
রাজ্যের নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন চিকিৎসাবিদ্যার স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞ ডক্টর গুজবউদ্দিন। তাঁর কোনো ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বড়। তিনি ঘোষণা দিলেন, “যত বেশি পানি, তত বেশি সুস্বাস্থ্য। দিনে দুই লিটার কেন? বিশ লিটার খান!”
পরদিন রাজ্যের মানুষ পানির বোতল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। কেউ গলায় ঝুলিয়েছে পাঁচ লিটারের জার, কেউ মাথায় বেঁধেছে পানির ট্যাংক। স্কুলে ছাত্ররা বইয়ের বদলে বোতল নিয়ে যাচ্ছে। অফিসে কর্মচারীরা কাজের চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে বাথরুমে।
এক সপ্তাহের মধ্যে তৃষ্ণানগরে এক নতুন সংকট দেখা দিল। সবাই এত পানি খাচ্ছে যে কিডনি প্রতিবাদ মিছিল শুরু করল। অবশ্য বাস্তবে কিডনি হাঁটতে পারে না, কিন্তু রূপকের রাজ্যে সবই সম্ভব। কিডনিগুলো ব্যানার নিয়ে বের হলো—“আমাদেরও বিশ্রাম চাই”, “অতিরিক্ত উৎসাহও বিপজ্জনক”।
রাজা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এ কী হচ্ছে?”
কিডনিদের নেতা বলল, “মহারাজ, মানুষ এতদিন আমাদের অবহেলা করেছে। এখন আবার অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখাচ্ছে। দুইটাই সমান কষ্টদায়ক।”
রাজা মাথা চুলকালেন। তিনি বুঝলেন, তৃষ্ণানগরে সমস্যা পানির নয়, সমস্যার নাম ‘অতিরঞ্জন’।
এদিকে আরেক দল নাগরিক নতুন মতবাদ আবিষ্কার করল। তারা বলল, “খাবারের সঙ্গে পানি খাওয়া মহাপাপ। খাবার খেয়ে অন্তত বিশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে।”
বিষয়টি শুরু হয়েছিল স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ হিসেবে। কিন্তু তৃষ্ণানগরের মানুষ যেকোনো পরামর্শকে ধর্মগ্রন্থে পরিণত করতে ওস্তাদ ছিল।
ফলে একদিন দেখা গেল, একজন বৃদ্ধ ভাত খেতে খেতে বিষম খেয়েছেন। পাশে পানি রাখা আছে, কিন্তু তিনি কাঁপতে কাঁপতে বলছেন, “না, এখনও আট মিনিট বাকি!”
লোকজন তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছে—“ধৈর্য ধরুন। নিয়ম ভাঙবেন না।”
কেউ একজন ঘড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক বিশ মিনিট পূর্ণ হওয়ার পর তাঁকে পানি দেওয়া হলো। তখন তিনি বললেন, “এখন আর দরকার নেই, আমি ইতোমধ্যে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে দেখা করে এসেছি।”
তৃষ্ণানগরের মানুষ নিয়মকে এত ভালোবাসত যে যুক্তিকে সন্দেহ করত।
রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে বাস করতেন লেবুবালা নামের এক নারী। তিনি প্রতিদিন সকালে কুসুম গরম পানিতে লেবু মিশিয়ে খেতেন। এতে কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা হলো, তাঁর প্রতিবেশীরা ভাবল এই পানীয়ই সব রোগের ওষুধ।
একদিন বাজারে ঘোষণা দেওয়া হলো, “লেবু-গরম পানি খেলে ওজন কমে।”
পরদিন সবাই লেবুর দোকানে হামলা চালাল।
কেউ তিন কেজি লেবু কিনল, কেউ পাঁচ কেজি।
একজন এতটাই উৎসাহী ছিলেন যে দিনে চল্লিশ গ্লাস লেবু-পানি খেতে শুরু করলেন।
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “ওজন কমেছে?”
তিনি বললেন, “না, তবে ব্যাংক ব্যালান্স অনেক কমেছে।”
তবুও কেউ শিক্ষা নিল না।
কারণ মানুষ অনেক সময় ফলাফল দেখে না, স্লোগান দেখে।
তৃষ্ণানগরের সবচেয়ে বিখ্যাত রোগ ছিল গ্যাস্ট্রিক। এই রোগকে সবাই এমনভাবে লালন করত যেন এটি পরিবারের সদস্য।
কেউ সময়মতো খেত না, কেউ রাত তিনটায় ভাত খেত, কেউ সকালের নাশতা বাদ দিত। তারপর সবাই গ্যাস্ট্রিককে দোষ দিত।
একদিন গ্যাস্ট্রিক নিজেই আদালতে মামলা করল।
বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার অভিযোগ কী?”
গ্যাস্ট্রিক বলল, “মানুষ নিজেরা যা খুশি করে, তারপর সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপায়।”
আদালতে হাসির রোল পড়ে গেল।
গ্যাস্ট্রিক আবার বলল, “কেউ দিনে ছয় কাপ চা খায়, কেউ খালি পেটে ঝালমুড়ি খায়, কেউ রাত জেগে ভাজাপোড়া খায়। তারপর বলে আমি নাকি অত্যাচার করি!”
বিচারক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কারণ সত্য কথার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তা শুনতে মজার লাগলেও মানতে কষ্ট হয়।
এদিকে গরমের দিনে আরেক নতুন ফ্যাশন শুরু হলো। বাইরে থেকে এসে বরফ-ঠান্ডা পানি খাওয়া।
একটি কোম্পানি বাজারে নতুন পণ্য আনল—“মেরুপ্রদেশীয় পানি”।
বোতলের গায়ে লেখা—“এত ঠান্ডা যে পেঙ্গুইনও কাঁপবে।”
মানুষ লাইন দিয়ে কিনতে লাগল।
একদিন সূর্য নিজেই বিরক্ত হয়ে রাজদরবারে হাজির হলো।
সে বলল, “আমি তো শুধু গরম দিচ্ছি। কিন্তু এরা নিজেরাই শরীরের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে।”
রাজা বললেন, “তুমি কী পরামর্শ দাও?”
সূর্য উত্তর দিল, “যে কোনো কিছুতেই মধ্যপন্থা ভালো। কিন্তু তোমাদের মানুষজন মধ্যপন্থাকে খুব অপছন্দ করে। তারা হয় কিছুই করবে না, নয়তো সবকিছু অতিরিক্ত করবে।”
রাজা চুপ করে রইলেন।
কারণ সূর্যের কথায় সত্যের উত্তাপ ছিল।
একদিন তৃষ্ণানগরে এক রহস্যময় ভিক্ষুক এল। তাঁর নাম ছিল প্রজ্ঞাদাস।
তিনি কোনো বক্তৃতা দিতেন না। শুধু মানুষের কাজকর্ম দেখতেন।
একদল লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “স্বাস্থ্য ভালো রাখার গোপন রহস্য কী?”
তিনি বললেন, “যখন তৃষ্ণা পাবে, পানি খাও। নিয়মিত পানি খাও। কিন্তু পানিকে দেবতা বানিও না।”
লোকেরা হতাশ হলো।
কারণ তারা জটিল উত্তর আশা করেছিল।
প্রজ্ঞাদাস আবার বললেন, “খাবারের আগে-পরে সময়মতো পানি খাও। কিন্তু ঘড়িকে ডাক্তার বানিও না।”
লোকেরা আরও হতাশ হলো।
তিনি বললেন, “লেবু-পানি উপকারী হতে পারে। কিন্তু লেবুকে অলৌকিক শক্তির জাদুকর ভাবো না।”
এবার অনেকে রাগ করল।
কারণ মানুষ সহজ সত্যের চেয়ে চমকপ্রদ মিথ্যা বেশি পছন্দ করে।
প্রজ্ঞাদাস শেষবার বললেন, “স্বাস্থ্য কোনো একক নিয়মের ফল নয়। এটি অভ্যাস, ভারসাম্য, পরিমিতি আর সচেতনতার সমষ্টি।”
কিন্তু এই কথার কোনো বাজারমূল্য ছিল না।
কারণ বাজারে বিক্রি হয় বিস্ময়, ভারসাম্য নয়।
কয়েক মাস পরে তৃষ্ণানগরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।
মানুষ বুঝতে শিখল, পানি জীবন বটে, কিন্তু জীবনের পুরো অর্থ নয়।
কেউ আর অতিরিক্ত পানি খেয়ে নিজেকে জলাধার বানানোর চেষ্টা করল না।
কেউ ঘড়ি হাতে বসে থেকে পানির জন্য প্রাণপাত করল না।
কেউ লেবুকে জাদুকাঠি ভাবল না।
কেউ গ্যাস্ট্রিককে জাতীয় ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখল না।
ধীরে ধীরে তৃষ্ণানগরের মানুষ উপলব্ধি করল, তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল না গরম, না গ্যাস্ট্রিক, না তৃষ্ণা।
তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল অন্ধ অনুকরণ।
যে অনুকরণ মানুষকে চিন্তার বদলে স্লোগান শেখায়।
যে অনুকরণ পরামর্শকে জ্ঞান নয়, উন্মাদনায় পরিণত করে।
যে অনুকরণ স্বাস্থ্যকে বিজ্ঞানের বদলে ফ্যাশনে রূপ দেয়।
এরপর থেকে তৃষ্ণানগরের বিদ্যালয়গুলোতে একটি নতুন পাঠ চালু হলো—“পানির শিক্ষা”।
সেখানে শিশুদের শেখানো হতো, শুধু পানি পান করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, তথ্যও পান করতে হয়। তবে যেমন অতিরিক্ত পানি ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি যাচাই না করা তথ্যও বিপজ্জনক।
কারণ পৃথিবীতে পানিশূন্যতার মতোই একটি ভয়ংকর রোগ আছে—বুদ্ধিশূন্যতা।
আর সেই রোগের চিকিৎসা কোনো বোতলে বিক্রি হয় না।
তার জন্য দরকার প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তির আলো এবং পরিমিতির প্রজ্ঞা।
তৃষ্ণানগরের মানুষ শেষ পর্যন্ত পানি পান করতে শিখেছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তারা চিন্তা করতে শিখেছিল।
আর যে সমাজ চিন্তা করতে শেখে, সে সমাজের তৃষ্ণা শুধু শরীরের থাকে না—জ্ঞান, সত্য ও প্রজ্ঞার প্রতিও জন্ম নেয়।
সেদিন তৃষ্ণানগরের আকাশে মেঘ উঠেছিল। দূরে বৃষ্টি নামছিল। মানুষ ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ আর স্লোগান দিচ্ছিল না।
তারা শুধু নীরবে এক গ্লাস পানি পান করছিল।
কারণ অবশেষে তারা বুঝেছিল—জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে সবচেয়ে কম বাগাড়ম্বরই যথেষ্ট।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now