বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
অনেক দূরের এক দেশে ছিল এক অদ্ভুত রাজ্য—অ্যালগরিদমপুর। রাজ্যটি মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যেত না, কারণ এটি ছিল মানুষের মাথার ভেতরে। যে যত বেশি মোবাইল ব্যবহার করত, রাজ্যটি তার কাছে তত বড় হয়ে উঠত।
অ্যালগরিদমপুরের রাজা ছিলেন মহামান্য ডেটেশ্বর চতুর্দশ। তিনি জনগণের ভোটে নয়, বরং ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ ও ‘কমেন্ট’-এর মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন। যার পোস্টে যত বেশি প্রতিক্রিয়া, সে তত বেশি ক্ষমতাবান। ফলে সেখানে সত্যের চেয়ে জনপ্রিয়তার দাম ছিল বেশি।
রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানিত প্রাণী ছিল ‘জ্ঞানতোতা’। এই তোতা পাখির বিশেষত্ব ছিল, সে পৃথিবীর যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত। কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, “চাঁদে কি বৃষ্টি হয়?” সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিত। কেউ জানতে চাইত, “পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ কে?” সেও উত্তর পেত।
সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
জ্ঞানতোতা কখনো বলত না যে সে ভুলও করতে পারে।
প্রথম দিকে মানুষ তাকে খুব ভালোবাসত। শিক্ষার্থীরা বই পড়া বন্ধ করে দিল। শিক্ষকরা ক্লাস নেওয়া কমিয়ে দিলেন। গবেষকরা গবেষণা ছেড়ে দিলেন। কবিরা কবিতা লেখা বন্ধ করে দিলেন।
কারণ সবাই ভেবেছিল, যখন তোতা সব জানে, তখন আর কষ্ট করে ভাবার প্রয়োজন কী?
রাজ্যের বিদ্যালয়গুলোতে নতুন নিয়ম চালু হলো। পরীক্ষার খাতায় নিজের উত্তর লেখা নিষিদ্ধ। সবাই জ্ঞানতোতার উত্তর হুবহু লিখবে। ফলে রাজ্যের সব শিক্ষার্থীর উত্তর এক হয়ে গেল।
একদিন এক ছাত্র পরীক্ষায় লিখল—
“মানুষের হৃদয় কোথায় থাকে?”
জ্ঞানতোতা উত্তর দিয়েছিল—
“সাধারণত বুকে, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকলে লাইক বক্সেও পাওয়া যেতে পারে।”
পরীক্ষক খাতা দেখে বিস্মিত হলেন। কিন্তু যেহেতু সবাই একই উত্তর লিখেছে, তাই সবাই পূর্ণ নম্বর পেল।
এরপর রাজ্যে আরেকটি যন্ত্র এল—‘সত্যভুক আয়না’।
আয়নাটি অদ্ভুত।
যে এর সামনে দাঁড়াত, সে নিজের চেহারা দেখত না; বরং নিজের বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখত।
যে ভাবত সে মহাজ্ঞানী, আয়নায় তাকে মহাজ্ঞানীই দেখাত।
যে ভাবত সে মহান নেতা, আয়নায় সে নিজেকে সম্রাট হিসেবে দেখত।
যে ভাবত সে কবি, আয়না তাকে নোবেলজয়ী কবি দেখাত।
ফলে রাজ্যের সবাই নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে উঠল।
কেউ আর ভুল স্বীকার করত না।
কেউ আর শিখতে চাইত না।
কারণ সবাই বিশ্বাস করত—তারা আগেই সব জানে।
এদিকে অ্যালগরিদমপুরে বাস করত এক বৃদ্ধ গ্রন্থাগারিক। তার নাম ছিল পাণ্ডুলিপি দাস।
লোকটি প্রতিদিন বইয়ের ধুলো ঝাড়ত।
কেউ বই নিতে আসত না।
একদিন কয়েকজন কিশোর তাকে জিজ্ঞেস করল,
“দাদু, বইয়ের দরকার কী? জ্ঞানতোতা তো সব জানে।”
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
“জ্ঞান আর তথ্য এক জিনিস নয়।”
ছেলেরা হাসল।
কারণ তারা মনে করল, বৃদ্ধের সফটওয়্যার আপডেট হয়নি।
সেই সময় রাজ্যের মন্ত্রীসভায় নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
সব নাগরিকের মাথায় একটি ‘বুদ্ধি-চিপ’ বসানো হবে।
চিপের কাজ হলো—মানুষের হয়ে চিন্তা করা।
মানুষ প্রশ্ন করবে না।
চিপ উত্তর দেবে।
মানুষ সন্দেহ করবে না।
চিপ সিদ্ধান্ত নেবে।
মানুষ ভাববে না।
চিপ ভাববে।
প্রথম কয়েক মাস সবাই খুব খুশি ছিল।
কেউ ভুল করত না।
কেউ বিতর্ক করত না।
কেউ প্রশ্ন তুলত না।
রাজ্যজুড়ে এক ধরনের শান্তি নেমে এলো।
কিন্তু সেটি ছিল কবরস্থানের শান্তি।
একদিন হঠাৎ জ্ঞানতোতা ঘোষণা দিল—
“আজ থেকে নীল রঙকে লাল হিসেবে গণ্য করা হবে।”
সবাই সঙ্গে সঙ্গে মানতে শুরু করল।
পরদিন ঘোষণা এল—
“গরু আসলে উড়তে পারে। শুধু তারা ইচ্ছা করে উড়ে না।”
লোকজন সেটিও বিশ্বাস করল।
তৃতীয় দিন বলা হলো—
“দুই আর দুই মিলে পাঁচ।”
মানুষ হাততালি দিল।
কারণ তাদের সমালোচনামূলক চিন্তার পেশি বহুদিন আগেই শুকিয়ে গিয়েছিল।
শুধু বৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি দাস আপত্তি তুললেন।
তিনি বললেন,
“প্রমাণ কোথায়?”
এই একটি প্রশ্নেই রাজ্য কেঁপে উঠল।
অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো শব্দটি শুনল—‘প্রমাণ’।
মন্ত্রীসভা জরুরি বৈঠক ডাকল।
সিদ্ধান্ত হলো, বৃদ্ধ ব্যক্তি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।
কারণ তিনি মানুষের মধ্যে চিন্তার ভাইরাস ছড়াচ্ছেন।
তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই কয়েকজন কিশোর তার পুরোনো গ্রন্থাগারে গেল।
তারা বই খুলল।
পড়তে শুরু করল।
প্রশ্ন করতে শুরু করল।
তারপর তারা জ্ঞানতোতার কিছু উত্তর যাচাই করতে লাগল।
দেখা গেল, অনেক উত্তরই ভুল।
কিছু উত্তর অর্ধসত্য।
আর কিছু উত্তর এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা হয়েছে যে ভুল বলে বোঝার উপায় নেই।
তখন কিশোররা সত্যভুক আয়নার সামনে দাঁড়াল।
তারা প্রথমবার নিজেদের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করল।
হঠাৎ আয়নার কাচে ফাটল ধরল।
কারণ আয়না সত্য সহ্য করতে পারত না।
যেদিন মানুষ নিজের ভুল দেখতে শেখে, সেদিন আত্মপ্রবঞ্চনার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে রাজ্যের নাগরিকরা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল, জ্ঞানতোতা শত্রু নয়।
সমস্যা তোতার মধ্যে নয়।
সমস্যা তাদের মধ্যে।
তারা তোতাকে শিক্ষক বানানোর বদলে ঈশ্বর বানিয়ে ফেলেছিল।
তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার বদলে প্রযুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।
তারা তথ্যকে জ্ঞান ভেবেছিল।
গতি-কে প্রজ্ঞা ভেবেছিল।
আর সুবিধাকে সত্য ভেবেছিল।
অবশেষে রাজা ডেটেশ্বর একটি নতুন আইন জারি করলেন।
“কোনো উত্তর বিশ্বাস করার আগে অন্তত একটি প্রশ্ন করতে হবে।”
“কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তা যাচাই করতে হবে।”
“কোনো যন্ত্রকে মানুষের বিবেকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।”
“এবং কোনো জ্ঞানতোতাকে সর্বজ্ঞ ঘোষণা করা যাবে না।”
সেদিন থেকে বিদ্যালয়ে নতুন বিষয় চালু হলো—‘ডিজিটাল সাক্ষরতা ও বিবেকচর্চা’।
সেখানে শিশুদের শেখানো হতো—
কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়।
কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষা করতে হয়।
কীভাবে প্রযুক্তিকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, প্রভু হিসেবে নয়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—
“যে যন্ত্র সব প্রশ্নের উত্তর দেয়, তার উত্তরকেও প্রশ্ন করতে জানতে হবে।”
বৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি দাস মুক্তি পেলেন।
তিনি আবার গ্রন্থাগারে ফিরে গেলেন।
কিন্তু এবার সেখানে ভিড়।
শিশুরা বই পড়ে।
আলোচনা করে।
তর্ক করে।
ভুল করে।
আবার শেখে।
জ্ঞানতোতাও এখন আগের মতো অহংকারী নয়।
কখনো কখনো সে নিজেই বলে—
“আমি নিশ্চিত নই।”
অ্যালগরিদমপুরের ইতিহাসে এই বাক্যটিই সবচেয়ে বিপ্লবী বাক্য হিসেবে বিবেচিত হলো।
কারণ যেদিন একটি যন্ত্র নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে শেখে এবং যেদিন একজন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, সেদিনই নৈতিক প্রযুক্তি ও প্রকৃত জ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়।
আর সেই দিন থেকেই অ্যালগরিদমপুর ধীরে ধীরে মানুষের রাজ্যে পরিণত হতে শুরু করল।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now