বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
কালো গোলাপের চাবি
"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Queen (০ পয়েন্ট)
X
লেখিকা: আরোহি
*অধ্যায় ১
রাত ২টা ১৭। পুরান পল্টনের ৪২ নম্বর বাড়ি। ছয়তলা। লিফটে "নষ্ট" লেখা কাগজ ঝুলছে তিন মাস ধরে। নিশি সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। প্রতি ধাপে ওর কেডসের শব্দ ইকো হচ্ছে। চারপাশে অন্ধকার। শুধু ফোনের টর্চ জ্বলছে।
ফোনে মেসেজটা এসেছে সন্ধ্যা ৭টা থেকে। একই লাইন বারবার: "ছাদে আয়। একা। ২টা ১৭। না আসলে কাল সকালের পত্রিকায় তোর ছবি। ক্যাপশন: খুনি।"
নিশি মেসেজটা ডিলিট করতে পারেনি। কারণ সেন্ডার নম্বরটা ওর নিজের নম্বর।
পাঁচ তলায় উঠে ও দাঁড়াল। বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। তিন বছর আগে এই বাড়িতেই আরাভের সাথে ওর শেষ দেখা হয়েছিল। সেদিনও বৃষ্টি ছিল। সেদিনও আরাভ বলেছিল, "তুই আমার যোগ্য না, নিশি। তোর মধ্যে অন্ধকার আছে।"
ছাদের দরজাটা হাট করে খোলা। বাতাসে কিসের গন্ধ? চন্দন আর রক্ত মেশানো গন্ধ।
ছাদে উঠেই নিশির পা আটকে গেল। সামনে আরাভ। ঝুলছে। কিন্তু গলায় দড়ি না। কালো রেশমের ফিতা। এত পাতলা ফিতা যে কেটে বসে গেছে চামড়ায়। মুখটা নীল হয়ে গেছে। চোখ খোলা। যেন কিছু দেখে মরেছে।
আরাভের বুকের উপর একটা শুকনো কালো গোলাপ। পাপড়িতে হাতে লেখা সংখ্যা: ১। কালি না। রক্ত।
নিশি বমি আটকাল। ও আরাভকে ঘৃণা করত। হ্যাঁ। কিন্তু এভাবে মরতে দেখবে ভাবেনি।
"পুলিশ ডাকতে হবে।" ও পকেটে হাত দিল। ফোন নেই। ছাদে আসার পথে পড়ে গেছে।
হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু পড়ার শব্দ। নিশি নিচে তাকাল। একটা খাম। বাদামি খাম। সিল করা। খামের উপর ওর নাম। লাল কালি দিয়ে: নিশি।
কে ফেলল? ছাদে ও ছাড়া কেউ নেই। মাথা তুলে দেখল। চারপাশে শুধু পানির ট্যাঙ্ক আর অ্যান্টেনা।
কাঁপা হাতে খাম ছিঁড়ল। ভেতর থেকে বের হলো একটা মরিচা ধরা চাবি আর ভাঁজ করা কাগজ। কাগজে চার লাইন:
_আমার ঘর নেই, তবু আমি থাকি
আমার মুখ নেই, তবু আমি হাসি
আমি ছুঁতে পারি না, তবু আমায় ছোঁও
আমি মরলে তুমিও মরবে। বলো, আমি কে?_
নিচে লেখা: "২৪ ঘণ্টা সময়। উত্তর দাও আমার ইমেইলে। thedarkshadow@proton.me
ভুল উত্তর দিলে পরের লাশ তুমি। ঠিক উত্তর দিলে তৃতীয় লাশটা বাঁচবে।
চাবিটা তোমার বাসার বুকশেলফের গোপন ড্রয়ারের। ২০২১ এর ১৪ ফেব্রুয়ারির ডায়েরিটা ওখানে। পড়ো। মনে পড়বে তুমি কী করেছিলে।"
নিশির হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ভ্যালেন্টাইনস ডে। সেদিন ও আরাভকে একটা ঘুমের ওষুধ মেশানো কফি দিয়েছিল। শুধু ভয় দেখানোর জন্য। আরাভ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। নিশি ভেবেছিল ও মরে গেছে। ১০ মিনিট। মাত্র ১০ মিনিট ও আরাভের পাশে বসে কেঁদেছিল। তারপর আরাভ জেগে উঠে ওকে থাপ্পড় মেরে চলে যায়।
"তুই সাইকো, নিশি। তোর সাথে আর না।"
সেই রাতের কথা কেউ জানে না। আরাভও কাউকে বলেনি। তাহলে এই খুনি জানল কীভাবে?
নিশি চাবিটা মুঠোয় চেপে ধরল। ধাঁধার উত্তর ও জানে। ছায়া। ছোটবেলায় দাদুর কাছে শিখেছিল। কিন্তু উত্তর দিলেই কি ও নিরাপদ হবে?
হঠাৎ ছাদের অপর পাশে শব্দ। টিনের চালে কেউ হাঁটছে। ধীর পায়ে। ছপ ছপ।
নিশি টর্চ ঘোরাল। আলো পড়ল একটা কালো ছায়ার উপর। লম্বা। কালো লম্বা কোর্ট। মুখে সাদা মাস্ক। শুধু চোখ দুইটা দেখা যাচ্ছে। ধূসর। একদম মরা মাছের মতো ধূসর।
লোকটা এক পা এগোল। নিশি দুই পা পিছাল। ছাদের কিনারা। নিচে ৬ তলা। পড়লে হাড়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
"দেরি করে ফেলেছো, নিশি।" লোকটার গলা ফিসফিসে। কিন্তু প্রতিটা শব্দ ছুরির মতো বিঁধছে।
"তুমি কে? আরাভকে তুমি মারোনি?"
"আমি মারিনি।" লোকটা মাথা নাড়ল। "আমি শুধু বিচারক। তুমি আরাভ, দুইজনেই পাপী। ও তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল। তুমি ওকে মারতে চেয়েছিলে। এখন হিসাব সমান।"
নিশির গলা শুকিয়ে গেল। "তুমি পুলিশ?"
লোকটা হাসল। মাস্কের ভেতর থেকে দাঁত দেখা গেল। "পুলিশ হলে এতক্ষণে তুমি হ্যান্ডকাফ পরে থাকতে। আমি তোমার প্রেমিক, নিশি। যে অন্ধকারে তোমাকে দেখেছে। যে জানে তোমার সব পাপ।"
ও পকেট থেকে আরেকটা কালো গোলাপ বের করল। নিশির হাতে গুঁজে দিল। গোলাপের কাঁটা নিশির তালু কেটে দিল। এক ফোঁটা রক্ত পড়ল গোলাপে।
"এটা রাখো। পরের চিঠি পাবে কাল ঠিক ২টা ১৭ তে। তোমার বালিশের নিচে। আর হ্যাঁ, ধাঁধার উত্তরটা দিও। ছায়া। আমি জানি তুমি জানো। কিন্তু উত্তর দিলেই খেলাটা শুরু হবে।"
দূরে সাইরেনের শব্দ। পুলিশ আসছে। কেউ খবর দিয়েছে।
লোকটা এক লাফে পাশের বিল্ডিং এর ছাদে চলে গেল। মানুষ না যেন বিড়াল। দুই সেকেন্ডে অন্ধকারে মিশে গেল।
নিশি একা দাঁড়িয়ে রইল। হাতে কালো গোলাপ, পকেটে মরিচা ধরা চাবি, পায়ের কাছে আরাভের লাশ। আর মাথায় হাজারটা প্রশ্ন।
খুনি ওকে ভালোবাসে বলল। কিন্তু ভালোবাসার নামে ওকে ফাঁসাচ্ছে কেন? ধাঁধার উত্তর দিলে তৃতীয় লাশ কে বাঁচবে? আর ১৪ ফেব্রুয়ারির ডায়েরিতে আসলে কী লেখা আছে?
সাইরেন কাছে চলে এল। নিশি দৌড় দিল সিঁড়ির দিকে। ধরা পড়া যাবে না। ধরা পড়লে ওর পাপ সবাই জেনে যাবে।
ছাদ থেকে নামতে নামতে ওর ফোনে আবার মেসেজ এল। ওর নিজের নম্বর থেকে।
"সুন্দরী, দৌড়াও না। তোমার ছায়া তোমার সাথেই আছে।"
নিশি ফোন ছুড়ে ফেলে দিল। স্ক্রিন ভেঙে গেল। কিন্তু মেসেজটা ওর মাথায় গেঁথে গেল।
ওর ছায়া। ওর সাথেই আছে।
---
নিশি সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তিনবার হোঁচট খেল। মাথার ভেতর শুধু একটা কথা ঘুরছে: ১৪ ফেব্রুয়ারির ডায়েরি। ওটা ওর বাসায়। তালা দেয়া বুকশেলফের গোপন ড্রয়ারে। চাবি ছাড়া খোলা যায় না।
কিন্তু চাবিটা এখন ওর পকেটে। মরিচা ধরা, ঠান্ডা। যেন বরফের টুকরা।
বাসায় ঢুকেই ও লাইট জ্বাল না। অন্ধকারই নিরাপদ। পুরান ঢাকার এই ফ্ল্যাটটা ওর দাদুর। দাদু মারা যাওয়ার পর ও একা থাকে। বুকশেলফটা ঘরের কোণায়। কাঠের, ভারী। দাদু বলতেন, "এই শেলফে আমার সব পাপ রাখা, নাতনি। তুমি খুলো না।"
নিশি কখনো খোলেনি। আজ খুলতে হবে।
চাবিটা ড্রয়ারের ছোট তালায় লাগাতেই কট করে শব্দ হলো। ড্রয়ার খুলে গেল। ভেতরে একটা কালো ডায়েরি। চামড়ার কভার। উপরে সোনালি কালি দিয়ে লেখা: N+A = Forever।
N+A। নিশি আরাভ।
হাত কাঁপছে। ডায়েরি খুলল ও। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ এর পাতা। ওর নিজের হাতের লেখা।
_"আজ আরাভ বলল ও নাকি মিতুকে ভালোবাসে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল। তিন বছরের রিলেশন শেষ করে দিল এক মিনিটে। আমি ওকে কফি বানিয়ে দিলাম। ওর ফেভারিট। শুধু দুইটা ঘুমের ট্যাবলেট গুঁড়ো করে মেশালাম। ও ঘুমাক। তারপর আমি ওকে বোঝাবো আমি ছাড়া ওর কেউ নেই। আমি ওকে মারতে চাইনি। শুধু... শুধু ও যেন আমাকে ছেড়ে না যায়।"_
নিশি পাতাটা ছিঁড়ে ফেলতে গেল। পারল না। চোখের পানি পড়ে কালি লেপ্টে গেল।
হঠাৎ দরজায় টক টক। রাত ৩টা। এই সময় কে?
নিশি ডায়েরি বুকের সাথে চেপে ধরল। দরজার পিপহোলে চোখ রাখল। বাইরে কেউ নেই। গলিটা ফাঁকা। শুধু একটা কালো খাম পড়ে আছে পাপোশের উপর।
দরজা খুলল ও। খামটা তুলতেই ভেতর থেকে আরেকটা চিঠি আর একটা ছবি পড়ল।
ছবিটা ওর নিজের। ঘুমন্ত অবস্থায় তোলা। ওর বেডরুমের ছবি। মানে কেউ ওর রুমে ঢুকেছে। ক্যামেরা বসিয়েছে।
চিঠিতে লেখা: "ডায়েরি পড়েছো? ভালো। এখন দ্বিতীয় ধাঁধা। উত্তর দাও ১২ ঘণ্টার মধ্যে।
_আমার জন্ম নেই, তবু আমি বড় হই
আমাকে খাওয়ালে আমি মরে যাই
আমি আলো দেখলে পালাই
আমি অন্ধকারের বন্ধু। বলো, আমি কে?_
P.S. ছবিটা সুন্দর না? তুমি ঘুমালে তোমাকে পাহারা দিই আমি। ডার্কলি ভালোবাসি তো।"
নিশির গা হিম হয়ে গেল। কেউ ওর রুমে ঢোকে। ওকে দেখে। ও ঘুমালে পাহারা দেয়। এটা ভালোবাসা না, এটা স্টকিং। ডার্ক রোমান্সের নামে সাইকোপ্যাথি।
ও জানালা বন্ধ করল। কার্টেন টেনে দিল। তবু মনে হচ্ছে কেউ ওকে দেখছে। ওর ছায়াটাই যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে।
ধাঁধার উত্তর: আগুন। ও জানে। কিন্তু উত্তর পাঠাবে কোথায়? thedarkshadow@proton.me এই ইমেইলে?
ল্যাপটপ অন করল। ইমেইল লিখতে গেল। সাবজেক্টে লিখল "উত্তর: আগুন"। সেন্ড বাটনে আঙুল রাখতেই স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। তারপর একটা লাইন ভেসে উঠল:
"স্মার্ট মেয়ে। উত্তর ঠিক হয়েছে। তৃতীয় লাশ বেঁচে গেল। আপাতত।"
স্ক্রিন আবার নরমাল। যেন কিছুই হয়নি।
নিশি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মাথা ঘুরছে। খুনি ওর ল্যাপটপও হ্যাক করেছে। মানে ওর সব ডাটা ওর কাছে।
ফোনটা ভাঙা। নতুন ফোন কিনতে হবে। কিন্তু টাকা? ওর ব্যাংক ব্যালেন্স চেক করতে গিয়ে দেখল, লাস্ট ট্রানজেকশন: আজ রাত ২টা ১৮। ১ টাকা। সেন্ডার: Dark Shadow। রিমার্কে লেখা: "চায়ের দাম। জেগে আছো তো?"
ও এক টাকার জন্য কেউ খুন করে না। কিন্তু খুনি করছে। খেলছে।
টেবিলের উপর কালো গোলাপটা রাখা। গোলাপের পাপড়ি নড়ে উঠল। বাতাস নেই। তবু নড়ল। নিশি ভালো করে তাকিয়ে দেখল, পাপড়ির নিচে ছোট করে একটা চিরকুট লুকানো।
চিরকুটে একটা ঠিকানা আর একটা সময়: "কাল রাত ১২টা। শ্যামবাজারের পুরনো লঞ্চঘাট। একা আসবে। মাস্ক পরা লোকটাকে বিশ্বাস করো না। ও মিথ্যা বলে। আমাকে বিশ্বাস করো। আমি তোমাকে বাঁচাবো। -A"
A মানে আরাভ? আরাভ তো মরে গেছে। তাহলে চিরকুট পাঠাল কে?
নিশি চিরকুটটা মুচড়ে ফেলল। মাথা কাজ করছে না। খুনি ওকে ভালোবাসে বলে। আরেকজন চিরকুট দিয়ে বাঁচাতে চায় বলে। আর পুলিশ ওকে খুনি ভাববে। কারণ আরাভের লাশের কাছে ওর ফোন, ওর চুল, ওর লিপস্টিকের দাগ সব পাওয়া যাবে।
আয়নার সামনে দাঁড়াল ও। নিজের চোখের দিকে তাকাল। চোখের নিচে কালি। তিন বছর আগের সেই ভয়টা আবার ফিরে এসেছে। ও কি সত্যি সাইকো? আরাভকে মারতে চেয়েছিল। পারেনি। এখন আরাভ মরে গেছে। কাকতালীয়?
আয়নায় ওর পেছনে একটা ছায়া নড়ে উঠল। নিশি চমকে ঘুরল। কেউ নেই। শুধু ওর নিজের ছায়া।
ছায়াটা ওকে দেখে হাসল। ঠিক যেমন ধাঁধায় লেখা: "আমার মুখ নেই, তবু আমি হাসি।"
নিশি চিৎকার করে উঠল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না।
টেবিলের উপর ল্যাপটপটা আবার টিং করে উঠল। নতুন মেইল। সেন্ডার: thedarkshadow@proton.me
"ভয় পেয়ো না, সুন্দরী। ছায়া তোমার শত্রু না। ছায়া তোমার প্রেমিক। আমি। কাল রাত ১২টা। লঞ্চঘাটে এসো। আমি তোমাকে চুমু খাব। ডার্কলি। তারপর বলব পরের লাশ কে হবে।"
মেইলের নিচে একটা এটাচমেন্ট। নিশি ভয়ে ভয়ে ক্লিক করল।
একটা অডিও ফাইল। প্লে করতেই একটা গলার স্বর ভেসে এল। আরাভের গলা। কিন্তু মরা মানুষের মতো ভারী।
"নিশি... তুমি আমাকে মারোনি। কিন্তু তুমিই আমার মৃত্যুর কারণ। এখন তুমিই পরের শিকার। পালাও। ওকে বিশ্বাস করো না। ও..."
অডিওটা কেটে গেল। মাঝপথে।
নিশি ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল। দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরল। ঘরের সব আলো নিভে গেল। লোডশেডিং।
অন্ধকারে শুধু ওর নিঃশ্বাসের শব্দ। আর দূর থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি। ফজরের আজান।
রাত শেষ। নতুন দিন শুরু। আর খুনির খেলাও।
নিশি বুঝে গেল, ও একা না। ওর সাথে ওর ছায়া আছে। আর সেই ছায়াটাই ওকে ভালোবাসে। ডার্কলি। মারাত্মকভাবে।
--
সারাত নিশি ঘুমায়নি। লোডশেডিং এর পর কারেন্ট আসেনি। মোমবাতির আলোয় ও ডায়েরির পাতা উল্টেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারির পরের পাতাগুলো সব ছেঁড়া। কেউ ছিঁড়েছে। কিন্তু কে?
সকাল ১০টা। পুলিশ এল ওর বাসায়। অফিসার রায়হান। লম্বা, সোজা চেহারা। চোখ দুইটা ধারালো।
"মিস নিশি, আরাভের লাশের পাশে আপনার ফোন পাওয়া গেছে। আর ছাদে আপনার চুল, আপনার লিপস্টিকের দাগ। আপনি ওখানে কী করছিলেন রাত ২টায়?"
নিশি মিথ্যা বলতে পারল না। সব বলল। শুধু চাবি আর ডায়েরির কথা বাদ দিল।
রায়হান ওর দিকে তাকিয়ে রইল। "ধাঁধা পেয়েছেন? কেউ আপনাকে হুমকি দিচ্ছে? মিস নিশি, আপনি কি কিছু লুকাচ্ছেন?"
"না।" নিশির গলা কেঁপে গেল।
রায়হান একটা কার্ড দিল। "কিছু মনে পড়লে কল দিয়েন। আর একা বের হবেন না। খুনি সিরিয়াল কিলার হতে পারে।"
পুলিশ চলে যাওয়ার পর নিশি দরজা বন্ধ করল। ওর হাতে এখন দুইটা অপশন। পুলিশকে বিশ্বাস করা, নাকি ছায়ামানুষটাকে।
রাত ১টা ৫০। শ্যামবাজারের পুরনো লঞ্চঘাট। বুড়িগঙ্গার পানি কালো। বাতাসে পচা গন্ধ। ঘাটে একটা বাতি টিমটিম করছে।
নিশি এল। একা। মাস্ক পরে। চিরকুটের কথা মতো।
১২টা বাজতেই ঘাটের ওপাশ থেকে কেউ এল। কালো কোর্ট। মুখে সাদা মাস্ক। ধূসর চোখ। ছায়ামানুষ।
"এসেছো।" ওর গলা শান্ত। "সাহসী মেয়ে।"
"তুমি আরাভকে মারোনি বলেছিলে। তাহলে কে মেরেছে?"
ছায়ামানুষ এক পা এগোল। নিশি পিছাল না। "আমি মারিনি। আমি শুধু সাজাই। মারো তোমরা। তোমার পাপ, ওর বিশ্বাসঘাতকতা।"
"তুমি কে?"
"আমি তোমার ছায়া, নিশি। যে তোমাকে তিন বছর ধরে দেখছে। যেদিন আরাভ তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল, সেদিন থেকে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কারণ তুমি আমার মতো। অন্ধকার।"
নিশির বুক কেঁপে উঠল। "ডার্ক রোমান্স করো না আমার সাথে। সত্যি বলো। পরের লাশ কে?"
ছায়ামানুষ হাসল। "পরের লাশ... অফিসার রায়হান। কাল রাত ২টা ১৭। ও তোমাকে সন্দেহ করে। সন্দেহ করা পাপ।"
হঠাৎ ঘাটের পেছন থেকে গুলির শব্দ। টাস। ছায়ামানুষ পাশ কাটাল। একটা বুলেট ওর কোর্ট ছিঁড়ে গেল।
"পুলিশ!" নিশি চিৎকার করল।
ছায়ামানুষ ওর হাত ধরল। বরফের মতো ঠান্ডা হাত। "পালাও, নিশি। ওরা তোমাকে ফাঁসাবে। আমার সাথে এসো।"
নিশি হাত ছাড়িয়ে নিল। "আমি খুনি না।"
"সবাই খুনি, সুন্দরী। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষে। তুমি আরাভকে ওষুধ দিয়েছিলে। আমিও ওকে মারতে হেল্প করেছি। আমরা সমান।"
নিশি পেছন ঘুরে দৌড় দিল। পেছনে পায়ের শব্দ। ছায়ামানুষ ওর পিছু নেয়নি। বরং দাঁড়িয়ে বলল:
"তৃতীয় ধাঁধা কাল রাত ২টা ১৭ তে পাবে। উত্তর দিলে রায়হান বাঁচবে। ভুল দিলে ও মরবে। আর হ্যাঁ... আমি তোমাকে চুমু খেতে পারিনি আজ। কাল খাবো।"
নিশি দৌড়াতে দৌড়াতে বুড়িগঙ্গার পাড়ে পড়ে গেল। হাঁটু ছিলে গেল। রক্ত বের হলো।
পেছন ফিরে তাকাল। ঘাট ফাঁকা। ছায়ামানুষ নেই। শুধু পানিতে একটা কালো গোলাপ ভাসছে।
ওর ফোনে মেসেজ এল। ওর নিজের নম্বর থেকে: "ভালো দৌড়াও তুমি। আগামীকাল রাত ২টা ১৭। রায়হানের জন্য প্রার্থনা করো। উত্তর: অন্ধকার।"
অন্ধকার। তৃতীয় ধাঁধার উত্তর। ও জানত না, কিন্তু মেসেজেই উত্তর দিয়ে দিল খুনি।
নিশি বুঝল, খুনি ওকে বাঁচাচ্ছে না। ওকে দিয়ে খেলাচ্ছে। আর ও নিজেও এই খেলায় মজা পাচ্ছে। কারণ তিন বছর ধরে ওর ভেতরের অন্ধকারটা কেউ বোঝেনি। এই ছায়ামানুষটা বোঝে।
ডার্কলি। ভয়ংকরভাবে।
চলবে---
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now