বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

“অলসপুরের মহামান্য কর্মবিরতি পরিষদ”

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ অলসপুর নামের রাজ্যটি পৃথিবীর মানচিত্রে ছিল না, কিন্তু পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষের ভেতরে তার একটি করে গোপন শাখা ছিল। সেই রাজ্যের জাতীয় সঙ্গীত ছিল—“আজ না হোক, কাল তো আছেই।” আর জাতীয় প্রতীক ছিল আধখাওয়া একটি কলা, যা খেতে খেতে কেউ আর শেষ করেনি। রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল “পরে করবো নগর”। সেখানে ঘড়ির কাঁটা ঘুরত ধীরে, কিন্তু অজুহাতের চাকা চলত খুব দ্রুত। অলসপুরের রাজা ছিলেন মহামান্য বিলম্বেশ্বর তৃতীয়। তিনি এতটাই কর্মবিমুখ ছিলেন যে সিংহাসনে বসার পর রাজকীয় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, —“আজ আর বললাম না, কাল বিস্তারিত বলবো।” সেই “কাল” আর আসেনি। রাজা রাজত্ব চালাতেন না, বরং “চলবে” বলে চালিয়ে দিতেন। তাঁর প্রধান উপদেষ্টার নাম ছিল টালবাহানা চন্দ্র। লোকটি এমনভাবে কথা বলত যেন প্রতিটি কাজই আগামী শতাব্দীর জন্য নির্ধারিত। অলসপুরে একটি মন্ত্রণালয় ছিল—“জাতীয় কর্মবিরতি ও অজুহাত উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।” সেখানে হাজার হাজার কর্মকর্তা কাজ করতেন, যদিও কেউ কোনোদিন কাজ করতে দেখা যায়নি। অফিসে ঢুকেই সবাই প্রথমে চা খেত, তারপর চায়ের ক্লান্তি কাটাতে বিশ্রাম নিত, বিশ্রামের পর দুপুরের খাবার, খাবারের পর ঘুম, আর ঘুম থেকে উঠে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি। মন্ত্রণালয়ের দেয়ালে বিশাল অক্ষরে লেখা ছিল— “কাজ করলে ভুল হতে পারে, কাজ না করলে ভুলের প্রশ্নই ওঠে না।” অলসপুরের জনগণ অত্যন্ত সভ্য ছিল। তারা কখনো কারও অনুরোধ সরাসরি ফিরিয়ে দিত না। তারা বলত—“অবশ্যই করবো।” তারপর এমনভাবে হারিয়ে যেত যেন প্রতিশ্রুতিটাই ছিল এক ধরনের সাহিত্যিক রূপক। রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষ ছিলেন দার্শনিক আলসেমি আলী। তিনি প্রতিদিন শহরের মোড়ে বসে বক্তৃতা দিতেন। তাঁর অনুসারীরা তাকে “স্থিরতার সাধক” বলত। একদিন তিনি বললেন, —“মানুষ কাজ করে কেন? কারণ সে বসে থাকতে জানে না।” জনতা হাততালি দিল। যদিও হাততালিটাও তারা ধীরে ধীরে দিল, যেন দ্রুত তালি দিলে অতিরিক্ত শক্তি খরচ হয়ে যাবে। অলসপুরে এক অদ্ভুত আইন ছিল—যে যত বেশি কাজ ফেলে রাখতে পারবে, সে তত বড় সম্মান পাবে। প্রতি বছর “জাতীয় বিলম্ব পদক” দেওয়া হতো। একবার একজন নাগরিক বিশ বছর ধরে নিজের ঘরের ভাঙা দরজা ঠিক করেনি। তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠতে বলা হলে সে বলেছিল, —“আজ উঠতে ইচ্ছে করছে না, পরে নেব।” রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাও ছিল অভিনব। স্কুলে ছাত্রদের শেখানো হতো—“যে পড়া আজ পড়া যায়, তা আগামীকাল পর্যন্ত ফেলে রাখার মধ্যেই জ্ঞানের পরিপক্বতা।” পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে ছাত্ররা প্রথমে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। তারপর একজন আরেকজনকে বলত, —“এত তাড়া কীসের? জীবন তো পড়ে আছেই!” বিশ্ববিদ্যালয়ে “অলসতাতত্ত্ব” নামে একটি বিভাগ ছিল। সেখানে গবেষণা হতো—কীভাবে একটি সাধারণ কাজকে জটিল অজুহাতে রূপান্তর করা যায়। এক অধ্যাপক দশ বছর ধরে একটি গবেষণাপত্র লিখছিলেন—“আগামীকাল নামক মনস্তাত্ত্বিক মরীচিকা।” শেষ পর্যন্ত তিনি সেটি জমা দেননি। কারণ তিনি মনে করতেন, অসমাপ্ত গবেষণার মধ্যেই গবেষণার সৌন্দর্য। অলসপুরের অর্থনীতিও ছিল চমৎকার। কেউ সময়মতো কিছু না করলেও সবাই আশা করত সব ঠিক হয়ে যাবে। কৃষক বীজ বুনতে ভুলে যেত, তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, —“আল্লাহ ভরসা।” ব্যবসায়ী দোকান খুলতে দেরি করত, তারপর কাস্টমার না পেয়ে দুঃখ করত। চিকিৎসক রোগী দেখার আগে বিশ্রাম নিতেন, রোগী ততক্ষণে সুস্থ হয়ে গেলে বলতেন—“দেখলেন? বিশ্রামই আসল ওষুধ।” এই রাজ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থায় ছিল ঘড়িগুলো। তারা সারাক্ষণ মানুষকে সময় মনে করিয়ে দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একসময় অলসপুরের সব ঘড়ি একত্র হয়ে ধর্মঘট ডাকল। একটি দেয়ালঘড়ি চিৎকার করে বলল, —“আমরা আর সময় দেখাবো না! এরা সময়কে কোনো সম্মানই দেয় না!” কিন্তু নাগরিকরা তাতেও বিচলিত হলো না। তারা বলল, —“সময় না জানলে তো আরও ভালো। এখন দেরি হওয়ার ভয়ও নেই।” অলসপুরের রাজপ্রাসাদে একদিন এক রহস্যময় লোক এল। তার নাম কর্মেশ। লোকটি দেখতে সাধারণ, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত জ্যোতি। সে রাজাকে বলল, —“মহারাজ, এই রাজ্য ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।” রাজা হাই তুলে বললেন, —“ধ্বংসও তো একদিনে হয় না।” কর্মেশ বলল, —“মানুষ কাজ না করে শুধু অজুহাত বানাচ্ছে। তারা বাঁচছে না, কেবল সময় পার করছে।” মন্ত্রী টালবাহানা চন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন, —“আপনি উন্নয়ন বুঝেন না। আমাদের এখানে চিন্তার স্বাধীনতা আছে। কেউ চাইলে কাজ না করারও স্বাধীনতা পায়।” কর্মেশ বুঝল, সরাসরি উপদেশে লাভ হবে না। তাই সে এক অভিনব পরিকল্পনা করল। সে শহরের মাঝখানে একটি বিশাল আয়না বসাল। নাম দিল—“আত্মদর্শন যন্ত্র।” প্রথম দিন লোকজন ভিড় করল। আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে তারা ভয় পেয়ে গেল। কারণ সেখানে তাদের চেহারা নয়, তাদের অসমাপ্ত কাজগুলো দেখা যাচ্ছিল। কারও বইয়ের ধুলো, কারও অপূর্ণ স্বপ্ন, কারও অবহেলিত সম্পর্ক, কারও বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিভা। এক যুবক দেখল, সে একসময় কবি হতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রতিদিন “আগামীকাল লিখবো” বলতে বলতে তার খাতা সাদা রয়ে গেছে। এক বৃদ্ধ দেখলেন, তিনি জীবনে সন্তানকে সময় দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু “কাজের চাপ” আর “পরে সময় দেব” বলতে বলতে ছেলে বড় হয়ে দূরে চলে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই প্রথমবারের মতো অস্বস্তি অনুভব করল। অলসপুরে এর আগে কেউ নিজের ভেতর এত গভীরভাবে তাকায়নি। কিন্তু বিপদ ঘটল অন্য জায়গায়। রাজ্যের অজুহাত ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। তারা দেখল, মানুষ ধীরে ধীরে কাজ শুরু করছে। ফলে অজুহাতের বাজার পড়ে যাচ্ছে। “কাল করবো লিমিটেড” নামের একটি কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার পথে। তারা জরুরি বৈঠক ডাকল। কোম্পানির চেয়ারম্যান বললেন, —“এই কর্মেশ আমাদের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষ যদি কাজ শুরু করে, তাহলে আমরা অজুহাত বিক্রি করবো কাকে?” অবশেষে তারা রাজার কাছে অভিযোগ দিল। রাজা বিরক্ত হয়ে বললেন, —“লোকটাকে গ্রেপ্তার করো… না থাক, আজ না। কাল করো।” এই “কাল” এর মধ্যেই কর্মেশ আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠল। সে মানুষের কাছে ছোট ছোট কাজের গুরুত্ব বোঝাতে লাগল। সে বলত, —“একটি ঘর পরিষ্কার করা মানে শুধু ঘর পরিষ্কার করা নয়; এটি নিজের মনের ধুলো ঝাড়া।” লোকজন প্রথমে হাসত, পরে ভাবত। একদিন কর্মেশ শহরের মাঝখানে ২৫ মিনিটের একটি ঘণ্টা বসাল। সে বলল, —“মাত্র ২৫ মিনিট মন দিয়ে কাজ করুন, তারপর ৫ মিনিট বিশ্রাম নিন।” অলসপুরের মানুষ প্রথমে অবাক হলো। কারণ তারা এত ছোট সময়েও কাজ করা সম্ভব ভাবেনি। এক তরুণ চেষ্টা করল। সে মাত্র ২৫ মিনিট পড়ল। তারপর বিস্মিত হয়ে বলল, —“এত কম সময়েও এত কাজ হয়?” কর্মেশ হাসল। —“কাজ পাহাড় নয়, ভয়টাই পাহাড়।” ধীরে ধীরে রাজ্যে পরিবর্তন আসতে লাগল। লোকজন বড় কাজকে ছোট ভাগে ভাগ করতে শিখল। কেউ পুরোনো বই গুছাল, কেউ অসমাপ্ত গান শেষ করল, কেউ বহুদিন পর মায়ের সঙ্গে বসে কথা বলল। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এল রাজা বিলম্বেশ্বরের মধ্যে। একদিন তিনি গোপনে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। সেখানে তিনি নিজের মুখ নয়, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজ্য দেখলেন। প্রাসাদের দেয়ালে ফাটল, জনগণের চোখে শূন্যতা, আর সিংহাসনের চারপাশে জমে থাকা অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। তিনি কেঁপে উঠলেন। প্রথমবারের মতো তিনি বুঝলেন—অলসতা শুধু কাজ ফেলে রাখা নয়; এটি ধীরে ধীরে জীবনকে ফাঁকা করে দেওয়া। পরদিন তিনি সভা ডাকলেন। মন্ত্রী টালবাহানা চন্দ্র অবাক হয়ে বললেন, —“মহারাজ, আজই সভা?” রাজা বললেন, —“হ্যাঁ, আজই। কারণ কাল নামের দেশটি আসলে অস্তিত্বহীন।” সভায় রাজা ঘোষণা দিলেন— “আজ থেকে অলসপুরের নাম পরিবর্তন করা হবে। নতুন নাম—প্রচেষ্টানগর।” জনতা প্রথমে হতবাক, তারপর ধীরে ধীরে হাততালি দিল। এবার তালি একটু জোরেই হলো। তবে সবাই বদলায়নি। কিছু মানুষ তখনও চায়ের দোকানে বসে বলত, —“এত কাজ করে লাভ কী?” কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারাও আর আগের মতো নিশ্চিন্ত ছিল না। কারণ তাদের ভেতরেও একবার আয়নার প্রতিবিম্ব ঢুকে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রচেষ্টানগর বদলে গেল। সেখানে মানুষ আর অজুহাতকে জ্ঞান মনে করত না। তারা বুঝল, বিশ্রাম প্রয়োজন, কিন্তু বিশ্রামের নামে আত্মসমর্পণ নয়। রাজ্যের নতুন জাতীয় সঙ্গীত হলো— “ছোট পদক্ষেপেই শুরু হয় দীর্ঘ যাত্রা।” আর পুরোনো জাতীয় প্রতীক আধখাওয়া কলাটি সরিয়ে সেখানে রাখা হলো একটি ছোট বীজ। কারণ বীজ জানে—মাটির নিচে পড়ে থাকলেই চলবে না, একদিন তাকে অঙ্কুরিত হতেই হবে। কর্মেশ একদিন নিঃশব্দে রাজ্য ছেড়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে সে শুধু একটি বাক্য লিখে রেখে গেল রাজপ্রাসাদের দেয়ালে— “অলসতা কখনো বিশ্রাম নয়; এটি স্বপ্নের ওপর জমে থাকা ধুলো।” অনেক বছর পরও সেই বাক্যটি মানুষ পড়ত। কেউ কেউ আবার পড়েও ভাবত— “কাল থেকে জীবনটা বদলাবো।” তবে এবার পার্থক্য ছিল একটি। অনেকেই সত্যিই পরদিন শুরু করত।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now