বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাজামান শুভ
দেশটার নাম ছিল ঘুমপুর। নাম শুনেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রটি ছিল ঘুম এবং অলসতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর অন্য দেশগুলো যেখানে অর্থনীতি, বিজ্ঞান কিংবা শিল্প নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে ঘুমপুরের জাতীয় স্লোগান ছিল—
“ঘুমাও, কারণ জেগে থাকলে বাস্তবতা দেখা যায়।”
এই রাষ্ট্রের মানুষ ভোরকে ভয় পেত। কারণ ভোর মানেই আলো, আর আলো মানেই সত্য প্রকাশ। তাই বহু বছর আগে ঘুমপুরের পার্লামেন্টে “সূর্যোদয় নিয়ন্ত্রণ আইন” পাস হয়েছিল। আইনে বলা হয়েছিল, “অত্যধিক ভোরে জেগে ওঠা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।” ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ সকাল দশটার আগে বিছানা ছাড়ত না। যারা ভুল করে খুব সকালে উঠে পড়ত, তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো।
ঘুমপুরের রাজধানীর নাম ছিল “হাইনগর”। শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বিশাল বিলবোর্ড ঝুলত। তাতে লেখা থাকত—
“ভোরে উঠবেন না, জাতির ঘুম নষ্ট করবেন না।”
“সকালের হাওয়া মানুষকে চিন্তাশীল বানায়—সতর্ক থাকুন!”
“ঘুমই উন্নয়নের চাবিকাঠি।”
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন জনাব তন্দ্রানাথ ঢুলু। জনগণ তাকে “হাইমন্ত্রী” নামে চিনত। তিনি আন্তর্জাতিক অলসতা সম্মেলনে একবার বলেছিলেন,
“যে জাতি বেশি ঘুমায়, সে জাতি কম ঝামেলা করে।”
এই বক্তব্যের জন্য তিনি “বিশ্ব নিদ্রা শান্তি পদক” পেয়েছিলেন।
ঘুমপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ছিল “রাত্রিজাগা বিনোদন করপোরেশন”। তারা সারারাত মানুষের হাতে মোবাইল ধরিয়ে রাখার জন্য অসংখ্য ব্যবস্থা চালু করেছিল। রাত দুইটায় লাইভ অনুষ্ঠান, তিনটায় সিরিজ ম্যারাথন, চারটায় রাজনৈতিক তর্ক অনুষ্ঠান—সবই ছিল মানুষের ঘুম নষ্ট করে সকালবেলা ঘুমিয়ে রাখার মহাপরিকল্পনার অংশ।
এই করপোরেশনের মালিক ছিল এক রহস্যময় ব্যবসায়ী—ঘুমচোর গাঢ়নিদ্রা। লোকটা ছিল ভীষণ বুদ্ধিমান। সে জানত, মানুষকে দুর্বল করতে চাইলে তার সকাল কেড়ে নিতে হবে। কারণ ভোরের মানুষ চিন্তা করতে শেখে, আর চিন্তাশীল মানুষ সহজে প্রতারিত হয় না।
ঘুমচোরের কোম্পানির বিজ্ঞাপন ছিল—
“রাত জাগুন, জীবন ভুলে থাকুন।”
ঘুমপুরের মানুষ রাত জেগে ভিডিও দেখত, তর্ক করত, অন্যের জীবন বিশ্লেষণ করত, আর ভোর হওয়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। সূর্য ওঠার সময় পুরো শহরটা যেন মৃত নগরীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে যেত।
শুধু একজন মানুষ ছিল ব্যতিক্রম।
তার নাম ছিল সুবেহান। ছোটবেলা থেকেই সে ভোর ভালোবাসত। ফজরের আজানের পরে যখন চারপাশে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ত, তখন সে মাঠে হাঁটতে বের হতো। শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটলে তার মনে হতো পৃথিবীটা এখনো পুরোপুরি অসুন্দর হয়ে যায়নি।
কিন্তু এই অভ্যাসের জন্য সবাই তাকে সন্দেহ করত।
একদিন পাশের বাড়ির কাকা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ভোরে উঠে কী করো?”
সুবেহান বলল,
“হাঁটি।”
লোকটা আতঙ্কিত হয়ে বলল,
“এত সকালে হাঁটাহাঁটি? তুমি কি বিপ্লবী?”
ঘুমপুরে ভোরে হাঁটা ছিল প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহের সমান।
কারণ সরকার বিশ্বাস করত, সকালের নির্মল হাওয়া মানুষের মস্তিষ্কে অক্সিজেন বাড়িয়ে দেয়। আর অতিরিক্ত অক্সিজেন পেলে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে।
দেশের জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান “অলসতা একাডেমি” একবার একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল—
“ভোরের হাওয়া গ্রহণকারীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।”
এই রিপোর্ট প্রকাশের পর সরকার জরুরি বৈঠক ডাকে।
হাইমন্ত্রী তন্দ্রানাথ টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন,
“এটা ভয়ংকর! মানুষ যদি ভোরে উঠতে শুরু করে, তাহলে তারা নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করবে!”
অতঃপর সরকার “সকাল প্রতিরোধ নীতিমালা” চালু করল।
নতুন আইন অনুযায়ী—
• সকাল ছয়টার আগে পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ
• পাখির ডাককে শব্দদূষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো
• শিশিরকে “পিচ্ছিল রাষ্ট্রবিরোধী উপাদান” ঘোষণা করা হলো
• ভোরের বাতাসে হাঁটলে স্বাস্থ্যকর চিন্তার অপরাধে জরিমানা
এমনকি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নতুন অনুষ্ঠান চালু হলো—
“ভোরের হাওয়া: জাতির জন্য হুমকি?”
সেখানে বিশেষজ্ঞরা বললেন,
“সকালের হাওয়া মানুষকে অকারণে সুখী করে তোলে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।”
একজন বিশেষজ্ঞ তো আরও একধাপ এগিয়ে বললেন,
“যারা ভোরে ওঠে, তারা সাধারণত বই পড়ে। আর বই পড়া মানুষকে বিপজ্জনক করে তোলে।”
জনগণ এই বিশ্লেষণে মুগ্ধ হলো।
এদিকে সুবেহান প্রতিদিনের মতো ভোরে হাঁটতে থাকল। সে লক্ষ্য করল, সকালে পৃথিবীটা অন্যরকম। পাখিরা বিনা টিকিটে কনসার্ট করছে। বাতাসে ধানের গন্ধ। আকাশে হালকা কুয়াশা। মানুষের কোলাহল নেই। যেন প্রকৃতি মানুষের বোকামি থেকে কয়েক ঘণ্টার ছুটি নিয়েছে।
একদিন হাঁটার সময় তার সঙ্গে দেখা হলো এক বৃদ্ধের। বৃদ্ধ মাঠের পাশে বসে সূর্যোদয় দেখছিলেন।
সুবেহান জিজ্ঞেস করল,
“চাচা, আপনি এত সকালে আসেন কেন?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
“বাবা, সারাজীবন টাকা কামাতে গিয়ে জীবনটাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন ভোরের কাছে একটু জীবন ভিক্ষা চাইতে আসি।”
কথাটা সুবেহানের মনে গভীর দাগ কাটল।
সে বুঝতে শুরু করল, ঘুমপুরের মানুষ শুধু ভোর হারায়নি; তারা নিজেদের অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছে।
এদিকে ঘুমচোর গাঢ়নিদ্রার ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে উঠছিল। সে নতুন অ্যাপ বের করল—“অসীম স্ক্রল”। অ্যাপটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, একবার ব্যবহার শুরু করলে সময়ের হিসাব ভুলে যাওয়া।
মানুষ রাতভর ভিডিও দেখত। কেউ রান্না শেখার ভিডিও দেখে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কেউ ব্যায়ামের ভিডিও দেখে বিছানা থেকে উঠত না। কেউ “কীভাবে সকালে উঠবেন” ভিডিও দেখতে দেখতে দুপুরে ঘুম থেকে উঠত।
একজন যুবক একদিন ঘোষণা দিল,
“আগামীকাল থেকে আমি ভোরে উঠব।”
এই ঘোষণা ঘুমপুরে খুব জনপ্রিয় ছিল। কারণ সবাই জানত, “আগামীকাল” নামের দিনটি কখনো আসে না।
ধীরে ধীরে ঘুমপুরে অদ্ভুত রোগ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষ সারাক্ষণ ক্লান্ত বোধ করত। অল্প বয়সে মেদ বাড়ত। অনিদ্রায় ভুগত। মন খিটখিটে হয়ে যেত। ডাক্তাররা ওষুধ দিতেন, কিন্তু রোগ সারত না।
একদিন সুবেহান শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে বলল,
“তোমাদের ওষুধের দরকার নেই, দরকার ভোরের বাতাস।”
লোকজন হেসে উঠল।
একজন বলল,
“বাতাসে আবার স্বাস্থ্য ভালো হয় নাকি?”
আরেকজন বলল,
“এই লোক নিশ্চিত বিদেশি এজেন্ট!”
পরদিন টেলিভিশনে খবর বের হলো—
“ভোরপন্থী চক্র সক্রিয়।”
সরকার সুবেহানকে নজরদারিতে রাখল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যারা তার সঙ্গে ভোরে হাঁটতে শুরু করল, তারা ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। তাদের মুখে হাসি ফিরল। শরীর হালকা লাগল। মন শান্ত হলো।
একজন ব্যবসায়ী বললেন,
“আমি আগে সারারাত ফোন দেখতাম। এখন ভোরে হাঁটি। আশ্চর্য, জীবনে প্রথমবার মনে হচ্ছে আমি বেঁচে আছি।”
একজন ছাত্র বলল,
“আগে পড়তে বসলে ঘুম আসত। এখন সকালে পড়লে মাথা পরিষ্কার থাকে।”
এই পরিবর্তন দেখে সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
কারণ সুস্থ মানুষকে ভয় দেখানো কঠিন।
হাইমন্ত্রী জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। তিনি বললেন,
“ভোরের হাওয়া আসলে বিদেশি ষড়যন্ত্র। এটি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়।”
এক সাংবাদিক সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন,
“স্যার, তাহলে আপনি কখনো ভোর দেখেননি?”
মন্ত্রী গম্ভীরভাবে বললেন,
“আমি দায়িত্বশীল মানুষ। আমি রাত তিনটা পর্যন্ত টকশো দেখি।”
সংবাদ সম্মেলনের পর জনগণ মন্ত্রীর দেশপ্রেমে আবেগাপ্লুত হলো।
এদিকে সুবেহানের ভোর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মানুষ দল বেঁধে মাঠে যেতে শুরু করল। শিশুরা পাখির ডাক চিনতে শিখল। কেউ সূর্যোদয় দেখল, কেউ ঘাসে খালি পায়ে হাঁটল।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—মানুষ সামাজিক মাধ্যমে কম সময় কাটাতে শুরু করল।
ঘুমচোর গাঢ়নিদ্রার ব্যবসা ধসে পড়ল।
সে রাগে বলল,
“মানুষ যদি প্রকৃতির প্রেমে পড়ে, তাহলে আমাদের কৃত্রিম বিনোদন কে কিনবে?”
অবশেষে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল। তারা শহরের সব পার্কে বিশাল দেয়াল তুলে দিল, যাতে সূর্যোদয় দেখা না যায়।
কিন্তু তারা একটা ভুল করেছিল।
আকাশের ওপর তো দেয়াল তোলা যায় না।
পরদিন ভোরে হাজার হাজার মানুষ ছাদে উঠে সূর্যোদয় দেখল।
সেই প্রথম ঘুমপুরের মানুষ উপলব্ধি করল—
তারা এতদিন বেঁচে ছিল না; শুধু সময় পার করছিল।
তারা বুঝল, ভোরের হাওয়া শুধু শরীরকে সতেজ করে না; এটি মানুষকে নিজের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
হাইমন্ত্রী তন্দ্রানাথ শেষ চেষ্টা হিসেবে ঘোষণা দিলেন—
“ভোরে ওঠা জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর!”
কিন্তু ততদিনে মানুষ বদলে গেছে।
কারণ একবার যে মানুষ সত্যিকারের ভোর দেখে ফেলে, তাকে আর কৃত্রিম আলো দিয়ে চিরকাল বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।
সেদিন থেকে ঘুমপুরের জাতীয় স্লোগান বদলে গেল।
আগে লেখা থাকত—
“ঘুমাও, বাস্তবতা ভুলে থাকো।”
এখন লেখা হলো—
“যে মানুষ ভোরকে হারায়, সে ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now