বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবাধ্য মেঘ

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Md jihad Islam(guest) (০ পয়েন্ট)

X শুরুতেই আমার পরিচয়টা দেওয়া যাক। আমি জিহাদ ইসলাম, ঢাকা কলেজের ফিলোসফি বিভাগে অধ্যয়নরত। তবে আজ আমার কথা নয়, আজ যাকে নিয়ে লিখব সে আর কেউ নয়—আমারই আপন কাকাতো বোন, তারু। বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার এক অজপাড়াগাঁয়ের নিম্নবিত্ত পরিবারে ২০০৫ সালে আমার জন্ম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। দরিদ্র পরিবার হলেও ছোট হওয়ার সুবাদে আমার ইচ্ছা আর আবদারের অপূর্ণতা খুব একটা দেখতে হয়নি। গ্রামের নৈসর্গিক সবুজ আর চেনা মেঠোপথেই আমার বেড়ে ওঠা। গ্রামের স্কুল থেকেই মাধ্যমিকের পাট চুকিয়ে পরিবারের সিদ্ধান্তে ভর্তি হলাম উপজেলা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণীতে। পরিবার ছেড়ে দূরে কোথাও একা থাকার এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য ছিল সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিবেশ। তবে উপজেলার প্রাণকেন্দ্রেই আমার বাসা হওয়ায় অল্পদিনেই সবকিছু মানিয়ে নিলাম। নাদুস-নুদুস গড়ন আর সবসময় মুখে এক চিলতে হাসি থাকার কারণে উপজেলার সবার সাথেই চট করে আমার একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। বিশেষ করে উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক শিক্ষা অফিসারের হাত ধরে উপজেলা প্রশাসনের প্রায় সবার সাথেই এক গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। তাদের পরিচ্ছন্ন জীবন আর সাফল্য দেখে মনের ভেতর প্রবল ইচ্ছে জাগত—আমিও একদিন তাদের মতো সফল হবো! সেই অদম্য স্বপ্ন বুকে নিয়ে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনা করে যাচ্ছিলাম। কলেজ আর বাসা একই জায়গায় হওয়ায় আমার একটা অন্যরকম পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। উপজেলার সেই বিশাল দিঘি, থানার বড় স্টেডিয়াম আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী—সব মিলিয়ে এক অপরূপ মায়াবী পরিবেশ। ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম ভীষণ প্রকৃতিপ্রেমী। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের অজান্তেই নানা কবিতা আর ছন্দ লেখার চেষ্টা করতাম। মুখে সবসময় কবিতার মতোই বুলি ফুটত; ভালো-খারাপ যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমার মুখের হাসিতে কখনো কমতি ছিল না। এসবের জন্যই কলেজের শিখা ম্যাম আমাকে ডাকতেন 'ফটকা কবি'। আর রোকেয়া ম্যাম বিনোদনের আসরে সবসময় আমাকেই শীর্ষে রাখতেন এবং পরামর্শ দিতেন আমি যেন আরও বেশি বেশি কবিতা পড়ি আর লেখার চেষ্টা করি। কলেজের সেই দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সোনালী সময়। একদিকে যেমন সবার ভালোবাসা ও পরিচিতি পাচ্ছিলাম, অন্যদিকে আমার অর্জনগুলোও ছিল বলার মতো。 এভাবেই চলতে চলতে একসময় ফাইনাল পরীক্ষার চূড়ান্ত সময় চলে এলো। যথারীতি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—উপজেলা অফিসারদের মতো বড় হতে হলে আমাকে কোনো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেই হবে। স্বপ্ন ছোঁয়ার সেই তাড়নাতেই পরীক্ষা শেষ করে বাড়িতে মাত্র সাতটা দিন কাটিয়েছিলাম। আট দিনের মাথায়, এক বুক আশা নিয়ে পা রাখলাম সম্পূর্ণ এক অপরিচিত শহর—ঢাকায়। ঢাকায় আমার আশ্রয় হলো বড় ভাইয়ার কাছে। ঢাকায় এসেই আজিমপুরের ইউসিসি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলাম। মাথায় তখন একটাই জেদ—যে করেই হোক, আমাকে জীবনে কিছু একটা করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এক অপরিচিত শহরে শুরু হলো নতুন জীবনযাত্রা। সারাদিন কোচিং আর বাসা—ব্যস, এতটুকুই ছিল আমার পৃথিবী। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। বড় ভাবি আমাকে অনেক সাহায্য করতেন, এই মানুষটা আমার জন্য যা করেছেন তা কোনোদিন ভোলার নয়। আমার মা আর বোনের পরে তিনিই একমাত্র নারী, যিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো করে আগলে রেখেছেন, ভালোবেসে হাত উঁচিয়ে খাইয়ে দিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাকে সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। হঠাৎ এক ভোররাতে মায়ের ফোন এলো। ওপাশ থেকে মায়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠ ভেসে এলো—আমার দাদী আর নেই। বুকটা কেঁপে উঠল। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালেই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দাদীর দাফন-কাফন শেষ করে আবারো ঢাকায় ফিরে এসে নিয়মমাফিক পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম। এর ঠিক দু মাস পরের কথা। মা আবারো অনুরোধ করে বললেন, গ্রামে দাদীর জন্য দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, সব আত্মীয়-স্বজন আসবে, আমাকেও যেতে হবে。 মার কথা রাখতে গ্রামে গেলাম। কিন্তু এবারের গ্রামটা যেন আমার কাছে একদম অন্যরকম এক অনুভূতি নিয়ে ধরা দিল, যা আগে কখনো হয়নি। দাদী বাড়িতে পা রাখতেই হঠাৎ আমার চোখে পড়ল এক মায়াবী প্রেয়সী। তাকে দেখার পর মুহূর্তেই যেন আমার চারপাশের সবকিছু থমকে গেল। > তার ওই শান্ত চোখ দুটি যেন গল্পে ভরা কোনো নদী, যেখানে আমি ডুবে যাচ্ছিলঅম নিঃশব্দ ভালোবাসার গভীরতায়। তার দীর্ঘ চুল ছিল রাতের মতো গভীর আর স্বপ্নের মতো নরম। সে দাঁড়িয়ে ছিল নিঃশব্দে, তবুও তার চারপাশ থেকে ছড়িয়ে পড়ছিল এক অদ্ভুত মায়াবী আলো—এ যেন বহু পুণ্য আর প্রার্থনার পর হঠাৎ আমার জীবনে নেমে আসা কোনো পরম শান্তি। মনে হচ্ছিল, সময়টা ঠিক সেই মুহূর্তেই থমকে গেছে। তার ওই শান্ত চোখ দুটি যেন আমার সমস্ত অস্থিরতা ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছিল, আর আমি ডুবে যাচ্ছিলাম এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে—যেখানে ভালোবাসা কোনো উচ্চারণের মুখাপেক্ষী নয়, শুধু অনুভবের গভীরতম স্পর্শ। মনে হচ্ছিল, তাকে দেখেই পার করে দিতে পারি জনম-জনমান্তর, কোনো ক্লান্তি ছাড়া, কোনো অভিযোগ ছাড়া। শুধু তার পাশে নীরবে বসে থাকলেও হয়তো পূর্ণ হয়ে যাবে আমার সমস্ত অপূর্ণ জীবন।‌ > বেশ খানিকটা সময় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। সম্পূর্ণ অপরিচিত হওয়ায় সামনে গিয়ে কথা বলার সাহসটুকু সঞ্চয় করতে পারিনি। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে মাকে জিজ্ঞেস করতেই সেই অপরিচিতার পরিচয় জানতে পারলাম। জানতে পারলাম, সে আর কেউ নয়—আমারই ছোট কাকার মেয়ে, তারিন (তারু)। মায়ের মুখেও তার দীর্ঘ চুল আর নমনীয়তার গল্প শুনলাম। সত্য বলতে, তাকে প্রথম দেখাতেই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটার জন্যই বুঝি আমার জন্ম। সে যেন আমার কত চেনা, কত আপন! আপন কাকাতো বোন হলেও, আমাদের বাবা-চাচাদের সম্পর্কের তিক্ততার কারণে সে এতদিন আমার কাছে এক অপরিচিত মানুষ হয়েই থেকে গিয়েছিল। গ্রামে কাটানো ওই দু'দিন তার সাথে কথা বলার জন্য আমি হাজারটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু কী বলব, কীভাবে কথা শুরু করব—এটা ভাবতেই সময় ফুরিয়ে গেল। অবশেষে বুকে এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর নীরব হাহাকার নিয়ে আবারো ঢাকায় ফিরে এলাম। ঢাকায় ফিরতেই শুরু হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। একদিকে পরীক্ষার চাপ, অন্যদিকে মনের ভেতর প্রেয়সীকে পাওয়ার ব্যাকুলতা—দুই ফ্রন্টেই আমি তখন এক ক্লান্ত সৈনিক। একটার পর একটা ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছিলাম। শেষমেশ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে 'পার্লি' (পালি) নিয়ে পড়ার সুযোগ হলেও, প্রেয়সীকে ঢাকায় রেখে অত দূরে যাওয়ার তীব্র অনিচ্ছার কারণে আমি ঢাকাতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। দেখতে দেখতে চার-চারটি মাস কেটে গেল। এই চার মাসের প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ আমি তাকে মনে করেছি। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে তাকে খুঁজেছি। মনে মনে তাকে নিয়ে বুনেছি কতশত রঙিন স্বপ্নের জাল! হঠাৎ এক বিকেলে বড় ভাইয়া এসে বললেন, কাকার বাসায় যেতে হবে, গ্রামের পারিবারিক জমি নিয়ে কিছু ঝামেলা চলছে। শুনে আমার মনটা খুশিতে নেচে উঠল—এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! তারিনকে আবার দেখতে পাব, এটা ভাবতেই বুকের ভেতর এক অন্যরকম শিহরণ অনুভব করছিলাম। আসর নামাজের পর আমরা কাকার বাসায় গেলাম। তাদের বাসায় এটাই ছিল আমার প্রথম পা রাখা। ভীষণ ভালো লাগছিল। সবার সাথে পরিচয় হলো, প্রথমবারের মতো তাদের সাথে কথা হলো। তারিনকে আবার চোখের সামনে দেখলাম, সবকিছু যেন রূপকথার মতো স্বপ্নের মতো লাগছিল। বাসায় ফিরে এসেই ছটফটানি বেড়ে গেল। ভাইয়ার ফোনটা লুকিয়ে লুকিয়ে চেক করতে লাগলাম যদি প্রেয়সীর নম্বরটা কোথাও পাওয়া যায়! কিন্তু কোথাও কিছু পেলাম না। উপায় না পেয়ে একদিন ভাইয়াকে সরাসরিই বলে দিলাম—"এই বাসায় আর ভালো লাগে না, কাকার বাসায় একটু বেড়াতে যাওয়া উচিত"। এরপর থেকে কারণে-অকারণে প্রেয়সীর বাসায় আমার যাতায়াত শুরু হলো। ধীরে ধীরে তারিনের সাথে আমার একটা চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠল। একটু সময় পেলেই আমি তাকে নক করতাম। প্রতিদিন আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো। কোনোদিন একটু কথা না হলে বা তাকে না দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত, অস্থির হয়ে যেতাম। তার একটুখানি আওয়াজ আর এক পলক দেখার জন্য আমার বাহানার কোনো শেষ ছিল না। দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু সুখের দিন বোধহয় বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একদিন কাকী ফোন করে জানালেন, কাকা মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। খবরটা শুনে মনটা ভীষণ ভারী হয়ে গেল। তারিনরা দুই বোন, কোনো ভাই নেই। এই বয়সে ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা করা তাদের পক্ষে কতটা কঠিন, তা ভাবতেই শিউরে উঠছিলাম; তার ওপর জীবন তো অনিশ্চিত। মাঝেমধ্যেই কাকার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু এই কোলাহলময় ব্যস্ত শহরে আমার মতো এক বেকার ছেলের খোঁজ নেওয়া ছাড়া আর করারই বা কী ছিল? কাকাকে যতবার দেখেছি, ততবারই মনে হয়েছে কাকার হাত দুটো ধরে তারিনকে নিয়ে আমার মনের সুপ্ত অনুভূতির কথাগুলো বলে দিই। কিন্তু তার ওই জীর্ণ, অসুস্থ শরীর দেখে প্রতিবারই আমি নির্বাক হয়ে যেতাম। ধীরে ধীরে কাকার শরীরের অবস্থার অবনতি হতে লাগল, তিনি তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই কঠিন সময়েও আমি তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। অবশেষে ২০২৪ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর, এক ভোর সকালে কাকীর ফোন এলো—কাকা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কাকার দাফন-কাফন ঢাকাতেই সম্পন্ন হলো। একটা বিষয় আজো আমাকে ভীষণ মর্মাহত করে—নিজেদের স্থায়ী গ্রামের ঠিকানা থাকতেও কেন এই অচেনা, নিষ্ঠুর শহরে কাকাকে দাফন করা হলো? কাকার মৃত্যুর পর তারিনের সাথে আমার যোগাযোগ চলল। একদিন সাহস করে মনের সবটুকু আবেগ খুলে তারিনকে আমার এতদিনের জমিয়ে রাখা ভালোলাগা আর ভালোবাসার কথা জানালাম। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ভালোবাসার কথা শোনার পর থেকেই সে আর আগের মতো সময় দিত না। দিন দিন তার ব্যস্ততা আর অজুহাত বাড়তেই থাকল। তার সাথে একটু কথা বলার জন্য আমি পাগলের মতো ছটফট করতাম, একসময় বুঝতে পারলাম সে অন্য কারোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তবুও তার প্রতি আমার অনুরাগে কোনো কমতি ছিল না। তারিনকে নিজের অনুভূতি বোঝাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে কাকীর কাছে গিয়ে আমার মনের কথা খুলে বললাম। ভেবেছিলাম হয়তো গুরুজন হিসেবে তিনি বুঝবেন, কিন্তু ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। আমার আর আমার পরিবারের প্রতি কাকীর চিন্তাধারা ছিল ভীষণ নিচুমানের। এই বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে আমাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিলেন। আমি জানি না আমার সাথে কেন এই নির্মমতা করা হলো! আমি তো কোনো অপরাধ করিনি, কোনো মিথ্যা বলিনি; আমি তো শুধু মন থেকে তারুকে চেয়েছিলাম, এর বেশি কিছু তো চাইনি। তারিনের সাথে যোগাযোগ করার আর কোনো পথ খোলা রইল না। তার একটুখানি কণ্ঠস্বর শোনার জন্য আমার আত্মা ছটফট করত। হাজার বার তাকে খুঁজেছি, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তাকে পাইনি। এরপর শুরু হলো নিজের সাথে নিজের এক নির্মম যুদ্ধ। প্রেয়সীর স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলার জন্য একের পর এক ঘুমের ওষুধ খেতে শুরু করলাম। কিন্তু দিন যত যাচ্ছিল, প্রেয়সীর প্রতি মায়া ও টান আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠছিল; তাকে ভোলা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কিছুদিন পর সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বেহায়ার মতো আবার কাকীর নম্বরে যোগাযোগ শুরু করলাম, উদ্দেশ্য একটাই—যদি প্রেয়সীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়! সুযোগ পেলেই চলে যেতাম প্রেয়সীর কলেজের সামনে, যেখানে তার নিয়মিত যাতায়াত। এভাবে দীর্ঘ ৮টি মাস কেটে গেল। এই দীর্ঘ সময়ে হাজার বার চেষ্টা করেও এক পলকের জন্য না পেয়েছি তার দেখা, না শুনেছি তার কথা। তবুও আমি ক্লান্ত হইনি। প্রেয়সীর প্রতি অবাধ্য আবেগ আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বাহানা খুঁজতে বাধ্য করত। মনের গহীনে একটা আশার প্রদীপ জ্বলছিল—কোনো একদিন হয়তো সব মেঘ কেটে যাবে, তাকে আমি আমার করেই পাব। অবশেষে ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রেয়সীর সাথে কথা বলার সুযোগ হলো। কিন্তু কথা বলে জানতে পারলাম তার অন্য এক প্রেমের কাহিনী এবং সে সেখানে ভীষণভাবে ঠকেছে! যে মানুষটার জন্য আমি এতটা বছর ধরে চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছি, তার মুখে অন্য পুরুষের গল্প শোনাটা আমার কোমল হৃদয়ে এক মৃত্যু আঘাতের মতো লেগেছিল। তবুও মনকে বোঝালাম—প্রেয়সী হয়তো তার ভুল বুঝতে পেরেছে, এবার অন্তত সে আমার খাঁটি অনুভূতিটা উপলব্ধি করতে পারবে। এক বুক আশা নিয়ে নতুন করে আবার পথ চলা শুরু করলাম, ভাবলাম এবার হয়তো তাকে সারাজীবনের জন্য পেয়ে যাব। তাকে বোঝাতে লাগলাম যে আমার ভালোবাসা কখনো মিথ্যে ছিল না। ডাঙ্গায় হারিয়ে যাওয়া মাছ যেমন জলাশয় ফিরে পেলে নতুন করে শ্বাস নেয়, আমিও তারিনকে ফিরে পেয়ে তেমনি নতুন করে বাঁচতে শুরু করলাম。 নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করতে লাগলাম এবং অনেকটা সময় পার করে দ্বিতীয়বারের মতো তাকে প্রেম নিবেদন করলাম। তার উত্তর ছিল—সে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে। তাকে অনেকটা সময় দিলাম। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে উত্তরটি এলো, তা আমার পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিল; সে জানাল, "সে অন্য কারো"। তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার এতটাই তীব্র ছিল যে, এত অপমানের পরেও আমি আবারো কাকীর কাছে গিয়ে তারিনের জন্য অনুনয়-বিনয় করলাম। কাকী এবার উত্তর দিলেন—আমার বাবা-মা এই সম্পর্কে রাজি হবেন কি না। সব ভুলে বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে তারিনের কথা জানালাম। মা প্রথমটায় খুব রাগ করলেও পরে আর অমত করেননি। মা-ও তারিনকে বেশ পছন্দ করতেন। মা বললেন, ঈদে সবাই যখন বাড়ি যাবে, তখন এ বিষয়ে কাকীর সাথে সামনাসামনি কথা বলবেন। আমি চাতক পাখির মতো ঈদের দিন গুনতে লাগলাম। ভাবলাম এবার বুঝি অবসান হবে, এবার হয়তো তাকে পেয়ে যাব। এই আশায় তারিনের জন্য একটা সুন্দর নাকফুল কিনলাম। আর এই সবকিছুর কথাই কাকী জানতেন। ঈদ চলে এলে কাকীকে গ্রামে আসার জন্য অনেক অনুরোধ করলাম, কিন্তু কাকী এলেন না, ঢাকাতেই থেকে গেলেন। বাড়িতে যাওয়ার পর প্রেয়সীকে নিয়ে অনেক আলোচনা হলো, কিন্তু কাকী না আসায় সবকিছুই আমার প্রতিকূলে চলে গেল। বুকভরা রাগ আর ক্ষোভ নিয়ে তার পরের দিনই ঢাকা চলে আসলাম। তারিনকে বারবার দেখা করার জন্য অনুরোধ করলেও, তার অজুহাতের দেয়ালের কাছে আমি বারবার শূন্য হাতে ফিরে এসেছি। কত বড় নাদান পাগল আমি! প্রেয়সীর জন্য ১৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসলাম, অথচ সে আমার জন্য বুড়িগঙ্গা নদীও পার হতে পারল না! প্রেয়সীকে আমি বড্ড মিস করি। সকাল-বিকাল কল, এসএমএস করা আর প্রতিদিন হাজার বার ফোন চেক করা—এই আশায় যে হয়তো তার একটা মেসেজ আসবে! অথচ এত দীর্ঘ সময়ে কখনোই প্রথম থেকে তার কোনো কল আসেনি। তার এই শীতল নির্মমতা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সে হয়তো আবারো আমার থেকে বহুদূরে চলে যাচ্ছে। আর আমাকে ঠেলে দিচ্ছে এক নিশ্চল গহীনে—যেখানে হারালে মানুষ আর কোনোদিন ফিরে আসে না। এই ভাবনাগুলো আমাকে দিন দিন পাগল করে তুলছিল, আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিলাম। যখন বুঝলাম আমি অতিরিক্ত করে ফেলছি, তখন এক গাদা ওষুধ খেয়ে ফোনটা বন্ধ করে একটানা দুইদিন ঘুমিয়ে রইলাম। আমার এই কাণ্ড দেখে আত্মীয়-স্বজন সবাই প্রেয়সীর ব্যাপারে জেনে গেল এবং সবার কাছ থেকেই তাকে নিয়ে নানা রকম কটূক্তি শুনতে লাগলাম। কিন্তু আমি তো শুধু তাকেই চেয়েছিলাম! চারপাশটা যতই ঘোলাটে হোক না কেন, আমি আমার ভালোবাসার জায়গা থেকে একচুলও নড়িনি। বারবার তারিন আর কাকীর কাছে অনুনয় করেও তারা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ মে মাসের ৩ তারিখ মামার ফোন এলো। আমি আগেই জানতাম মামা তারিনের বিষয় নিয়েই কথা বলবেন। (মামাই একমাত্র মানুষ, যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই) । মামা জিজ্ঞেস করলেন, "কী চাস?" হয়তো প্রেয়সীকে চাইব, আর না হয় তাকে সারাজীবনের জন্য হারাব—এই ছিল পরিস্থিতি。 পথ হারানো পাগলের মতো শেষবারের মতো একবার কাকীকে আর একবার তারিনকে কল দিলাম; তারিন যদি শুধু একটা বার 'হ্যাঁ' বলত, তবেই তাকে পেয়ে যেতাম। আমি তো কোনোভাবেই তাকে হারাতে চাইনি। কিন্তু এই শেষ মুহূর্তেও ওই নিষ্ঠুর মানুষগুলো আমাকে নির্মমভাবে ফিরিয়ে দিল। নিশ্চুপ করে দিল আমার ভেতরটাকে, আর জ্যান্ত কবর দিল আমার হাজারো আবেগ আর ভালোবাসাকে। ৫ তারিখ, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে মামা আমার সামনেই কাকীকে ফোন দিলেন। ওপাশ থেকে স্পিকারে শুনতে লাগলাম আমাকে নিয়ে কাকীর যত অভিযোগ। এই মানুষগুলোকে কত আপন ভাবতাম আমি, অথচ আমাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য তাদের আয়োজনের কোনো কমতি ছিল না! একটা মানুষকে নিজের করে পেতে গিয়ে আজ আমি সবার চোখে এক চরম অপরাধী। আমার সামনেই মামা আর কাকী সিদ্ধান্ত নিলেন—আমি কোনোদিন প্রেয়সীকে পাব না আজ থেকে তার সাথে আমার সমস্ত যোগাযোগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু দেখছিলাম। নিজেকে বড্ড আবর্জনা মনে হচ্ছিল। একটা মানুষকে ভালোবেসে পেতে গিয়ে আজ আমি নিজেকেই কতটা নির্মমভাবে হারিয়ে ফেললাম! আমৃত্যু আমার ভাবনায় একটা আক্ষেপ থেকে যাবে—যে মানুষটাকে পাওয়ার জন্য এত কিছু করলাম, তার কাছ থেকে এই শেষ মুহূর্তে ন্যূনতম একটুখানি সাহস বা সাপোর্ট আমি পেলাম না! তার কাছে আমাকে মনে রাখার মতো অনেক অনেক স্মৃতি জমিয়ে রেখে এসেছি। তবুও জানি, সে হয়তো কোনোদিন আমাকে মনে করবে না। আর মনে করেই বা কী হবে? আমি তো সময়ের আগেই বিলীন হয়ে যাব... মিশে যাব কোনো এক অনন্ত অন্ধকারে!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now