বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
সুঁইপুর নামে এক অদ্ভুত নগরী ছিল।
সেই নগরীতে সূর্য ওঠার আগেই বাঁশি বাজত, আর রাত শেষ হতো সাইরেনের শব্দে। সেখানে মানুষ ঘড়ির কাঁটার চেয়ে দ্রুত হাঁটত, আর সময়কে তারা ডাকত “স্যার” বলে। নগরীর সবচেয়ে বড় স্থাপনাটির নাম ছিল—“মহামান্য এক্সপোর্ট প্রাসাদ”। বাইরে থেকে দেখতে বিশাল কাচঘেরা ভবন, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই মনে হতো কেউ যেন হাজার মানুষের নিঃশ্বাস এক জায়গায় আটকে রেখেছে।
সুঁইপুরের মানুষেরা খুব অদ্ভুত ভাষায় কথা বলত।
সেই ভাষায় “দয়া করে” শব্দটি ছিল দুর্লভ, কিন্তু “এখনই” শব্দটি ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।
তাদের অভিধানে “কাল” বলে কিছু ছিল না; সবকিছুই “আজ”, “এই মুহূর্তে”, কিংবা “পাঁচ মিনিট আগে”।
এই নগরীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি ছিলেন জেনারেল ম্যানেজার বজ্রনাথ। সবাই তাকে সংক্ষেপে বলত—“জিএম সাহেব”। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলে মনে হতো টিনের ছাদে বজ্রপাত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভদ্র ভাষা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই তিনি সভা শুরু করতেন এভাবে—
“যে কাপড়ে ভুল করবে, তার কপালে আজ দুঃখ আছে!”
তার নিচে ছিলেন প্রোডাকশন মন্ত্রী প্যাঁচাল উদ্দিন। নাম প্যাঁচাল হলেও তিনি খুব কম কথা বলতেন। কারণ তিনি জানতেন, বেশি কথা বললে কাজ কম হয়। তাঁর মুখে সবসময় একটাই বাক্য—
“কাজ শেষ, পরে নিঃশ্বাস।”
আর ছিলেন কোয়ালিটি সম্রাট খুঁত মিয়া। তিনি পৃথিবীর সবকিছুর ভেতর ভুল খুঁজে পেতেন। কেউ নতুন শার্ট পরে এলে বলতেন—
“কলার বেঁকে গেছে।”
কেউ কবিতা লিখলে বলতেন—
“লাইন মিস।”
এমনকি একদিন নিজের বিয়ের ছবিও দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন—
“ফিনিশিংটা ভালো হয়নি।”
সুঁইপুরের মানুষ জানত, খুঁত মিয়ার চোখ এড়িয়ে ভুল বাঁচে না।
একদিন বিদেশি রাজ্য “বায়ারল্যান্ড” থেকে বিশাল অর্ডার এল।
অর্ডারের নাম—“রয়্যাল লেডিস শর্ট প্যান্ট”।
শুনে পুরো নগরীতে উৎসব শুরু হয়ে গেল। কারণ এই অর্ডার মানেই কয়েক মাসের বেতন, নতুন মোটরসাইকেল, বাজারে গরুর মাংস, আর ঈদের আগে বাচ্চাদের নতুন জামা।
কিন্তু সমস্যা হলো, অর্ডারের সঙ্গে সময়ও এসেছিল খুব কম।
মাত্র দশ দিনে এক লাখ পিস।
সুঁইপুরে তখন দিন-রাতের পার্থক্য উঠে গেল।
মানুষ ঘুমের মধ্যেও সেলাইয়ের শব্দ শুনতে লাগল।
কেউ ভাত খেতে খেতে বলছে—“সুতা কাটো।”
কেউ বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমের ঘোরে বলছে—“শিপমেন্ট ধরো!”
শহরের বাতাসেও তখন এক ধরনের টেনশন মিশে গেছে।
কারখানার ফ্লোরে কাজ করত তরুণ সুপারভাইজার নরম আলী। নাম নরম হলেও জীবনে কখনো নরম হওয়ার সুযোগ পায়নি। তার দায়িত্ব ছিল চার নম্বর লাইনের শ্রমিকদের কাজ ঠিক রাখা।
একদিন রাত তিনটার সময় সে দেখল, এক শ্রমিক ভুল করে উল্টো দিকে পকেট লাগিয়ে ফেলেছে।
নরম আলী চিৎকার করে উঠল—
“এটা পকেট লাগাইছো, নাকি স্বাধীনতা ঘোষণা করছো!”
শ্রমিক মেয়েটি ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলল।
কিন্তু নরম আলী পরে নিজেও চুপচাপ বসে রইল। কারণ সে জানত, তার এই চিৎকার আসলে রাগ নয়; ভয়।
একটা ভুল মানে পুরো লাইনের সর্বনাশ।
সুঁইপুরে ভয়ও ছিল শিল্পের অংশ।
এদিকে বায়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি হিসেবে এলেন মিস্টার রবার্ট ব্ল্যাক।
লম্বা নাক, চিকন ঠোঁট, আর হাতে সবসময় একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস।
তিনি কাপড় এমনভাবে দেখতেন, যেন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ এই সেলাইয়ের ওপর নির্ভর করছে।
প্রথম দিনই তিনি একটি শর্ট প্যান্ট হাতে নিয়ে চিৎকার করলেন—
“This is disaster!”
কেউ ইংরেজি পুরো বুঝল না, কিন্তু “ডিজাস্টার” শব্দটি বুঝে সবাই কেঁপে উঠল।
তারপর শুরু হলো জরুরি সভা।
জিএম বজ্রনাথ টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন—
“কে এই সর্বনাশ করেছে?”
সবাই মাথা নিচু করে রইল।
কারণ সুঁইপুরে ভুলের কোনো মালিক ছিল না; কিন্তু শাস্তির মালিক ছিল সবাই।
ঠিক তখন কোয়ালিটি সম্রাট খুঁত মিয়া গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
“স্যার, এই মালটার যা অবস্থা—এটা প্রথমে জিএম অফিসে ধর্ষিত হয়েছে, তারপর পিএম অফিসে পুনরায় ধর্ষিত হয়েছে, শেষে ফ্লোরে গণধর্ষণ হয়েছে।”
ঘর নিস্তব্ধ।
নতুন যোগ দেওয়া এইচআর অফিসার ভদ্রা রহমান প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন।
তিনি শহরের নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “কর্পোরেট কমিউনিকেশন” পড়ে এসেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন—ভাষা হতে হবে কোমল, মার্জিত, ইতিবাচক।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন—
“স্যার… এই শব্দগুলো খুব আপত্তিকর।”
খুঁত মিয়া শান্তভাবে বললেন—
“ম্যাডাম, ভুলও খুব আপত্তিকর।”
জিএম বজ্রনাথ তখন গভীর দর্শনের ভঙ্গিতে বললেন—
“দেখেন ম্যাডাম, এখানে ভাষা ফুল না। এখানে ভাষা হাতুড়ি। কাজ না হলে আমরা কবিতা পড়ে বেতন দিব নাকি?”
ভদ্রা রহমান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
পরদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—সুঁইপুরের ভাষা বদলাবেন।
তিনি দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার টাঙালেন—
“ভদ্র ভাষা ব্যবহার করুন।”
“গালাগালি নয়, ভালোবাসা দিন।”
“রূঢ়তা নয়, সহমর্মিতা।”
প্রথম দিন সবাই হাসল।
দ্বিতীয় দিন কেউ পাত্তা দিল না।
তৃতীয় দিন শিপমেন্ট ফেইল করল।
কারণ পোস্টার পড়তে পড়তে সবাই কাজের চেয়ে ভাষা নিয়ে বেশি চিন্তা করতে লাগল।
একজন সুপারভাইজার একজন অপারেটরকে বলতে গিয়ে আটকে গেল—
“আপনি… মানে… যদি একটু… ঐ… ভুলটা…”
এতক্ষণে আরও দশটা ভুল হয়ে গেছে।
ফ্লোরে বিশৃঙ্খলা নেমে এল।
এক পর্যায়ে জিএম বজ্রনাথ ভদ্রা রহমানকে ডেকে বললেন—
“ম্যাডাম, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিককে কবিতা শোনালে যুদ্ধ জেতা যায় না।”
ভদ্রা রহমান প্রতিবাদ করলেন—
“তাহলে কি অশ্লীল ভাষাই সমাধান?”
বজ্রনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“না ম্যাডাম। অশ্লীলতা কখনো সমাধান না। কিন্তু বাস্তবতাকে মেকআপ দিয়ে ঢাকলেও কাজ হয় না।”
এই কথাটা শুনে ভদ্রা রহমান চুপ হয়ে গেলেন।
সেদিন রাতে তিনি প্রথমবার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে পুরো কাজ দেখলেন।
দেখলেন—একজন শ্রমিক টানা ষোল ঘণ্টা কাজ করেও হাসছে।
দেখলেন—একজন কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর নিজের খাবার না খেয়ে লাইনের ভুল ধরছে।
দেখলেন—একজন হেলপার রাত তিনটায় ঘুমিয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ানো আরেকজন তাকে পানি খাইয়ে আবার কাজে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
তিনি বুঝলেন, এই কারখানার ভাষা রূঢ় হলেও এর ভেতরে এক অদ্ভুত সহমর্মিতা আছে।
সুঁইপুরে মানুষ “ভাই” শব্দটা কম বলত, কিন্তু বিপদে সবার আগে ছুটে আসত।
এরপর একদিন ঘটল বড় বিপর্যয়।
শিপমেন্টের আগের রাতে দেখা গেল পুরো চালানে মাপের ভয়াবহ সমস্যা।
কারও প্যান্ট বেশি বড়, কারও ছোট।
মিস্টার রবার্ট ব্ল্যাক রাগে লাল হয়ে বললেন—
“This shipment is dead!”
সঙ্গে সঙ্গে পুরো ফ্লোরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
কারণ এই শিপমেন্ট বাতিল হলে শুধু কোম্পানির ক্ষতি নয়; হাজার মানুষের ওভারটাইম, বেতন, এমনকি চাকরিও ঝুঁকিতে পড়বে।
জিএম বজ্রনাথ সবাইকে নিয়ে দাঁড়ালেন।
তার চোখ লাল, কণ্ঠ ভারী।
তিনি চিৎকার করতে পারতেন।
গালাগালি দিতে পারতেন।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেদিন তিনি শান্ত গলায় বললেন—
“আজ দোষ খুঁজলে আমরা মরব। আজ শুধু সমাধান খুঁজো।”
এই একটি বাক্য যেন পুরো ফ্লোরে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিল।
মানুষ আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কেউ মাপ ঠিক করছে, কেউ সুতা কাটছে, কেউ কার্টন বদলাচ্ছে।
রাত পেরিয়ে ভোর হলো।
ভোর পেরিয়ে দুপুর।
অবশেষে শিপমেন্ট বের হলো।
ট্রাক যখন ফ্যাক্টরির গেট ছাড়ল, তখন অনেকের চোখে পানি।
মিস্টার রবার্ট ব্ল্যাক চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বিদায়ের সময় তিনি শুধু বললেন—
“You people are crazy… but magical.”
কেউ পুরোটা বুঝল না।
তবুও সবাই হাততালি দিল।
সেদিন রাতে ভদ্রা রহমান ফ্যাক্টরির টয়লেটে ঢুকে দেয়ালে একটা লেখা দেখলেন—
“এখানে সবাই কাপড় সেলাই করে,
কিন্তু নিজের জীবনটা কেউ জোড়া লাগাতে পারে না।”
তিনি দীর্ঘক্ষণ সেই লেখার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ তার মনে পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য আসরের কথা।
সেখানে এক কবি টয়লেটের দেয়ালে লেখা দেখে বলেছিলেন—
“এটাই উত্তর-আধুনিক বেদনার ভাষা।”
কিন্তু সুঁইপুরে কেউ সাহিত্য বিশ্লেষণ করে না।
এখানে মানুষ দেয়ালে কবিতা লেখে ক্লান্তি থেকে, আর পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে।
ধীরে ধীরে ভদ্রা রহমান বদলে গেলেন।
তিনি ভাষাকে আর শুধু শব্দ হিসেবে দেখলেন না।
তিনি বুঝলেন, প্রতিটি পেশার নিজস্ব উপভাষা থাকে।
আইনজীবীর ভাষা আলাদা, সৈনিকের ভাষা আলাদা, রাজনীতিকের ভাষা আলাদা।
গার্মেন্টসের ভাষাও আলাদা—কারণ এর জন্ম হয়েছে চাপ, সময় আর দায়বদ্ধতার ভেতর।
তবুও তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেলেন।
তিনি বললেন—
“রূঢ়তা কমানো যায়, কিন্তু বাস্তবতা লুকানো যায় না।”
তারপর থেকে সুঁইপুরে অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হলো।
গালাগালি কিছুটা কমল।
কিন্তু জরুরি ভাষা রয়ে গেল।
এখন কেউ বলে—
“ভুল করলে পুরো লাইন ডুববে।”
আগে বলত আরও ভয়ঙ্কর কিছু।
মানুষ শিখল—কঠোর হওয়া যায়, অপমানজনক না হয়েও।
কিন্তু পুরো পরিবর্তন কখনো এল না।
কারণ সুঁইপুরের মূল জ্বালানি এখনো সময়, চাপ আর টার্গেট।
বহু বছর পর সুঁইপুর নিয়ে এক কবি উপন্যাস লিখলেন।
তিনি লিখলেন—
“সুঁইপুরে মানুষ কাপড় সেলাই করতে করতে নিজের আবেগের সেলাই খুলে ফেলেছে।”
বইটি সাহিত্য পুরস্কার পেল।
সেমিনারে বুদ্ধিজীবীরা বললেন—
“এটি শ্রম-সভ্যতার অস্তিত্ববাদী সংকটের প্রতীক।”
ফ্যাক্টরির শ্রমিকেরা বইটা পড়ে শুধু হেসেছিল।
কারণ তারা জানত—
যে ভাষাকে সাহিত্যিকেরা “অস্তিত্ববাদ” বলেন, সেটাই তাদের কাছে ছিল “ডেডলাইন”।
সুঁইপুর আজও আছে।
সেখানে এখনো রাত জেগে মানুষ শিপমেন্ট বাঁচায়।
এখনো কেউ ভুল করলে বজ্রনাথের উত্তরসূরিরা রেগে ওঠে।
এখনো টয়লেটের দেয়ালে কবিতা লেখা হয়।
এখনো সময়কে সেখানে “স্যার” বলা হয়।
আর এখনো সুঁইপুরের মানুষ বিশ্বাস করে—
“দোষ পরে দেখা যাবে, আগে মাল বের করো।”
এই বিশ্বাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের নির্মম সৌন্দর্য।
কারণ তারা জানে—
ভাষা কখনো কখনো নগ্ন হতে পারে,
কিন্তু শ্রম কখনো অশ্লীল নয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now