বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটা সময় ছিল, দিনের একটা নির্দিষ্ট অংশ যেন নিজের অজান্তেই বরাদ্দ থাকত গল্পের জন্য। ব্যস্ততা থাকত, কাজ থাকত, জীবনের ছোট ছোট অস্থিরতাও ছিল—তবুও দিনের শেষে কিংবা গভীর রাতে মন টানত সেই পরিচিত জায়গাটায়, গল্পের ঝুড়িতে। মনে হতো, সেখানে ঢুকলেই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করছি। যেখানে শব্দের ভেতর মানুষ বাঁচে, অনুভূতিরা কথা বলে, আর অচেনা মানুষগুলোও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে খুব আপন।
আমি তখন গল্পের ঝুড়ির পুরনো গল্পবাজদের একজন। প্রতিদিন লিখতাম। কখনো ছোট গল্প, কখনো অনুভূতির টুকরো, কখনো আবার রাত জাগা কল্পনার ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্রের জীবন। কী অদ্ভুত ব্যাপার, একটা গল্প পোস্ট করার পর অপেক্ষা করতাম কারা পড়বে, কারা মন্তব্য করবে, কারা হয়তো নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাবে। সেই অপেক্ষার মাঝেও ছিল এক ধরনের আনন্দ। মনে হতো, আমি একা নই। কোথাও না কোথাও কিছু মানুষ আছে, যারা আমার শব্দের ভেতর নিজেদের খুঁজে নেয়।
তখন গল্পের ঝুড়ি শুধু একটা ওয়েবসাইট ছিল না। ওটা ছিল একটা পরিবার। সেখানে সহলেখক ছিল, ছোট ভাই-বোন ছিল, বন্ধুত্ব ছিল, অভিমান ছিল, আবার মিলেও যাওয়া ছিল। রাত জেগে আড্ডা হতো। কেউ নতুন গল্প লিখলে সবাই মিলে পড়তাম, আলোচনা করতাম। কেউ মন খারাপ করে থাকলে তাকে ঘিরে কথার বৃত্ত তৈরি হতো। গল্পের আড়ালে মানুষগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।
অনেকেই ছিল, যারা লেখার হাত খুব ভালো ছিল না শুরুতে। কিন্তু উৎসাহ পেতে পেতে, প্রতিদিন একটু একটু করে লিখতে লিখতে একসময় দারুণ লেখক হয়ে উঠেছিল। তখন কেউ কাউকে ছোট করে দেখত না। বরং সবাই চাইত, অন্যজনও আরও ভালো লিখুক। এখনকার মতো কেবল প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ইচ্ছে। একটা নতুন গল্প পোস্ট হলে যেন ছোট্ট একটা উৎসব শুরু হয়ে যেত। কে আগে পড়বে, কে আগে মন্তব্য করবে—এই নিয়ে মজার এক উন্মাদনা কাজ করত।
সেই সময়টার কথা ভাবলে এখনো একটা নরম বিষণ্নতা এসে বসে মনে। কারণ সময় বদলে গেছে। মানুষ বদলে গেছে। ব্যস্ততা বেড়েছে। আগের মতো প্রতিদিন আর লেখা হয়ে ওঠে না। কখনো ইচ্ছে হয়, কিন্তু শব্দগুলো আর আগের মতো ধরা দেয় না। জীবন যেন ধীরে ধীরে মানুষকে বাস্তবতার দিকে টেনে আনে, আর কল্পনার জন্য বরাদ্দ সময়টুকু কমে যেতে থাকে।
এখন গল্পের ঝুড়িতে ঢুকলেও আগের সেই পরিচিত কোলাহল পাই না। অনেক পরিচিত নাম হারিয়ে গেছে। কেউ চাকরির ব্যস্ততায়, কেউ সংসারে, কেউ হয়তো জীবনের অন্য কোনো মোড়ে গিয়ে থেমে গেছে। ছোট ভাই-বোনেরা যারা একসময় “ভাইয়া নতুন গল্প কই?” বলে ইনবক্স ভরিয়ে রাখত, তারাও হয়তো বড় হয়ে গেছে। তাদের জীবনেও এখন নতুন নতুন ব্যস্ততা।
তবুও অদ্ভুতভাবে সেই স্মৃতিগুলো আজও রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে পুরনো গল্পগুলো খুলে পড়ি। পুরনো মন্তব্য দেখি। কারো একটা ছোট্ট প্রশংসা, কারো মজার কোনো কথা, কারো অভিমানী মন্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, এ তো শুধু লেখা ছিল না, এ ছিল একটা সময়ের জীবন্ত স্মৃতি।
আজ আর প্রতিদিন গল্প লেখা হয় না, আগের মতো নিয়মিত আড্ডাও হয় না। কিন্তু ভেতরের সেই গল্পবাজ মানুষটা এখনো মরে যায়নি। সে এখনো মাঝরাতে হঠাৎ কোনো লাইন ভেবে চুপ করে বসে থাকে। এখনো কোনো বৃষ্টির রাতে মনে হয়, একটা গল্প লেখা যেত। এখনো পুরনো কোনো সহলেখকের নাম দেখলে মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা, যখন কয়েকটা শব্দই মানুষকে এতটা কাছের করে তুলত।
হয়তো সময়ের নিয়মেই সব বদলে যায়। আগের মতো সবকিছু কখনোই থাকে না। কিন্তু কিছু জায়গা, কিছু মানুষ, কিছু স্মৃতি আমাদের ভেতরে স্থায়ী হয়ে যায়। গল্পের ঝুড়ি আমার জন্য তেমনই একটা জায়গা। যেখানে আমি শুধু গল্প লিখিনি, নিজের একটা সময় রেখে এসেছি। নিজের হাসি, কষ্ট, স্বপ্ন, একাকিত্ব—সবকিছুর কিছু অংশ সেখানে জমা আছে।
আজও যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি এখনো গল্প লেখো?” — আমি হয়তো হেসে বলি, “আগের মতো আর না।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানি, একজন গল্পবাজ কখনো পুরোপুরি লেখা ছেড়ে দিতে পারে না। হয়তো শব্দ কমে যায়, প্রকাশ কমে যায়, কিন্তু গল্পগুলো কোথাও না কোথাও ঠিকই বেঁচে থাকে।
আর তাই এখনো বিশ্বাস করি, কোনো একদিন হয়তো আবার সেই পুরনো আড্ডা ফিরে আসবে। হয়তো সবাই একসঙ্গে আর হবে না, হয়তো অনেকেই হারিয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে। তবুও কেউ একজন হঠাৎ পুরনো কোনো গল্পে মন্তব্য করবে, কেউ ইনবক্সে লিখবে “ভাইয়া, নতুন কিছু লিখেন না কেন?” — আর তখন মনে হবে, গল্পের ঝুড়ির সেই দিনগুলো আসলে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সেগুলো এখনো কোথাও বেঁচে আছে, আমাদের স্মৃতির ভেতর, শব্দের ভেতর, আর একদল মানুষকে ঘিরে তৈরি হওয়া সুন্দর এক সময়ের ভেতর।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now