বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সোনার খাঁচার হিসাবরক্ষক

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। শহরের প্রান্তে, যেখানে ধুলো আর দালানের মাঝে নৈতিকতার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, সেখানে এক অদ্ভুত রাজ্য ছিল—নাম তার “দলিলপুর”। এই রাজ্যে সবকিছুই ছিল কাগজের ওপর নির্ভরশীল—জন্ম, মৃত্যু, ভালোবাসা, বিশ্বাস—সবই যেন সিলমোহরের অপেক্ষায়। আর এই রাজ্যের অঘোষিত সম্রাট ছিলেন এক জনাব—যার নাম কেউ সরাসরি উচ্চারণ করত না। সবাই তাকে ডাকত “হিসাবরক্ষক”। হিসাবরক্ষকের গল্প শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণভাবে। তিনি ছিলেন মাটির মানুষ—অন্তত তিনি নিজেই তা বলতেন। তার পোশাকে ছিল সরলতা, কথায় ছিল বিনয়, আর চোখে ছিল এক অদ্ভুত ঝিলিক—যা তখন কেউ বুঝতে পারেনি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল, সেই ঝিলিক যেন সোনার আলো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তার বাড়ি বেড়ে উঠছে গাছের মতো, গাড়ি বাড়ছে ছায়ার মতো, আর ব্যাংকের অঙ্কগুলো ফুলে উঠছে বর্ষার নদীর মতো। দলিলপুরে একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল—যে যত বেশি কাগজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে তত বড় মানুষ। আর হিসাবরক্ষক কাগজের রাজনীতিতে ছিলেন একেবারে সিদ্ধহস্ত। তিনি জানতেন, কোন জমি কাকে দিতে হবে, কোন দলিলকে সত্য বানাতে হবে, আর কোন সত্যকে দলিলে হারিয়ে ফেলতে হবে। একদিন শহরের এক বৃদ্ধ কৃষক এলেন তার কাছে। তার হাতে ছিল মাটির গন্ধমাখা এক টুকরো কাগজ—তার পৈতৃক জমির দলিল। বৃদ্ধ কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “বাবা, এই জমিটা আমার বাপ-দাদার। একটু ঠিক করে দেন।” হিসাবরক্ষক কাগজটা হাতে নিয়ে হাসলেন—সেই হাসি ছিল মোলায়েম, কিন্তু তাতে ছিল হিসাবের ঠাণ্ডা গন্ধ। তিনি বললেন, “সবই হবে, তবে কাগজেরও তো খরচ আছে।” বৃদ্ধ বুঝতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, হয়তো সরকারি ফি। কিন্তু যখন শুনলেন, সেই ‘খরচ’ তার জমির অর্ধেকের সমান, তখন তার চোখে জল এসে গেল। তিনি বললেন, “আমি তো গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব?” হিসাবরক্ষক তখন চুপচাপ তার পাশে বসা এক সহকারীকে ইশারা করলেন। সহকারী ফিসফিস করে বলল, “না পারলে জমিটাই দিয়ে দেন, ঝামেলা শেষ।” এইভাবেই দলিলপুরে জমি বদলাতো—কাগজে নয়, ক্ষমতার ইশারায়। হিসাবরক্ষকের বাড়ি ছিল এক বিস্ময়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, যেন কোনো রাজপ্রাসাদ। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যেত, এটি আসলে এক বিশাল খাঁচা—সোনার খাঁচা। প্রতিটি ঘরে ছিল দামি আসবাব, প্রতিটি দেয়ালে ঝুলত অদৃশ্য হিসাবের তালিকা। তার স্ত্রী প্রায়ই বলতেন, “এই বাড়ি কি আমাদের, নাকি আমরা এই বাড়ির বন্দি?” হিসাবরক্ষক হেসে বলতেন, “সবই তো আমাদের—কাগজে লেখা আছে।” কিন্তু কাগজ কি কখনো আত্মাকে বাঁধতে পারে? দলিলপুরে এক সময় গুজব ছড়াতে শুরু করল—হিসাবরক্ষকের নাকি রাতের বেলা ঘুম হয় না। তিনি নাকি মাঝরাতে উঠে বসেন, আর অদৃশ্য কারও সঙ্গে কথা বলেন। কেউ বলত, তিনি হিসাব মিলান—কোন জমি কোথায় গেল, কার টাকা কোথায় জমা হলো। কেউ বলত, তিনি ভয় পান—কারণ কাগজের হিসাব সবসময় মেলে না। একদিন এক তরুণ সাংবাদিক এলেন দলিলপুরে। তার চোখে ছিল প্রশ্ন, আর কলমে ছিল সাহস। তিনি হিসাবরক্ষকের গল্প খুঁজতে শুরু করলেন। লোকজন প্রথমে কিছু বলতে চাইত না—কারণ ভয় ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে গল্প বেরিয়ে আসতে লাগল—জমি, টাকা, হুমকি, আর অদৃশ্য ক্ষমতার জাল। সাংবাদিক একদিন হিসাবরক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনার এই সম্পদের উৎস কী?” হিসাবরক্ষক তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, “সবই নিয়মমাফিক।” তার চোখে তখন সেই পুরনো ঝিলিক—কিন্তু এবার তাতে ছিল ক্লান্তি। সাংবাদিক আবার জিজ্ঞেস করলেন, “মানুষ বলছে, আপনি নিয়ম বানান, মানেন না।” হিসাবরক্ষক একটু থেমে বললেন, “মানুষ অনেক কিছুই বলে। কাগজ কী বলে, সেটাই আসল।” সেই দিন রাতে দলিলপুরে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। শহরের সব দলিল একসঙ্গে উধাও হয়ে গেল। জমির মালিকেরা জেগে উঠল আতঙ্কে—কার জমি কার, কেউ জানে না। হিসাবরক্ষক পাগলের মতো তার অফিসে ছুটলেন। ফাইলের পর ফাইল খুললেন—সব ফাঁকা। সিল আছে, কাগজ আছে—কিন্তু লেখা নেই। তিনি প্রথমবারের মতো বুঝলেন—কাগজ ছাড়া তার ক্ষমতা শূন্য। পরদিন সকালে শহরের মানুষ একত্র হলো। তারা বলল, “যে জমিতে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেটাই আমাদের।” তারা কাগজের বাইরে সত্য খুঁজে পেল। আর হিসাবরক্ষক দাঁড়িয়ে রইলেন তার সোনার খাঁচার সামনে—হিসাব মিলাতে না পেরে। শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, তার প্রাসাদ ধীরে ধীরে খাঁচায় পরিণত হচ্ছে—দেয়ালগুলো যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। তিনি বের হতে চাইছেন, কিন্তু দরজা নেই। কারণ তিনি নিজেই দরজাগুলো বন্ধ করেছিলেন—এক এক করে, প্রতিটি দলিলের সঙ্গে। দলিলপুরে এখনো নতুন হিসাবরক্ষক আসে, নতুন কাগজ তৈরি হয়। কিন্তু মানুষ শিখেছে—সব সত্য কাগজে লেখা থাকে না। আর সোনার খাঁচা? তা এখনো ঝলমল করে—কিন্তু ভেতরে থাকে শুধু একটাই জিনিস—অমিল হিসাবের নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now