বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গল্পের নাম- ভেলোরের দিনগুলি পর্ব-৩

"ভ্রমণ কাহিনী" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ গল্পের নাম- ভেলোরের দিনগুলি পর্ব-৩ ‘ফতেহ আলী সাহাব টিপু’ তিনি টিপু সুলতান নামেই ইতিহাস বরেণ্য ছিলেন। ব্রিটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা হিসেবে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আজীবন যুদ্ধ করে গেছেন বলেই তিনি “শের-ই-মহীশূর বা মহীশূরের বাঘ” নামে পরিচিত ছিলেন। টিপু সুলতানের নাম ইতিহসে অনেক পড়েছি এবং টেলিভিশনের সিরিয়ালেও দেখেছি। ভেলোরে এসে যদি তাঁর বিশ্বখ্যাত দুর্গটি দেখে না যাই তাহলে নিজেকে হয়তো কোনদিন ক্ষমা করতে পারবো না। যাহোক আমাদের বিশাল কাফেলার সফর সঙ্গী বন্ধু লালমনিরহাট জেলা জর্জকোর্টের এডভোকেট হুমাউন কবির কাজল, তার সহধর্মিণী আয়শা আক্তারি এজবি, তাদে মেয়ে জাইমা ও আমার ছেলে ইয়াশ মোর্শেদ অমি, রবিউল ইসলাম সুমন, জাকির হোসেন রিপন ও তার সহধর্মিণী রুমা। দিনটি ছিলো রবিবার। ভারতবর্ষে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি হয় তাই আমাদের কাজের তেমন চাঁপ নেই। তবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে সূযের্র প্রখরতা। পড়ন্ত বিকেল তার পরেও রোদের তেজ দেখে মনে হয় সবে মাত্র দূপুর হলো। এদিকে মন ভীষণ উশখুশ করছে, কখন টিপু সুলতানের সেই বিশ্বখ্যাত ট্রাজিক দুর্গটি দেখতে পাই। আমরা যে গেস্ট হাইজে থাকি সেখান থেকে ‘সায়দাপেট’ বাজার খুব বেশি দূরে নয়। পায়ে হেঁটে গেলে পনেরো-বিশ মিনিটের দূরত্ব। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে আমরা সোজা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। অল্প কিছুদূর যেতে না যেতে এডভোকেট কাজল ভাইয়ের মিসেস আয়শা আক্তারি ভাবি, তার মেয়ে জাইমা ও আমার ছেলে ইয়াস মোর্শেদ অমি এর মাঝেই যুক্তি করে ফেলে এ প্রখর রোদে তারা আর এক পা’ও সামনের দিকে ফেলবে না। জাইমা ধপাস করে রাস্তার ধারে বসে পড়লো। অমি তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় রাস্তায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলো না, সেখানেই টোটো পেয়ে গেলাম। দুর্গের প্রবেশ মুখে এসে চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেলো, চারিদিকে একই রকম শৈল্পিক কারুকার্য আসলে আমরা কোন দিকে যাবো। আমাদের ভ্রমণ দলের সদস্য সুমন. বেশ কিছুদিন ধরে ভেলোরে থাকায় সে এখানে আগেও এসেছিলো। তাই আমরা তাকেই আমাদের গইড হিসেবে অনুসরণ করছি। গোটা দুর্গের স্থাপত্য এবং শিল্পকাজের কোনও তুলনা হয় না। এই দুর্গের সবকিছুই পাথর দিয়ে বানানো। এর নির্মাণশৈলী বিস্মিত করার মতো। সব মিলিয়ে অনন্য একটি স্থাপত্য টিপু সুলতান দুর্গ। আমার বারবার মনে হতে লাগলো আজ থেকে চার-পাঁছ শত বছর আগেও এত সুরক্ষিত ও শক্তিশালী দুর্গ শুধু মাত্র পাথর দিয়ে মানুষ কিভাবে বানিয়েছিলো? তখন না ছিলো কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি, না ছিলো কোপন আধুনিক সুযোগ সুবিধা। আমরা একটা ছোট্ট সেতু পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। চারদিকে পরিখা আর শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রতিরক্ষামূলক সুড়ঙ্গ বা লেক চোখে পড়লো। তার সাথে নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রহরীদের বেশ কিছু মূর্তি। সেখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত মধ্য বয়সী একজন লোক গাছের ছায়ায় বেশ আরাম করে বসে ঝিমাচ্ছে। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি চোখ খুলে আমার দিকে তাকালেন, আমি হিন্দিতে বললাম যে, তার সাথে একটু কথা বলতে চাই। তিনি দু’পাশে মাথা নেড়ে আমাকে সম্মতি দিলেন। তারপর আমি তার নাম জানতে চাইলে তিরি ঠিক বিরক্ত হলেন কিনা জানি না তবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন- লাড়িয়া মাথু। প্রিয় পাঠক এখানে একটু বলে রাখা দরকার যে, তামিলরা ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের মানুষ থেকে একটু ভিন্ন। তারা খুব উগ্র মেজাজের হয়ে থাকে। ন¤্রতা ও ভদ্রতা এমন গুণাবলী আমি খুব কম লোকের আচার আচরণে দেখতে পেয়েছি। তবে তাদের মাঝে সততা আছে। সততার ব্যাপারে তারা শতভাগ সংকল্পবদ্ধ। জীবন দেবে তবু নীতি থেকে এক চুল পরিমাণ সরে আসবে না। এ জন্য আমি তাদের সেলুট করি। যাহোক এই দুর্গ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন- প্রায় ১৩৩ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ভেলোর দুর্গ পুরোটাই গ্রানাইট পাথর দিয়ে নির্মিত। দুর্গের চারপাশে রয়েছে লেইক সদৃশ জলাধার, যা দুর্গের পরিখা হিসেবে নিরাপত্তায় ব্যবহার হতো। এক সময় এই পরিখায় হাজার হাজার কুমির ছিলো। দুর্গে অবস্থিত সুড়ঙ্গ প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বীরঞ্জিপুরামে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শাসনকালে এই দুর্গ নির্মিত হয়। সপ্তদশ শতকে সুলতানের কাছে পরাজিত হয়ে ভেলোর ফোর্ট বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শেষ রাজবংশ আরাভি দাসের হাতছাড়া হয়। মাত্র কয়েক দশক পরেই সেই দুর্গ জয় করে নেয় মারাঠা গুষ্টি। অষ্টাদশ শতকে দুর্গ দখল করে মুঘলরা। এরপর তা ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। এছাড়া দুর্গের চারপাশে রয়েছে বিশাল আকারের পরিখা। যা ৬০ থেকে ১২০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত। এর দৈর্ঘ্য ২.৬৫ কিমি। শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেই এই পরিখা খনন করা হয়। পাথর দিয়ে তৈরি সুউচ্চ দেয়ালগুলো এতটাই মজবুত যে সামান্যতম ক্ষয়ে যায়নি। বছরের পর বছর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গের চারপাশে রয়েছে চারটি ওয়াচ টাওয়ার। এর মাধ্যমে ওই সময় শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য করা হতো। সিঁড়ি বেয়ে দেয়ালের উপরে উঠলে পুরো দুর্গটি এক নজরে দেখা যায়। দুর্গের পশ্চিম পাশে কয়েকটি কামান তাক করা রয়েছে। জং ধরা কামানগুলো পুরনো ইতিহাসকে স্বরণ করিয়ে দেয়। কামানগুলোর উপর আলতো করে হাত বুলালাম। এক সময় টিপু সুলতানের ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে কেঁপে উঠতো পুরো এই অঞ্চলের মাটি। এখন সেখানে পড়ে আছে খন্ড খন্ড তার কিছু স্মৃতি চিহ্ন। আমরা ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চার পাশের স্থাপত্যশৈলী প্রাণ ভরে দেখলাম। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে, একটু নির্জনে সময় কাটাতে মুক্ত বায়ু শ্বাস নিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসেন। দুর্গের ভেতরে রয়েছে বিয়োগান্তক ঘটনার এক মহান নায়ক টিপু সুলতানের হৃদয় বিদারক কাহিনী। যেখানে তাঁর পরিবারের রক্তের দাগ লেগে আছে প্রতিটি স্থাপত্যের শৈল্পীক কারুকার্যময় নিদর্শনে। টিপু সুলতান, পিতার ইংরেজ বিতাড়ন যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে ১৭৯৯ সালে যুদ্ধে প্রাণ হারান। ইতিহাসের চরম বর্বরোচিত নরকীয় ঘটনার সূত্রপাত হয় তখনই। মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতানের চার স্ত্রী, পনেরোটি সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ও মন্ত্রী পরিষদের অনেককেই এখানে বন্দি করে রাখা হয়। লাড়িয়া মাথুর ভাষায়- ‘তার জানামতে সেই জায়গাটি কখনোই খোলা হয় না। বছরের পর বছর তালাবদ্ধই থাকে’। টিপু সুলতানের সন্তানদের আত্বচিৎকার এসব দেয়ালের অন্ধকারে মিশে যায়। বেগম মহলের বেগমদের অশ্রæ আর রক্তের স্রোতধারা যেসব পাথরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে তা আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। আমি বেগম মহলের সামনে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধকরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর কল্পনায় দেখতে পেলাম সুলতানের শিশু সন্তানগুলো জড়োসড়ো হয়ে যেন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। সূর্যাস্তের হলুদ আভা পশ্চিম দিগন্ত থেকে ক্রমশঃ হারিয়ে যেতে শুরু করেছে, গোধুলির আঁধার একটু একটু করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন আলো-অন্ধকারের মাঝে আমরাও সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। হাজারো প্রশ্ন মাথার ভেতর এস উঁকি দিতে শুরু করে হয়তো এমন অন্ধকারেই হারিয়ে গেছে একটি পরিবার, ইতিহাসের স্বর্ণখচিত একটি অধ্যায়, একটি বাঘের গর্জন। টিপু সুলতানকে নিয়ে স্থানীয়দের মাঝেও ভীষণ রকমের আবেগ কাজ করে। তারা তাকে এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। দুর্গ পরিদর্শনের পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আমাদের ‘তাজ লাক্স গেস্ট হাউজ’ এর মালিক মোহাম্মদ আমির হোসেনের সঙ্গে নানা আলাপচারিতার মাঝে টিপু সুলতান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন- টিপু সুলতানের পরিবারকে বন্দি করে রাখার পর যাদের হত্যা করা হয় তাদেরকে মসজিদের পাশেই সমাহিত করা হয়। যেখানে সুলতানের মা, স্ত্রী, দুইকন্যাসহ অসংখ্য সমাধি রয়েছে। ডান পাশে রয়েছে টিপু সুলতানের স্ত্রী বালখা বেগমের সমাধি। অন্যপাশে অনেকগুলো সমাধির চিহ্ন রয়েছে যারা টিপু সুলতানের জামাতা, আত্মীয় ও মন্ত্রীপরিষদের সদস্য ছিলেন। এর পরেই রয়েছে টিপু সুলতানের মেয়ে ফাতেমার সমাধির চিহ্ন। একেবারে শেষ প্রান্তে মসজিদের পাশে রয়েছে সুলতানের মা হায়দার আলীর স্ত্রী বাকশি বেগমের সমাধি। এছাড়া মন্ত্রী আফতাব খাজা, জামাতা মির্জা হাসান রাজাসহ অনেকেই এখানে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। বন্দি পরবর্তী সময়ে টিপু সুলতানের পরিবারের একটি বড় অংশকে কলকাতা পাঠিয়ে দেওয়া হয় আর যাদের সন্দেহ করা হয়নি তাদের ভেলোরে রেখে দেওয়া হয়। কলকাতা নিয়ে যাওয়ার সময় টিপু সুলতানের সর্ব কনিষ্ট পুত্র শাহজাদা ওয়াহিদ উল্লাহ সুলতান ঐখান থেকে পালিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ এর সুনামগঞ্জে পরিচয় গোপন করে ওয়াহিদ উল্লাহ নামে সেখানে আশ্রয় নেন। এভাবেই হত্যা, রক্ত আর বিভক্তর ক্ষত নিয়ে টিপু সুলতানের বংশধরেরা ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়। এভাবেই হত্যা, রক্ত আর বিভক্তর ক্ষত নিয়ে টিপু সুলতানের বংশধরেরা ধুঁকে ধুঁকে নিঃশেষ হয়ে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়। এখনো দুর্গের দেয়ালে উঠলে দর্শনার্থীরা অনুভব করতে পারে সেই সব বন্দী নারী পুরুষের আর্তচিৎকার। টিপু সুলতান দুর্গ দেয়ালের কোণায় কোণায় সুলতান আর সুলতানদের স্বপ্নের অপমৃত্যুর স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। ভেলোর শহরের এই দুর্গ সেখানকার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। শুধু বাইরের সৌন্দর্যই নয়, দুর্গের ভেতরে আছে অসাধারণ একটি জাদুঘর। এতে রয়েছে ৯০০-১৪০০ বছর আগের ব্রোঞ্জের দেব-দেবীর অনেক মূর্তি-ভাস্কর্য। সেই সময়ের প্রাণীদের অবয়ব দেখে চোখ কপালে উঠে যেতে পারে! বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মিশ্রণ দিয়ে কাচের জারে রেখে দেওয়া হয়েছে জন্তু-জানোয়ার। ভারতীয়দের মধ্যে দেশপ্রেম বা স্বদেশিদের জন্য আলাদা একটা টান আছে। অনেক জায়গায় এর প্রমাণ পাবেন। বিশেষ করে যখন কোথাও ফি দিতে হবে। জাদুঘরেও এটি লক্ষ্য করেছি। এর প্রবেশমূল্য ভারতীয়দের জন্য ১০ রুপি আর বিদেশিদের বেলায় ১০০ রুপি! জাদুঘরের আরও অনেক কিছু দর্শনীয়। এর মধ্যে অন্যতম খ্যাপাটে দেশপ্রেমিক টিপু সুলতানের ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র! রণক্ষেত্রে তিনি কতটা প্রতাপশালী ছিলেন, সেটা বোঝা যায় এখানে। প্রজাদের প্রতি তার প্রেম আর বাঘপ্রীতির নানান উদাহরণও আছে। তিনি যে তলোয়ার ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিল ডোরা দাগ, হাতলে ছিল খোদাই করা বাঘের মূর্তি। তার ব্যবহৃত রুমালও ছিল বাঘের মতো ডোরাকাটা। এমনকি রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোশাকে থাকতো বাঘের ছবি। সৈন্যদের ব্যবহার্য তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারও এই খোদাই থেকে বাদ যেতো না। দূর দূরান্ত থেকে আসা মানুষজন টিপু সুলতান দুর্গে এসে প্রাচীন বৃক্ষরাজির ছায়াতলে প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে সময় কাটায়। দৃষ্টিনন্দন এ দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে পাথরের তৈরি ফটক। সামনে এগুলেই হাতের ডানপাশে রয়েছে বিশাল আকারের জলকণ্টেশ্বর মন্দির। যেখানে এখনো পূজা অর্চনা হয়। মন্দিরটির সামনে গিয়ে অবাক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কিভাবে এতবড় একটি মন্দির এত নকশা করে তৈরি করা হয়েছে, ভাবতে গেলে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়। অসংখ্য দেব দেবীর প্রতিকৃতি পাথরে খোদাই করে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী বয়ে গেলেও সবকিছু এখনো অক্ষত রয়ে গেছে। মন্দিরের ভেতরের আঙ্গিনায় ছোট ছোট আরও অসংখ্য মূর্তি রয়েছে। পুরনো আমলের আরাধনার স্থান ও বৈঠক খানার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেলেও শিল্পীর সুনিপুণ আঁচড় ভাবনার যোগান দেয়। আমরা ঘুরে ঘুরে পুরো মন্দিরের স্থাপত্যশৈলি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম চারশত বছর আগেও শিল্পচর্চায় তারা কত অগ্রগামী ছিলো। মন্দির থেকে বের হয়ে হেঁটে একটু সামনে গেলেই দেখতে পাই খ্রিস্টানদের একটি গীর্জা। জানা যায়, বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত অসংখ্যা সৈনিকদের গীর্জার পাশেই সমাহিত করা হয়। এর পাশেই রয়েছে সরকারি অফিস। অন্যপাশে রয়েছে টিপু সুলতানের সময়ে করা পাথরের তৈরি একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। তবে গত দশ বছর ধরে মসজিদটি বন্ধ রয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রহরীর কাছে মসজিদটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ঝামেলা এড়ানোর জন্য কতৃপক্ষ মসজিদটি বন্ধ করে দেয়।' তবে মসজিদ বন্ধ করার পর এ অঞ্চলের 'হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, যানবাহন চলাচল বন্ধ করে মসজিদ খুলে দেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করে। কিন্তু কতৃপক্ষ গন্ডগোলের ভয়ে মসজিদটি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেয়।' দুর্গের মধ্যভাগে রয়েছে গোল আকৃতির একটি খোলা মাঠ। যেখানে সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হতো বলে ধারণা করা হয়। তবে জাদুঘরে টিপু সুলতানের সিংহাসন দেখিনি। হয়তো খেয়াল করা হয়নি। ব্রিটিশদের রক্ত হিম করে দেওয়া এই যোদ্ধাকে ভোলেনি ভেলোরের মানুষ। নয়তো বিজয়নগর সাম্রাজের নানান কীর্তির পরও এই স্থাপনাকে লোকে টিপু সুলতানের দুর্গ বলতো না। শক্ত পাথরের এই দুর্গেই মিশে আছে ভারতের স্বাধীনতাকামী প্রচ্য প্রতাপশালী বীরের নাম। মহীশুরের ক্ষিপ্র বাঘ টিপু সুলতান সত্যিকার অর্থেই হৃদয় থেকে হৃদয়ে বেঁচে থাকা যোদ্ধার নাম। টিপু সুলতানকে বলা হতো শের-ই-মহীশূর; অর্থাৎ মহীশূরের বাঘ। মজার বিষয় হলো, তাকে এই উপাধি দিয়েছিল তারই আজন্ম শত্রু ইংরেজরা। তার এই বাঘ হয়ে ওঠার পেছনে অনেক কারণে আছে। বরাবরই ইংরেজরা তার কৌশল, অসাধারণ ক্ষিপ্ততা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তার কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছে। টিপু সুলতান নিহত হওয়ার পর ইংরেজরা চরম হত্যা যজ্ঞের মাধ্যমে হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি করে। চারিদিকে ব্যাপক লুণ্ঠন চালায়। যা বিভিন্ন ঐতিহাসিকের লেখনীতে উঠে আসে। ভগবান এস গিদোয়ানী তার 'দি সোর্ড অব টিপু সুলতান' বইতে উল্লেখ করেন, ওই সময় ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পরিচালক রিচার্ড ওয়েলেসলি ‘মহীশূরের বাঘ’ টিপু সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর উল্লাস করে মন্তব্য করেন, ‘গোটা ভারতবর্ষই এখন আমাদের’। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, টিপু সুলতান জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত এভাবে বাঘের মতোই লড়াই করে নিজের জীবন দিয়েছেন। তাকে ভারতের স্বাধীনতাকামিদের প্রতিক বলা হতো। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য একমাত্র তিনিই অবশিষ্ট ছিলেন। তাই ভারত দখলে বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ইংরেজরা আশ্রয় নেয় কূটকৌশলের। নিজ সেনাপতি মীর সাদিকের বিশ্বাস ঘাতকতায় অবশেষে ভারতের সূর্যের শেষ আলোটা ১৭৯৯ সালে চিরতরে নিভে যায়। আবার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় পুরো ভারত বর্ষ। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, ভারতবর্ষের সূর্য সন্তান ও তাঁর পরিবারের এমন নির্মম ট্রাজেডির গল্প শুনে এবং তার নির্দশগুলো দেখে চোখের পাতা বারবার ভিজে যাচ্ছে। খুব নরম মনের মানুষ এডভোকেট কাজল ভাই এমন নির্মম ট্রাজেডির নির্দশগুলো দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পাচ্ছেন না হয়তো সে কারণেই দ্রæত ফেরার জন্য বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন। ফিরতে মন না চাইলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই পা বাড়ালাম গন্তব্যের দিকে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now