বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
গল্পের নাম -ভেলোরের দিনগুলি পর্ব-২
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডু রাজ্যে চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা একটি জেলা শহরের নাম ভেলোর। উপর থেকে দেখলে অনেকটা স্টেডিয়ামের মতো মনে হয় পুরো শহরটিকে। সমুদ্র সমতল পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২১৬ মিটার। ভেলোর পূর্বঘাট পর্বত থেকে উৎপন্ন “পালার নদীর” তীরে গড়ে উঠেছে ভেলোর। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায় যে, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনাস্থল ছিলো ভেলোর। ভেলোর শহরটি র্ফোট সিটি বা দূর্গের শহর নামেও পরিচিত। বৃটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা বীরযোদ্ধা টিপুসুলতানের স্মৃতিবিজড়িত একটি দুর্গের ভগ্নাবশেষ ভেলোর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ শহরটির সুনাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
ভেলোরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করে। তাই সূর্য আড়ালে না যাওয়া পর্যন্ত বাইরে বের হওয়াটা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ভেলোরের অধিবাসীরা এমন তাপমাত্রায় চলতে অভ্যাস্ত কাজেই তাদের খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু আমরা যারা নাতিশীতষ্ণ অঞ্চলের মানুষ তাদের কাছে এ তাপমাত্রা সহ্য করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
প্রিয় পাঠক আমি পূর্বেই বলেছি ভারতের তামিল নাডু ও কেরালা রাজ্যে ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিলো চিকিৎসা। আর চিকিৎসা ছাড়া ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ করাটাও কঠিন কাজ। সরাসরি বলতে গেলে ট্যুরিজম ভিসা খুব কমই পাওয়া যায়। যাহোক আমার উদ্দেশ্য ‘রদ দেখা আর কলা বেচা’ দু’টোই একসাথে।
সাতদিন একটা লম্বা সময় কারণ আমি ডাক্তারের এপয়েন্টম্যান্ট পেলাম সাতদিন পর। হাতে লেখালেখি ছাড়া আপাতত অন্যকোন কাজ নেই। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এ সাত দিনে যতোটুকু পারা যায় আশেপাশের জায়গাগুলোতে একটু ঘুরে বেড়া আর আমার লেখা-লেখির কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যেই ভাবনা সেই কাজ। তবে বাধা হয়ে দাঁড়ালো সেখানকার উচ্চ তাপমাত্রা। ভরদুপুরে রোদের তাপে শরীরের চামড়া পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তাই পড়ন্ত বিকেলে যতোটা সম্ভব সুর্যের তাপকে ফাঁকি দিয়ে আমরা সবাই বেড়িয়ে পড়ি পাহাড়ের খোঁজে। আমাদের বিশাল কাফেলার সফর সঙ্গী বন্ধু লালমনিরহাট জেলা জর্জকোর্টের এডভোকেট হুমাউন কবির কাজল, তার সহধর্মিণী আয়শা আক্তারি এজবি, তাদে মেয়ে জাইমা ও আমার ছেলে ইয়াশ মোর্শেদ অমি, রবিউল ইসলাম সুমন, জাকির হোসেন রিপন ও তার সহধর্মিণী রুমা। পাহাড় দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ছোট-বড় কারও কোন দ্বিমত খুঁজে পাওয়া গেলো না।
ভেলোর শহরটির পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে গেলেই একটি উঁচু পাহাড়ের দেখা পাওয়া যায়। আমরা টোটো যোগে সে পাহাড়ের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়লাম। এক কিলোমিটার ভুল তথ্য নয়, সত্যিটা হলো আমরাতো পাহাড়ের গা ঘেঁষেই চলছি। আসলে পাহাড়ের চূঁড়াটা একটু দূরে। যাহোক মিনিট ত্রিশের মাথায় আমরা সেই কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছে গেলাম। বড় বড় পাথরের মাঝখানে জন্মানো অসংখ্য ছোট ছোট গাছ গাছালি। আবার নাম নাজানা অনেক বড় বড় গাছও আছে। এখানে এসে ছোট ছোট গাছগুলো ধরে যতোটুকু উপরে ওঠা যায়, উঠে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে একটা বড় পাথরের ওপর বসে পড়লাম। আর মনে মনে তামিলনাডু রাজ্যসরকারের উপর একটু ক্ষোপ প্রকাশ করতে লাগলাম। প্রকৃতিক নৈসর্গের বেলাভ’মি এ পাহাড়গুলোকে যদি পর্যটনের আওতায় নিয়ে এসে উপরে ওঠার শিড়ি বানিয়ে দিতো, তাহলে আমাদের মতো শতশত পর্যটকদের এতোটা কষ্ট করে উপরে ওঠার বিড়ম্বনা পোহাতে হতো না। উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে দিগন্তের সীমানা পর্যন্ত যতোদূর দৃষ্টি চলে যায় চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। নয়নাভিরাম, দৃষ্টিনন্দন পাহাড়গুলোকে দেখে কবি নজরুলের একটা গান মনে পড়ে গেলো-
“আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।
ওই পাহাড়ের ঝরনা আমি,
উধাও হয়ে বই গো, উধাও হয়ে বই”
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই পাহাড়, প্রকৃতি যেন তার সবটুকু উজার করে দিয়েছেন এখানে মানুষের উপভোগের জন্য। হয়তো তাই প্রকৃতি প্রেমিকরা জীবনের ঝুকি নিয়ে হলেও পাহাড়ের বুকে ছুটে আসেন তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে জীবনে আস স্বাদ খুঁজে পেতে। উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই যেন হালকা মেঘের প্রেমোস্পর্শে চোখের পাতা ভিজে যায়, মাথার চুলে শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিকণা জমে শীতল অনুভুতির সৃষ্টি করে। প্রকৃতির উজার করা প্রেমের মাদকতায় দুচোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
দিগন্ত বিস্তৃত আকাশের বুকজুড়ে ভাঙা ভাঙা মেঘের খেলা, পাথরের সাথে খয়েরি মাটির মিতালি, বুকের পাঁজরে যেন আটকে রেখেছে গাছের শিকড়। গহীন অরণ্যে শাল-সেগুনসহ নাম না জানা হাজারো উঁচু গাছ যেন প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টির সাক্ষী বহন করে চলেছে। সবুজ ঘণ বনবীথি থোকায় থোকায় ফুটে থাকা বাহারি রঙের নানা রকম ফুল, যেন গন্ধ বিলাবার জন্যই জন্মের স্বার্থকতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। কাঁচা, আধা পাকা বিচিত্র রকমের ফল এখানকার বন্য প্রাণি বিশেষ করে বানরদের সীমাহীন আনন্দে থাকার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বানরেরা গাছের চিকন ও লম্বা ডালগুলোকে তাদের দোলনার উপকরণ ভেবে একগাছ দুলে অন্য গাছে অনায়াসে চলে যাচ্ছে, পড়ে যাওয়র কোন ভয় তাদের মধ্যে কাজ করছে না। পাখিদের কিচির-মিচির শব্দ আর মৌমাছিদের গুঞ্জণে গোটা পাহাড়ে যেন এক অবিরাম সুরের লহড়ি বয়ে যাচ্ছে। খাড়া পাহাড়, উঁচু নিচু বন্ধুর পথ, পা বাড়ানোর উপায় নেই একটু দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনার জল, জলপ্রপাতের মতো মনোমুগ্ধকর ছলাত ছলাত শব্দ। সাদা পাথরের উপর দিয়ে প্রবাহমান পরিস্কার পানি যেন চোখের জলের মতোই স্বচ্ছ, নির্মল। মো. রকিবুজ্জামানের লেখা সুবীর নন্দীর কণ্ঠে একটি গানের কথা মনে পড়ে গেলো --
“পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝরনা বলো,
ওই পাহাড়টা বোবা বলেই কিছু বলে না” ।
চারিদিকে উঁচু পাহাড়ের সারি, ঢেউ খেলানো সবুজ বনের উপরে যেন কূয়াশার আনাগোনা, পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদে হালকা দক্ষিণা বাতাসের মৃদু স্পর্শ এক অপূর্ব সৌন্দর্যের আবহে আমাকে ভেসে নিয়ে যাচ্ছে। এমন আনন্দ মুখর পরিবেশে আমার কেবলি মনে হচ্ছে “হে আমার সৃষ্টিকর্তা আমি তোমার কাছে স্বর্গ চাই না” যে তোমার বিশাল অনন্ত এ জগৎ তুমি পুর্ণ্যাত্মা মহাপুরুষদের মধ্যে রেখে দিও, মাটির এ পৃথিবীতে আমাকে নিয়ে এসে এই বিশাল উঁচু পাহাড়, ফুল ফল, বৃক্ষরাজি, বন্য প্রাণিদের খেলা, পাখির গান এই মুগ্ধ মায়া জগতের মধ্যে আমাকে এতটুকু স্থানে সুবর্ণ করার শক্তি দিও। তোমার নিখিল সৃষ্টির এ জীব-জগৎ, বিশাল উঁচু পাহাড়, ফুল ফল, বৃক্ষরাজি, পাখির গান এসবের মধ্যে কী অপূর্ব শান্তি কি সুখময় অনুভূতি আর যেন মনে কোনো আশা নেই, কোনো তৃষ্ণা নেই, পাপ নেই, পুণ্যের স্পৃহাও নেই, স্বর্গ ভোগের আকাক্সক্ষা নেই, শুধু চারিদিকে আছে ঘুরে বেড়ানোর এক বুক ভরা তৃষ্ণা।
আমার সঙ্গী সাথীরা পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় যেয়ে বড় বড় পাথরের ওপর বসে ছবি ছবি তোলা নিয়ে ব্যাস্ত পড়ে। আর আমি ডুবে আছে প্রকৃতির প্রেমে। এডভোকেট কাজল আমাকে জোর করেটেনে নিয়ে গেলেন একটা জায়গায় যেখান থেকে পুরো ভেলোর শহরটাকে দেখা যাচ্ছে। সত্যি তো আমি সে দিকটায় যেতে পারিনি। খুব উঁচু জায়গা থেকে হায়ারেজ বিল্ডিংগুলোকেও অতি ক্ষুদ্র আর রাস্তায় চলমান মানুষগুলোকে ‘গালিভার্স ট্যাভেলের’ সে লিলিপুটের মতো মনে হচ্ছে । সত্যি এক অকল্পনীয় ও বিশ্ময়কর ব্যাপার। সে মুহুর্তে কেন জানি আমার মনে হলো যে, হয়তো এমন এক কাল্পনিক দৃশ্য অবলোকন করেই ‘জনাথন সুইফ্ট’ তার বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস “গালিভার্স ট্রাভেল” রচনা করেছেন। দলের ছোট সদস্যরা বানরদের লাফালাফি দেখে খুব মজা পাচ্ছে। আমরা সবাই ুমলে অনেক ছবি তুললাম। এদিকে পশ্চিম আকাশে সূর্যটা বলে দিচ্ছে ফেরার সময় হয়ে এসেছে। স্থানীয় লোকজন বলছে সন্ধ্যার পর অনেক হিংস্র প্রাণি আসে। কাজেই আমাদেও আর দেরি করা ঠিক হবে না। মন না চাইলেও নিরাপত্তার খাতিরে আমাদের দ্রুত পাহাড়ের উপর থেকে নামতে হলো। তারপর একটু পায়ে হেঁটে রাস্তায় এসে টোটো ভাড়া করে আমরা গন্তব্যে ফিরে এলাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now