বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শৈশবের দিনগুলোকে এখন মনে করলে মনে হয়—আমি একসময় সত্যিই অঢেল ধনী ছিলাম। টাকার হিসেবে নয়, স্বপ্নের হিসেবে। আমাদের বাড়ির পাশের ছোট্ট গলিটা বৃষ্টি নামলেই বদলে যেত নদীতে। সেই নদীর মাঝখানে আমার তিন–চারটে কাগজের নৌকা আর পুরোনো খাতার পাতায় বানানো জাহাজ দুলতে দুলতে ভেসে বেড়াত। আমি হাঁটু ভেজানো পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতাম, চোখে রাজ্যের অধিপতির মতো গর্ব। ওগুলো কাগজের হলেও জলের ওপর চলত, এটাই তো ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বৃষ্টি থামার পরও আমার খেলা থামত না। আকাশে তখন উড়ত আমার কাগজের বিমান। একটার নাম দিতাম “বজ্রবাহক”, আরেকটার “মেঘদূত।” দূরের ছাদের দিকে তাক করে ছুড়ে দিলে মনে হতো আমি যেন পাইলট, গোটা পাড়া আমার রানওয়ে। ছোটখাটো দূরত্বে হাঁটার দরকার পড়ত না—মনে মনে কাগজের প্লেনেই যাত্রা করতাম। গন্তব্য ঠিক করতাম নিজের ইচ্ছেমতো, কোনো মানচিত্রের প্রয়োজন হতো না।
ঘরের ভেতরেও আমার সাম্রাজ্য কম ছিল না। ভাঙা প্লাস্টিকের খেলনা, পাটকাঠির টুকরো, দেশলাইয়ের কাঠি জড়ো করে আমি প্রাসাদ বানাতাম। কখনো একতলা, কখনো তিনতলা—দেয়ালগুলো একটু কাত হয়ে থাকলেও ওগুলো ছিল আমারই দুর্গ। সেখানে আমি রাজা, প্রজা, পাহারাদার—সবাই একসঙ্গে। কেউ ভাড়া চাইত না, কেউ কর বসাত না। পুরো রাজ্য চলত আমার কল্পনার আইনে।
ব্যবসাও ছিল আমার। সিগারেটের খালি বক্স দিয়ে গাড়ি বানিয়ে সারি সারি করে সাজিয়ে রাখতাম। এক পাশে লেখা থাকত—“মোটর শো–রুম।” ক্রেতা আসত পাড়ার বন্ধুদের মধ্য থেকে। কেউ একটা গাড়ি কিনতে চাইলে আমি দর হাঁকাতাম, তারপর দর–কষাকষি। নারকেলের খোল দিয়ে বানানো দাঁড়িপাল্লায় কাঁটায় কাঁটায় ওজন করতাম কাগজের নোট। লেনদেন শেষ হলে এমন ভাব করতাম, যেন দিনের শেষে বিশাল লাভ হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতাম যখন নিজেকে বিজ্ঞানী ভাবতাম। ফেলে দেওয়া ইনজেকশনের সিরিঞ্জে জল ভরে গাছের পাতায় ছিটাতাম, কখনো মাটিতে ঢুকিয়ে দেখতাম কত দূর যায়। আমার ধারণা ছিল, আমি নতুন কিছু আবিষ্কার করছি। কোনোদিন মনে হতো গাছের ভেতর দিয়ে জল চলার পথটা আমি বের করে ফেলব, কোনোদিন মনে হতো নতুন ধরনের সেচব্যবস্থা বানাচ্ছি। বড়রা হয়তো এসব দেখে হাসত, কিন্তু আমার মনে হতো আমি পৃথিবী বদলাতে বসেছি।
এখন এসব ভাবলে বুকের ভেতরটা একটু হালকা হয়ে আবার ভারী হয়ে যায়। কোথায় গেল সেই বড়লোকী চাল? আজকের আমি কাগজের নৌকা বানাতে পারলেও আর হাঁটু ভেজানো পানিতে দাঁড়িয়ে ভাসাতে পারি না। কাগজের বিমান ছুড়লেও তার সঙ্গে উড়ে যায় না মন। প্রাসাদ বানাতে গেলে মাথায় আসে খরচের হিসেব, সময়ের ঘাটতি, কাজের তালিকা। ব্যবসা করতে গেলে আসে ঝুঁকির হিসাব, লাভ–ক্ষতির অঙ্ক। বিজ্ঞানী হতে গেলে আগে আসে পরীক্ষার অনুমতি, বাজেট, রিপোর্ট—তারপর আসে কৌতূহল।
মনে হয়, শৈশবটাকে আমি বড্ড বেহিসেবি খরচ করে ফেলেছি। তখন বুঝিনি, ওই খেলাগুলোই ছিল আসল সম্পদ। আজ বড় হয়ে আমি যেন উল্টো গরিব—স্বপ্নের দিক থেকে, বিস্ময়ের দিক থেকে। বড় হওয়ার পথে এত হিসেব কষেছি যে ভেতরের সেই শিশুটাকে কোথায় যেন ফেলে এসেছি।
একদিন অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। রাস্তার পাশে জল জমে ছোট্ট পুকুরের মতো হয়েছে। ছুটতে ছুটতে একদল বাচ্চা কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। তাদের হাসি, চিৎকার, প্রতিযোগিতা—সবকিছু আমাকে টেনে নিল অনেক বছর পেছনে। একজন বলছে, “আমারটা আগে যাবে।” আরেকজন চেঁচিয়ে উঠছে, “না, আমারটা বড়, তাই জিতবে।”
হঠাৎ মনে হলো, আমি তো এখনও কাগজ ভাঁজ করতে পারি। ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করলাম। একটু অদ্ভুত লাগছিল—রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বড় মানুষ হয়ে নৌকা বানাচ্ছি! কিন্তু হাত চলতে চলতেই মনটা হালকা হয়ে গেল। নৌকাটা জলে ছাড়লাম। সেটাও ভেসে চলল, ঠিক যেমনটা একসময় আমারগুলো চলত।
কয়েকজন বাচ্চা অবাক হয়ে তাকাল। একজন জিজ্ঞেস করল, “আঙ্কেল, আপনি কি আগে এসব খেলতেন?” আমি হেসে বললাম, “খেলতাম না—আমি তো একসময় খুব ধনী ছিলাম।” তারা বুঝল না, কিন্তু আমি বুঝলাম।
বৃষ্টি থামার পরও আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, ভেতরের সেই শিশুটাকে আমি পুরো হারাইনি—সে কেবল চুপ করে বসে ছিল, আবার ডাক পেলেই বেরিয়ে আসতে পারে। বড় হওয়া মানে হয়তো সব খেলনা ফেলে দেওয়া নয়; বড় হওয়া মানে খেলনাগুলোকে আলাদা তাকের ওপর রেখে মাঝে মাঝে নামিয়ে দেখা।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ডেস্কের ওপর একটা কাগজের বিমান বানালাম। জানালা দিয়ে ছুড়ে দিলাম না, শুধু তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, আকাশটা এখনও আছে—শুধু তাকিয়ে দেখার সময়টা কমে গেছে।
আমি বুঝলাম, যদি আমরা মাঝে মাঝে হিসেবের খাতা বন্ধ করে কৌতূহলের দরজা খুলে দিই, তাহলে বড় হওয়াটাও আর এত ভারী লাগে না। শৈশবের সেই অঢেল সম্পদ—কল্পনা, বিস্ময়, খেলাচ্ছলে শেখা—সবই এখনো আমাদের ভেতরে লুকিয়ে আছে। শুধু মনে করিয়ে দিতে হয়, আমরা একসময় কতটা ধনী ছিলাম।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now