বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পরীক্ষার ঘরে ন্যায়ের নীরব কান্না

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। এমেলিয়া কখনো ভাবেনি যে জীবনের এতগুলো পরীক্ষার ভিড়ে একটি দিন এমন দগদগে স্মৃতি হয়ে থাকবে। সে দ্বিতীয়বারের মতো এই পরীক্ষায় বসছে—বারোটা পরীক্ষা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে, তবু আজকের অভিজ্ঞতা যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গেল। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে রওনা দিয়েছিল, দীর্ঘ সাত ঘণ্টার ক্লান্তিকর যাত্রা পেরিয়ে পৌঁছায় ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শাখায়। বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে সে ভাবছিল—এইবার হয়তো ভাগ্য একটু সহায় হবে, কষ্টের ফল মিলবে। কিন্তু কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়েই তার বুকের ভেতর অজানা শঙ্কা জমে উঠল। বাইরে বড় বড় পোস্টারে সাঁটানো সিট প্ল্যান দেখে সে খানিকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল—প্রথম তলায় তার কেন্দ্র। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই শুরু হলো নতুন দুশ্চিন্তা। একতলা, দোতলা—বারবার সিঁড়ি ভেঙে ঘুরছে, অথচ কোথাও তার রুমের নাম নেই। দশ-পনেরো মিনিট কেটে যায়, ঘাম ঝরতে থাকে, বুক ধড়ফড় করে। অবশেষে এক কর্মচারীর কাছ থেকে জানতে পারে—তার রুম আসলে গ্রাউন্ড ফ্লোরের একদম শেষ প্রান্তে, ১১০ নম্বর। আবার ছুটে নামতে হয়। তখন মনে হচ্ছিল, পরীক্ষা দেওয়ার আগেই যেন শক্তির অর্ধেক খরচ হয়ে গেছে। রুমের সামনে দাঁড়িয়ে সে থমকে যায়। ভেতরে ঢুকে দেখে চেয়ার-টেবিল এলোমেলো, মেঝেতে ধুলো, জানালা দিয়ে আলো ঠিকমতো ঢুকছে না, বাতাস ভারী। মনে হলো যেন এখানে পরীক্ষা নয়, বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান চালাতে এসেছে সবাই। কয়েকজন পরীক্ষার্থী বিরক্ত মুখে চারপাশ তাকাচ্ছে, কেউ কেউ রুম গোছাতে চেয়ার টানছে। এমেলিয়া নিজের আসনে বসে গভীর শ্বাস নেয়—“চলো, যাই হোক, মনটা শক্ত করতে হবে,” নিজেকে বলে সে। ঠিক তখনই শুরু হয় আরেক অস্বস্তি। তার পেছনের বেঞ্চে বসা ছেলেটা শুরু থেকেই অকারণে নড়াচড়া করছে, পা ঠুকছে, চেয়ার ঠেসে দিচ্ছে। এমেলিয়া প্রথমে কিছু বলেনি—পরীক্ষার সময় ঝামেলায় জড়াতে চায়নি। কিন্তু প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারল, ছেলেটার চোখ বারবার তার খাতার দিকে যাচ্ছে। তার সেট কোড ২, আর পেছনের ছেলেটার ৩। অথচ পাশের আরেকজনের সেট আবার ২—এই ফাঁকে সে সুযোগ নিচ্ছে, কখনো সামনে ঝুঁকে, কখনো পাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর মিলিয়ে নিচ্ছে। চারজন শিক্ষক রুমে থাকলেও কেউ যেন খেয়ালই করছে না। এমেলিয়ার কলম থেমে যায় কয়েকবার। সে জানে, এমন অন্যায় দেখেও চুপ থাকা দুর্বলতা; কিন্তু সামনে বসে প্রতিবাদ করলে নিজের পরীক্ষাই হয়তো বিপদে পড়বে—এই ভয়টা তার বুকের ভেতর দানা বাঁধে। প্রশ্নের উত্তর লিখতে লিখতে তার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন ভারী হয়ে যাচ্ছে। ন্যায়ের সঙ্গে অন্যায়ের এই দ্বন্দ্ব তার মাথার ভেতর কোলাহল তুলছে। “এভাবে তো অযোগ্যরাই এগিয়ে যায়,” মনে মনে ফিসফিস করে সে। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টায় ঘটনাটা আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে। ছেলেটা তার ওএমআর শিটে সেট কোড পূরণই করেনি প্রথমে। সময় প্রায় শেষ—তখন সে হঠাৎ এক শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলে, “স্যার, সেট কোড লিখিনি।” অবাক হয়ে শিক্ষক তাকে আরেকটা ওএমআর দেন। এমেলিয়া চোখের কোণে সব দেখে—ছেলেটা যার সেট ছিল ৩, সে এবার নির্দ্বিধায় ২ লিখে দেয়। বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দেয় তার। এত সহজে? এত প্রকাশ্যে? অথচ কেউ কিছু বলল না। হল থেকে বেরিয়ে এসে রোদের আলোয় দাঁড়িয়ে এমেলিয়ার মনে হচ্ছিল, শরীরের ক্লান্তির চেয়েও মনটা বেশি ভারী। সাত ঘণ্টার পথ, রুম খোঁজার দৌড়ঝাঁপ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সবকিছুর ওপর এই অন্যায় দেখার যন্ত্রণা যেন তার আত্মাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। আশেপাশে অন্য পরীক্ষার্থীরা কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ নির্বিকার, কেউ আবার হাসাহাসি করছে। এমেলিয়া চুপচাপ ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয়। চোখের সামনে ভাসে সেই ছেলেটার মুখ, শিক্ষকদের উদাসীন দৃষ্টি, আর নিজের নীরবতা। ফেরার পথে বাসের জানালায় তাকিয়ে সে ভাবে—এই দেশ, এই সমাজ কি এমনই হবে সবসময়? যেখানে নিয়ম মানা মানুষ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, আর নিয়ম ভাঙা মানুষ নিশ্চিন্তে এগিয়ে যায়? তবু কোথাও এক কোণে ক্ষুদ্র একটুকরো আশাও জ্বলে ওঠে। সে মনে মনে ঠিক করে, এই অভিজ্ঞতা তাকে ভেঙে দেবে না। বরং আরও দৃঢ় করবে। সে আবার পড়বে, আবার পরীক্ষা দেবে, আবার দাঁড়াবে—কারণ তার লড়াই শুধু একটি প্রশ্নপত্রের সঙ্গে নয়, ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান তৈরির সঙ্গেও। দিনের শেষে এমেলিয়া বুঝতে পারে—এই পরীক্ষার ফল যাই হোক, আজ সে জীবনের আরেকটা বড় পাঠ শিখেছে। অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কত কঠিন, আর নীরবতা কত ভারী হতে পারে। সে জানে, হয়তো আগামী দিনগুলোতেও এমন দৃশ্য দেখবে, কিন্তু নিজের ভেতরের সততা আর স্বপ্নকে সে হারাতে দেবে না। কারণ সব কোলাহলের মাঝেও কোথাও না কোথাও সত্যের জন্য লড়াই করা কিছু মানুষ আছে—আর সে চায়, তাদের দলে থাকতে। সন্ধ্যার আলো নামার সঙ্গে সঙ্গে বাস শহরের বাইরে চলে যায়। এমেলিয়া চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। ক্লান্ত শরীরের ভেতরে নতুন এক প্রতিজ্ঞা জন্ম নেয়—এই পথ যতই কঠিন হোক, সে পিছিয়ে যাবে না। পরীক্ষার ঘরের সেই নীরব কান্না একদিন হয়তো শব্দ পাবে, আর তখন ন্যায়ের পাল্লায় ওজন বাড়বে। সে সেই দিনের অপেক্ষায় থাকে, নিজের স্বপ্নকে বুকে জড়িয়ে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now