বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
তিতাস নদের পাড়ের ছোট্ট গ্রাম শ্যামলপুর। একসময় এই গ্রামের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সবুজ ধানের ক্ষেত, পাটের দোল, আর সকালবেলা শিশির ভেজা বাতাসে কৃষকের হাসিমুখ। গ্রামের প্রায় সবাই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জমিই তাদের জীবন, ফসলই তাদের স্বপ্ন। কিন্তু সময় বদলেছে, কৃষিও বদলেছে। সেই বদলের স্রোতে শ্যামলপুরও পিছিয়ে থাকেনি।
গ্রামের প্রবীণ কৃষক মনির আলী প্রায়ই বলেন, তাঁর ছোটবেলায় কীটনাশক বলে তেমন কিছু ছিল না। পোকা দমনের জন্য ছাই, গোবরের পানি, বা নিমপাতা ব্যবহার করা হতো। ফলন কম হতো ঠিকই, কিন্তু জমির গন্ধ ছিল আলাদা, ফসলের স্বাদ ছিল অন্যরকম। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ল, জমি কমল, বাজারে চাপ বাড়ল। তখন কৃষি কর্মকর্তারা এলেন নতুন নতুন রাসায়নিক নিয়ে। বলা হলো, কীটনাশক ব্যবহার করলে ফসল বাঁচবে, উৎপাদন বাড়বে, কৃষক লাভবান হবে। মনির আলীর ছেলে রফিক তখন তরুণ। সে বাবার কথায় কান না দিয়ে নতুন পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরল।
প্রথম কয়েক বছর সত্যিই ভালো গেল। ধানে পোকা কম লাগল, সবজির পাতা ঝকঝকে থাকল। আগের চেয়ে ফলন দ্বিগুণ হলো। বাজারে বিক্রি করে রফিক নতুন টিনের ঘর তুলল, ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করাল। গ্রামে তখন রফিককে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হতো। সবাই বলত, আধুনিক কৃষি মানেই কীটনাশক। কম খরচে বেশি ফলন, এটাই তো লাভ।
কিন্তু ধীরে ধীরে অদৃশ্য এক অন্ধকার নামতে শুরু করল। প্রথমে কেউ খেয়াল করেনি। রফিক যখন স্প্রে করত, তার মাঝে মাঝেই মাথা ঘুরত, বমি ভাব হতো। সে ভেবেছিল গরমের জন্য। পরে ত্বকে চুলকানি, চোখ জ্বালা শুরু হলো। পাশের জমির কৃষক হাশেমের অবস্থাও একই। তারা কেউই মাস্ক বা সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার করত না। গ্রামে এসবের গুরুত্ব তখনো বোঝা হয়নি।
একদিন রফিকের স্ত্রী আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়ল। ডাক্তার বললেন, খাবারের মাধ্যমে শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক ঢুকছে। শাকসবজি, মাছ—সবকিছুর মধ্যেই এর প্রভাব থাকতে পারে। রফিক স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তো নিজের জমির ফসলই খায়। যে ফসল তাকে বাঁচাবে ভেবেছিল, সেটাই কি তাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে?
গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটাও বদলে গেছে। আগে সেখানে ছোট মাছ, ব্যাঙ, শামুক ভরে থাকত। শিশুরা খালে নেমে খেলত। এখন পানি কালচে, মাছ কমে গেছে। মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে মরা মাছ। কৃষি অফিসের এক কর্মচারী এসে বললেন, কীটনাশকের রাসায়নিক মাটির ভেতর দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানিতে, আবার বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে খালে গিয়ে মিশছে। এতে জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু তখন আর কে শোনে কার কথা। সবাই তখন ফলন বাঁচাতে ব্যস্ত।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরেক সমস্যা দেখা দিল। আগের যে কীটনাশকে পোকা মরত, এখন তা আর কাজ করছে না। পোকা যেন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দোকানদার বলল, নতুন আর শক্তিশালী ওষুধ নিতে হবে। দাম বেশি, ঝুঁকিও বেশি। কিন্তু বিকল্প কী? ফসল নষ্ট হলে তো সর্বনাশ। রফিক বাধ্য হয়ে আরও তীব্র রাসায়নিক ব্যবহার শুরু করল।
এই শক্তিশালী স্প্রে শুধু ক্ষতিকর পোকাকেই নয়, জমির উপকারী পোকা, প্রজাপতি, মৌমাছিকেও মেরে ফেলল। ফুলে মৌমাছি না বসায় ফলনেও নতুন সমস্যা দেখা দিল। পাখির সংখ্যাও কমে গেল। শ্যামলপুরের আকাশ যেন নিঃশব্দ হয়ে উঠল। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতি কেউ তখন হিসাব করেনি, কিন্তু প্রকৃতি তার দাম ঠিকই আদায় করছিল।
একদিন গ্রামের স্কুলে এক তরুণ শিক্ষক পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে বিষাক্ত রাসায়নিক ধাপে ধাপে জমা হয়। খালে কীটনাশক গেলে ছোট প্রাণী তা গ্রহণ করে, বড় মাছ ছোট মাছ খায়, মানুষ সেই মাছ খায়। এভাবেই জৈব বিবর্ধনের মাধ্যমে বিষ মানবদেহে ঢোকে। কথাগুলো শুনে রফিকের বুক কেঁপে উঠল। সে যেন নিজের জীবনটাই চোখের সামনে দেখতে পেল।
মনির আলী তখন আবার কথা বললেন। বললেন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কখনো জেতা যায় না। বরং তাকে বুঝে চলতে হয়। তিনি প্রস্তাব দিলেন, আবার কিছুটা জৈব পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার। শুরুটা কঠিন হবে, ফলন কমতে পারে, কিন্তু জমি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।
ধীরে ধীরে কয়েকজন কৃষক সাহস করে নতুন পথ নিল। তারা নিম তেল, ফেরোমন ফাঁদ, হাত দিয়ে পোকা দমন, আর ফসলের ঘূর্ণন শুরু করল। কৃষি অফিসের সহায়তায় Integrated Pest Management পদ্ধতি শেখা হলো। সব পোকা শত্রু নয়, কিছু পোকা ফসলের বন্ধু—এই ধারণা প্রথমবারের মতো গ্রামে আলোচনায় এল। রাসায়নিক একেবারে বন্ধ হলো না, কিন্তু ব্যবহার সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হলো।
প্রথম বছর ফলন খুব বেশি হয়নি। কিন্তু জমির রং বদলাতে শুরু করল, খালে আবার ছোট মাছ দেখা গেল। রফিকের শরীরও ধীরে ধীরে ভালো হলো। সে বুঝতে পারল, লাভ শুধু টাকায় নয়, সুস্থ জীবনেও। আয়েশা বলল, এখন খাবারের স্বাদ আলাদা লাগে, মনে শান্তি আছে।
শ্যামলপুর পুরোপুরি বদলে যায়নি, সমস্যাও শেষ হয়নি। কিন্তু গ্রামের মানুষ অন্তত বুঝতে শিখেছে, কীটনাশকের সুবিধা যেমন আছে, তেমনি তার ভয়ংকর কুফলও আছে। অন্ধভাবে ব্যবহার করলে তা কৃষক, পরিবেশ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি। সচেতন ব্যবহার, বিকল্প পদ্ধতি আর প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হতে পারে টেকসই সমাধান।
নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে রফিক আজ যখন সবুজ ক্ষেতের দিকে তাকায়, তার মনে হয়—এই জমি শুধু তার নয়, তার সন্তানেরও, এই দেশেরও। তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও তারই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now