বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জলরথের গানের দিন

"গ্রাম্য লোককথা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ বর্ষার গভীরতা যখন ধীরে ধীরে সরে গিয়ে শরতের রোদ্দুর নদীর বুক জুড়ে ঝিলমিল উঠতে শুরু করে, তখনই জাগ্রত হয় বাংলার নদীঘাটে নৌকা বাইচের উন্মাদনা। কুঁড়েঘর, পাকাবাড়ি, মাটির উঁইচালা—সবখানেই যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন। গ্রামের মানুষদের জন্য এটি শুধু একটি খেলা নয়; এটি তাদের হৃদয়ের ধ্বনি, আদি সংস্কৃতির এক সজীব পুনর্জন্ম। এই সময় নদীর পাড়ে দাঁড়ালে শোনা যায় বৈঠার তালে মিশে থাকা গানের সুর—যেন বাতাসকেও ছুঁয়ে যায় এক গভীর ঐতিহ্যের টান। সেই ব্যস্ততার মাঝেই বসন্তপুর গ্রামের কিশোর রিহান প্রথমবার উপলব্ধি করল, নৌকা বাইচ কেবল মানুষের শক্তির লড়াই নয়, এটি আত্মারও উৎসব। রিহান নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সারাদিন দেখত, কীভাবে মানুষজন লম্বা গয়না নৌকার কাঠ ঠিক করছে, কেউ বৈঠা ঘষে মসৃণ করছে, কেউবা গান রচনার তালিম দিচ্ছে। গ্রামের সবচেয়ে পুরোনো বাইচ দল “জলরথ” এ বছর নতুন করে দল গঠন করছে। সেই দলে এবার রিহানকেও ডেকে নেওয়া হয়েছে। সে ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কতবার যে বাইচ দেখেছে তার হিসেব নেই, কিন্তু মাঝি হয়ে নৌকায় নামার সাহস কখনো পায়নি। তবু এ বছর গ্রামের সবাই তার মধ্যে যে কোমল আগ্রহ দেখেছে, তা তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে একসময় এই বাইচের ব্যাপক খ্যাতি ছিল। জেলেরা বলত, এই নদীই নাকি একসময় বারো ভুঁইয়াদের যুদ্ধের নৌযাত্রার পথ ছিল। রিহানের দাদাও একসময় সারঙ্গী নৌকার মাঝি ছিলেন; তাঁর বজ্রকণ্ঠের গান নাকি তিন কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যেত। সেই স্মৃতি রিহানের কল্পনাজগৎকে দোলায়, যেন তার রক্তেই বয়ে চলেছে নৌকা বাইচের সুর। দলনায়ক জলিল মাস্টার বলতেন, “বাইচে জিততে হলে হাতের জোর যত লাগবে, তার চেয়ে বেশি লাগবে মন আর তাল। তালের বাইরে চলে গেলে নদীও রুষ্ট হয়।” রিহান এই কথাগুলো মনে ধরে রাখতে রাখতে আরও বেশি মন দিয়ে অনুশীলনে নামল। কয়েক সপ্তাহ ধরে নদীর পাড়ে সাজসজ্জার কাজ চলে। গয়না নৌকার গায়ে কমলা-লাল রঙে আঁকা হয় দেহলতার নকশা। প্রান্তে বসানো হয় উঁচু কাঠের মাচা, যেখানে দাঁড়িয়ে গায়েন দলকে নেতৃত্ব দেবে। গায়েন হিসেবে এবার নির্বাচিত হয়েছে নাদিম, যিনি তার কণ্ঠে বৈঠার শব্দের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারতেন অদৃশ্য আগুনের তেজ। তার গানের একটি লাইন রিহান বারবার গুনগুন করত—“তরী চল ধীরে, রই না আর তীরে, মন গেছে ছুটে নদীর তলানিতে…” গানটির প্রতিটি শব্দ যেন মাঝিদের ভেতরে অদ্ভুত শক্তি জাগিয়ে দেয়। বাইচের দিন যত এগিয়ে আসে, নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড় জমতে থাকে। দোকানিরা মেলা বসায়, বাচ্চারা ভেলকি দেখায়, নারীরা শাড়ির রঙে নদীর তীর সাজিয়ে তোলে। দূরগ্রাম থেকে আসা লোকজনের হাসির শব্দে পরিবেশ একেবারে উৎসবে পরিণত হয়। রিহান বারবার ভাবত, কেন এত মানুষ এই খেলা দেখতে আসে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে বুঝতে পারে, এই নদীই তো তাদের জীবনের গল্প—জন্ম, সংগ্রাম, বিজয়, পরাজয়—সবকিছুই নদীর জলের মতো বহমান। আর সেই গল্পেরই দৃশ্যমান রূপ নৌকা বাইচ। অবশেষে অপেক্ষার দিন এল। সকালে কুয়াশা সরতেই নদীর বুকে তৈরি হয়ে গেল রঙিন নৌকার সারি। কেউ কোশা, কেউ সারঙ্গী, কেউ গয়না—যেন কাঠের নৌকা নয়, সবকটি প্রাণ পেয়ে উঠেছে মানুষের মাতমে। “জলরথ” নৌকাটি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে পাড়ের ঠিক মাঝামাঝি। রিহান বৈঠা হাতে নিয়ে গভীর নিশ্বাস ফেলল। তার গায়ে হঠাৎ দাদার গল্পগুলো ভেসে উঠল—যুদ্ধ, মহড়া, গান, সাহস। যেন সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত শক্তিতে রূপ নিল, যা তাকে প্রথমবার সত্যিকারের মাঝি করে তুলল। ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই জলরথ নদী ছিঁড়ে ছুটে চলল। নাদিমের কণ্ঠে জেগে উঠল উচ্চস্বর—“হা-ইয়া… হা-ইয়া…” মাঝিরা যেন একই দেহ, একই সুর, একই শ্বাস। রিহান প্রথমবার অনুভব করল যে দলগত শক্তি কী অসাধারণ কিছু; একেকটি বৈঠা যেন সমুদ্রের ঢেউ ভেদ করছে। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজার মানুষের হাততালি, চিৎকার, উল্লাস মিলেমিশে যেন বাতাসটাকেই গরম করে তুলল। রিহানের কানে শুধু বৈঠার শব্দ, গানের তাল আর নিজের দম নেয়ার শব্দই আসছিল। মাঝপথে নদীর স্রোত হঠাৎই ঘুরে এল। প্রতিপক্ষ “সোনার তরী” দল এগিয়ে যেতে লাগল। রিহানের চোখে পড়ল জলিল মাস্টারের সংকেত—শরীর নিচু করে বৈঠার ঘাত বাড়াতে হবে। সে মুহূর্তে রিহান নিজের ভেতরের সব শক্তি একত্র করল। গায়েনের গলা যেন আরও উচ্চ, আরও আগুনে—“ধরো ধরে রাখো, নদী আজ আমাদের!” মাঝিদের শরীরে ফুঁসে উঠল এক বিদ্যুৎ। জলরথ আবার স্রোতের বিরুদ্ধে গতি ফিরে পেল। শেষ ১৫০ মিটার। মানুষের চিৎকারে নদী যেন ফুঁপিয়ে উঠেছে। রিহান অনুভব করল বৈঠার প্রতিটি টানের ঝাঁকুনিতে নিজের কাঁধ কেঁপে উঠছে, হাত অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু দম হারানো মানেই পরাজয়, এটা সে জানে। বৈঠা টানার একেকটি মুহূর্তে সে যেন শোনে দাদার কণ্ঠ—“জয় নদীর, জয় মাঝির।” নদীও যেন আজ তাদের পাশে। প্রবাহ সরে এসে জলরথকে সামান্য এগিয়ে দিল। সবাই মিলে শেষবার জোরে টান দিল, এবং এক বিস্ফোরিত উল্লাসে নৌকা সবার আগে ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে ফেলল। জয়ের সুর ভেসে উঠতেই নদীর দু’পাড়ে একসঙ্গে চিৎকার। রিহান মাথা তুলে দেখল, তার চোখ ভিজে গেছে অজান্তেই। সে বুঝল, নৌকা বাইচের আসল জয় শুধু প্রথম হওয়া নয়; জয় হলো নিজের ভেতরের ভয়কে হারানো, জয় হলো ঐতিহ্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। মানুষের ভালোবাসা আর নদীর আশীর্বাদই যেন তাকে নতুন করে জন্ম দিল। বিকালে মেলার মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান হলো। জলরথের মাঝিরা সম্মাননা পেল, গায়েন নাদিম পেল বিশেষ স্বীকৃতি। রিহানের কাঁধে গ্রামপ্রধান হাত রেখে শুধু বললেন, “আজ তুই আমাদের দাদাদের গৌরব ফিরিয়ে আনলি।” সেই একটি বাক্য রিহানের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে রইল। রাতের আকাশে তখন শারদীয় চাঁদ ওঠে। নদীর ওপর তার আলো পড়ে তৈরি করে রহস্যময় জ্যোৎস্নার পথ। রিহান নৌকার পাশে বসে সেই দৃশ্য দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, আজ সে শুধু একটি প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়নি; সে জয় করেছে ইতিহাসের টান, লোকসংস্কৃতির গর্ব, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আর নিজের স্বপ্নকে। নদীর জলে ভেসে থাকা চাঁদের আলোয় সে অনুধাবন করল—নৌকা বাইচ আসলে জীবনযাত্রার প্রতীক। যেখানে ছন্দ, ধৈর্য, বিশ্বাস এবং দলগত চেতনা ছাড়া কিছুই সফল হয় না। মানুষের হাতে বৈঠা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত জয় এনে দেয় নদীর প্রতি শ্রদ্ধা আর একে অপরের প্রতি আস্থা। সেই আস্থার ভরসায়ই বাংলার নদীগুলো প্রতি বছর আবার জেগে ওঠে, আর মানুষের প্রাণে সঞ্চারিত করে হাজার বছরের ঐতিহ্যের রক্তস্রোত। সেদিন রাতে রিহান নিজের মনে বলল, “এই নদী, এই নৌকা, এই গান—এগুলো শুধু ঐতিহ্য নয়, আমাদের অস্তিত্ব।” নদীর বুক থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের শব্দ যেন তাকে উত্তর দিল—“অস্তিত্ব চিরন্তন, যতদিন বৈঠার তাল বেঁচে থাকবে।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now