বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-৩১
সন্ধ্যার পর বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে বসে ওমর আলি প্রধান, তফিজুল মেম্বার, মইন উদ্দিন মেম্বার, সহ আরও অনেকে বসে রেডিওতে বিবিসির সংবাদ শুনছেন। কান পেতে খুব মনোযোগ সহকারে সবাই রেডিওর দিকে চেয়ে আছেন ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অধিবাসীদের অবরুদ্ধ জীবন যাপনের কথা সেখানে বলছে। অবরুদ্ধ জীবন যাপন বলতে-গোটা বিশ্ববাসীকে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ-কষ্টকে বিশ্বাস করানো খুব সহজ কাজ ছিল না। এখানে নিত্যদিন কি ভয়ানক ঘটনা ঘটে চলেছে-সেটা জানাও কার বাকি ছিলনা। কিন্তু এখানে এসে কারও সহানুভুতি জানানো ছিলো কঠিন কাজ। ইতোমধ্যে সাংবাদিক মুনাজাতকে বি.এস.এফ- ধরার জন্য ধাওয়া করতে করতে ডাহাগ্রামের ভেতরে এসে প্রবেশ করে। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই যে আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করেছেন এটার জন্য লক্ষ-কোটি শুকরিয়া। ডাহাগ্রামের ভিতরে এসে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে যাবে, আর এখানকার লোকজন বুড়ো আঙ্গুল চুষবে এমটিতো কখনো হতো না। সেখানে একটা বিরাট দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছিলো, এমনকি দু’চার জনের প্রাণহানিরও আশঙ্কা ছিলো।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের জীবনের কোন দাম নেই কার কাছে, বিশেষ করে ভারতের ধাপড়া-মেকলিগঞ্জের মানুষের কাছে। এতদিনের বন্ধুত্ব, এতদিনের হৃদয় ঘটিত প্রেম, প্রিতি, ভালোবাসা, নিজের স্বার্থের কাছে তারা এক মুহূর্তের জন্য বিকিয়ে দেয়। তাদের ধারণা ছিল যে, ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষগুলোকে কোন রকমে হটিয়ে দিতে পারলে তারা নিজের মতো করে ভারতের অংশ হিসেবে একে ব্যবহার করতে পারবে। তাদের কাছে এখানকার মানুষ ছিলো তুরুপের তাস, যখন ইচ্ছে তারা কাজে লাগাবে। এরই লক্ষ্যে ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ ও ‘বজরং’ দল মিলে তাদের কাজ ছিলো ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষদের হুমকি-ধামকি দেওয়া, তাতের উপর অত্যাচার করা,
বাংলাদশের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বেশ জোরালো ভাবে আলাপ আলোচনা চলছে। বাংলাদেশী সৈন্য ও নির্বাচনের বিভিন্ন উপকরণ সমুহ তিনবিঘার উপর দিয়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় আসবে এরূপ প্রচারে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’। এ কমিটির মেখলীগঞ্জ এলাকার নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি মি. কে, সি সিং এবং ধাপড়া হাট এলাকার নেতৃত্বে মতিলাল লস্কর মাস্টার আরোও সক্রিয় হয়ে এবার নড়ে-চড়ে বসেন। তারা বলেন- প্রয়োজনে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে তবুও তিনবিঘার উপর দিয়ে বাংলাদেশের একটা পিপড়াকেও পার হতে দেয়া হবে না। ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি ভারতের কোন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি বা প্রশাসনের কাছে স্থান না পেয়ে, ধাক্কা খায়-ঐ ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার নিরিহ বাসিন্দাদের উপর। যতো রাগ তাদের উপর। রাত হলেই চারিদিক থেকে নানা ধরণের হুমকি-ধামকি আসে। ‘বজরং বাহিনী’ এসে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। সব ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা থেকে সবাইকে তাড়িয়ে দেবে। নিরস্ত্র, অসহায়, সহজ সরল গ্রামবাসী এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ, একরকম খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে। তাদের পক্ষে এ সকল কথা, একেবারে উড়িয়ে দেয়ার কথা বলে মনে হয় না। কারণ ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়’।
পরেরদিন অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে থাকে, যতোই বেলা বাড়তে থাকে চারিকে কেমন সুনসান নীরবতা, একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে যেন চৈত্রের খরা বাতাসের দাপাদাপি। ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে শিমুল গাছের হলুদ পাতাগুলো। রাস্তা প্রায় জনশুন্য। সবাই একটা বিভীষিকার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের অনেক আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ধাপড়া-মেখলিগঞ্জ এলাকায় থাকে মুলত তারাই এ বিপদের দিনে খুব গোপনীয়তার সাথে ওখানকার ভালো-মন্দ সংবাদ পৌছে দিতো। সর্বশেষ সংবাদ আসলো আজ বিকেলে-‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ এর নেতৃতে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নির্বাচনের বিরুদ্ধে এক বিশাল মিছিল নিয়ে তারা আসবে। মিছিলটি ধাপড়ার হাট থেকে শুরু হয়ে ডাহাগ্রামের মূল রাস্তা ধরে আসবে। তাদের উদ্দেশ্য হলো ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীকে মিছিলে সামিল করে তাদের নিজের মুখ দিয়েই বলা যে, “আমরা তিনবিঘার রাস্তা চাই না, আমরা ভারতের সাথে থাকতে চাই”। আর যদি তারা মিছিলে সামিল হতে না চায় তাহলে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর আর রক্ষে নেই, হয়তো আজকেই চিরকালের জন্য এ জীবন্ত নাটকের যবনিকা পড়ে যাবে। সিদ্ধান্ত হলো খুব সাবধানে প্রত্যেক বাড়ির মহিলা ও শিশুরা সবাই আশ্রয় নেবে বঙ্গেরবাড়ির স্কুলঘরে। আর পুরুষেরা যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকবে। তবে তারা যদি শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে চলে যায়, তাহলে আমরা তাদেরকে বাধা দেব না। আর অনর্থক ভাবে যদি তারা আমাদের প্রতি চড়াও হয়, আমাদের জান-মালের ক্ষতি করে তাহলে আমরাও তার উচিত জবাব দেব।
বাড়ির মহিলারা অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে, প্রাণটাকে কোন রকমে গলায় আটকে রেখে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কোন শব্দ না করে অত্যন্ত সর্ন্তপণে গোছ-গাছ করে পোটলা বেঁধে নিচ্ছে। কোন বাড়িতে বস্তাবন্দি করার সময় হাত ফস্কে কোন থালা-বাসন পড়ে ঝনঝন করে উঠলে, কাজ ছেড়ে সবাই বাইরে এসে দেখে যে, কেউ বুঝি এসে হামলা করল। কারও ঘরে কোন ছোট্ট শিশু অকারণে কেঁদে উঠলে তার মুখ চেপে ধরে কান্না থামানো হচ্ছে। সবার ধারণা লুটেরা এসে সব লুট করে, বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। কাজেই যা এতো দিনের সাজানো-গোছানো সংসার জিনিস পত্র তো আর কম নয়, যা কিছু সঙ্গে নেয়া যায় সেটাই লাভ। বেলা একটু পশ্চিমদিকে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই বেরিয়ে পড়ে বঙ্গেরবাড়ি স্কুলে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশে। কার মাথায়, কার হাতে বস্তা, কার ঘাড়ে, কার পিঠে বস্তা। ছোট ছোট বাচ্চা ব্যাতীত যাদের ছোট-খাট পুটলি বহন করার শক্তি আছে তারাও বাদ যায় নি, তাদেরও মাথায় একটা না একটা কিছু আছে। সবাই বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, বাড়ি থেকে বের হয়ে অনেকে আবার চোখের পানি মুছে বাড়ির ভেতরটা ভালো করে দেখে নেয়, যেন কোন কিছু ছাড়া না পড়ে। যদিও বারবার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা তাদের আছে। তবুও যেন মনকে সায় দিতে পারে না। নীরব কান্নায় দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় বারি ঝরে। এ যেন নিয়োতির অলঙ্ঘনীয় লেখা, পাপের প্রায়শ্চিত্য। কিন্তু কোন পাপের প্রায়শ্চিত্য করছে তারা নিজেও জানে না। অজানা আতঙ্কে সবার বুক দুরুদুরু কাঁপছে, চোখ ঝলসে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেক্ষণ আগে, জীবন্ত শবেরা বেরিয়ে আসছে রাস্তায়, শতশত নীরব মানুষ, রাস্তা পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বোচকা-বুচকির মতোই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কোলে-কাঁধে নিয়ে অন্ধকারে সবাই ছুটছে। ছোট বাচ্চারা আর কতোটা পথই বা হাটতে পারে? হাটতে হাটতে যখন পা ব্যথা করে তখন দুষ্টুমি করে মায়ের হাত ফস্কে ছুটে গিয়ে মধ্য রাস্তায় বসে পড়ে। মা রেগে গিয়ে সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আবার থেমে যায়, এতটুকু পা আর কতো হাটতে পারে, তাই কাছে যেয়ে আদর করে বলে-‘বাবা এইত আর অল্প একটু, আমরা চলে এসেছি, ওঠ বাবা আর একটু কষ্ট কর। মা অনেক বলে-কয়ে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। সে পিছে পিছে হাটে আর মাথা নিচু করে পড়ে যাবার ভান করে।
পোষা কুকুরগুলো একটু দৌড় দিয়ে সামনে যায়, কিন্তু মুনিব তো আর তার সাথে দৌড়াতে পারে না তাই সে আবার ফিরে আসে। ছোট কোন গাছ কিংবা ঝোপ-ঝার দেখলে দৌড়ে গিয়ে এক পা তুলে প্রস্তাব করে দিয়ে আবার মুনিবের পিছে পিছে দৌড়াতে শুরু করে। কুকুরের নাসিকারন্ধ্র ভীষণ স্পর্শকাতর হয়, তাই দিক নিদের্শনার জন্য তারা নতুন রাস্তায় ঘণ-ঘণ প্রস্তাব করে আর সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে তারা ফিরে আসতে পারে।
বঙ্গেরবাড়ির আশে-পাশে যাদের যাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি আছে তারা সেখানে গিয়ে ওঠে। কিন্তু সবারতো আর আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি নেই, তারা সেই ছোট্ট একটি স্কুল ঘরে সবাই এক সাথে গাদাগাদি করে নিজ নিজ বস্তাগুলোর উপরে মাথা রেখে ঘুমায়। এতোবড় গ্রামটা কি করে যে এতো তাড়াতাড়ি জনশূন্য হয়ে গেলো সেটা ভাবতেও অবাক লাগে। মানুষ প্রাণের ভয়ে যে সবি করতে পারে এটাই তার প্রমান। এখন রাত ঠিক ক’তটা গভীর তা অনুমান করার কোন উপায় নেই, গোটা আকাশ মেঘে ঢাকা সন্ধ্যা তারা দর্শনের কোন সম্ভাবনা নেই। আকাশে চাঁদ তারার কোন অস্তিত্ব নেই। এতোটুকু বাতাসও চলাচল করছে না। একটুকরো মেঘেও নড়ছে না। চারিদিকে চোখ ঝাঁঝাঁলো কি বিভৎস অন্ধকার, মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর হয়ে আছে।
হুক্কায় তামাক সাজিয়ে তাতে আগুন দিয়ে গোড়স-গোড়স শব্দে টানতে থাকে আবদুল্লাহ, সেই পোড়া আগুনের ক্ষীণ আলোয় দেখা যায়, ত্রিভুজের মতো ভাঁজ হয়ে শুয়ে আছে তার ছোট্ট মেয়েটি। রাজকন্যার মতো চেহারা, টকটকে লাল ফর্সা রঙ, টিকোলো নাক, লাল গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, হাটু ভাজ করে তলপেটের কাছে গুটিয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তার পাশে বড় বোন একটা বস্তায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তার মেঘবরণ কালো চুল, যেন আঁধারের সাথে মিশে একাকার হয়ে আছে। থমথমে রাত, চারিদিকে নীরবতা, কোথাও কোন শব্দ নেই, কার মুখে কোন কথা নেই, কার চোখে ঘুম নেই। সবাই কান খাড়া করে আছে যে, এই বুঝি শত্রæরা এসে হামলা করে, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়, পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাদের নিজ হাতে গড়া এতদিনের সাজানো সংসার। কারও হাছি-কাশি আসলেও সেটা নীরবে সহ্য করার চেষ্টা করছে। নেহাৎ সহ্যের বাইরে চলে গেলে তখন দু’হাতে মুখ ঢেকে যতোটুকু শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। যে ভাবে হোক কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই রাতটা কেটে গেল সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো। চান্দু পালোয়ান এবার প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য গ্রামের সব আগ্রহী যুবকদের ডাকদিয়ে নিজেকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কি কৌষল অবলম্বন করতে হবে সেটা বুঝিয়ে দেন।
সূর্যটা একটু মাথার উপরে উঠতে শুরু করেছে রোদের প্রচণ্ড তাপ যেন মাথার মগজ গলিয়ে পড়বে এমন অবস্থা। ক্ষেতে-খামারে মানুষ নেই, গ্রামের রাস্তায় মানুষ নেই। বাড়ি গুলো ফাঁকা ঘরদোর খাঁ-খাঁ করছে। ভেড়ার পালের মতো মানুষ দলবদ্ধভাবে উদ্বাস্তু হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সকলের মনে শুধুই শঙ্কা আর ভয়, রাত হলেই যেন কি না কি দুর্ঘটনা ঘটে। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর আরও বেশী বিপদ, পেট বাঁচাবে না জীবন বাঁচাবে? যারা দিন মজুর, মানুষের বাড়িতে কাজ-র্কম করে খায়, কিংবা নদীতে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবন যাপন করে, তাদের তো বেহাল দশা। না যেতে পারছে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে, না যেতে পারছে নদীতে মাছ ধরতে। তাদের বোউ বাচ্চা খাবে কি? বাঁচবে কিভাবে? এখানে সরকারের কোন খোঁজ খবর নেই, সরকারি সাহায্য সহযোগিতা নেই, এতগুলো মানুষ কতোদিন এভাবে না খেয়ে পড়ে থাকবে? ছোট বাচ্ছা যাদের তারা যতটুটু পেরেছে মুড়ি, চিড়া, চালভাজা ইত্যাদি সাথে নেয়ে এসেছে কিন্তু সেগুলোও তো শেষ। এখন কি হবে? বড়রা না হয় না খেয়ে দু’এক দিন কেটে দেবে কিন্তু বাচ্চাদের কি হবে?
পরের দিন বিকেলে সবাই একত্রিত হয়ে ঘর-বাড়ি ছেড়ে আসা গরিব, অসহায়, অনাহারি মানুষগুলোর খাবারের ব্যবস্থা কিভাবে করা যায় সে নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এমন সময় অনেক দুরে একটি কোলাহল শোনা যায়, যদিও বোঝা যাচ্ছে না আসলে এটি কিশের আওয়াজ। দু’জন লোক সাঁকোয়া নদীর পারে গিয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে কান খাড়া করে সেই আওয়াজটা শোনার চেষ্টা করছে, আসলে সেটা কোথা থেকে আসছে। সত্যি সত্যি একটা মিছিলের শব্দ বড় রাস্তার দিকে আসছে তবে এখনও অনেক দুরে। মাস্টার সবাইকে ডেকে বলে তোমরা আপন আপন দলে বিভক্ত হয়ে পৃথক ভাবে কয়েকটা বাড়িতে আশ্রয় নেও। তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে গেলে যাক, তাতে তোমরা কেউ বাধা দেবে না। আর যদি তারা আক্রমনাত্বক কোন কিছু করে তখন আমরা তার জবাব দেব।
চান্দু পালোয়ান উপস্থিত ট্রেনিং প্রাপ্ত যুবকদের উদ্দেশে বলে- শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকা অবস্থায় আমরা ওদের কাছে হার মানব না, আমরা মাথানত করব না। প্রয়োজনে হাসি মুখে জীবন দেব, তবুও আমাদের মা-বোনদের, আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জীবন বিপন্ন হতে দেব না। ওরা আমাদের মারবে? এতোটা স্হস তাদের নেই, কারণ ভারতীয় প্রশাসন তাদের পক্ষে নেই। এই মুহুর্তে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সেটা ভারত সরকারের বিপক্ষে যাবে।
কাজেই ভারতীয় প্রশাসন সেটা চাবে না। তোমরা মনে রাখবে, ওদের জীবনের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সময়সীমা এখন থেকে নির্ধারণ করব আমরা। আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে তোমরা ভেব না, নিশ্চিন্তে থাকতে পার ওরা আমাদের কাছে ভেড়ার সাহস পাবে না। যারা আমাদের গোচরে এসে আক্রমণ করার চেষ্টা করবে তারা কিছুতেই রেহাই পাবে না। ওরা ভেবেছে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষেরা অসহায়, দুর্বল, হাত-পা বাঁধা চতুষ্পদ জন্তুর মতো, আমরা যখন ইচ্ছা তাদের পাখির মতো শিকার করতে পারব। তাদের গুটিকয়েককে হত্যা করলে, গ্রামের কয়েকটা বাড়ি জ্বালিয়ে দিলে তারা ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাবে। পোড়া মাটির গন্ধ শুঁকে বেঁচে আছি আমরা, আমাদের জীবন নেয়া অতো সহজ নয়।
মিছিলে অনেক পরিচিত মুখও ছিলো যারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় বসবাস করে এমন হিন্দু ধর্মালম্বি। যাদের সাহসে ‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি’ এর সদস্যরা ডাহাগ্রামে এসে মিছিল করার সাহস পায়। যা হোক, তারা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে। এতে করে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসী মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় কিছু দুষ্কৃতিকারী লম্পট যুবকের প্ররোচনায় তাদের কিছু সংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল যুবক রাস্তার পাশের বাড়িতে ঢুকে জোয়ান ছেলেদেরকে টেনে আনে তাদের দলে। যারা আসতে অসম্মতি জানায় তাদেরকে মার-ধোর করে। এভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার টহলরত যুবকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের উপর। শুরু হয় ধাওয়া-পালটা ধাওয়া। গোটাগ্রাম হৈহৈ করে ওঠে। টহলরত যুবকেরা একত্রিত হয়ে চারিদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে একসাথে আক্রমণ করে, এমতবস্থায় কুল-কিণারা না পেয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে, তাদের অনেকে মার খেয়ে আহত হয়ে পালাতে শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা পালানোর কৌষল হিসেবে, ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর মনকে অন্যদিকে ঘুরে দেওয়ার জন্য রাস্তার ধারের কয়েকটা বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সবাই যখন আগুন নেভার কাজে বেতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা নিরাপদে পালিয়ে যায়। এতে বেশ কয়েকটি ঘর-বাড়ি পুড়ে যায়। বাড়িগুলোতে কোন মহিলা ও শিশু না থাকায় তেমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত ললিত কুমার পোদ্দার নামে একজন হিন্দু মেম্বারও এ হামলাকারিদের মদদ দেন বলে জানা যায়। তার ইন্ধনে উচ্ছৃঙ্খল যুবকেরা সেদিন বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারে আগুনের লেলিহান শিখা লক-লক করে উপরে ওঠে, বাতাসের তীব্রতায় আরও শক্তিশালী হয়ে বহুগুণ ছড়িয়ে পড়ে। হু-হু শব্দ করে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে পুরোপরি মিলিয়ে যাওয়ার আগে যেন বাতাসের সাথে খেলা করে। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে বাঁশের খুঁটিগুলো বন্দুকের গুলির মতো প্রচণ্ড শব্দে ফেটে যাচ্ছে। দুর থেকে মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধের গোলা গুলি চলছে। বাঁশের খুঁটির শক্ত গিটগুলো ফেটে যাওয়ার শব্দ মায়ের বুকে যেন সত্যি সত্যি বারুদের গোলার মতো পিঞ্জর ভেদ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই বারুদের গুলি লেগে এই বুঝি তার বুকের ধন জবাই হওয়া কবুতরের মতো মাটিতে লুটে পড়ে ছটফট করছে, বাঁচার করুণ আকুতি নিয়ে মাকে ডাকছে।
নিজের বসত-বাটি, তিলে-তিলে গড়া সারাজীবনের সঞ্চিত সম্পদ, চোখের সামনে দাউ-দাউ করে জ্বলা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, কেউ আগুন নেভাতে আসছে না। আগুনের একটা বিশাল বৃত্ত আকাশের নিচু ঝালর পোড়াতে পোড়াতে সবকিছুকে ছোট করে আনছে। দিগন্তের পরিধি ভয়াবহ আগুনের আলোয় টকটকে লাল হয়ে আছে। রক্ত আর পোড়া মাংসের গন্ধে চারিদিকের বাতাস কেমন ভারী হয়ে গেছে। গোয়ালে আটকে পড়া গরু-বাছুর আর ছাগলের করুণ চিৎকার যেন মানবতার এই জঘন্য ও নিকৃষ্টতম কার্যকলাপকে ঘৃণা ভরে ধিক্কার জানাচ্ছে। অসহায় প্রাণিগুলো প্রাণ বাঁচাতে হয়ত তার শরীরের যতো শক্তি আছে তার সবটুটু দিয়ে ঘরের বেড়া ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করছে কিন্তু অবশেষে ব্যর্থ হয়ে নীরবে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কোন কোন গোয়ালের আবার বেড়া ভেঙ্গে দু’একটা গরু বাইরে এসেও বাঁচতে পারে নি, একটু দুরে গিয়ে মরে পড়ে আছে। ছাইয়ের স্তুপে নিরিহ প্রাণিগুলোর দেহবশেষ, হাড্ডি, চামড়া মিশে একাকার হয়ে আছে। তাজা রক্তের স্রোতে পোড়া ভিটের ছাইগুলো ভিজে মাটির সাথে ল্যাপটে আছে। আধাপোড়া বাঁশের খুঁটিগুলো মানবতার এই জঘন্য ও নিকৃষ্টতম কার্যকলাপের নীরব সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যায়ভাবে নিরপরাদ গ্রামবাসীদের উপর দৃষ্টান্তহীন জুলুমের স্বাক্ষী।
বিভৎস অন্ধকারের মধ্যে মাত্র দু’এক ঘন্টায় ঘটে যাওয়া সে হৃদয়-বিদারক ঘটনা একটা নতুন ইতিহাসের জন্মদিল। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর কাছে এ যেন একাত্তরের পঁচিশে মার্চের সেই ভয়ঙ্কর কালো রাত, এতবছর পর আবার ফিরে এল। আগুনের ভয়ঙ্কর লেলিহান শিখা দেখে গোটা গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের বাড়ি ডাহাগ্রামের পূর্বপাশে। কারো কারো বাড়ি পুড়ে গেছে, কয়টা বাড়ি পুড়ে গেছে সে হিসেব তাৎক্ষনিক ভাবে মেলানো অসম্ভব ছিলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাই নিজের জীবনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে মহা আতঙ্কের মধ্যদিয়ে সময় পার করছে। গ্রামে হাতে গোনা দু’তিনটা বন্দুক ছিল, গোটা গ্রামের মহিলা ও শিশুদের বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে এনে সেখানে বন্দুক দিয়ে পাহারা দেওয়া হয়। চলতে পারে না এমন বৃদ্ধ ব্যতীত সবাই হাতে লাঠি-সোটা, ছুড়ি-বল্লম নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এখানে কেউ আক্রমণ করতে আসলে কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব বুঝে দেবে তারা। অবশেষে বাস্তবে তাই হল। যুদ্ধের এ পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে আজকে হয়তো কতো মানুষ যে লাস হয়ে পড়ে থাকতে হতো তার হিসেব মেলানো কঠিন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now