বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩০
আজ বিকেলের প্রকৃতিটা বেশভারি মনে হচ্ছে রোদও একেবারে হালকা হয়তো খানিকটা কুয়াশাও পড়বে। বাড়ির দক্ষিন দিকটায় একটা পুকুর আছে পানিগুলো বেশ স্বচ্ছ টলটলে কয়েকটা হাঁস মনের আনন্দে ছুটোছুটি করে মাছগুলোর সাথে খেলা করছে। নির্জন পকুর ঘাটে বেশ ভালোই লাগছিল শেষবিকেলের সোনালি আলোয় কাকরে কাকরে ঠোঁকা ঠুঁকি আর সর্নালী মাছের গান। এমন মোহনীয় ক্ষণে মোহনের উপস্থিতি ভীষণ প্রয়োজন ছিল। কেন জানি আজকাল চলতে ফিরতে, উঠতে বসতে মোহনের কথা মনে পড়ে, অবলা এ মোনটা কেবলি তাকে কাছে পেতে চায়। দেহের প্রয়োজনে নয়, যৌবনের প্রয়োজনে নয়, হয়তো সময়ের প্রয়োজনে, হয়তো মনের প্রয়োজনে। আমাকে পুকুর পারে একাই বসে থাকতে দেখে মিনুর মা এক কাপ চা হাতে নিয়ে আমার কাছে এসে বলে- ছোট আম্মা চা খাও, মনটা ভালো হয়া যাবে।
আরে খালা, তোমা ফির চা আনির গেইলেন ক্যান? মোর জীবনে কি আরও ভালো লাগা, মন্দ লাগা এইলা কোন কিছু আছে?
মিনুর মায়ের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। আমার মাথায় হাত দিয়ে বলে-মা জীবনতো শুরু- এতো হা-হুতাশ করলে কি করি চলবে মা? এ জীবনে মুই কতো কিছুই না দেখনু- ভালটা যেমন জানো এর উল্টোটাও কম জানো নারে মা। দিন-দিন বয়স বাড়ির নাগচে আর জানার ঝোলাটাও আসতে আসতে ভর্তি হইতেছে। এই বাড়িতে প্রতিদিন কতো রকমের লোক আইসে, কতো রকমের লোকের সাথে মোক মিশা নাগে, রান্নায় আলুটা এ্যাকনা কম সিদ্ধ হইলে নুনটা এ্যাকনা চড়া হইলে কতো কথা যে শুনা নাগে মহাজনের। তখন খুব খারাপ লাগে রে মা, নিজের উপর খুব ঘেন্না হয়। তখন মনে হয় ক্যানে যে আল্লাহ হামাক দুনিয়াত পাঠাইল, আর ক্যানে যে উপরোত বসি বসি তামাশা দেখির নাকচে সেটা তায় ভালো জানে।
না খালা, মন খারাপ করি কোন লাভ নাই। সবার আচার-ব্যবহার, বিবেক-বুদ্ধি একই রকম হয় না। তাই তোমা কষ্ট পান আর একজন তোমাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। এটাই সৃষ্টির রহস্য, খালা।
এ দুনিয়াত মোর কারো উপর কোন অভিযোগ নাইরে মা। অভিযোগ শুধু নিজের ভাগ্যেও উপর। গরিব হইলেও সংসারে হামার কোন দিনই অভাব ছিল না। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু। নিজের ক্ষ্যাতের গম ভাঙ্গি সেই তাজা আটার গরম রুটি, ক্ষ্যাতের ডাইল, শাক-সব্জি, নিজের গরুর খাটি দুধ। এই অভাবের সংসারে দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণা সয়ে, সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পর রাইতোত যখন বিছানায় শুয়ে পড়ি তখন এগিলা কথা মনোত উঠিলে এ্যাকনা খুশি খুশি নাগে, মনোত সুখ-সুখ ভাব আইসে-গানের কথা মনে পরে-
এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে এইতো নদীর খেলা,
সকাল বেলা বাদশারে তুই ফকির সন্ধ্যা বেলা।
এমন সময় কোথা থেকে একদৌড় দিয়ে এসে হাফাতে হাফাতে মিনু বলে- মা, মা, বড় দাদি তোমাক ডাকাইল?
আচ্ছা ছোট আম্মা মুই যাঁও।
ঠিক আছে খালা বড় বুবুক কন যে মুই গুকুর পারোত আঁছো।
এই মিনু শোন, এদিকে আয়।
হ্যাঁ ছোট দাদি কন, কি কবার চান?
তোর বড়দাদি আমার কথা কিছু বলেছে রে?
না ছোটদাদি কিছু না। কাইল যেলা তোমা ঘুমাইছিলেন সেলা মা আর বড়দাদি তোমাক নিয়া কথা কইছিলো।
কি কথা কইছেরে?
বড়দাদু তোমার জীবনটাক না কি নষ্ট করে দিচে। সারাজীবন তোমা কেমন করি কাটাবেন? বড়দাদি কইছে তোমাক দেখিলে নাকি তার চৌখোত পানি আইসে। সেই জন্য তায় তোমাকে ডাকায় না।
থাক ওসব কথা, আচ্ছা মিনু- তুই কি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারিস না?
মোক শরম নাগে ছোটদাদি।
কেন, শরম লাগে কেন?
মুই, আমি-তুমি করি কথা কইলে দাদা মোক ধমক দেয়, এই চেংরি তোর ফুটানী বাড়চে, সারাদিন বসি খ্যায়া ঘ্যাম ধরচে?
ও আচ্ছা, এখনতো তোর দাদা নাই।
পৃথিবীর সব সুন্দর জিনিসগুলোকে অসুন্দরের আবরণে ঢেকে দিয়ে প্রকৃতি কি যে মজা পায়, কে জানে। বসন্তের গন্ধমাখা বাতাস গোটা প্রকৃতিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, গোধুলির নরম সন্ধ্যাগুলো যখন অন্ধকারে ঝাপসা হয়ে যায়, তখন প্রকৃতি অন্ধকারের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আবিয়া এক ভয়ার্ত কণ্ঠে গুঙ্গিয়ে উঠলো। তার বুকের ভিতরটা ধক্ ধক্ করছে। তার সারা শরীরটাকে কঠিনভাবে পাক দিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে যেন এক ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপ। ফণা দুলিয়ে তার চোখে-মুখে বারে বারে দংশন করছে। সারা শরীর জুড়ে বিষ ছড়িয়ে পড়ছে। বিষাক্ত রক্তগুলো ক্রমে অন্তর জুড়ে ছোবল মারছেÑবিবেকের দংশনে। এমন একটা বীভৎস ঘটনা তার জীবনে ঘটে যাবে এটা ছিল তার কল্পনার বাইরে। সারা উঠানে যেন বইতে লাগলো উত্তাল ঝড়ো হাওয়া। আবিয়ার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজ অনেক দূর পথের যাত্রী সে, নিঃশব্দে জীবন ইতিহাস শুনছে। গল্পের শুরুটা কোথায় তাও তার জানা নেই। অদৃশ্য এক শক্তির কঠোর শাসনে তার জীবনটাকে তছনছ করছে। মাকড়সার জালে আটকে পড়া, মাছির মতো আজ সে কেবলই ছটফট করছে।
সৃষ্টিসেরা জীব হয়েও আজ তার অস্তিত্ব এতো বিপন্ন। অমাবস্যার অন্ধকার সূর্যকে কত প্রশ্ন করছেÑ উত্তর তারও জানা নেই। এভাবে বিপন্ন হয়ে ভোরের নিষ্পাপ শিশিরবিন্দু বৃক্ষরাজির কোমল কচি পাতাগুলোকে একই প্রশ্ন করে, উত্তর কারও জানা নেই। তাহলে কি তার জীবন এভাবেই বিপন্ন হয়ে যাবে? শেষে কি মোহনও তাকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে যাবে? না মোহন দোহাই তোমার এমনটি কোর না। তোমার ঔরসজাত সন্তান আমি আমার দেহে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। না মোহন, তুমি এমনটি করতে পার না, তোমার সৃষ্টি হওয়া কেবলই আমার জন্য। তুমি আর কারও হতে পার না। তুমি আর আমি, তোমার সুখ আর আমার অস্তিত্ব আজ একই সাথে মিশে যেতে চলেছে। বিশ্বাসে কর মোহন আমি তোমাকে“ভালোবাসি” ভীষণ ভালোবাসি।
মোহনকে সেদিন জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে আবিয়া অনেক্ষণ কেঁদেছিল। চোখের কোণে আটকে থাকা কষ্টের লোনাজল বিস্মৃতির ধুলো বালি সরিয়ে তার গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে। মনে মনে মোহন বলে নীলা- তুমি কাঁদো, আর কাঁদো। হৃদয়ের গহীনে লুকানো জমাট বাঁধা কষ্টগুলো তোমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তোমার চারপাশের ঐশ^র্য, চাকচিক্যময় বর্ণালী জগৎ, অনাগত ভবিষ্যত তোমার ভেতরে ভেতরে পঁচা কাঠের অভ্যন্তরে উঁই পোকার মতো ক্ষয় করে ক্রমাগত তোমাকে দুর্বল করে চলেছে, তুমি কাঁদো আবিয়া, আরো কাঁদো, কাঁদতে কাঁদতে সব কষ্টের জলগুলো নিঃশে^ষ করে দাও। যেন তোমাকে আর কষ্ট দিতে না পারে। এক পলক দেখার অনাদিকাল প্রতীক্ষা, বিস্মৃতির বেড়াজাল সরিয়ে মায়াবী মুখের প্রাণোচ্ছল হাসি, ক্ষমাহীন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বুকের মধ্যে তোমাকে পাওয়া, বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ তৃপ্তি সুধায় হৃদয় পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভরা পূর্ণিমার অম্লান জোছনাকে স্বাক্ষী রেখে কতো নির্ঘুম রাত যে পার করেছ তার হিসেব আমি তোমাকে দিতে পারব না জানি, তবে জীবন ডায়রির খোলা পাতায় যে দুঃখ কষ্ট , জ্বালা-যন্ত্রণা, নিগৃহিত নিপিড়িত সময়ের কালো দাগ, ব্যর্থতার চরম গ্লানি, হতাশার কৌশলগত পরিক্রমায় ডুবে থেকে দিনে দিনে যে নিজেকে নিঃশ্বেষ করে দিয়েছ তা আমি বেশ উপলব্ধি করতে পাচ্ছি।
ভালোবাসার প্রতি তোমার যে শ্রদ্ধাবোধ এ আমার চির চেনা, সময়ের পালাবদলে তোমার কষ্টার্জিত অতীত, দম বন্ধকরা আবেগ অনুভুতি, ক্ষয়ে যাওয়া আত্মার অতৃপ্ত বাসনা নীরবে নিভৃতে কেঁদে কেঁদে যে মধ্যরাতের বাতাশ ভারিকরে তা কেবল তোমারই নিজেস্ব ইচ্ছা অনিচ্ছাকে জলাঞ্জলি দিয়ে। সেদিন কাঙ্খিত সম্বোধনে আমার কাঙ্গাল মন বড় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, বিবর্ণ এক ধুসড় রাতে তার নীল চোখে কেবলি খুঁজি রবির ঝলমলে আলোয় রাঙা প্রভাত। কোন এক সময়ে অসাধ্য সাধনের দৃঢ় প্রত্যয়ে আমার হৃদয় গহব্বরে ভালোবাসা ভীষণ বিদ্রহী হয়ে ওঠে, নাম নাজানা ফাগুনের আর্বিভাব হয়, শিহরে ওঠে ধমনীর রক্ত কণিকা গুলো। কারণে অকারণে তোলপার করে ওঠে, জলডাকাতের মতো ভীষণ উৎপাত শুরু করে বুকের ভিতর। প্রতীক্ষার নরকীয় প্রহরের অবসানে নিবিষ্ট ধ্যানে অনেক্ষণ বিভোর থাািক। মরুসাহারার খরা বুকে উত্তপ্ত মন একটু প্রশান্তির ক্যানভ্যাসে স্বস্থির রংতুলির আঁচড়ে ভবিষ্যত জীবনের রঙিন ছবি আঁকে। সাঁঝের মায়া কাটিয়ে নিসিদ্ধ রাতের একাকিত্ব ঘুচিয়ে যখন সাবলিলতায় ফিরে আসে অস্থির মন তখন ভীষণ চঞ্চল হয়ে ওঠে, শূন্য হৃদয়ের উর্বর জমিনে বিলাসী স্বপ্নের দু”ফোটা বৃষ্টি পড়ে। তাই স্বপ্ন বিলাসী মন ক্ষণিকের জন্য হলেও সেই জমিনে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে।
জীবনের অগোছালো উঠোনে হঠাৎ এসে থমকে দাঁড়ায় চলমান বিবেক, নিজের বুকের উপর থেকে আবিয়াকে সরিয়ে নিয়ে মোহন বলে- একটু অপেক্ষা কর প্রিয়তমা? দেখবে একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমার ভয় তো কেবল সেখানেই মোহন, যেখানে অপেক্ষমান রাতের নীরবতা গুমড়ে কাাঁদে, আশার থলিতে থাকে জীবনের চাওয়া পাওয়া। পাহাড় সমান উঁচু নিচু পথ, চলতে গিয়ে পিচলে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায় শরীরের অবয়ব। আমার ভাগ্যহত জীবনে একি নিয়তির নির্মমতা! জন্মের পাপে মমতার পরিবর্তে পেয়েছি রুক্ষতা, শাসনের ডাণ্ডা বেড়ি। আমার আর এ নরকে বাঁচতে ইচ্ছে করে না মোহন?
মোহন আবিয়ার মুখ চেপে ধরে বলে- ছিঃ অমন কথা মুখে বলতে নেই? আমি বলেছিতো একটু অপেক্ষা কর, আর কয়েকটা মাস। তারপর সকল জ্বালা যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে আমাদের মিলন হবে কোন এক সুখের মোহনায়। হৃদয়ের আলিঙ্গনে পরম তৃপ্তির উষ্ণতায় আপ্লুত চোখ ভালোবাসার নিবিড় স্পর্শে কেবল নতুনত্ব খুঁজে পাবে। আধারের গায়ে রঙিন আলো মেখে আমরা সেদিন নবজীবনের স্বাদ খুঁজে বেড়াব। হৃদয়ের গোপন গলিতে লুকিয়ে রাখা প্রেম বিকশিত হবে তোমার শালিক জোড়া চোখে, হাজার বছর ধরে চলবে আমাদের এ পথচলা, তবুও কখনো হবে না শেষ।
মোহন আমার মনের ভেতর কেন জানি এক অজানা আতঙ্কের সুর বার বার বেজে উঠছে, হয়তো এটাই আমাদের শেষ দেখা। আর কোনদিন দেখা হবে না।
কথাগুলো বলার সময় থরথর করে তার ঠোঁট কাঁপছে, শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে গেছে। সে আর দাড়িয়ে থাকতে পাচ্ছে না ধপাস করে বিছানার উপর বসে পড়ল।
আবিয়া তোমাকে শান্তনা দেবার মতো কোন অমোঘ বাণী আমার জানা নেই, শান্তিহীন নীরবতায় হাজারো চিন্তা মাথায় জড়ো করে নির্ঘুম রাত কাটাবে, এতোটা পাগল হলে কি অসম জীবনের পথে পাড়ি দেয়া যায়? এতোটা আবেক প্রবণ হলে কি কষ্টকে জয় করা যায়? তুমিই বলো?
সৃষ্টির বিশাল মহাশূন্যের লক্ষকোটি নক্ষত্রের কথা আজ আমার মনে নেই কিন্তু এ পৃথিবীর পরিমন্ডলে একটি নক্ষত্র মাটির ধুলোর প্রতিটি অনু পরমাণুতে প্রতি মুর্হুতে যে অব্যক্ত বেদনায় কুঞ্চিত হয়ে কারও অসীম করুণার প্রতিক্ষায় প্রহর গুণছে সে আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে। তার অসমাপ্ত প্রতিক্ষার প্রতিটি ক্ষণ, অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাসের করুণ আর্তনাদ কোমল হৃদয়ের সীমানা পার হয়ে মধ্যরাতের বাতাসকে ভারী করছে। বঞ্চিত জীবনের অস্বাভাবিক গতি বারবার তাকে দুর্বল করে দেয়, অসহায় জীবনের কোন তৃপ্তি নেই, সুখ-শান্তির বালাই নেই, কেবলি অন্ধকার, যে অন্ধধকারের কোন শেষ নেই, সীমানা নেই। অতৃপ্ত মনের তৃপÍতাকে পরিপূর্ণ করার প্রয়াসে গভীর মমতার বন্ধনে জড়িয়ে সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ কষ্টগুলোকে হাতের মুঠোয় জড়ো করে এখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো নীল আকাশের বুকে মিশিয়ে দেয়। জীবন চলার পথে সে শান্তি ও নিস্তার খুঁজে বেড়ায়।
প্রকৃতির পালাবদলে দিন যায় রাত আসে, মাস যায় বছর আসে কিন্তু পরিবর্তন আসেনা অমোঘ নিয়োমের, অনাগত ভবিষ্যতের। অদম্য ইচ্ছে গুলোকে মাটি চাঁপা দিয়ে পুতে ফেলে সবার মনোরঞ্জনে নিজেকে আত্মহুতি দেয়। হৃদয়ের কোণে লালিত স্বপ্ন গুলোকে গুছিয়ে নেয়ার তিব্র বাসনা প্রতিকুলতার সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত, আপোষহীন দুর্বার তেজ দীপ্ত অস্থির চিত্ত কেবলি বারবার হারিয়ে যায় কালবৈশাখী ঝড়ে, ভেঙে যায় আকাশে উড়ানোর ডানা স্থিমিত হয়ে পড়ে মনের জোর বোবা কান্নায় থেমে যায় চঞ্চলতা, অদম্য সাহস বুকের শক্তি। দু”চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রæ হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণে রঙিন পৃথিবীটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে বাক শক্তি হারিয়ে যায়। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্ধস্ত কোন উপত্তকার মতো আবিয়ার বুকটা দুমড়ে মোচড়ে যায়। হৃদয়ের নিভৃতে কোনে এক প্রচণ্ড শব্দের পর আবার চুপচাপ হয়ে যায়। ভাবনার কেন্দ্র বিন্দুতে আগুন লাগে, সব পুড়ে ছারকার হয়ে যায়। চোখের সামনে দৃশ্যমান থাকে কেবলি ছাইয়ের স্তুপ, তার শৈশব, যৌবন, ইপ্সীত প্রেম, অহংকার আশা নিরাশার ধুধু বালু চর। পার হয়ে যাওয়া দিন, মাস, বছর।
তিনকুড়ির বিছানার বালিশটা সরাতে গিয়ে রহিমার মনে পড়ে যায়, ছোট বেলায় দাদির মুখে শুনেছে কেউ মরে গেলে নাকি তার মাথার চুলে যে উকুনগুলো বাসা বাঁধে সেগুলো ভয়ে গুটিসুটি মেরে মাথা ছেড়ে বালিশের তলে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। তাই সে বালিশটা হাতে নিয়ে দরজার কাছে আলোতে এসে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখে সে উকুনগুলো আছে কি না। চুলে তেল মাখার অভ্যাস তিনকুড়ি মহাজনের কোন দিনই ছিল না, উসকো খুসকো চুল নিয়ে অভ্যাটা ধরে রাখে। সজজ সরল রহিমার জীবনে তিনকুড়ি মহাজনই একমাত্র পুরুষ ছিল। সংসার জীবনের কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে সে তার জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সব এখানেই খুঁজে নেয়। রহিমার কোন সন্তান নাই। মাঝে মাঝে দু’হাত তুলে আল্লহর কাছে একটি সন্তান চায় কিন্তু তার চাওয়া পূরণ হয়না। আল্লাহর উপর কারও হাত না থাকলেও অভিমানে তার বুকটা ফেটে যায়। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কেন যে আল্লাহ তার উপর এমন নারাজ হয়ে আছে কে জানে।
রহিমা আবিয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, কি নিষ্পাপ উৎফুল্লতা তার চোখে, মুখে। কি মায়াবি মুখ-খানা যেন স্বর্গীয় কোন হুরপরী। কেন যে তোর কপালটা এমন ভাবে পুড়লো আবিয়া। আবিয়া কথা না বলে এক দণ্ড থাকতে পারত না অথচ এখন কেমন শান্ত শিষ্ট, নীরব হয়ে শুয়ে আছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাসে সে এখন ভবিষতের অনাগত দিনগুলোর কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছে। জীবন সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের বিপরীতে সাতার কাঁটতে কাঁটতে সে এখন ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, আর নিজেকে সামলে রাখতে পাচ্ছে না। নিজের মানুষটা যে কিনা আমার সজ্জা সঙ্গী তাকে চাওয়াটাও যেন অরঙ্ঘণীয় পাপ। চুলোয় যাক জীবন-যৌবন, সর্বনাশা শরীর। কি হবে বেঁচে থেকে শুধু কষ্টকে ধার করে জীবনের তাকে সাজিয়ে রাখা।
রহিমার চোখর কোণে অশ্রু এসে গেলো। আবিয়া ও মোহন দু’জনে পাশা-পাশি দাঁড়িয়েছে তাদেরকে দেখে রহিমা মনে মনে ভাবে, কি সুন্দর মানিয়েছে তাদের মনে হচ্ছে যেন মানিক জোড়। মনে হচ্ছে মোহনের জন্যই আবিয়ার জন্ম হয়েছে। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? মোহন কি আবিয়াকে মেনে নিতে পারবে? লেখা পড়া জানা ছেলে সে, কখোন কোন মেয়েকে চোখে লেগে যায়। যদিও মোহন এমন ছেলে নয়, তবুও তো বয়সটা এমন। আবিয়াকে বলতে হবে সে যেন মোহনের সাথে একটু কথা-বার্তা বলে, একটু মেলা-মেশা করে তাহলে তার মনটাও ভালো থাকবে। সারাটা দিন মেয়েটা একা একা ঘরে বসে থাকে এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? ওহিমা মোহনকে ডেকে বলে-
মোহন তুই ঘরে যা, মুই আবিয়ার সাথে এ্যাকনা কথা কঁও।
মোহন নিজের ঘরে যেয়ে বালিশ উঁচু করে বিছানায় হেলান দিয়ে মনে মনে ভাবে, তাহলে বুবুকি তাদের মেলা-মেশাটা টের পেয়েছে? তা নাহলে আমাকে ছাড়া আবিয়াকে একা ডাকলো কেন? আর কি এমন কথা আছে তার সাথে যা আমার সামনে বলা যাবে না। নাকি কোন মেয়েলি কথা, সেটা যদি হয় তো তারা সারাদিনই বাড়িতে থাকে যে কোন সময় বলতে পারত? বিষয়টা বোধয় জটিলের দিকেই যাচ্ছে।
এমন সময় আবিয়া এসে ঘরে ঢুকেই মোহনের গায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তার কপালে, চোখে, দু’গালে, ঠোঁটে পাগলের মতো একটার পর একটা চুমু দিতে থাকে। মোহনকে কোন কথা বলারই সুযোগ সে দিচ্ছে না। মোহন অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে দু’হাতে বুকের ভেতর স্বজোরে চেপে ধরে। এভাবে অনেক্ষণ সময় এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর আবিয়ার মুখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে দিয়ে শরাবের নেশা লাগা, কোমল ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু দেয়। পাখির পালকের মতো নরম বুকের স্পর্শে তার হৃৎপিণ্ডটা কেঁপে উঠলো। যৌবনের উচ্ছ¡সিত আবেগে অন্তহীনরুপে কাম্য হয়ে ওঠে তার দেহ-মন, মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ পযর্ন্ত সমস্ত শরীর। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চুম্বকের মতো কাছে টানে, যেন চঞ্চলা হরিণীর নাভিমূলে কস্তরির ভেতর গুপ্ত সুগন্ধির জন্য ছটফটানি। অতঃপর অবিরাম জ্বরবিকারের ঘূর্ণির মধ্যে ডুবে তলিয়ে যায়। সূচের মুখে ক্ষণকালের অপেক্ষা বিঁধে আছে, মুহূর্তের গর্জনে দেহ কাঁপিয়ে আসবে জোয়ার, ভাসিয়ে দেবে মহা প্লাবনে। যৌবনের গন্ধে মাতাল, কাঙ্গাল দেহের রক্তিম আকাশে অতঃপর বৃষ্টি নামে, প্রবল খর স্রোতে হৃদয়ের বাঁধ ভেঙ্গে যায়, উথলে ওঠে ভীষণ জলোচ্ছাস, সুগন্ধি স্রোতস্বিনীর কলকল ধ্বনিতে তারা ভেসে য়ায়, এ জগতে নয়, অন্য জগতে, অন্য কোথাও। সময়হীন স্রোতের বিপরীত কচ্চপ দৌড়ের মতো ধাবমান বাতাস, চুর্ণ-বিচুর্ণ দেহ, দৃষ্টির ঝাপসা আলো, স্বর্গী উদ্দানের ঝমঝম বৃষ্টি যেন ম্যানগ্রোভের শীতলতা আনে তাদের দেহে,মনে। কি অপূর্ব তৃপ্তিময় স্বর্গীয় অনুভুতি ডুবু-ডুবু বুকের ভেতর জেগে ওঠে ফুলে-ফেঁপে ওঠা যৌবনের নিংড়ানো সুখ, কপালের ভাঁজে বিন্দু-বিন্দু ঘাম, এ যেন হাজার বছর বেঁচে সাধ জাগিয়ে দেয়।
আবিয়া আস্তে আস্তে উঠে বসে, তবুও মোহন টেরপায় আবার তাকে জড়িয়ে ধরে মুখের চারপাশে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকা চুল গুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলে- আবিয়া, বুবু তোমাকে কি বললো?
তোমার মাথা আর মুণ্ড, এতোক্ষণ ধরে আমরা যা করলাম, বুবু সেটাই করতে বলেছে।
হেয়ালি করনা আবিয়া? সত্যি করে বল, আমি খুব দুচিন্তায় আছি। আমার বুকের ভেতরে একটা ভয়, একটা অযাচিত আতঙ্ক, আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
তোমাকে বের করে দিয়ে বুবু আমাকে কাছে বসালো, তারপর আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল- সারাদিন ঘরটায় একেলায় বসি থাকিস, এভাবে কি বাঁচা যায়? মোহন বাড়ি আসিলে তার সাথে এ্যাকনা গল্প-গুজব কর, এপাশ-ওপাশ বেড়াবেড়ি কর তাতে তোর ভালো লাগবে। এভাবে একেলায় ঘরোত বসি থাকলে তুইতো পাগল হয়া যাবু। তোমাগুলাতো এ যুগের ছেলে-মেয়ে, তোমাক এগুলা কওয়া নাগবে ক্যান আবিয়া?
আবিয়ার মুখে এসব কথা শুনে মোহন আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবিয়াকে জড়িয়ে ধরে। তারপর বলে তোমার আর আমার মাঝে আর কোন দুরত্ব থাকবে না আবিয়া। আর কোন বাধা নেই, আমার ভয়ছিল শুধু বুবুকে নিয়ে।
আবিয়ার এ অবস্থা দেখে আর যা হোক কার বুঝতে বাকি রইলো না যে, মেয়েটা তার পর নয়। ঠিক এ মুহূর্তে কি করা উচিত,সে এখন কি করতে পারে। সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মোহন দু”হাতের উপর প্াঁজাকোলা করে আবিয়াকে তুলেনিয়ে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। সে নির্বাক, কোন কথা বলার এতোটুকু শক্তিও তার মধ্যে অবশিষ্ট্য নেই।
পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই একজন নারী ও পুরুষ একত্রে সুখ, দুঃখ ভাগাভাগি করে পৃথিবীটাকে শান্তিময় বাসস্থানে পরিণত করেছে। আজ পর্যন্ত কোথাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি। একজন নারী কখনোই তার জীবনে পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না তার পাশে সুবোধ সঙ্গী হিসেবে একজন পুরুষ থাকে। আমাদের সমাজে বিয়ে নামক যে প্রথাটা প্রচলিত রয়েছে তার আসল উদ্দেশ্য হলো একজন নারী অথবা একজন পুরুষের জীবনের পূর্ণতা দান করা। এখানে নারী অথবা পুরুষ কখনই বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে পারে না।
অবশ্য এ বিষয়ে পাঠকগণের মনে হয়তো একটা প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে যে, এ জগতে অনেক নামি-দামি মহান ব্যক্তি আছেন যাঁরা বিয়ে-শাদি না করে সংসারহীন জীবন যাপন করেছেন। হ্যাঁ, তা একেবারে অস্বীকার করার মতো নয় তবে আমি বলবো-যাঁরা সংসারহীন জীবন যাপন করেন, তাঁদের জীবন পরিপূর্ণ নয়, এটাকে কখনোই স্বস্তিতে বেঁচে থাকা বলে না। এমন জীবন-যাপনে কোথাও না কোথাও একটা অপূর্ণতা থেকে যায়, তবুও যাঁরা বেঁচে থাকেন তাদের এটাকে স্বস্তির জীবন বলে না, অনেকটা বৈরাগ্য বা সন্ন্যাস জীবনের মতো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now