বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৮
প্রিয় পাঠক, এখানে একটু বলে রাখা দরকার যে, উনিশ শ’ একাত্তর সালের মহান মক্তিযুদ্ধে ৬ (ছয়) নং সেক্টরের আওতায় ছিল বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। যার সদরদপ্তর ছিল বুড়িমাড়ি হাসর উদ্দিন দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় দ্বায়িত্বে ছিলেন উইং কমাণ্ডার মো. খাদেমুল বাশার। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার সাহসী সন্তানদের একত্রিত করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নিমিত্তে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে তোলার জন্য ডাহাগাম-অঙ্গারপোতায় একটা “ইয়োথ ট্রেনিং ক্যাম্প” ছিল সাবুবর রহমান প্রামানিক সেই ক্যাম্পের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার “ইয়োথ ট্রেনিং ক্যম্পে” মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ যুবকদেরকে প্রথমিক ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হত। সময়ের প্রয়োজনে অনেককে এখান থেকে সরাসরি যুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়া হত। তবে বেশিভাগ ক্ষেত্রে এখানে প্রথমিক প্রশিক্ষণ শেষে খুব অল্প সময়ের জন্য ভারতের কুচবিহার জেলার টাপুরহাট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অস্ত্র ব্যবহারের পূর্নাঙ্গ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হত। এই গ্রাম থেকে তেরো জন মুক্তিযোদ্ধা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। তাঁরা হলেন-মো.সাবুবর রহমান প্রামাণিক, আব্দুর রাজ্জাক প্রধান, যহের আলি, লুতফর রহমান, ওমর আলি, মিথুন রায় পেদি, হরিকান্ত রায়, যতিশ রায়, জগবন্ধু রায়, নব কুমার রায়, ধীরেন্দ্র কান্ত রায়, ধীরেন্দ্র চন্দ্র রায়, গোপিকান্ত রায়।
চান্দু পালোয়ান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও কিভাবে তরুণ যুবকদের প্রথমিক ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হত সেটা সে খুব মনোযোগের সাথে রপ্ত করতে সক্ষম হয়। আর ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার এ চরম দুর্দেিন আজ তার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।
যাক শুরুটায় চান্দু পালোয়ান তার নিজেরই বাহাদুরি উপস্থাপন করল। চার-পাঁচজন জোয়ান ছেলের হাতে লাঠি দিয়ে চান্দু লাঠিয়াল তাদের সবাইকে একসাথে তার উপর আক্রমণ করতে বলা হল, সবাই চারদিক থেকে একই সাথে তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করল কিন্তু তার গায়ে কেউ একটা ফুলের টোকাও দিতে পার না। গ্রামের সেরা পালোয়ান নসিব আলি পরনের লুঙ্গি হাঁটুর উপরে তুলে গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তার সাথে পাল্লা দিতে গেল। প্রথম আক্রমণে নসিব আলি কুপোকাত হয়ে ফিরে এল। সবাই হাতে তালি দিয়ে চান্দু পালোয়ানকে বলল-সাব্বাস! চান্দু ভাই, আপনার কাজ আপনি চালিয়ে যান। ছেলেদের এমন ভাবে প্রশিক্ষণ দেবেন যেন তারা একশ’ জনের একজন হতে পারে।
রোদের রঙ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, বেলা অনেকটা পড়ে গেছে, হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে আসবে তাই দেরি না করে মহির আলি গরু গুলোকে আনতে যায় মাঠে। যে দিনকাল পড়েছে, তাই আশে-পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল দু’একজন মানুষ আছে কি না। মাঠে একটা শুধু উঁচু আল মাঝখানে। আলের পূর্বে ভারত আর পশ্চিমে বাংলাদেশ। ভারতে যারা বসবাস করে তারাও প্রতিবেশীর মতো। প্রতিদিন রাত পোহালে তাদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, তাদের মাঝে যে আন্তরিকতা তাতে কোর দেশের সীমানা বিভেদ সুষ্টি করতে পারে না। একটাইতো গ্রাম! শুধু মানচিত্র আলাদা। ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার যে সীমান্তে আবার হিন্দু বসতি বেশি সেখানেতো ভারত-বাংলাদেশের সীমানা টেরই পাওয়া য্য়া না। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবগুলোতে তারা নিজ দেশের সীমানা ভুলে একে অপরের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। তাছাড়া পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক থাকে তখন ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার মানুষগুলোতো অবাধে ভারতের হাট বাজারে যেয়ে তাদের জমি থেকে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনে। সমস্যা বাঁধে তখনই যখন ভারত সরকার কতৃক ডাহাগাম-অঙ্গারপোতাকে তিনবিঘা করিডর হস্তান্তর করার প্রসঙ্গ আসে। প্রশাসনিক দিক থেকে তেমন সমস্যা না হলেও ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের জনগণ চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। তারা ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার উপর অবরোধ সৃষ্টি করে। প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় যুবকদের পাহারা বসায় যেন একটা ছোট বাচ্চাও ভারতে প্রবেশ করতে না পারে। পেটের তাগিদে, জীবনের প্রয়োজনে যদি কেউ তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ভারতে যায়, তখন তাদের উপর চলে অমানষিক নির্যাতন। গোটা গ্রামজুড়ে নেমে আসে হাহাকার, গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে খাবার নেই, কারো ঘরে লবন নেই, কেনসিন নেই গোটা গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়।
এ অবরোধের মাঝেও ভারতের সীমান্তঘেঁষা প্রতিবেশীরা চক্ষু লজ্জার কারণে কেউ কথা ফেলতে পারে না। বিপদে আপদে ডাহাগাম-অঙ্গারপোতাবাসীর পাশে এসে দাঁড়ায়।
মহির আলি দিন মজুরি করে খায়, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, না খেয়ে, না পড়ে দু’চারটাকা করে জমিয়ে সেই টাকা দিয়ে ছোট্ট দুটি গরুর বাছুর কেনে। তারপর থেকে দিন রাত যত্ন করে বাছুর দুটোকে বড় করে তোলে। একটি বাছুরের রঙ কালো বলে তার নাম সে রাখে কালু,আর অন্যটির রঙ লাল বলে তার নাম সে রাখে লালু। একটি ঘরের একপাশে একখানা বাঁশের মাচা পেতে তাতে সে রাতের বেলা ঘুমায় আর অন্যপাশে থাকে গরু দু’টো। মধ্যরাতে গরু দরদর করে প্রসাব করে, সেই প্রসাব আর গোবরে মাখা লেজ গরু যখন মশা তাড়ানোর জন্য জোরে নড়া-চড়া করে তখন প্রসাব মাখা গোবর দিয়ে মহির আলির মুখ সহ গোটা গা ভিজে যায়। প্রসাব ঝাপটায় মহির আলির ঘুম ভেঙ্গে গেলে বিছানায় বসে সে কালুকে বকাবকি শুরু করে। ঐ কালুই দিনরাত শুধু প্রস্রাব করে। দিনরাত মিলে বিশ-ত্রিশবারেরও বেশি সে প্রস্রাব করে। মহির আলি কালুকে বলে-‘কাইল থাকি তোর খাওয়া-দাওয়া তামান বন্ধ, মুই দ্যাখোতো কায় তোক খাবার দেয়, কায় তোর জন্য দুপুরা ঔদোত ক্ষ্যাতের আইল থাকি ঘাস কাটি আনে। দিনরাত বসি বসি খ্যায়া তোর প্যাটোত চর্বি জমিছে হারামজাদা’। এভাবে শত রাগ আর অভিমানের মধ্যদিয়ে সে নিজের সন্তানের মতো তার লালু-কালুকে ছোট থেকে বড় করে তোলে।
সূর্যের শেষ আলো সবুজ মাঠের উপর পড়ে যেন হলুদ আকার ধারণ করছে। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরই আঁধার নেমে আসবে। তাই তাড়াতাড়ি করে পা ফেলে মহির আলি যায় মাঠ থেকে তার লালু-কালুকে নিয়ে আসার জন্য। সেখানে পাড়ার অনেকের গরু ছাগল বাঁধা ছিল, কিন্তু তাগড়া, মোটা তাজা গরু গুলোর একটিও নেই, প্রথমে তার মনে হয়েছিল যে, সবাই হয়ত তাদের গরুগুলো ঘরে তুলে ফেলেছে। আর তার লালু-কালু সেই ক্ষোভে দড়ি ছিড়ে হয়তো কোথাও যেয়ে কারো ক্ষেত সাবার করছে। কিন্তু না, আশে পাশে কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মহির আলির মতো অনেকে এসে দেখে তার হালের তাগড়া বলদগুলো নাই। গরু হারানোর সংবাদ চারিদিকে চড়িয়ে পড়লে বিধাব সফুরা বেওয়া ধড়ফড় করে মাঠে এসে তার খাসি দু’টোকে এদিক সেদিক খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওযা যাচ্ছে না। আশে-পাশে সবাইকে জিজ্ঞাসা করে তারা কেউ কালো রঙের কোন খাসি দেখেছে কি না। কিন্তু আর যাদের গরু ছাগল সেখানে বাঁধা ছিল সবাই দেখেছে খাসি দুটোকে গরুর সাথে ঘাস খেতে।
মহির আলি বলে-সফুরা তোর খাসি দুইটা যে এটেকোনা মোর আড়িয়াটার বগলোত দেখিনু ঘুরি গুরি ঘাস খাবার নাগচে। একনা ভাল্ করি খুঁজি দেখেকতো কাঁও আরো বাড়ি ধরি য্যায়া বান্দি থোইল না কি?
নিঃসন্তান বিধবা সফুরার মৃত স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়ির ভিটে আর এই খাসি দু’টোই শেষ সম্বল। সেটাও হারিয়ে তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে, সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। ছবুর ও মহির আলি দু’জনে মিলে সফুরাকে ধরে বাড়ি নিয়ে আসে, পাড়ার মহিলারা দৌড়াদৌড়ি করে মাথায় পানি ঢালতে থাকে। গোটা গ্রামে রৈ-রৈ পড়ে য়ায়। বর্ডারের কাছে যারা গরু-ছাগল বেঁধেছিল তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে গরু-ছাগল নিয়ে। সব মিলে প্রায় পনের-বিশটা গরু-ছাগল নাই। ভারতীয় লোকজন টেনে নিয়ে গেছে। সীমান্তের কাছে হিন্দু প্রতিবেশী যারা বসবাস করে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে- তারা কিছুই বলতে পারে না। এরপর সবাই মিলে ললিত মেম্বারকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মেখলীগঞ্জে আসল ঘটনাটি জানার জন্য। সে ফিরে এলে বোঝা যাবে আসলে কি থেকে কি হয়েছে।
আচ্ছা স্যার ঠিক আছে আপনারা বোধয় কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলছেন, বলেন আমরা বাহিরে অপেক্ষো করছি।
আরে কি যে বলেন ভাই- আপনারা আমাদের বন্ধু, পরম আত্মীয়। আমাদের এ দুর্বিসহ-দুর্দিনে আপনারা যে এসেছেন এটা আমাদের চরম ভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের গ্রামের অনেক গরিব মানুষ আছে যারা পেটের তাগিদে ভারতে যেয়ে কাজ কর্ম করে। মজিদ নামে এমন একজন ব্যক্তি প্রায় বছর খানেক আগে স্বামী স্ত্রী মিলে ভারতে কাজ করতে যায়। ডাহাগ্রামের বর্তমান অবস্থা তারা জানে না। তাই স্বামী স্ত্রী মিলে স্বাভাবিক ভাবে বাড়িতে আসার জন্য বেড়িয়ে পড়ে। হয়তো অনেক দুরে তারা গিয়েছিল তাই ফিরতে একটু রাত হয়। এখান থেকে আধা কিলোমিটার দুরে কিন্তু ভারতের বর্ডার। বর্ডারের কাছা কাছি নাকি তারা চলে আসে, এমন সময় কয়েকজন যুবক মজিদকে ধরে আটক করে তার বউয়ের ওপর অশালীন আচরণ করতে শুরু করে। মজিদ শক্তিশালী হওয়ায় তাদেরকে পরাস্ত করে তার বউকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। আপনারাই বলেন ভাই, এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়?
স্যার আমরা কি সেই ভদ্র লোকের সাথে দেখা করতে পারব?
কেন পারবেন না? তবে তারা একটু সুস্থ হোক আমি আপনাদেরকে তাদের সাথে কথা বলার জন্য নিয়ে যাব।
সন্তান তুল্য সেই গরু দু’টো হারিয়ে গেলে মহির দিশেহারা হয়ে পড়ে, গরুর শোকে সে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। মহির আলি অশিক্ষিত, গরিব, খুব সহজ সরল মানুষ, সাংবাদিককে দেখে সরকারের কোন উচ্চ পর্যায়ের মানুষ মনে করে তাই সে পিছন থেকে এসে হুড়মুড় করে মোনাজাত সাংবাদিকের পায়ে পড়ে। কেঁদে কেঁদে বলে- ‘স্যার মোর সব শ্যাষ হয়া গেইল। মোর ছওয়ার মতো লালু-কালুকে ঐ শুয়োরের বাচ্চাগুলা টানি ধরি গেইছে স্যার। মোর লালু-কালুক এ্যাকনা আনি দ্যান স্যার মুই আর কিচ্ছুই চাঁও না স্যার।
মহির আলির বেদনাদায়ক করুণ মিনতিতে মোনাজাত সাংবাকি সহ সেখানকার সবার চোখে পানি চলে আসে। গ্রামের এসকল মানুষ কতো সহজ সরল, তারা কোন ধন সম্পদ চায় না, কোন ক্ষমতা চায়না, তারা কোন রাজনীতি বোঝে না, কোন দেশের সীমানা বোঝে না। তারা সবাই মিলে সুখে-দুঃখে মিলেমিশে একসাথে বাঁচতে চায়।
মোনাজাত সাংবাদিক চোখ মুছে ডান পাশে ফিরে মাস্টার সাহেবের দিকে চেয়ে বলেন- স্যার কি হয়েছে? কে নিয়ে গেছে ওনার গরু?
মাস্টার সাহেব বলেন-আজ বিকেল বেলার ঘটনা, এখান থেকে আধা কিলোমিটার দুরে ভারতের বর্ডার বিরাট একটা মাঠ, মাঝখানে শুধু একটা আল ভারত-বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণ করেছে। এখানে ভারত-বাংলাদেশের সীমানা ভুলে গিয়ে এতোদিন আমরা প্রতিবেশি হিসেবে একে অপরের সাথে মিলে মিশে বসবাস করে আসছি। তারা যখন তখন আমাদের এখানে আসে আর আমরাও তাদের কাছে যাই। কিন্তু হঠাৎ আমাদেরকে অবরুদ্ধ করে ফেললে তারাও আমাদের এখানে আসা বন্ধ করে দেয়। আর সেই বর্ডারে আজ বিকেলে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। মহির আলি, ছাবের আলি, দুলাল, কাতিবুল, তাজুল, ইমদাদুল, সফুরা বেওয়া, প্রমুখ ব্যক্তির গরু-ছাগল তারা টেনে নিয়ে যায়। সব মিলে ষোলটি গরু ও ছয়টি ছাগল তারা নিয়ে যায়। গরিব, খেটে খাওয়া দীন-দুঃখি মানুষ গুলো এই চরম দুর্দিনে সন্তানসম লালিত-পালিত এ সব গরু ছাগল হারিয়ে এক রকম দিশে হারা হয়ে পড়ে। পরিবার গুলোতে আপনজন হারানোর মতো শোকের ছায়া নেমে আসে। আপনি বলেন ভাই? আমাদের দেশ নেই, সরকার নেই, নূন্যতম সহায়তা পাবার কোন জায়গা নেই, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই, বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির দিকে চেয়ে থাকতে হয়। এমতবস্থায় যদি বেঁচে থাকার সম্বলটুকুও কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে চরম হতাশা ছাড়া জীবনে আর কি-ই বা থাকতে পারে।
‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতাবাসী দিনের বেলায় ভালো থাকলেও সূর্যাস্তের সঙ্গে যেন তাদের জীবন ঘড়ির কাঁটার মতো পিটপিট করে কচ্চপ গতিতে চলে। কথায় বলে কষ্টের রাত ভীষণ দীর্ঘ হয়। হয়ত সেটাই হবে, রাতের আঁধারে নিজের প্রাণটাকে কোনরকমে গলা অবধি ধরে রেখে মৃত্যুর আশঙ্কায় হা-হুতোশ করে ভোরের আলো ফুটে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। রাত পোহালে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে, স্বস্থির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কিন্তু সে আর কতদিন? কতদিন এভাবে বাঁচা যায়? চালের অভাবে ভাত নেই, লবনের অভাবে তরকারি নেই, চিনির অভাবে চা নেই, কেরসিনের অভাবে ঘরে আলো নেই, জিনিস পত্রের দাম নেই। চারিদিকে শুধু নেই আর নেই।
শুধারাম জেলে রাতে আব্দুল্লার বাড়িতে এসে বলে- আব্দুল্লাহ দা তোমা কাঁও দুই-চারদিন ভারতে যাবেন না। ওমারগুলার কথা বার্তা মোর কাছে ভালো লাগে নাই। এ মুহুর্তে ওমরাগুলা পাগলা কুত্তার মতো হয়া আছে, যে কাউকে মারি ফেলাইতেও কোন দ্বিধা করিবে না। তোমারগুলার মধ্যে এমন কোঁও আছে যায় এ সংবাদ গুলা রাতারাতি ভারতে পৌছে দেয়। কায় এমন করিবার নাগছে সেটা যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাক খুঁজি বাহির করির নাগবে। তা নাহলে ভবিষ্যতে বিপদ আরো বাড়বে।
সারারাত গাছের নিচে সাপ, জোঁক আর মশাদের উৎপাত সহ্য করে, চাতকের মতো ওপারে যাওয়ার ব্যাকুল প্রতিক্ষায় বসে থেকে, কোন এক সময় সুযোগবুঝে ‘বি, এস, এফ’ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে পাটগ্রামে যেয়ে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সামগ্রি নিয়ে আসত। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে সেটিও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
ইতিমধ্যে ভারতের “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” অবগত হয়ে যায় যে, ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার যুবকেরা নাকি সামরিক ট্রেনিং নিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে অবসর প্রাপ্ত সৈনিকেরা সেখানে যেয়ে গ্রামের যুবকদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে অনেক সাংবাদিক ও কলাকুশলী সেখানে যেয়ে তাদের সব-ধরণের সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশ করছে। বিবিসির মতো শক্তিশালি গণমাধ্যম অহরহ ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার সংবাদ পরিবেশন করছে। এতেকরে গোটা বিশ্ব জেনে যায় যে, এখানকার মানুষেরা অবরুদ্ধ অবস্থায়, মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ফলে সমগ্র বিশ্বের কাছে ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতা একটি সহানুভুতির স্থান দখল করেছে। আমরা এর বিপক্ষে যা করছি সবি তাদেরই পক্ষে চলে যাচ্ছে। যাহাই হোক, আর যাকিছুই ঘটুক না কেন, আমাদের হাল ছেড়ে দিলে চলবে না, তাদের উপর আরো কড়া নজর রাখতে হবে, কোন ভাবে যেন তারা ভারতের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। একটি দুধের বাচ্চাও যেন ভারতে আসতে না পারে। অবরুদ্ধ অবস্থায়, অনাহারে তারা কতোদিন থাকতে পারে আর কতোদিন তাদের প্রচারণা চালাতে পারে।
‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতার অবরোধের দিন দশেক পরে, তারিখটা আমার মনে নেই আর হাতে ঘড়িও ছিল না তাই সূর্যের উপর আন্দাজ করে সময়কে যথাযথ ভাবে পরিমাপ করা দুষ্কর, তবে সকাল নয়-দশটার মতো হবে। একজন মানুষ প্রাণের ভয়ে দৌড়াচ্ছে, জান-প্রাণ ছেড়ে দিয়ে দৌড়াচ্ছে। কোন রাস্তা নয়, খাল-বিল, ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু আল, কাঁদা-পানিতে ভরা জমির মধ্যদিয়ে। পরনে তার একটা গাঢ় সবুজ রঙের লুঙ্গি-প্রায় হাটুরও উপর পর্যন্ত গোছানো, গায়ে রঙ জ্বলে যাওয়া একটা হাফহাতা শার্ট তার পিছনের দিকে অনেকটা ছেড়া। মাথায় একখানা গামছা বাঁধা তাকে দুর থেকে দেখে চেনার কোন উপায় নেই যে এটা সাংবাদিক মোনাজাত। সে আমাদের পিছনের গেইট দিয়ে হাফাতে-হাফাতে বাড়িতে ঢুকে, তারপর মাকে বলে- ‘মা আমি সাংবাদিক মুনাজাত, বি,এস, এফ আমার পিছু নিয়েছে আমাকে তাড়াতাড়ি একটা লুকানোর জায়গা দেন’। ওরা আমাকে ধরতে পারলে মেরে ফেলবে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে-মা ধানের গোলায় একটা একটা ধান রাখার ডুলিতে (বাঁশের তৈরী ধান রাখার খাঁচা) তাকে ঢেকে রাখেন।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে রাইফেল ঘাড়ে দু’জন বি,এস,এফ এলো। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছি বলে আমাদেরকে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল-‘এক খাতারনাক আদমি ইধার আয়া, তুমলোক উসকো দেখা কেয়া?’
আমি হাত নেড়ে জানালাম যে না, এদিকে কেউ আসে নি। ওরা চলে যাচ্ছিল, কি যেন মনে করে আবার ফিরে এল। এদিক সেদিক ভালো করে দেখে চলে গেল।
মুনাজাত সাংবাদিককে ধরতে না পেয়ে তারা নিজে নিজে মাটিতে লাথি মেরে, হিন্দিতে অনেক গালি-গালাজ করে। তারা চলে গেলে একটু দুর থেকে আমি তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করি, আসলে তারা চলে যায় নাকি আবার কোথাও যেয়ে বসে থাকে। কিন্তু না, সত্যি সত্যি তারা চলে যায়। আমি মাকে গিয়ে বললাম-মা ওরা চলে গেছে, তুমি ভাইকে বাইরে আসতে বলো।
মা আমাকে বলে- তুই ভালো করে দেখেছিস? তারা চলে গেছে না কোথাও গিয়ে লুকিয়ে আছে।
মা আমি সাঁকোয়া নদী পর্যন্ত তাদের পিছে পিছে গিয়েছিলাম, তারা নদী পার হয়ে যাওয়ার পর আমি বাড়ি ফিরে আসি।
আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, উনি গোলা ঘরে লুকিয়ে আছেন, তুই ওনাকে বাইরে আসতে বল্।
আমি মুনাজাত ভাইকে বাইরে নিয়ে এসে, গোসলখানায় নিয়ে গেলাম।
মা টেবিলে ভাত সাজিয়ে রেখে তাকে ডেকে বলে- বাবা উপস্থিত যা আছে তা দিয়েই একটু খেয়ে নেন।
মুনাজাত ভাইয়ের হয়তো ভীষণ ক্ষুধা লেগেছিল তাই কোন কথা না বলে সোজা টেবিলে এ বসে পড়লো। খাওয়া শেষে পান দিতে দিতে মা বলে আপনার সাথে যে আর একজন এসেছিল উনি কোথায়?
ও’ গত পরশু চলে গেছে, এখানকার নিউজগুলো পত্রিকায় কাভার করার জন্য। খালাম্মা আপনারা সব খবর রাখেন দেখছি।
হ্যাঁ বাবা, আপনারা নিজের জীবন বাজি রেখে আমাদের জন্য এখানে পড়ে আছেন, আর আমরা যদি এটুকু না জানি তাহলে তো বিষয়টা ভীষণ স্বার্থপরের মতো হয়ে যায় না?
আমার ছেলে মজিবর পাটগ্রাম সরকারি কলেজে পড়ে। দেখতে অনেকটা আপনার মতো উঁচা-লম্বা, গায়ের রঙ আপনার মতই।
হ্যাঁ খালামা, আমি ওনাকে চিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে উনিও ছিলেন। কিন্তু ওনার বাড়ি যে এখানে সেটা জানতাম না। ভালোই হলো সবার সাথে দেখা হয়ে গেলো। খালামা আমি এখন আসি। আমার জন্য দোয়া করবেন।
আচ্ছা বাবা, কিছু মনে না করলে আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
জী-খালামা বলেন, মনে করার কি আছে। তবে খালামা আমি আপনার ছেলে মজিবরের সমবয়সী কাজেই আমাকে তুমি করে বলেন। আপনি করে বললে আমার লজ্জা লাগে।
ঠিক আছে বাবা, বি,এস,এফ তোমার পিছু নিল কেন?
খালামা, আমি আসার প্রায় সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল, বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানতে পারলাম যে, দহগ্রামের অকিাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা মুসলমানদের বিপক্ষে কাজ করছে। অনেকে ভারতের লোকদের সাথে নিয়োমিত যোগাযোগ রেখে এখানকার সকল সংবাদ রাতারাতি সেখানে পাচার করছে। ফলে ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতায় যা কিছুই ঘটুক না কেন তারা সেই সংবাদ খুব দ্রæত পেয়ে যাচ্ছে। কারা এ কাজ গুলো করছে সেটা জানার জন্য আমি ছদ্মবেশে কামলা সেজে তাদের কাছা কাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু বি.এস.এফ-যে আমাদের বাংলাদেশে ঢুকতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না। আমি যে বাড়িটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তার একটু দুরে বর্ডারের কাছে দ’ুজন বি.এস.এফ-কে আমি দেখতে পাই। তাদের দেখে আমি ফিরে আসার জন্য হাঁটতে থাকি। আমি জানি না হয়তো বি.এস.এফ-কে কেউ বলেছে যে এ লোককে কোনদিন দেখিনি। তাই তারা আমার পিছু নেয়, এক সময় তারা আমাকে থামতে বলে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি দৌড় দেই। আমি জানি এটা বাংলাদেশ ওরা আমাকে এখান থেকে ধরে নিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু মাঝখানে অনেক ঝামেলা হবে, মারা-মারি হবে একপর্যায়ে আত্মরক্ষার জন্য তারা গোলা-গুলিও করতে পারে এমনি এতে কার প্রাণও চলে যেতে পারে। সেটা ভেবে আমি পালিয়ে এসেছি।
তুমি বুদ্ধিমানের কাজ করেছ বাবা। অহেতুক ঝামেলায় না জড়ানোই ভালো। তবে এখন থেকে খুব সাবধানে চলাফেরা করিও বাবা। তোমাদের থাকা, খাওয়া-দাওয়া কোথায় হচ্ছে বাবা? আমার এখানেও এসে থাকতে পার।
যেদিন যেখানে পাই সেখানেই থাকি। গত কয়েদিন ধরে শামছুল মাস্টারের বাসায় ছিলাম। গতরাতে আবার তফিজুল মেম্বার আমাকে নিয়ে এসেছেন তার বাড়িতে। ও আচ্ছা, তফিজুল মেম্বার আমার চাচাত ভাই। আমার বাবার বাড়ি আরও আকটু সামনে, চাচা ওপাশটায় যেয়ে বাড়ি করেছেন।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now