বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরের রাত তখন গভীর। পথঘাটে মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে বেশ আগেই। ফুটপাতের চায়ের দোকানে শুধু দু-একজন দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে চা চুমুক দিচ্ছিল। রাস্তার ওপারে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতি নিয়মিত ছন্দে জ্বলে-নেভে, যেন অন্ধকারে নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করছে। এর মাঝেই অরিন্দমের মোটরসাইকেল এগোচ্ছিল খানিকটা ক্লান্তি নিয়ে। হাসপাতালের ডিউটি সেরে ফিরছিল সে। প্রতিদিনের মতো আজও ভিতরে একটা অজানা দায়িত্ববোধ আর মানুষের অসহায় মুখগুলোর স্মৃতি তার মনকে ভারী করে রেখেছিল।
রেলস্টেশনের মোড়ে পৌঁছাতেই হঠাৎ ভিড় চোখে পড়ল। একদল মানুষ গোল করে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝখান থেকে শোনা যাচ্ছে আতঙ্কে ভরা কয়েকটি চিৎকার। অরিন্দম স্বভাবগত তাড়নায় ব্রেক চাপল। মোটরসাইকেল থামতেই সে দেখল—মাঝে একজন মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছে। কেউ একজন ডেকে উঠল, “ভাইয়া, মনে হয় মানুষটা জ্ঞান হারাইছে!” আরেকজন বলল, “কেউ কি ৯৯৯-এ ফোন দিছে?”
অরিন্দম দ্রুত এগিয়ে গেল। ভিড়ের মুখগুলো উদ্বিগ্ন, কিন্তু কেউ স্পর্শ করতে সাহস পাচ্ছে না—কেউ জানে না কী করতে হবে। মানুষটার মুখ মলিন, শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনও লক্ষণ নেই, বুকও ওঠানামা করছে না। অরিন্দমের মনে পড়ল তার মেডিকেল ট্রেনিংয়ের প্রথম ক্লাসের কথা—প্রশিক্ষক বলেছিলেন, “মানুষের জীবন বাঁচাতে কখনও কখনও শুধু পাঁচ থেকে সাত মিনিটই থাকে। সময়টা যদি তুমি কাজে লাগাতে পারো, তুমি হয়ে উঠতে পারো কারও জীবনের আলো।”
সে গলায় হাত দিয়ে বলল, “সবাই একটু সরে দাঁড়ান, জায়গা লাগবে।” তারপর লোকটিকে শক্ত মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে দিল। প্রথমেই পরীক্ষা করল—সাড়া আছে কি না। দু’বার ডাকল, কাঁধে হাত রাখল—কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। পাশের একজন বলল, “ভাইয়া, মনে হয় মারা গেছে।” অরিন্দম মাথা নাড়ল,
“না, এখনো সময় আছে। কেউ ৯৯৯-এ কল করুন—দ্রুত।”
এক তরুণ ফোন বের করল, স্পিকার অন করে কল করতে লাগল। অরিন্দম মাথা সামান্য পেছনে ঠেলে রোগীর নাক-মুখের কাছে মুখ নিয়ে যাচাই করল—বাতাস নেই, বুকও উঠছে না। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে হাত দুটো বুকে রাখল, ঠিক নিপল লাইনের মাঝ বরাবর। চারপাশের মানুষ শ্বাস চেপে তাকিয়ে রইল। তারপর সে বুকের ওপর ঠেলা দিতে শুরু করল—এক, দুই, তিন… ছন্দবদ্ধভাবে, শরীরের ওজন ব্যবহার করে প্রতিটা চাপ যেন বুকের গভীর পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রতি মিনিটে একশ’র বেশি চাপ। তার কপালে ঘাম জমে উঠল, কিন্তু হাত থামল না।
৩০ টি চাপ সম্পন্ন করতে না করতেই ভিড়ের মধ্যে একটা প্রত্যাশার দোলা বয়ে গেল। তারপর অরিন্দম মাথা পেছনে ঠেলে রোগীর চিবুক তুলল, নাক চেপে ধরে মুখে মুখ লাগাল। এক সেকেন্ডে একটি শ্বাস দিল। ভিড়ের কেউ কেউ ভয়ে চোখ বন্ধ করল; কেউ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রথম শ্বাসে বুক ওঠেনি। সে আবার বুকের অবস্থান ঠিক করে দ্বিতীয়বার শ্বাস দিল। এবার সামান্য নড়েচড়ে উঠল বুক। অরিন্দম বুঝল, সে সঠিক পথেই যাচ্ছে।
আবার শুরু করল বুক চাপ দেওয়া। “এক, দুই, তিন…” চারপাশের মানুষ গুনতে লাগল তার সাথে। কেউ একজন বলল, “ভাইয়া, আপনি পারলে মানুষটা বাঁচবো।” আরেকজন দাঁত চেপে বলল, “আমরা কই এত আগে এই CPR শিখলাম না?”
দ্বিতীয় চক্র শেষে শ্বাস দিতে গেল অরিন্দম। এ বার প্রথম ফুঁতেই বুক খানিকটা উঁচু হলো। ভিড়ের মধ্যে আশা জাগল। ততক্ষণে দূরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল—৯৯৯ কল করা ছেলেটা বলল, “ভাইয়া, আসতেছে! আর একটু চালাইয়েন।”
অরিন্দমের হাত ব্যথা হয়ে গেছে, শ্বাস দ্রুত চলছে, কিন্তু সে থামল না। তৃতীয়বার চাপ দিতে দিতে হঠাৎ অনুভব করল—রোগীর বুকের ভিতরে যেন সূক্ষ্ম একটা নড়াচড়া হচ্ছে। সে দ্রুত শ্বাস পরীক্ষা করল। খুব হালকা, প্রায় না-শোনা এক নিঃশ্বাসের শব্দ মিলল। অরিন্দমের গলা শুকিয়ে গেল উত্তেজনায়—সে চিৎকার করে বলল,
“শ্বাস ফিরতেছে! সবাই একটু দূরে থাকুন—চাপ দেবো না এখন।”
অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল। দুইজন প্যারামেডিক দৌড়ে এসে রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করল। তাদের একজন অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি যদি CPR না দিতেন, মানুষটা আর বাঁচত না। আপনি ওর জীবন ফিরিয়ে দিলেন।”
অরিন্দম শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে দেখল, লোকটির হাত সামান্য নড়ল, চোখের পাতা কেঁপে উঠল—জীবন ফিরে আসার প্রথম স্পন্দন যেন। ভিড় হঠাৎ করেই করতালিতে ফেটে পড়ল। কেউ কেউ আবেগে কেঁদে ফেলল। এতক্ষণ যারা ভয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাই এখন অরিন্দমকে ধরাধরি করে দাঁড় করাচ্ছে, পানি দিচ্ছে।
যখন রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো, প্যারামেডিকরা বলল, “হাসপাতালে নেওয়া হবে, তবে এখনো স্থিতিশীল। CPRটাই সবকিছু বদলে দিয়েছে।”
ভিড় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। অরিন্দম মোটরসাইকেলের পাশে এসে দাঁড়াল। রাতের বাতাস একটু ঠান্ডা লাগছিল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো তার মুখে পড়ে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা তৈরি করছিল। সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকল সেই জায়গার দিকে, যেখানে কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
তার মনে হতে লাগল—মানুষের জীবন রক্ষা করতে সবসময় ডাক্তার হওয়া লাগে না, ওষুধ লাগে না, বড় হাসপাতাল লাগে না। কখনও কখনও শুধু দুটি হাত, সামান্য জ্ঞান আর ইচ্ছা—এগুলিই যথেষ্ট। পাঁচ মিনিটই একজন মানুষকে মৃত্যুর গভীর অন্ধকার থেকে টেনে আনতে পারে।
সে নিজের মনেই বলল, “বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যদি CPR জানত, তবে কত পরিবার অকাল শোক থেকে বাঁচত!”
রাত অনেক হয়ে গেছে। অরিন্দম বাড়ির পথে মোটরসাইকেল চালাতে লাগল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলি হালকা বাতাসে দুলছে, স্ট্রিটলাইটের নিচে লম্বা ছায়া পড়ছে। তার মনে হচ্ছিল—আজকের রাতটা শুধু একটি জীবন বাঁচানোর ঘটনা নয়, বরং তার নিজের জীবনেও একটি নতুন আলো জ্বলে উঠেছে। জীবন যত অপ্রত্যাশিতই হোক, মানুষ মানুষকে বাঁচাতে পারে—যদি সে জ্ঞান রাখে, সাহস রাখে, চেষ্টা রাখে।
আজকের রাত অরিন্দমকে শিখিয়ে দিল—
যখনই কেউ পড়ে যায়, অচেতন হয়ে যায়, শ্বাস বন্ধ হয়, তখন পালিয়ে যাওয়া বা দাঁড়িয়ে দেখা নয়—কেউ না কেউ এগিয়ে যাবে, হাত বাড়াবে, বুক চাপ দেবে, শ্বাস দেবে, হারিয়ে যাওয়া জীবন ফিরিয়ে আনবে।
আর সে জানে—
যতদিন মানুষ বাঁচতে চায়, ততদিন CPR শেখা, শেখানো আর প্রয়োগ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব হয়ে থাকবে।
রেলস্টেশনের মোড়টি তখন আবার শান্ত। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই অরিন্দমের কানে যেন ভেসে আসে এক অদৃশ্য কণ্ঠ—যে কণ্ঠ বলে, “ধন্যবাদ… আমাকে বাঁচানোর জন্য।”
আজকের রাতটি তার কাছে শুধু ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরা রাত নয়।
এ রাত—পাঁচ মিনিটের আলো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now