বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৬
ওমর আলি প্রধান, শামছুল মাস্টার, তফিজুল সরকার ও মঈন উদ্দিন মেম্বার সহ গ্রামের আরও কয়েকজন সেখানে বসে আছেন, কারও মুখে হাসি নেই সবাই যেন একটা ভয়াবহ সঙ্কটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে সবাই। এভাবে অবরুদ্ধ অবস্থায় কতদিন বাঁচা যায়। বিষয়টি সরকারের উপর মহলে জানানো দরকার। কিন্তু সেটা কিভাবে? ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার যে সকল ছেলেরা বাহিরে থেকে পড়াশোনা করছে শামছুল মাস্টার ও সাবুবর রহমান তাদের সাথে নিয়োমিত যোগাযোগ রাখে। তাছাড়া “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা সংগ্রাম কমিটি” গঠন করা হয়েছে, যেখানে সাবুবর প্রমানিক, আজহারুল প্রধান, মজিবর রহমান, আব্দুল কাদের, নজরুল সরকার, মনজুর কাদের, রেজানুর প্রধান, দেলোয়ার হোসেন, সিরাজুল ইসলাম সহ অন্যান্য যুবকক ছেলেরা কাজ করছে। আমাদের এ দুরাবস্থার খবরাখবর তাদের কাছে কোন ভাবে পৌছে দিতে পারলে তারা এগুলোকে বিভিন্ন পেপার-পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করতে পারবে। “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের জীবনে একটা সম্ভাবনার দার উম্মুক্ত হবে।
আব্দুল্লাহ এসে সালাম দিয়ে বলে- স্যার মোক ডাকাইছেন?
হ্যাঁ আব্দুল্লাহ, ওখানে বস। আব্দুল্লাহ কি হয়েছিল তোমার? শুনলাম, কারা নাকি তোমাকে খুব মার-ধোর করেছে?
সেই হৃদয়-বিদারক ঘটনার কথা মনে হতেই আব্দুল্লাহর দুচোখ জলে ছল-ছল হয়ে ওঠে। আব্দুল্লাহ বলে- স্যার মুইতো গরিব মানুষ, দিন মিলে দিন খাঁও। সতিরপুলের পাশে দেবীর ডাঙ্গায় এক বাড়িতে মুই দুই-তিন বছর থাকি কাজ করো । দাদাটা একেবারে মাটির মানুষ। মোক খুব ভালোবাসে। সব সময় মোর বাড়ির খবরাখবর নেয়। প্রতিদিনের মতো কাজ শেষ করি চাল-ডাল নিয়া বাড়ির দিকে রওনা হই। হামার বর্ডারের কাছে হঠাৎ করে চার পাঁচটা জোয়ান চ্যাংরা আসি মোর চাউলের পোটলাটা কাড়ি নেয়, কোন কথা-বার্তা নাই মোক একটার পর একটা লাথি কিল, ঘুষি মারতে থাকে। সারাদিনের কাজের শরীর সহ্য করির না পায়া যখন মুই অজ্ঞান হয়া মাটিত পড়ি যাঁও, তখন মরি গেইছে মনে করি ওরা মোক ছাড়ি চলি যায়। মাঠে গরু নেওয়ার জন্য আসা যতীন দাদা (টেপড়ি যতীন) মোক মাটিতে অজ্ঞান হয়া পড়ি থাকির দেখি আশে-পাশের দুই চার জন লোককে ডাকে তার বাড়ি ধরি যায়। মোর মাথায় পানি ঢালা-ঢালি করে, নগেন দাদা একজন গ্রাম্য ডাক্তারকেও ডাকে আনে। জ্ঞান ফেরার পর দাদা মোক সব ঘটনা খুলে কয়। একটু সুস্থ হইলে, নগেন দাদা মোক জিজ্ঞাসা করে- আব্দুল্লাহ তোর কি হইছিল রে?
মুই সম্পূর্ণ ঘটনাটা তাকে খুলি কঁও। কিন্তু কথা কইতে মোর খুব কষ্ট হবার নাগছিল। দাদা মোক আরও জিজ্ঞাসা করেছিল- যে ছেলেগুলো তোক মারছিল তুই তাদের কাউকে চেনিস কি না। মুই কনু যে না দাদা সবাইকে চিনো না, তবে দুই একজনকে মোর মুখ চেনা আছে। সামনে দেখলেই চিনিবার পাইম।
নগেন দাদার দেয়া ঔষধ দেয়া সেই ঔষধগুলো খ্যায়া অনেকটা আরাগ্য মনে হবার নাগছে।
আব্দুল্লাহর মুখে তার উপর নির্যাতনের ভয়াবহ ঘটনা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। পিছন থেকে একজন উঠে বলে, আজকে আব্দুল্লাকে মারছে কালকে আর একজনকে মারবে, পরশু আমাকে মারবে, তাহলে কি আমরা মার খেতেই থাকব? আমাদের কি করার কিছুই নাই?
মাস্টার সাহেব বলেন-কে বলে আমাদের কিছুই করার নাই, আমরা এতটা দুর্বল নই যে তারা মারবে আর আমরা তার প্রতিবাদ করব না। কিন্তু আমাদের হাতে সে সময়টা এখনও আসে নাই। আল্লাহ অবশ্যই আমাদেরকে এমন একদিন দেবে যেদিন তারা আমারেকে দেখে ভয়ে কাঁপতে শুরু করবে। আপনরা সবাই ধৈর্য্য ধারণ করেন সেদিন আমাদের অবশ্যই আসবে, আসতেই হবে।
আব্দুল্লাহ তোমার ঘরে কি খাবার ব্যবস্থা আছে? না থাকলে, তোমার ভাবিকে বলে একদোন (বারো কে.জি) ধান নিয়ে যাও। আর ভারতে এখন কয়েকটা দিন যাইয়ো না। যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন বলেন- সমস্ত ঘটনাবলী ড্র্ফ্টা করে নিউজ আকারে লেখা হয়েছে, এগুলো সাংবাদিক মইনুল হকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে গণমাধ্যমে নিউজগুলো কাভারেজ হতো।
মাস্টার সাহেব বলেন- হ্যাঁ ভাই আপনি ঠিকই বলেছেন্ আমি আজ রাতেই কাউকে দিয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসী এমনি হতভাগ্য যে তাদের নিজের দেশে রাতের আঁধারে পালিয়ে যেতে হয়, বৃষ্টিতে ভিজে, মশার কামড় খেয়ে সারারাত গাছের নিছে বসে থেকে টহলরত বি,এস,এফ এর চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনবিঘা পার হতে হয়। ভালোভাবে পার হতে পারলে তো ভালোই আর যদি বি,এস,এফ এর হাতে ধরা পড়ে তাহলে অমানষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। বি,এস,এফ এর চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে কতজন পঙ্গু হয়ে আছে, কত জনের প্রাণ গেছে।
প্রতিদিনের ন্যায় আজও কয়েকজন যুবক তিনবিঘা পার হয়ে পাটগ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। মোনাজাত সাংবাদিক ও শামসুল মাস্টার তাদের কাছে
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অনেকগুলো রিপোর্ট এর কাগজপত্র যা “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসী সংগ্রাম কমিটির” কাছে পৌছে দিতে হবে। তিনবিঘা পার হওয়ার জন্য সারারাত ধরে তারা গাছের নিচে বসে অপেক্ষা করছে কখন বি,এস,এফ টহল শেষ করে ক্যাম্পে ফিরে যায়, কিন্তু রাত প্রয় শেষ হয়ে আসছে, চারিদিকে দিকে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে, টহলরত বি,এস,এফ কোন ভাবেই টহল ছেড়ে যাচ্ছে না। অবশেষে সে মহেন্দ্রক্ষণ এলো টহলরত বি,এস,এফ চলে যেতে লাগল। তারা একটু দুরে যেতেই তছমলেরা এক দৌড় দেয় পার হওয়ার জন্য, মাত্র তো তিনবিঘা জায়গা যায়গা দৌড়ে পার হতে সময় লাগে এক-দুই মিনিট। কিন্তু এখানেই বিধিবাম, পিছন থেকে আর একদল টহলরত বি,এস,এফ- এসে তাদের ধাওয়া করে, ধরার চেষ্টা করলে তারা এলোমেলো হয়ে দৌড়াতে থাকে, লক্ষ্য একটাই কোন রকমে তিনবিঘা পার হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করা। যারা ভালো দৌড়াতে পারে তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আর বেশী জোরে দৌড়াতে পারে না তারা পড়ে যায় ভাগ্যের বিড়ম্বনায়। তছমল হলো তাদের একজন। বি,এস,এফ পিছন থেকে গুলিছুড়ে আর সেই গুলি এসে লাগে তছমলের পেটের বাম দিকে, সঙ্গে সঙেগ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তছমল। জীবন বাঁচানোর তাগিদে সে কোন রকমে হামাগুড়ি দিয়ে তিনবিঘা পার হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করে। চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে, কথা বলার শক্তি নেই, আস্তে আ¯েত শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। নিজের শরীরটাকে বহন করার মতো আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। তবুও বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টায় শরীরের সমস্ত শক্তিগুলোকে একজায়গায় জরোকরে গলা চেঁচিয়ে তার সঙ্গী সাথিদের ডাকতে চেষ্টা করে। যারা টহলরত বি,এস,এফ- এর চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনবিঘা পার হতে সক্ষম হয়েছে তারা সবাই বাংলাদেশের বর্ডারের কাছে একটা গাছের নিচে বসে বিশ্রাম করছে তারসাথে তাদের সঙ্গী সাথিরা সবাই এসেছে কি না সেটিও দেখছে। সহিদার বললো যে তাদের সাথে তছমল নেই, সে বোধয় বি,এস,এফ এর হাতে ধরা পড়েছে। নিজের প্রাণটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তারা আবার তিনবিঘার কাছে ফিরে আসে তছমলকে খোঁজার জন্য।
পূর্বাকাশে আস্তে আস্তে আলোর রেখা ফুটে উঠেছে চারিদেকে বেশ ফর্সা হতে শুরু করেছে, পাখিরা তাদের আপন নীড় ছেড়ে বাইরে আসতে শুরু করেছে। তাদের কিচির-মিচির কলোকাকুলিতে চারিদিকে মুখরিত হয়ে উঠছে। সামনে আলোর রেখা আর পাখিদের ডাক সবার মনে একটু সাহসের সঞ্চার হলো । তারা বি,এস,এফ এর রাইফেলের গুলির ভয়কে উপেক্ষা করে এদিক সেদিক তছমলকে খুঁজতে লাগল। অনেক্ষণ ধরে খোঁজা খুঁিজর পর অবশেষে সহিদারের চোখে পড়ে, ঝাড় জঙ্গলে ভরা একটা জমির আইলের উপর মাথা রেখে হাত পা ছড়িয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে তছমল। সহিদার আঁৎকে ওঠে, রমজান এসে তার মুখ চেপে ধরে যেন সে চিৎকার করতে না পারে। কারণ হয়তো পাশেই কোথাও লুকিয়ে আছে বি,এস,এফ। তাদের উপস্থিতি টের পেলে তারা আরোও মরিয়া হয়ে উঠতে পারে আবারও গোলা-গুলি করতে পারে। রমজান তছমলের নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখে যে তার নিশ্বাস এখনও সচল আছে, সে বেঁচে আছে। সহিদার ও রমজান দু’জনে মিলে তছমলকে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় ওঠে আসে। যে কোন প্রকারে হোক তাকে খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, তাকে বাঁচাতে হবে।
সঙ্গী-সাথীরা সবাই মিলে তছমলকে ঘারে করে নিয়ে যায় পাটগ্রাম সরকারি হাসপাতালে কিন্তু তছমল কোনভাবেই হাসপাতালে যেতে রাজি হয় না। সে বলে-আমি আজ না হোক কাল তো মরবই, স্বাভাবিক ভাবে মরার চাইতে বি, এস, এফ এর গুলিতে মরা অনেক ভালো। আমি মরে গেলে গ্রামের কল্যাণ হবে, গোটা দেশ জানবে যে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষেরা এভাবে রাতের আঁধারে তিনবিঘা পার হয়, বি, এস,এফ এর গুলিতে, চরম নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মৃত্যু বরণ করে। বাংলাদেশ সরকার সহ উপর মহলের টনক নড়বে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা বলতে বাংদেশের যে একটি অবহেলিত নির্দিষ্ট ভ’খণ্ড আছে সেটি সবার মাথায় থাকবে।
এভাবে হয়তো একদিন দেখা যাবে যে, এখানকার মানুষের প্রাণ ভোমরা তিনবিঘায় যাতায়াতের জন্য একটা সুব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমার জীবনের বিনিময়ে যদি সেটা হয়, তবুও হোক এতে আমার কোন আপত্তি নেই, কোন দুঃখ নেই। আমি হাসি মুখে এই মৃত্যুকে বরণ করে নেব। তোমরা আমাকে হাসপাতালে নিও না ভাই। এই বলে সে আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তছমলের কথায়- সবার চোখ দিয়ে ঝরঝর কওে পানি পড়তে লাগল। সহিদার আবেগ প্রবণ হয়ে তছমলের মাথাটা তার বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটার পর একটা চুমু দেয়। তছমলের কথায় কর্ণপাত না করে দ্রæততার সাথে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় কিন্তু তা অনেক দেরি হয়ে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে অপারেশনের পূর্বেই তছমল এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। তছমলের মৃত্যুর সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে গোটা গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায়, চারিদিকে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মানুষের খুববেশী যে চাওয়া-পাওয়া তা তো নয়, মোটা ভাত কাপড়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা আর স্বাধীন ভাবে প্রাণখুলে মুক্ত বাতাসে একটু নিশ্বাস নেওয়া। এর চেয়ে তো বেশী কিছু তারা চায় না। অনাহারে, অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে তাদের ধৈয্যের সীমা মাঝে মধ্যে হারিয়ে যায়। তখন তারা বাঁধন হারা পাখির মতো এদিক সেদিক ছুটো ছুটি করে। জীবন বাঁচার তাগিদে, স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে রাতের আঁধারে বি,এস,এফ এর চোখকে ফাকি দিয়ে তারা তিনবিঘা পার হতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম হয়ে যায়। লাস হয়ে ফিরে আসতে হয় তাদের।
স্বাধীন ভাবে বাঁচার জন্য, স্বাধীন ভাবে পথ চলার জন্য তিনবিঘার জমিতে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে তছমল প্রমাণ করে গেছে, প্রয়োজনে আরোও রক্ত দেব তবুও আমাদের ন্যাহ্য দাবি, আমাদের ন্যাহ্য পাওনা তিনবিঘা আমরা ছাড়ব না।
পাটগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাত নম্বর ইউনিয়ন হলো ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতা । প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন করে মেম্বার থাকে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা ইউনিয়নে মইন উদ্দিন, তফিজুল হক সরকার ও ললিত কুমার পোদ্দার এই তিনজন মেম্বার।
সূর্যটা পñিম দিকে হেলে পড়লে তাপের প্রখরতাও অনেকটা কমে যায়। শামছুল মাস্টার, মইন উদ্দিন, তফিজুল হক সরকার, সাবুবর রহমান, আজহারুল প্রধানসহ গ্রামের অনেক মুরুব্বি হাঁটতে হাঁটতে ওমর আলি প্রধানের বাড়িতে যান। সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন হঠাত অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই আজ তিনি বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
উমর আলি প্রধান সবাইকে দেখে কোন এক অজানা আতঙ্কে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। গুরুতর কোন দুর্ঘটনা না ঘটলে কর্মব্যস্ত এসকল মানুষ কখনোই সময় নষ্ট করেন না। তাই তিনি একটু বিচলিচ ভাবেই জিজ্ঞাসা করলেন-কি বাহে মইন? নতুন করে আবার কোন দুর্ঘটনা ঘটলো নাকি?
চাচাজান, কি আর বলি আপনাকে। গ্রামের অবস্থা এটা তো নতুন কিছু নয় তবে দিন দিন আরও খারাপেরে দিকে যাচ্ছে, আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
হ্যাঁ বাবা, আমারতো আর বয়স নাই যে, তোমাদের সাথে দৌড়া-দৌড়ি করে কাজ করব। তবে তোমরা সবাই মিলে গ্রামটাকে, গ্রামের এই অশিক্ষিত সহজ সরল মানুষগুলোকে বাঁচাও। আমার মনে হয় তোমাদের উচিত প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় যুবক ছেলেদের নিয়ে একটা করে দল গঠন করা। যারা সারারাত পাহারা দেবে। প্রয়োজনে দু’তিনটা করে দল গঠন করবে, একদল সন্ধা থেকে অর্ধেক রাত আর বাকি রাত থাকবে অন্য দল। এতে করে দু’টো সুবিধা পাওয়া যাবে, চোর ডাকাতের উপদ্রব থেকে বাঁচা যাবে আর অন্যটি হল শত্রæরা ভয়ে গ্রামে প্রবেশ করার সাহস পাবে না। তোমরা কি বল?
হ্যাঁ চাচাজান, আমরা সবাই মিলে আপনার কাছেতো এ জন্যই এসেছি, আপনি আমাদের মরুব্বি ও গুরুজন। আপনার পরামর্শ আমাদের এই মুহূর্তে খুব দরকার।
তফিজুল সরকার বলেন- চাচা আপনি হয়তো শুনেছেন যে, আজ সকাল বেলা মাছ বিক্রি করার জন্য গ্রামের গরিব মানুষেরা ধাপড়ার হাটে যায়। হঠাৎ করে কয়েকজন উশৃঙ্খল যুবক এসে তাদের মাছগুলো কেড়ে নিয়ে মার-ধর করে। পরে বি,এস,এফ এসে নাকি তাদের উদ্ধার করে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্য়ন্ত বি,এস,এফ গ্রামবাসীকে হাটে যেতে নিষেধ করে।
মইন উদ্দিন মেম্বার বলেন- হ্যাঁ চাচাজান, বিষয়টা এতটা খারাপের দিকে যাবে ভাবতে পারি নাই। গোটা গ্রামবাসীর মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আমি যে একেবারে বসে আছি তাও না, ললিত মেম্বার সহ আমরা বি,এস,এফ ক্যাম্পে গিয়েছিলাম, সমস্ত ঘটনা তাদেরকে জানিয়েছি। ধাপড়ার হাটকে তারা কড়া নিয়ন্ত্রণ করবে, কোন সমস্যা হবেনা বলে আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছে।
শোন মেম্বার “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” এর কিছু বখাটে ও উশৃঙ্খল ছেলে পেলে, এর সাথে যোগ দিয়েছে বজরং দলের সদস্যরা। তারা তো প্রশাসনকে জিজ্ঞাসা করে কোন কিছু করবে না? কাজে প্রশাসন বল আর বি,এস,এফ বল তারা টেড়ই পাবে না যে কখন ঘটনা ঘটবে।
“তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার একটি ছোট বাচ্চাকেও আর ভারতের মাটিতে পা রাখতে দেবে না, এমনটি শোনা যাচ্ছে। তারা নাকি বলেছে, ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতারকে যে কোন কিছুর বিনিময়ে দখল করে নেবে। তারা ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার মানুষ চায় না, মাটি চায়। যে কোনদিন, যে কোন সময়ে তারা নাকি গ্রামে হামলা করে গ্রামবাসীকে তাড়িয়ে দেবে। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো, ডাহাগ্রাম-অঙ্গাারপোতার হিন্দু ধর্মালম্বিরা তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তোমরা বল এ পরিস্থিতিতে আমরা কি করতে পারি। যদি তারা রাতে হামলা করে, কোন অপ্রীতিকর ঘনটা ঘটায় তাহলে আমাদের জান মাল সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে, মা-বোনদের নিরাপত্তা দিতে পারবো না।
উমর আলি প্রধান বলেন-সাবু, তুমি তোমার এলাকার যুবক ছেলেদের নিয়ে রাতে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করো।
তফিজুল তুমি বঙ্গেরবাড়িসহ ডাহাগ্রামের মধ্যবর্তি এলাকার যুবক ছেলেদের নিয়ে পাহারার ব্যবস্থা কর।
মঈন উদ্দিন তুমি ডাহাগ্রামের পূর্ব ও দক্ষিণ এলাকার সবাইকে ডেকে রাতে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করো। তোমরা সবাইমিলে পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
যে কথা সেই কাজ, প্রত্যেক এলাকার যুবক ছেলেরা পালাক্রমে সারারাত ধরে পাহারা দিতে লাগল। এ সংবাদটা “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” এর কানে পৌছে যাওয়ায় তারা অনেকটা দমে গেল। কিন্তু প্রতিহিংসার আগুন ভেতরে ভেতরে তুষের মতো জ্বলতে লাগল।
প্রিয় পাঠক আমি পূর্বেই বলেছি যে “তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটি” অনেকটা জাতিগত প্রতিহিংসা ও সাম্প্রয়িক সংঘর্ষের মানসিকতার আদলে কাজ করছে। কোন সুস্থ চিন্তা চেতনা কিংবা সুস্থ মস্তিষ্কের প্ররোচণায় তারা কোন কাজ করে না। একজন প্রসিদ্ধ লেখকের কলমের কালি যেমন দেশের অভুতপূর্ব কল্যাণ সাধন করতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহারেও সৃষ্টি হতে পারে বিদ্বেষ-বাষ্প, হিংস্রতা ও সাম্প্রয়িকতার তাণ্বডলীলা। অনুরূপ একজন আদর্শ নেতার মুখের বাণী যেমন একটি দেশের কল্যাণে বিপ্লব ঘটাতে পারে, তেমনি তার অপব্যবহারেও সৃষ্টি হতে পারে মানুষের হিংস্রতা ও সাম্প্রদাায়িক সংঘর্ষেও তাণ্বডলীলা।
তৎকালে কিছু অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীনচেতা মানুষ, সে হিন্দু-কিংবা মুসলমান যেই হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টির বিপক্ষে ছিল তাদের জোরাল প্রতিবাদ। ধাপড়ার হাটে ডা. প্রফুল্ল কুমার, ডা. মৃত্যুঞ্জয়, নারায়ন মাস্টার, বাবু খগেন রায়, মণি পাল, নির্মল দত্ত, দিলিপ রায় প্রমুখ প্রবীণ ব্যক্তিরা সব সময় এ সব সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে কথা বলেছিলেন। তারা বলেন- সাম্প্রদায়িকতা কখনো মানবতার কল্যাণ সাধন করতে পারে না। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলজুড়ে যে সাম্প্রায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত হতে চলেছে তা অচিরে বন্ধ করা না গেলে এটা ভবিষ্যতে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
‘তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটির’ লোকেরা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে একটা বাজে সাম্প্রদায়িক কুচিন্তা ও ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করেছিল যে, তিনবিঘা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হলে, মুসলমানদের অত্যাচারে তারা সেখানে বসবাস করতে পারবে না। তাদেরকে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা ছেড়ে পালাতে হবে। তবে অনেকে আবার এটা মনে করতেন না। তারা হিন্দু-মুসলমান একসাথে মিলে-মিশে বসবাস করার পক্ষপাতি ছিল। এ সব অসাম্প্রদায়িক হিন্দুরা বরাবরে সবার সাথে মিলে-মিশে থাকতো এবং মুসলমানদেরকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করত।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা ভারতে উঠতে না পারলেও কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানে অবাধে যাতায়াত করতে করছে। তাদেরকে কোন বাঁধা দেয়া হচ্ছে না। অনেকের মতে-এভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অবরুদ্ধ মুসলমাদের এ দুর্যোগময় মূহুর্তে, যে সকল অসাম্প্রদায়িক হিন্দুরা সবার সাথে মিলে মিশে থাকতে চায়, তারাই মুসলমানদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তারা নিজে ঘাড়ে করে চুপি চুপি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দেয়। কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ এনে দেয়। অবশ্য এ রকম পরিবারের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হয়ত ভালো মানুষদের সংখ্যা কম বলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, এত ঝামেলা।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায়কোন প্রশাসন নেই, অস্ত্র নেই, খালি হাতে নিরাপরাধ অসহায় গ্রামবাসীরা স্বাভাবিক ভাবেই শত্রæর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছিল। রাস্তা-ঘাটে কিংবা বাড়ির বইরে খুব কম লোকজনের দেখা পাওয়া যেত। অবরুদ্ধ অবস্থায় ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ল গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো, যারা দিন আনে দিন খায়। এভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত খাদ্যাভাবে অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে থেকে তাদের মুখগুলো শুকিয়ে গেছে, চামড়াগুলো কুকড়ে গেছে, অনেকে চলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়েরা অভুক্ত থেকে থেকে একেবারে কঙ্কালশার হয়ে গেল। বুকের মানিকের এমন দুর্দশায় মায়ের মন কি আর স্থির থাকতে পারে? কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মা। কি বিভৎস হাহাকার, নৃশংসতার চিত্র মানুষের মুখে মুখে।
চারিদিকে শুধু শূন্যতা আর হাহাকার, কারও মনে স্বস্থি নেই, শান্তি নেই। ঘর আছে তো চাল নেই, চাল আছে তো লবন নেই, এমন অবস্থায় কি আর মানুষের মন স্বাভাবিক থাকতে পারে? জীবনে দুঃখ-কষ্ট, বেদনা-হতাশা, ব্যর্থতার পাশাপাশি থাকে আনন্দ, সুখের সফলতা। কিন্তু ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতারবাসী আজ পর্যন্ত কোন সুখের মুখ দেখতে পেলো না। মানুষের জীবনে আনন্দ-বেদনার এই কাব্যে কষ্টকে হারিয়ে সফলতা ঢেকে দিক ব্যর্থতাকে, এই প্রত্যাশায় বুক বেঁধে কতো মা হারিয়েছে তার কোলের সন্তান, নাড়িছেঁড়া ধন। ভেবেই পায় না সে, কি নিয়ে বাঁচবে? আপন জনদের হাজারো সান্তনার বাণী তাকে ভুলিয়ে রাখে ক্ষণিকের জন্য। মনকে শক্ত করার চেষ্টা করে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর জীবনে কোন ভালো-মন্দ নেই? উত্থান–পতন নেই? সফলতা-ব্যর্থতাও নেই?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now