বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
— মোহাম্মদ শাহজামান শুভ.
শীতের সকালে কুয়াশা নেমেছে শহরের উপর। রাস্তার বাতিগুলো এখনো জ্বলছে, যেন ঘুমভাঙা কোনো শহরের ক্লান্ত চোখ। পুরোনো গলির এক কোণে বসে আছে এক মানুষ—চুলে ধুলো জমেছে, মুখে দাড়ি, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। কেউ জানে না তার নাম, কোথা থেকে এসেছে, বা কেন এই শহরের ফুটপাথেই তার বসবাস। দোকানদাররা তাকে বলে “পাগল লালু।” কিন্তু লালু কি সত্যিই পাগল? নাকি আমরা সবাই মিলে তাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছি?
সেদিনও লালু একইভাবে বসেছিল। পাশে তার পুরোনো পলিথিনের ব্যাগ, তাতে কিছু ছেঁড়া জামা, একমুঠো ভাঙা বিস্কুট, আর একটা অর্ধেক বোতল পানি। পথচারীরা তার পাশ দিয়ে যায়—কেউ চোখ ফেরায়, কেউ নাকে হাত দেয়, কেউবা থেমে মোবাইলে ছবি তোলে। কিন্তু কেউ কাছে আসে না। একসময় লালু হেসে ওঠে—অকারণেই, যেন নিজের ভেতরের কোনো অদৃশ্য বন্ধু তাকে গল্প শুনিয়েছে।
এই শহরে এমন লালু অনেক। তারা আমাদের চোখের সামনে থাকে, অথচ আমাদের চেতনার বাইরে। স্কুলে, কলেজে, অফিসে, বাজারে—সবখানে আমরা “মানুষ” খুঁজে ফিরি, অথচ পাশের ফুটপাথে বসে থাকা মানুষটার দিকে একবারও তাকাই না।
একদিন সকালে স্কুলের শিক্ষক মেহজাবিন ম্যাডাম ক্লাসে প্রবেশ করলেন। হাতে পত্রিকার কাটা একটা ছবি—একজন মলিন পোশাকের মানুষকে দুই শিশু পানি খাওয়াচ্ছে। ছবিটি তিনি বোর্ডে টাঙালেন।
“তোমরা কী দেখছো এখানে?”—মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন।
একজন ছাত্র বলল, “ম্যাডাম, তারা একটা পাগলকে পানি খাওয়াচ্ছে।”
“আরও ভালোভাবে দেখো,” তিনি বললেন, “তারা একজন মানুষকে সহায়তা করছে।”
এই একটি বাক্যেই যেন শ্রেণিকক্ষের বাতাস বদলে গেল। মেহজাবিন ম্যাডাম তাদের বললেন লালুর গল্প—যিনি একসময় স্কুলশিক্ষক ছিলেন, কিন্তু সন্তান হারানোর শোকে মানসিক ভারসাম্য হারান। পরিবার তাকে রেখে যায়, সমাজ তাকে ভুলে যায়। এখন তিনি শহরের গলিতে ঘোরেন, আর শিশুরা তাকে “পাগল চাচা” বলে ডাকে।
গল্প শুনে শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আলিফ নামের এক ছাত্র বলে, “ম্যাডাম, আমরা কি কিছু করতে পারি ওর জন্য?”
মেহজাবিন হাসলেন, “কেন নয়?”
সেদিন থেকেই তারা স্কুলে “মানবিকতা ক্লাব” গড়ে তোলে। প্রতিদিন কিছু টিফিনের খাবার জমিয়ে রাখে—লালু ও তার মতো মানুষের জন্য। ছুটির পর কয়েকজন মিলে বাজারের পাশে গিয়ে তাদের খাবার দেয়, কথা বলে, হাসায়। একসময় লালু তাদের নাম ধরে ডাকতে শিখে যায়। তার হাসি বদলে যায়—সে আর কাঁদে না, গান গায়।
একদিন পৌরসভা থেকে এক কর্মকর্তা এলো স্কুলে। মেহজাবিন ম্যাডামের উদ্যোগের কথা শুনে তারা বলল, “আমরা এমন মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য একটা ছোট কেন্দ্র খুলব। আপনি কি পরামর্শ দিতে পারেন?”
তিনি মাথা নাড়লেন, চোখে আনন্দের জল।
কয়েক মাস পর শহরের পুরোনো হাসপাতালের একপাশে তৈরি হলো “মানবিক আশ্রয় কেন্দ্র।” সেখানে এসে আশ্রয় পেল লালুর মতো আরও অনেকে। কেউ মানসিক চিকিৎসা পেল, কেউ পেল খাবার, কেউ পেল শুধু মনোযোগ—যা হয়তো ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর।
লালু ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করল। একদিন বলল, “আমি পাগল ছিলাম না, আমি শুধু একা হয়ে গিয়েছিলাম।” তার এই এক বাক্য যেন সমাজের মুখে আঘাতের মতো শোনাল।
এরপর এক রবিবার সকালে মেহজাবিন ম্যাডাম তার ছাত্রদের নিয়ে গেলেন সেই আশ্রয় কেন্দ্রে। তিনি দেখলেন লালু এক শিশুর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তার চোখে এক স্নেহময় দীপ্তি। যেন কোনো হারানো বাবা ফিরে পেয়েছে সন্তানকে।
শহরটি তখনও ব্যস্ত—বাজারে দরদাম, রাস্তায় হর্ণ, রাজনীতির পোস্টার, মোবাইলের স্ক্রল। কিন্তু কোথাও কোথাও পরিবর্তনের বীজ বোনা হয়ে গেছে—একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে, কিছু শিশুর হৃদয় থেকে, এক নারীর মানবিক দৃষ্টি থেকে।
লালু এখন আর ফুটপাথে থাকে না। তাকে প্রায়ই দেখা যায় আশ্রয় কেন্দ্রের বাগানে বসে কবিতা বলতে—
“মানুষ দেখো মানুষকে,
ভালোবাসো কিছুক্ষণ।
তোমার দৃষ্টির উষ্ণতাই
ফিরিয়ে দিতে পারে জীবন।”
তার সেই কণ্ঠে এখন পাগলামি নেই, আছে শান্তি। শহরের ব্যস্ত মানুষরা হয়তো এখনো খুব একটা শোনে না, কিন্তু বাতাসে সেই কণ্ঠ ছড়িয়ে যায়—মৃদু, নীরব, অথচ গভীর।
কখনও কখনও রাতে হালকা বৃষ্টি নামে। শহরের আলো ভিজে ওঠে। দূরে আশ্রয় কেন্দ্রের জানালায় লালু বসে থাকে, তার চোখে এখনো সেই নির্লিপ্ত হাসি, কিন্তু আজ তাতে আছে এক আশ্রয়ের নিশ্চয়তা, এক মানবতার ছোঁয়া।
আমরা হয়তো ভাবি—কতজনকেই বা বদলানো সম্ভব? কিন্তু এক মেহজাবিন, এক আলিফ, এক “মানবিকতা ক্লাব” প্রমাণ করে, পরিবর্তন শুরু হয় একটিমাত্র হৃদয় থেকে। সমাজচ্যুত বলে যাদের আমরা দূরে সরিয়ে দিই, তারা হয়তো কেবল একটু ভালোবাসা, একটু শ্রবণ, একটু আশ্রয়ের অপেক্ষায় থাকে।
অবশেষে, শহরটি যেন একটু করে মানুষ হয়ে ওঠে—যেখানে কেউ আর “পাগল” নয়, বরং প্রত্যেকেই একেকটি অসমাপ্ত গল্প, যার শেষটা আমরা লিখতে পারি কেবল মানবিকতায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now