বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৩
তিনকুড়ি মহাজনের বড় স্ত্রী রহিমা খুব শান্তশিষ্ট একজন মহিলা। তার কোনো রাগ, অভিমান নাই। একটি সন্তানের জন্য সব সময় তার মন কাঁদে। তাই তিনি ভারাক্রান্ত মনে একা একা বসে ভাবেন আর মনে মনে বলেন সৃষ্টিকর্তা কেন যে তাদের উপর বিমুখ হলেন কে জানে। তাদের ঘরে একটি সন্তান দিলে কি এমন ক্ষতি হতো তার?
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনকুড়ি মহাজন বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেন। তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেনÑশোন্ বড় বোউ তোর কি মনটা খুব খারাপ?
ক্যান মহাজন? মুই কি তোমাক খারাপ কিছু কইছিনু?
আরে না, বিশ বছর থাকি তোর সাথে সংসার করিবার নাগছু আর তোর মনের কথা মুই বুঝিবার নও? তোর মুখ দেখলেই মুই কবার পাঁও তোর মনোত কি কথা ঘুরিবার নাগছে।
হায় আল্লাহ! এই বুড়া বয়সে আসি আর এতো কিছু তোমাক বুঝবার নাগবে না। এবার নিজের শরীরের ভালো মন্দটা বুঝলেই হবে।
আরে বোউ, স্যাটেকোনাই তো মোর সমস্যা। সারাটা জীবন মুই শুধু নিজের কথাই ভাব গেনু আর কার কথা ভাবার সময় পাঁও নাই।
বড় বোউ আল্লাহর যাকে ইচ্ছা ছওয়া-সন্তান দেয়, আর যাকে ইচ্ছা দেয় না। এতে মানুষের কোন হাত থাকে না। কতো মানুষের ছওয়া-সন্তান নাই। আবার কতো জনার ছওয়া হওয়ার পরেও পঙ্গু হয়া জন্মে, ওমার গুলারর ব্যথা আরও বেশি। কাজে ছওয়ার জন্যে মন খারাপ করি কি করিবু, আল্লায় হামাক যেটা দেয় নাই সেটা নিয়া সারাদিন কান্দি বেড়াইলেও কোন লাভ হবে না।
রহিমা স্বামীর কথায় আসস্ত হলেও মনকে প্রবোধ দিতে পারে না। নারী জনমে স্বার্থকতা হলো মা হওয়া, সন্তানের মুখে “মা ডাক” পৃথিবীর সর্বোত্তম ও মধুর বাণী। তাই সংসারের কথা চিন্তা করে, স্বামীর ভবিষ্যত বংশকুল রক্ষার কথা চিন্তা করে একদিন তিনকুড়ি খাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল-“মহাজন মোরতো ছওয়া-পওয়া কিছুই হইলো না, তোমার ভবিষ্যত বংশকুল রক্ষার জন্য আর একটা বিয়া করেন। আল্লাহ হয়তো তার কোলে তোমার বংশ রক্ষা করবে”।
সেদিন রহিমার কথায় তিনকুড়ি খাঁ মনে মনে এতটাই আনন্দিত হয়েছিল যে বোউকে কোলে নিয়ে নাচা-নাচি শুরু করেছিল। সাতদিনের মাথায় তিনকুড়ি খাঁ দ্বিতীয় বিয়ে করে, চকচকা একখান বোউ ঘরে নিয়ে আসে। নতুন বোউ পেয়ে তিনকুড়ি খাঁ, রহিমার আর কোন খোঁজ খবর রাখে নাই। জীবন যৌবন শিকায় তুলে রেখে, রহিমা সাজে এ বাড়ির বুড়ি, সংসারের মূখ্য কান্ডারী। তবুও সে মেনে নেয়, তার সব কিছুর বিনিময়ে যদি সংসারে সুখ আসে তাতেও তার সুখ। কিন্তু এখন তার স্বামী নীতি ও নৈতিকতা ভুলে যেয়ে হয়ে গেছে বিয়ে পাগল। সংসারের সুখের চেয়ে এখন তার নিজের সুখটাই মূখ্য। নিজের যৌন ক্ষুধা ও কামনা বাসনা চরিতার্থ করার নিমিত্তে যতো প্রকার অন্যায় কাজ আছে সবই সে নির্বিঘেœ করতে পারে। এতে কারও লাভ হোক, কারও ক্ষতি হোক, কারও জীবন ধ্বংস হোক তাতে তার কিছু আসে যায় না।
রহিমা ভাবে তার জীবনটা যেন কোন জীবনই নয়, কোন দিনই সে তার নিজেকে নিয়ে ভাবার সুযোগ পেলো না তবুও কোথায় যেন অতৃপ্তি, কোথায় যেন একটা শূন্যতা। সে সারা জীবন ধরে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো কেবলি সংসারের চার দেয়ালে ঘোর পাক খায়। নিজেস্ব কে ছাড়িয়ে আরও যে কোন কিছু থাকতে পারে এটা সে কোন দিনই ভেবে দেখার সুযোগ পায় নাই। যতোদিন জীবন আছে ততদিন এভাবে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দেয়া ছাড়া তার আর কোন পথ জানা নাই। জীবনের সুদীর্ঘ বছরগুলো যেন একটি রাতের স্বপ্নের মতো উড়ে গেলো, হঠাৎ মিলিয়ে গেলো। চল্লিশ বছরের কর্মজীবনের শেষে সে হয়ে দাঁড়াল মূল্যহীন, এখন তার রূপ নেই, যৌবন নেই সব কিছুই তার আজ মিলিয়ে গেছে। তাই তার কোন কদরও নেই। রহিমা তার স্বামীর এমন চালচলনে আর অবাক হয় না। সে যতো খুশি বিয়ে করুক, যতো খুশি অন্য কোন মেয়ের কাছে যাক, বাহিরে থাক, ফিরে আসুক অন্য বউয়ের কাছে সে সব তার কাছে আর নতুন মনে হয় না। আপন মনে গজগজ করতে করতে সে ঘরের দিকে যায়, দরজা থেকে দেখে তার বিছানায় আবিয়া শুয়ে আছে।
আবিয়া তোর শরীর খারাপ না কি? সন্ধ্যা বেলায় শুতি আছিস যে।
না বুবু, এমনিতেই শুইয়া আছো, ভালো লাগছে না।
ভালোলাগা কি আর এমনিতেই আইসেরে বুবু ? তার যে অনেক দাম, জীবনের অনেক কিছু দিয়া তাকে কিনি নিবার নাগে। তুই থাক, মুই এ্যাকনা পাকের ঘরে য্যায়া দ্যাখো মিনুর মা কি করির নাগচে।
আচ্ছা বুবু, তোমার দেহটা কি দিয়া গড়া কওতো? তোমার কি এ্যাকনাও খারাপ লাগে না। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ।
হ্যাঁরে বুবু এই সংসারটা গোটায় মোর মাথার উপর, তার বোঝায় মুই দুনিয়ার তামান জ্বালা যন্ত্রণা ভুলি যাও। ।
মোহন প্রতিদিন বাড়িতে এসে প্রথমে রহিমার ঘরে যায়। বুবুর মুখে ভালো মন্দ সব শুনে তারপর নিজের ঘরে যায়। কারণ প্রতিদিন বাজার হতে ফেরার সময় বোনের জন্য এটা সেটা নিয়ে আসে। আবিয়াও সেটা এ কয়েকদিনে উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাই সে মোহনের অপেক্ষায় রহিমার ঘরে শুয়ে আছে।
মোহন আজও তাই করল বাড়িতে ঢুকে সোজা রহিমার ঘরে গেলো, রহিমাকে ঘরে না পেয়ে ঔষধ গুলো টেবিলের উপর রেখে নিজের ঘরে ফিরবে এমন সময় দেখে বিছানায় আবিয়া শুয়ে ঘুমাচ্ছে। আবিয়াকে বুবুর বিছানায় দেখে তার বুকের ভেতরটা ধক্ধক্ করে উঠল। না জানি তার নতুন করে আরও কোন শারীরিক সমস্যা দেখা দিল কিনা। নইলে নিজের ঘর ছেড়ে আবিয়া বুবুর বিছানায় কেন? তাই সে রহিমাকে ডাকে বুবু, ও বুবু-
মোহনের চিৎকার শুনে রহিমা ও ঘর থেকে এসে বলে- কিরে মোহন? ক্যান ডাকেবার নাগছিস?
আচ্ছা বুবু, ছোট বুবুর গায়োত কি আরো জ্বর-টর আসছে না কি?
কই না তো? মোকতো কিছু কয় নাই।
না মানে, ছোটবুবু তোর বিছানায় ঘুমাচ্ছেতো তাই মোর মনে হইলো যে তার আরও নতুন করি কোনকিছু হইল না কি।
না এমনি হয়ত অর ঘরে ভালো লাগছিল না, এ্যাটেকোনা আসি শুইছে।
ও আচ্ছা। ঔষধ কি আছে না শেষ হয়া গেইছে?
মনে হয় আছে, শ্যাষ হয়া গেইলেতো মোক কইল হয়, তুই আবিয়াক এ্যাকনা কয়া দেখতো? ওষুধ না খাইলে ফির আরও জ্বও আসবে।
আচ্ছা বুবু ঠিক আছে।
মোহন হাত মুখ ধুইয়া আয় ভাত খ্যায়ানে। আর কতো রাত মুই এগুলা ধরি বসি থাকিম। মিনুর মার বোলে জ্বর-জ্বর মনে হবার নাগছে তায় ফির তাড়াতাড়ি বাড়ি চলি গেইল।
আবিয়া চোখ বন্ধ করে সব শুনে মনে মনে বলে-ওরে বুদ্ধু, যার জন্য সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করে আছি, এপাশ ওপাশ করে সময় পার করছি, আর সেই গাধা এসে কি না হাটে হাড়ি ভেঙ্গে দিল। আরে গাধা, তুমি এসে অন্তত একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতে? আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি। তারপর না হয় বুবুকে ডাকো। তানা করে এসেই গাধার মতো চিল্লা-চিল্লি শুরু করে দিলো। ইচ্ছে করছে গাধাটার মাথার চুল ধরে টেনে ছিড়ে ফেলি।
মোহন খাওয়া সেরে রহিমার ঘরে এসে মনে মনে পানের বাট্টা খোঁজে। ভাত খাওয়ার পর বুবুর কাছ থেকে একটুকরো সুুপারি নিয়ে মুখে না দিলে যেন তার খাওয়াটা পরিপূর্ণ হয় না। অনেকদিন থেকে এটা তার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। রহিমাও মোহনের জন্য একটুকরো সুপারি তার আঁচলের কোণে গিঠ দিয়ে বেঁধে রাখে, খাওয়ার পর সেটা মোহনকে দেয়। রহিমার বিছানায় তখনও আবিয়া শুয়ে আছে। এবার মোহন আবিয়াকে বলে-বুবু আপনার ঔষধগুলো কি সব ঠিকঠাক আছে না শেষ হয়ে গেছে?
না মোহন ভাই, আর বোধয় ঔষধ আনার প্রযোজন পড়রে না আমি অনেকটা সেরে উঠেছি। আজকে জ্বরটাও আর উঠে নাই।
না বুবু, জ্বর না থাকলেও এন্টিবায়োটিকের ডোজ শেষ করতে হবে। তানাহলে দু’দিন বাদ জ্বর আবার ফিরে আসবে।
সে যাই হোক না কেন মোহন ভাই, জ্বরটা কিন্তু আমাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। সে স্বইচ্ছায় আমাকে চেড়ে যেতেই চাচ্ছে না।
আপনার মতো মানুষ পেলে কেউ কি ভালো না বেসে থাকতে পারে বুবু?
তাই না কি? আপনার কথা শুনে হাসি পায় মোহন ভাই। আমি মানুষ না কি? হয়তো সৃষ্টিকর্তা মনুষ্য অবয়বে, আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একজন নারীমূর্তিতে প্রাণের সংযোগ ঘটিয়েছেন। কিন্তু নিয়তি নামের বস্তÍুটি দিতে ভুলে গেছেন। তাই আমার নারী হয়ে ওঠা, এর চেয়ে বেশি কিছু না মোহন ভাই।
আমি এতোকিছু জানি না ছোটবুবু। তবে অনেক হুজুর সাহেবকে আমি বলতে শুনেছি- মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন- নারীদেরকে নাকি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।
হা হা হা-এটা আবার কেমন নেয়ামত মোহন ভাই? মেয়েরা কি শুধুই ভোগের সামগ্রি হিসেবে প্রাপ্ত নেয়ামত? সংসারের কাজের লোক হিসেবে প্রাপ্ত নেয়ামত? না কি তাকে যা ইচ্ছে তাই করা যায সে হিসেবে প্রাপ্ত নেয়ামত?
আমি এতোকিছু জানি না ছোট বুবু, আর এ বিষয়ে কখনো ভাবিও নাই।
মোহন ভাই- নারীরা আজ শ্রেণিবৈষম্যের কারণে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে চিরকালই অবহেলিত। শ্রেণিবৈষম্যের গহ্বর থেকে উঠে আসা নারীর প্রতি বৈষম্য কোনোদিনও শেষ হবার নয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারী মানে নারীই, পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয় যেন সে। যতোই জাতপাত মুক্ত করতে চায়, ততোই সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে যায় নারী। শ্রেণিভেদে নারীর যে অবস্থান, সেখানে কোন নারী ভালো থাকতে পারে না। নারীরা যতো মুখ খোলে নির্যাতনের মাত্রাটাও বেড়ে যায় ততোগুণে। বিয়ের পর সে অবাক হয়ে দেখে তার ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন মূল্য নেই, নূন্যতম স্বাধীনতা নেই। নারীর প্রতি শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে। নারীরা হলো স্থায়ী সম্পদ, যা ইচ্ছে তা-ই করা যায়।
কোন নারী এতে প্রতিবাদ করতে গেলে, পরিবার সমাজ এবং ব্যক্তির চোখে সে হয় উচ্ছৃঙ্খল আর বেয়াদব । আরও বেশি শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় সে। নির্যাতন, অবিশ্বাস আর ভালোবাসাহীনতায় একটি মেয়ে ধুঁকে ধুঁকে ধ্বংসের দিকে যায়। প্রতিনিয়ত তার দিকে আঙুল তুললে কতোক্ষণ আর নিজেকে সামলে রাখা যায়। আবার নাজুক মানসিকতার কারণে বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবেলা করা বেশিরভাগ নারীর পক্ষেই সম্ভব হয় না। ততোদিনে সে বুঝে যায়, শখ আহ্লাদ আদর ভালোবাসা তার জন্য নয়, প্রাণটা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে, এটাই অনেক বেশি। অনেকটা বেঁচে থাকতে থাকতে মরে যাওয়া অথবা মরার মতো বেঁচে থাকা। কারণ ততদিনে প্রতিবাদ করার শেষ শক্তিটুকুও নিঃশেষ।
শারীরিক মানসিক নির্যাতন হয় তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু বিয়ের পর পরিস্থিতি পুরোই পাল্টে যায়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সমস্যা নেই কিন্তু তখনই বিপত্তি ঘটে যখন ঝামেলা তৈরি হয়, কিছুই ঠিকঠাক থাকে না। এই সমাজে মেয়েটি তখন অনেকটা অপাংক্তেয়। তাই নির্যাতন সহ্য করেও স্বামীর বাড়িকেই শেষ ঠিকানা ভেবে টিকে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। জীবনসঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার এই নারীরা বিবাহবিচ্ছেদ এবং আরও নির্যাতনের ভয়ে সহজে কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না। সবাই না হলেও বেশিরভাগ মেয়েই শান্তি চায়, নিরীহভাবে বাঁচতে চায়। সংসারকে যুদ্ধক্ষেত্র নয়, আনন্দময় করতে চায়।
রাত ক্রমে বেড়েই চলেছে, কিন্তু আবিয়ার চোখে ঘুম নেই, এ পাশ ওপাশ করে কতোবার ঘুমোতে চেষ্টা করলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না, চোখের পাতাগুলোকে কোনভাবে এক করা গেলো না। বাপের বয়সে-বয়স যার, সে কিনা তার স্বামী। একবার ইচ্ছে হয় বটি দিয়ে বুড়োর গলাটা কেটে দেয়। কিন্তু কল্পনা আর বাস্তবতা দু’টো ভিন্ন জিনিস। মনে মনে কল্পনা করাটা খুব সহজ কিন্তু বাস্তবে তার হিবেব মেলানো খুব কঠিন। বিছানা ছেড়ে আবিয়া বাহিরে এসে দাঁড়াল। মনের অজান্তে তার চোখ চলেয়ায় মোহনের ঘরের দরজায়। কিন্তু দরজা খোলা দেখে তার বুঝতে দেরি হলো না যে, মোহন এখনো ফেরে নাই। তাই সে এক পা দু’পা করে এগিয়ে যায় পুকুর পারে।
চারিদিকে নীরবতা কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকাগুলো দলবেঁধে একই সাথে ডেকে উঠছে। দূরের বাঁশ বাগানে কোনো উঁচু গাছের ডালে বসে নিঃসঙ্গ পাখিটা তার স্বজাতি গলায় বোউ কথা কও, বোউ কথা কও বলে-অবিরাম ডেকেই চলেছে, জানি না সে পাখিটা তারই মতো যন্ত্রণায় ছটফট করে বেড়াচ্ছে কি না। পূর্বাকাশে কি ঝলমল করে উঠছে পূর্ণিমার চাঁদ, বাঁধভাঙ্গা জোছনায় ভরিয়ে দিচ্ছে ধরণীর তৃষিত বুক। বিশাল পুকুরটার স্বচ্ছ পানির ভিতরে একটু একটু করে লাল হয়ে সরে যাচ্ছে চাঁদটা। ঝোপের আড়ালে দুটো বনবিড়াল উচ্ছসিত আলিঙ্গনে একে অপরের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে, তাদের কেউ একটু দুরে পালিয়ে যাচ্ছে ত্র অপর সঙ্গীটি আবার এক দৌড়ে গিয়ে তার অভিমান ভাঙ্গার জন্য মুখে মুখ লাগিয়ে আদর করছে।
দক্ষিণের মাতাল হাওয়া কোমল পরশ বুলিয়ে কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। মেঘহীন নীলাকাশের নীলাভ ভাব প্রকৃতিতে মিশে নীল-সবুজের চমৎকার আবহ তৈরি করেছে। ঘোরলাগা আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। হেমন্তের হালকা কুয়াশায় ভিজে আছে সবুজ ঘাস। সামনেই একটা শেফালি ফুলের গাছ। কমলা রঙের ডাটায় সাদা ফুলে শোভিত হয়ে আছে গাছটি। নিচেও যেন কমলা-সাদা চাদর বিছানো। মাতাল করা ফুলের ঘ্রাণে মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে অসহ্য সুন্দর এ প্রকৃতি। আপন সৃষ্টির আলোয় আলোকিত এ ভ’বন। সৃষ্টিকর্মের পরতে পরতে যেমন উৎসারিত হয়েছে নিত্যকার জীবনের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না তেমনি প্রকৃতির সাথে মানব হৃদয়েরও এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। প্রকৃতির মাঝেই আমরা খুঁজে পাই ভালোবাসা ও প্রেমের এক অবিমিশ্র উপাদান। আনন্দিতভাবে বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ। বর্ণিল, সুমধুর, স্বপ্নময় এক জীবন হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রকৃতি ও প্রেম জীবনবোধকে রোমান্টিকতার পরশে বর্ণময় করে তোলে ভরিয়ে দেয় বহুমাত্রিকতায়। সুখ দুঃখের প্রতিটি মুহুর্তকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করে।
মোহন আড়ত থেকে ফিরে দেখে পুকুর পারে কে যেন বসে আছে। ভরা পূর্ণিমার বাঁধভাঙ্গা জোছনায় পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে সে এক অপরূপা রমণীর ছায়া দেখতে পায়। তাই ছায়া নয়, বাস্তব অবয়বের সান্নিধ্য পেতে আবিয়ার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। মোহনকে দেখে আবিয়া ভুত দেখার মতো চমকে উঠে। তারপর মোহনের হাতটা ধরে বলে- আজকের এ অপূর্ব জোছনায়, এই মায়াবি ক্ষণে চাঁদো আকাশের নিচে যেন হারিয়ে যায় র্পথিবী, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সব উজার করা রূপ মাধুরী। কারা যেন সব লুট করে নিয়ে যায় ভালোবাসা।
মোহন অতৃপ্ত নয়নে- আবিয়ার দুটি চোখের গভীরতম অতলে তন্ময় হয়ে অনেক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে না তার স্বচ্ছ দুটি আঁখির মধ্যখানে গিরি প্র¯্রবণ কুÐের স্থির নীল জলের অতলে কোন সবুজ শেওলাজাত কোন মায়া লুকিয়ে আছে। তার কপালখানি যেন তৃতীয়া তিথির ক্ষীণ চন্দ্রের মতো চাপা বর্ণের স্থুল কোন অযাচিত কষ্ট খোদাইকৃত। পাহাড়ের গায়ে ধবধবে সাদা বনমল্লিকার পাপড়ির মতো আবিয়ার প্রতিটি অঙ্গ যেন সদ্য কোন প্রসাধনী প্রক্রিয়া থেকে টেনে বের করা হয়েছে। হাল্কা লিপস্টিক পড়া ঠোঁট দুটো টসটসে রসালো আঙ্গুরের মতো কোমলতায় কালের কোন নীলাভ আভা মাখিয়ে দেয়া হয়েছে। তার সাত জন্মে এমন লাবন্যময়ী ললনা অপরূপ অবয়ব প্রত্যক্ষ হয়েছে কিনা জানা নেই।
এমন করে কি ভাবছেন মোহন ভাই?
ভাবছি নতুন কোন ভাবনার শিরনামে ব্যাকুল হৃদয়ের কথা। দেখেছি তোমার স্বপ্নের সরোবরে ভেসে বেড়াচ্ছে রাজহংস। রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলে পাপড়িতে বসে খেলা করছে। তোমার গোপন অনভ‚তিগুলো রক্তের শিরা-উপশিরা মিশে শিহরণ জাগাচ্ছে। আমি কান পেতে শুনেছি তাদের উপস্থিতির কলোতান। বারবার আহŸান করছে মিলন গাঁথার সুরে।
হঠাৎ করে মোহনের তুমি সম্বোধনে আবিয়া চমকে ওঠে। কিন্তু ঘাবড়ায় না মোটেও। সে জানে মোহনের জীবন তরী একই মোহনার দিকেই ভেসে যাচ্ছে।
মনুষ্য হৃদয়ের জঠিলতম জায়গাটি-যেখানে বসবাস করে জীবনের অনাকাঙ্খিত দুঃখ কষ্ট জ্বালা যন্ত্রণা। আজ তুমি বেড়িয়ে আস আবিয়া, বেড়িয়ে আস সেখান থেকে। আর কোন দিন ফিরবে না সেখানে। কষ্টের পাণ্ডলিপি পড়ে থাক, আর তাকে নিয়ে কোন মাতামাতি নেই, নেই কোন জঠিল হিসেব নিকেশ।
পুকুরের পূর্বধারে কয়েকটি নারিকেল গাছ। গাছের পাতাগুলো পরস্পর মিলে তৈরি করেছে এক বিশাল সবুজের গালিচা। গালিচার উপর পূর্ণিমার চাঁদের আলো এক অদ্ভুত চমক দেয়। তাদের মধ্যে একটি গাছ পুকুরের দিকে হেলে পড়া। হেলানো গাছের ছায়াটি আবিয়ার খুব পছন্দের। সে ভীষণ ভালোবাসত ঐ হেলে পড়া গাছটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।
মোহন বলে-আবিয়া চলো ওই সামনের হেলেপড়া গাছটি আমরা সেখানে গিয়ে তার উপর একটু বসি। আজ প্রকৃতি যেন অকৃপণ হয়ে তার সকল সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে চারিপাশে। নূন্যতম কার্পণ্যতা নেই কোথাও, নেই কোন হিংসা বিদ্বেষ, কি অপূর্ব সৌন্দর্যের সমাহার চারিদিকে।
না মোহন আমার ভয় হয়, ভীষণ ভয়। কেবলি একদিকের, আমি কে? সামান্য, অতি নগন্য এক অর্বাচিন অবলা নারী, কি করে এতোটা স্পর্ধা করি? ভাগ্যহত জীবনের সব স্বপ্ন ধুয়ে মুছে কবে তিস্তার জলে ভেসে গেছে। এখন আর নতুন করে কোন স্বপ্নকে হৃদয়ের মাঝে স্থান দেয়াটা নেহাত বোকামি ও নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়া ছাড়া কিছুই হবে না।
সে তোমার নিজের কল্পনা আবিয়া, কে বলে নারী অবলা? কবি নজরুলের কথা তোমার মনে নেই? তিনিতো বলেই গেছেন-
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।
আবিয়া, তোমার নিজেস্বতায় অনেক আছে, তিক্ষ্ণ বুদ্ধি-বিবেক, ধারাল বিচক্ষণতা সৃষ্টিশীল মননশীলতা। এতো তাড়াাতাড়ি জীবনের হাল ছেড়ে দেবে, হার মেনে নেবেন জীবনের কাছে, এ আমি কি ভাবে হতে দেই বল ?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now