বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২২

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২২ বাড়ির সামনে একটা বিশাল পুকুর। তার দক্ষিণ ধারে পুকুরের পার ঘেসে বেশকিছু ফলজ গাছপালা, তার সাথে দু’চারটা গোলাপ রজনীগন্ধা, একটা হাসনাহেনার গাছ কোমর ভেঙ্গে একেবারে নেতিয়ে পড়েছে পুকুরের পানিতে। পুকুরের পূর্ব দিকটায় বাঁশ বাগান, তার তলে ছোট ছোট কিছু ঝোঁপ-ঝার জায়গাটাকে অন্ধকার করে রেখেছে, তারতলে বিভিন্ন রকম বন্য প্রাণিরা যেন নির্ভয়ে বসবাস করতে পারে। এই ছায়াঘন অন্ধধকারে খেঁক-শিয়ালরা মাটিখুঁড়ে নিজের জন্য গর্ত বানায়, আর হুলো শিয়ালেরা এসে সেই গর্ত দখল করে নেয়। এজন্য বড়শিয়াল ও খেক শিয়ালদের মধ্যে পকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে একটা স্নায়ু যুদ্ধ চলতে থাকে। তবে উভয়ের জাত শত্রু হলো কুকুর, যখন কোন কুকুর এসে তারাকরে তখন জীবন বাঁচানোর তাগিদে এসব শত্রু তার কথা ভুলে সবাই একই গর্তে ঢুকে পড়ে। আজকের সন্ধ্যার বিদায় মুহূর্তটা অসম্ভব সুন্দর লাগছে। নীল আকাশের বুকে হলুদ রঙের বাহারি মেঘগুলো হালকা বাতাসের বেগে ছুটোছুটি করছে। সামনের বাঁশবাগান নীড়ে ফেরা পাখিদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠছে। ঝিঁঝি পোকাগুলো তাদের স্বভাবসুলভ গলা ছেড়ে ঝিঁ ঝিঁ করে ডাকছে। কৃষ্ণচ‚ড়ার ডালে বসে কোনো এক সঙ্গীহারা পাখি বউ কথা কও, বউ কথা কও বলে ডেকেই চলেছে। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে তখনও দেখা যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ গুলো মহাআনন্দে খেলা করছে। সমস্ত বাগান জোনাকির মিটি-মিটি আলোয় ভরে গেছে। মানুষের ভয়ে বের হতে না পারা দু’টো খেঁকশিয়াল কি মনের সুখে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। এসব দেখতে দেখতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে আঁধার নেমে আসে বুঝতে পারে না আবিয়া। মিনু বলে ছোট দাদি আন্ধার হইছে মশাও কামড়েবার নাগচে, চলো বাড়ি যাই। তুই যা, আর শোন, ঘরের জানালা গুলো বন্ধকরে দিস, আমি একটু পরে আসছি। তোমা কি চা খাবেন ছোট দাদি? না থাক, এখন চা খাব না। আকাশটা আজ ভীষণ পরিষ্কার, এক ফোটা মেঘের বালাই নেই কোথাও। চাঁদটা আজ পৃবিীর এতো কাছে এসছে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যাবে। আবিয়া একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ফুলের গাছের কাছে দাঁড়াল। গাছটিতে অসংখ্যা ফুল ফুটেছে আর্শ্চযের বিষয় হলো সে এরকম ফুল এর আগে কখনো দেখেনি। ফুলটা অনেকটা পলাশ ফুলের মতো কিন্তু রং একেবারে কাঁচা হলুদের মতো। এর গন্ধটা ভীষণ চড়া নাকের ভিতর কেমন যেন সুড়সুড়ি দেয়। আবিয়া গাছটির একটা চিকন ডাল ধরে ঠিক চাঁদের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে আর মনে মনে ভাবছে মানুষের জীবনটা কত বৈচিত্রময়। সময়ের সাথে সাথে জীবনের সব কিছুই কেমন জানি বদলে যায়। সে বদলে যাওয়াটা একেক জনার জন্য একেক রকম হয়ে যায়। কারও কাছে সেটা হয় মহা সুখের, মহাআনন্দের আবার কারও কাছে সেটা হয় চরম দুঃখের, চরম দুর্ভাগ্যের। মানুষের জীবনের সাথে চাঁদটার কি আর্শ্চয মিল। মানুষের মতো তারও একদিন জন্ম হয়, আস্তে আস্তে সে বড় হয়। একদিন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হয়, তারপর সময়ের ব্যবধানে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে যেতে একদিন সে হারিয়ে যায়, তলিয়ে যায় অন্ধকারের অতল গহব্বরে। আবিয়ার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই মোহন কেমন অসস্থিতে কালক্ষেপণ করছে। আবিয়া যেন তেল সলতে নিয়েই তৈরি হয়ে জন্মেছে, কেবল একটুখানি আগুনের স্পর্শ পেলেই গোটা দুনিয়া জ্বালে পুড়ে ছারখার করে দেবে। আর সেই কিনা কর্দমাক্ত নর্দোমায় পড়ে জীবনের সবকিছু খোয়ে জঙধরা প্রদীপের মতো অযতেœ পড়ে আছে। তার কোমল হৃদয় ও শরীরের উপর যে অমানষিক অত্যাচার ও নির্যাতন করা হয়েছে তা কোন বিবেকবান মাখলুকাতের পক্ষে সায় দেয়া অসম্ভব। পৃথিবীর কোন সভ্যদেশে এমন অবিচার, এতো জঘন্য কোন ঘটনা এই অবলা মেয়েদের নিয়ে ঘটে কিনা আমার জানা নেই। আজ ইচ্ছে করেই তাড়াতাড়ি আড়ত থেকে চলে আসে মোহন। আবিয়ার সাথে একটু কথা বলতে হবে, কেন এই জীবনকে সে কোন প্রতিবাদ না করে নিবির্ঘেœ মেনে নিল। মনে মনে গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজে কিন্তু আবিয়াকে কোথাও দেখতে পেল না। সামনের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পেল মিনু কোথা থেকে যেন আসছে, তাই হাত দিয়ে ইশারা করে মিনুকে ডাকে- এই মিনু? এদিকে একটু আয়তো? ছোট দাদা মোক ডাকচেন? হ্যাঁ, তোর ছোট দাদি কই-রে? পুকুর পাড়োত বসি আছে। এতক্ষণতো মুইও ছোট দাদির সাথে বসিছিনু কিন্তু খুব মশা কামড়ের নাগছে সে জন্য মুই চলি আসিনু। ও আচ্ছা, ঠিক আছে তুই যা। আবছা আবছা অন্ধকারে মোহন পা টিপে টিপে নূন্যতম শব্দ না করে আবিয়ার পাশে যেয়ে দাঁড়াল। আবিয়া কারও যেন উপস্থিতি টের পেয়ে ভুত দেখার মত চমকে উঠল। শব্দ করার আগেই মোহন বলে- ভয় নেই বুবু আমি মোহন। আবিয়া গলার কাছে জামাটা টেনে নিজের বুকে থুথু দিয়ে বলে-ওহঃ মোহন ভাই, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এ অসময়ে---আমি ভুল দেখছি নাতো? আরে না বুবু, ভুল দেখবেন কেন? ভালো লাগছিলনা তাই বাড়ি চলে আসলাম। আপনি পুকুরপারে হাওয়া খাচ্ছেন, তাই লোভ সামলাতে পারলাম না। ও আচ্ছা বুঝেছি, আপনার ভালো না লাগার কারণটা কি জানতে পারি জনাব? সেটা জানতে পারলে তো আর আপনার কাছে আসতে হতো না ম্যাডাম। আমি নিজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতাম। বাহ! বেশত কবি-সাহিত্যিকের মত ভাবুক ভাবুক ভাব, এটা কিস্তু বেশ। প্রথম প্রেম পিপাসার রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি। প্রেম না ছাই, পাতাহীন বৃক্ষের মতো একতরফা করুণা প্রার্থী। বসন্তে পরাগায়ণের প্রতিক্ষায় অপলক চেয়ে থাকা। ভ্রমরেরা জানতেই পারলনা তার করুণ পরিণতি। অযাচিত প্রেম শষ্যের দানার মতো পরিপূর্ণ হয়ে আবার হৃদয়ের প্রখর উষ্ণতায় চুপসে যায়। ভাটা পড়ে বিশাল শূন্যচর জাগে মনের বেলাভ’মিতে। অযাচিত আগাছায় ভরে যায় সেই উর্বর জমি, কারও অযত্ন আর অবহেলায় সেই আগাছা শুকিয়ে সবুজহীন মরুভুমিতে পরিণত হয়। হায়রে অভাগা মজনু! লাইলিতো জানতেই পারল না তার বেদনা বিলাসী ঐন্দ্রজালিক প্রেমের স্বচ্ছন্দতার ভেতর হৃদয়ের এ সূক্ষ অশান্তি। ইয়ার্কি নয় বুবু, সত্যি আমার মনটা আজ ভালো নেই, তো? আমি কি করতে পারি জনাব? লাইলিকে কি ডেকে এনে দেব? সর্বনাস! তাহলে যে আমাকে সোজা নরকে যেতে হবে। নরক কেন? জীবনে বেঁচে থাকার জন্য কোন না কোন অবলম্বন তো থাকা চাই। যার উপর ভর করে ভবিষ্যতের দিনগুলোকে পারি দেয়া যায়। প্রেম-প্রিতি-ভালোবাসা, মায়া-মমতার দীপ্তিময় সম্ভারে স¤্রাট শাহজাহান গড়েছে ভালোবাসার তাজমহল। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ গড়েছে প্রেমের সিংহাসন। মায়া-মমতার ভেতরে গোলক ধাঁধাঁ তাই সময়ে, অসমায়ে বেজে ওঠে কানাইয়ের সর্বনাসী বাঁশি। প্রেমে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রাধা, ছুটে যায় কদম তলে। আরে বাহ! আপনিত দেখছি আসমা গেগম শীলাকে হার মানাবেন। এতো কিছু আপনার মাথায় আসে কিভাবে? দুঃখিত মোহন ভাই, আমি মনে হয় ছোট মুখে একটু বেশিই বলে ফেললাম। গরিব মানুষের মুখে এসব বেমানান। যারা দু’মুঠো খেতে পারে না, অনাহারে কাটে দিন রাত। ময়লা জীর্ণ বস্ত্র পরিধানের অনপোযুক্ত হলেও করার কিছু থাকে না। পনের টাকার অভাবে বিয়ে হয় দোজবর বুড়োর সাথে। ছিঃ বুবু ওভাবে বললে কিন্তু আমি আর এক মুহুর্ত এখানে থাকবো না। আচ্ছা মোহন ভাই, আর বলব না, দুঃখিত। আচ্ছা বুবু, এভাবে নিজেকে আর কত কষ্ট দেবেন? যা হবার সে তো হয়েই গেছে, এ নিয়ে বাকি জীবনটাকে নষ্ট করে দেওয়ার কোন মানে হয়? কতজনার জীবনে কত রকমেরই না দুর্ঘটনা ঘটে, সে জন্য কি তারা বেঁচে থাকে না? পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণি যে অমৃত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায় এবং বেঁচে থাকে। ছোট্ট একটি উদ্দেশ্য অর্জন না হলে কিংবা প্রিয় মানুষকে না পেলে তার জীবনের কিছু শেষ হয়ে যায় না, যেতে পারে না। মানুষের স্বপ্নতো ছায়াপথের সমান বিস্তৃত। ছোট্ট এক জোড়া চোখের নীড়ে কত অযুতসম স্বপ্ন বোনা থাকে, একনিমিশে তা বিপন্ন হয়ে যেতে পারে না। কবি নজরুল তাইতো বলেছেন-“চিরদিন কার সমান নাহি যায়”। দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। মানুষের কথা জানি না মোহন ভাই, আর কে কিভাবে বেঁচে থাকে সেটা এখানে মূখ্য বিষয় নয়, তবে আমার অবস্থানটা যে আর দশ জনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা সেটা আমি বেশ বুঝতে পারি। এ জন্য আমি জীবনকে নিয়ে ভাবি না বুবু, অতসত ভাবার অবকাশও পাই না। আমার কেন জানি মনে হয়, আমার দ্বারা সংসার নামের সেই জঠিল জায়গায় অবগাহন করা সম্ভব নয়। তাহলে কি করবেন? সন্ন্যাসী হয়ে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবেন? এটা কিন্তু বেশ মানাবে আপনাকে। পরনে গেরুয়া রঙের আলখাল্লা, মাথায় জঠবাঁধা চুল, গলায় বড়বড় কাঠির মালা, মুখভর্তি দাড়ি-গোফ। হাতে এটা একতারা আহ! কি অসাধারণ লাববে দেখতে। তাই নাকি? আপনি এর মধ্যেই লিওনার্দ দা ভিঞ্চিরি মতো মনে মনে ছবি এঁকে ফেললেন? তবে সেটাও হয়তো বা সম্ভব নয় বুবু। দেখি না কেন, শেষ পর্যন্ত জীবনের এ ভাসমান তরী কোথায় যেয়ে ভেড়ে। মোহন ভাই, আপনি এতো সুন্দর করে স্পষ্ট ভাষায় সাজিয়ে গুজিয়ে কথা বলতে পারেন, আমি মুগ্ধ হয়ে যাই আপনার কথা শুনে। আপনার মাঝেও যে একটা পাগল পাগল ভাব আছে, একটা উদাসী মন আছে, সেটা কিন্তু বাহ্যিক অবয়বে প্রকাশ পায় না। এখানে এই নির্জনে, নীরবতার মাঝে আপনাকে না পেলে হয়তো কোন দিনই সেটা জানতে পারতাম না। আরে না বুবু, আপনি যতোটা ভাবছেন তার সিকি অংশের ধারে কাছেও আমি নই। বিভিন্ন গল্প উপন্যাসের বই পড়তে পড়তে যা মুখস্ত হয়ে গেছে তাই একটু আধটু মুখ ফসকে বেড়িয়ে পড়ে, এই যা। মোহন ভাই, আপনি পড়াশোনা করে চাকরি-বাকরি করতে পারতেন? আপনার তো আর অর্থের অভাবে পড়া শোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আরে ম্যাডাম, গ্রামে স্কুলের যে অবস্থা, ঘর আছে তো দুয়ার নাই, ছাত্র আছে তো মাস্টার নাই। সেখানে আবার পড়া-শোনা? আর আমাকে বাইরে পাঠিয়ে পড়া-শোনা করাবে কে শুনি? পড়া-শোনার খরচই বা দেবে কে? এ জন্যই আমি পড়া-শোনা বাদ দিয়ে ব্যবসায়ের খাতায় নাম লিখিয়েছি। মোহন ভাই, দেখেন একটা ছেলে আর মেয়ের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার কি বিশাল তারতম্য করে রেখেছে। ছেলে হয়েছেন বলেই আপনি জীবনের একটা কঠিন সিদ্ধান্ত কতো সহজে একাই নিতে পেড়েছেন। অথচ আমি মেয়ে হয়েছি বলে আমার জীবনের নিজেস্ব কোন সিদ্ধান্ত নেই, কোন মতামত নেই। জীবন আমার আর সিদ্ধান্ত নেবে অন্যরা। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবে একজন মেয়েকে মাথা পেতে নিতে হবে। হায়রে অভাগী জীবন, এরই নাম কি বেঁচে থাকা? সব দোষ শুধু মেয়েদের বেলায় যেমন, মা-বাবার কথা না শুনলে কুসন্তান, কুলাঙ্গার, মুরুব্বীদোর কথা না শুনলে বেয়াদব, স্বামীর কথা না শুনলে অপয়া, ব্যভিচারিনী, শাশুরী ও ননদের কথা না শুনলে ডাইনী আরও কতো কথা যে শুনতে হয় তার কোন হিসেব নেই। মধ্যবয়সের টানাপোড়েন, সহজাত ভাবনা কল্পনার ব্যবচ্ছেদ, একাকীত্বের ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গতা সবকিছুর ভিতর দিয়ে জীবন চলে একাকী। হৃদয়েতে পথ কেটে সে পথ ধরে এগিয়ে যায় ঠিক হিসেব কষে। কারণ ততদিনে এতটুকু বুঝেছি, বাড়-বাড়ন্ত বোধ কখনো প্রকাশিতব্য নয়। তাই তো চুপসে গিয়েছি নিজের ভেতর ঠিক দম দেওয়া বেলুনের মতো ; নয়তো সমাজ আঙুল তুলবে, পরিবার চোখ রাঙাবে, প্রিয়জনেরা শঙ্কিত হবে। মোহন আবিয়াকে ঈষৎ আবেগে বলে-ছিঃ বুবু এতো হতাশ হয়ে পড়তে নেই? একদিন দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে, সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই এই কালো মেঘ কেটে যাবে, পূর্ব দিগন্তে ঝলমল করে উঠবে নতুন সূর্য। পৃথিবীটা আলোয় আলোয় ভরে যাবে। জীবনের দুঃসময় বেশীদিন থাকে না। দুঃখ যন্ত্রণা সয়ে সয়ে মানুষ খাঁটি সোনা হয়। আপনিও হয়তো তাই হয়েছেন এখন শুধু অলঙ্কার হওয়ার বাকি। এক সময় দেখবেন সেই অলঙ্কার হয়ে কোন সৌভাগ্যের গলায় শোভা পাচ্ছেন। পৃথিবীর লক্ষ-কোটি আবিয়া এভাবে কঠিন থেকে কঠিনতর জীবনের ভিতর দিয়ে নিজেকে পরিবর্তিত করে নিস্তার খুঁজে পেয়েছে। সিদ্ধ হস্তের কঠিন বন্ধনে মিলনের রাখিতে নিজেদের সৌভাগ্যকে গড়ে তাজমহলের রূপ দিয়েছে। এতোবড় সৌভাগ্য নিয়ে আমার জন্ম হয়নি মোহন ভাই? অলঙ্কার হয়ে সৌভাগ্যের গলায় শোভা পাওয়া আমার কাজ নয়। সে অন্যকারও হতে পারে। মোহন ভাবে পৃথিবীর লক্ষ-লক্ষ কোটি কোটি মেয়ের মধ্যে আবিয়া শ্রেষ্ঠ, সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ কষ্ট তার অনুভুতিশীল হৃদয়ের কাছ থেকে যে করুণা চায়, যে বেদনা চায়, আনন্দ উপশমের মত মনে হত যে গুলো তার নিজেস্ব সত্বায় পরিপূর্ণ। এর জন্য শুধু একটা আশ্রয়, একটা শৃঙ্খলা, জীবনের কাছ থেকে একটা মমতামুগ্ধ ¯েœহপূর্ণ ব্যবস্থা আহরণ করে নেবার জন্য এরই আশা-আশ্বাস পরিতৃপ্তি প্রাণ ভরে কাম্য। জীবনের সমস্ত করুণা আবিয়াকে দিয়ে দিয়েছে মোহন, এর জন্যই তার এতোটা ব্যথা, এতোটা কষ্ট, এতোটা সহানুভুতি। তিনকুড়ি খাঁর জন্য রাতের খাবার টেবিলে সাজিয়ে রেখে রহিমা ঘুমিয়ে পড়ে। সারারাত সে অঘোরে ঘুমায়, সকাল বেলা যখন তার ঘুম ভাঙ্গে তখন দেখে তার বুকের উপর বুড়ো স্বামীর একটি হাত, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রহিমা বলে- হায়রে বেচারা! কি প্রয়োজন ছিলো তোর এই বুড়ো বয়সে এসে আবিয়ার মতো একটি নব যৌবনা ষোড়শী যুবতীর জীবনটাকে নিয়ে ছিনি-বিনি খেলার। বিয়ের কতো বছর পার হয়ে গেলো একটা সন্তান সে জন্ম দিতে পারলো না, আর একটার পর একটা বিয়ে করে গরিব অসহায় জোয়ান মেয়েদের জীবনটাকে নষ্ট করে দেয়। স্ত্রির অধিকার নিয়ে তার উপর অত্যাচার করে, মারধোর করে। অবৈধ টাকার জোরে যা নয় তাই করে বেড়ায়। মোহন সকাল বেলা গোসল সেরে শার্ট প্যান্ট পড়ছে আড়তে যাওয়ার জন্য। রহিমা ডাকল-এই মোহন? এ্যাকমুঠ গরম ভাত খ্যায়া যা, কখন যে বাড়ি আসির পাইস তার তো ঠিক-ঠিকানা নাই। আচ্ছা বুবু-এই বলে-মোহন খাওয়ার ঘরের দিকে যেতে হঠাত তার দৃষ্টি চলে যায় আবিয়ার ঘরে। আবিয়া তখন ডান হাতে একটা চিরুনি নিয়ে পিছনের চুলগুলো বুকের সামনে এনে আনমনে আঁচড়াচ্ছিল। তার অনাবৃত বুকে কালো কেশের ঢেউ যেন বর্ষার পানিতে নবযৌবন প্রাপ্ত নদীর মতো ফুঁসে ওঠে। আর একটু হলে, একটু সুযোগ পেলে যেন পৃথিবীর সব কিছুকেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আবিয়ার দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল মোহন হঠাত একটা খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। মাথায় তার একটু জোরেই আঘাত লাগে। অনাকাঙ্খিত ভাবে মুখ ফসকে বেড়িয়ে যাওয়া উহঃ শব্দটি আবিয়ার কান পর্যন্ত পৌছে যায়। অমনি হাতের চিরুনিটা ফেলে দিয়ে আবিয়া দৌড়ে এসে মোহনের মাথায় হাত দিয়ে বলে দেখি দেখি মোহন ভাই কোথায় লাগল দেখি? আরে না ছোটবুবু কোথাও লাগেনি, এমনিতেই একটু অসাবধানতা বশত খুঁটিটার সাথে ধাক্কা লেগেছে। একটু সাবধানে চলতে পারেন না? এখনই তো একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত? আরে না ছোট বুবু, এরকম একটু আঁধটুতো সারাদিনে কতবার হয়, এ নিয়ে এত ঘাবড়াবার কি আছে। ও আচ্ছা, তাই নাকি? এই বলে আবিয়া মোহনের শার্টেও উল্টে যাওয়া কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে বলে একটু সাবধান হয়ে চললে তো আর দোসের কিছু নেই। রান্না ঘরের দরজা থেকে রহিমা তাদের দু’জনাকে খুব কাছা-কাছি দেখে প্রথমত একটু ঘাবড়ে যায় কিন্তু পরক্ষণে এই ভেবে সান্তনা পায় যে আবিয়ার মতো একটা নিস্পাপ মেয়ের জীবনতো আর এভাবে নষ্ট হতে পারে না। সে যদি কাউকে অবলম্বন করে বাঁচতে চায় তাতে তো আর দোষের কিছু নেই। মোহন যেন তাকে দেখতে না পায় সেই জন্য সে দ্রæত ঘরের ভেতরে চলে যায়। মোহনকে উদ্দেশ্য করে আবিয়া বলে- এদিক দিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছিল জনাব? বুবু খেতে ডাকছিলেন, তাই খাওয়ার ঘরে যাচ্ছিলাম। এমনটি হবে ঠিক বুঝতে পারিনি। ও আচ্ছা, বুঝেছি। মোহন ফিস্ ফিস্ করে বলে-কাঁচা কলা, আপনি কিছুই বুঝেন নি। আবছা আবছা করে হলেও সে আওয়াজ আবিয়ার কানকে ফাঁকি দিতে পারে নি। তাই আবিয়া আবার প্রশ্ন করে বসে- কি যেন বললেন? না কিছু না, এমনিতেই। সেটা আবার কি? আরে বাদ দেন তো ওসব চলেন, বুবু হয়ত অপেক্ষা করে বসে আছে। রহিমা মোহনকে খেতে দিয়ে আবিয়াকে বলে-আবিয়া তুইও এ্যাকনা খ্যায়া-নে। তোর আবার ওষুধ খাওয়া নাগবে। খালি প্যাটোত তো আর ওষুধ খাওয়া যাবে না। না বুবু থাক, মুই তোমার সাথে খাইম এ্যালায়। আরে পাগলি, সময় মতো ওষুধটা খাওয়া নাগবে না? তা হবে, এলাও মেলা সময় আছে। এ্যাকনা পরে খাইলে কিছু হবে না। মোহন মাথা নিচু করেই খাওয়া শেষ করে বললো- বুবু মোর ফিরতে দেরি হবে। কোন খরচপাতি লাগবে কি? না আজ তেমন কিছু লাগবে না, তবে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার চেষ্টা করিস, কারণ যা দিনকাল পড়ছে, তুই ঘরে না ফেরা পর্যন্ত মোর চিন্তার অন্ত থাকে না। তুই অযথাই চিন্তা করিস বুবু? মুই মেয়ে মানুষ নাকি যে, মোর জন্য তোক এতো চিন্তা করির নাগবে। আড়তের হিসেব-নিকাশ শ্যাষ না করি কি মুই আসির পাঁও? রহিমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে এবার আবিয়া বলে- আচ্ছা ঠিক আছে, তবে এতো কিছু বলার দরকার কি? আপনি কাজ শেষ করেই বাড়ি চলে আসবেন, অন্য কোথাও দেরি না করলেই হলো বেশ। মিনুর মা রহিমাকে ডাকলে সে ঘরে চলে যায়। এই সুযোগে মোহন আবিয়াকে বলে-আপার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খুবত মাস্টারি করলেন? কেন আমি কি ভুল কিছু বলেছি জনাব? আমি মানি যদিও সেটা অনাধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়ে তার পরেও তো নিজেস্বতা বলতে একটা কিছু থাকে? আপনার এতো কঠিন কথা আমি বুঝি না, তবে কাজ ছাড়া আমি কখনোই বাইরে থাকি না এটা আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি। থাক, সেটা আর আমাকে বলতে হবে না, বড় বুবুকে নিশ্চিত করে বললেই হবে। মোহন চলে যওিয়ার পর আবিয়া একা একা ভাবে, আমার মতো হতচ্ছাড়া একটা গরীব ঘরের মেয়ের এতটা আবেগ! বিয়ের পর একটা বুড়োর হাত ধরে সংসার করা, জীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায় আনন্দের চেয়ে কষ্টের ভাগটাই অনেক বেশী। দিনের পর দিন কষ্টের ক্ষতগুলোতে ভবিষ্যতে শুভক্ষণের প্রত্যশায় সান্তনার মলম লাগিয়ে একেবারে দম বন্ধকরে থাকার মতো অবস্থা।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৭ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now